| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আরাফাত মুন্না*
পাঠকপ্রিয়তা কোন সাহিত্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।সত্যিকারের সাহিত্য হয়ে উঠতে হলে তা পুরোপুরি শিল্পগুন বজায় রেখে লিখতে হয়।তবে আমি মনে করি,পাঠকরা ভাল লেখাটাই বেছে নেয়।
ঘরের কোনায় ছোট্ট একটি গর্তে বাবা-মার সাথে বাস করে রেটি। দুষ্টুমিতে ও বেশ পটু। গর্তের সব ইঁদুরকে ক্ষণে ক্ষণে জ্বালিয়ে বেড়ায়। গর্তের এ পাশ থেকে ওপাশে সারাদিন দৌড় আর লাফ-ঝাপ। ওর বয়সী অন্যান্য ইঁদুররা কিন্তু ওকে বেশ ভয় পায়। ছোট্ট ইঁদুরেরা ওকে দেখলেই ভয়ে মায়ের আড়ালে গিয়ে লুকোয়। সবার উপর সে জোড় খাটাতে চেষ্টা করে। ওর কথা না শুনলেই হয়েছে কাজ, মেরে একেবারে তুলোধুনো করে দেয়। তাই প্রায়ই ওর নামে রাজা কিকির কাছে নালিশ যায়। রাজা রেটিকে অনেক ভালবাসে। সে মাঝে মাঝে গর্ব করে বলে, ‘আমার রাজ্যে রেটির মত অমন সাহসী ইঁদুর খুঁজে পাওয়া কঠিন। বড় হলে আমি ওকে ইঁদুর বাহিনীর প্রধান বানাব।’ দুষ্টুমির জন্য রাজা তাকে মাঝে মাঝে বকা-ঝকা করলেও, তার দুষ্টুমি মোটেই কমত না। বরং এ ব্যাপারটা ওর কাছে আরো উৎসাহের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত।
গর্তের ভিতর রেটির এত দাপট থাকলেও এ কয়েকদিনের জীবনে তার এখনো দেখা হয়নি গর্তের উপরে কি আছে! কত চেষ্টা করেছে সে গর্তের উপরের পৃথিবীটাকে দেখতে কিন্তু প্রতিবারই বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার বাবা। সে তার বাবাকে ভীষণ ভয় পায়। বাবা চোখগুলো বড় করে যখন ওর দিকে তাকায় তখন ওর আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে যায়। দুষ্টুমি করতে গেলেই তার মনে পড়ে বাবার কঠিন চেহারাটা। তার এ বাবা ভীতিকে অন্যান্য ইঁদুরেরা বেশ কাজে লাগায়। তাই তাদের কোন অভিযোগ থাকলে তার বাবার কাছে এসে নালিশ করে । তখন তো তার একেবারে নাজেহাল অবস্থা করে দেয়। কিংবা ভীতু ইঁদুরেরা, ‘তোর বাবার কাছে নালিশ করব কিন্তু’বলে ওকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এ জীবনে সে একমাত্র বাবাকেই বেশি ভয় পায়, নইলে অন্য কাউকে পাত্তাও দেয় না। তবে ওর মা-মনিটা অনেক ভাল। বাবার হাত থেকে তাকে একমাত্র বাঁচাতে পারে তার মা-মনিই। তাই সে মাকে ভীষণ ভালবাসে।
একদিন পড়ন্ত বিকালে সবাই যখন রাজার সভায় আড্ডা দিতে গেছে এমন সময় রেটি বেশ ভাল একটা সুযোগ পেয়ে যায়। রেটি কিছুটা ভয়ে আর উত্তেজনায় গর্তের ভিতর থেকে চুপি চুপি পা ফেলে গর্তের বাইরে চলে আসে। বাইরে এসে অবাক বিস্ময়ে সে সবকিছু দেখতে থাকে। এতদিন সে গর্তের ভিতরটাকে কত বিশাল মনে করত, এর বাইরে আরো যে বিশাল জগৎ আছে তা তার ধারণাই ছিল না। কিন্তু এখন তার ভুল ভেঙ্গে গেছে। সব কিছু তার কাছে বিশাল বিশাল মনে হচ্ছে। সে যত দেখছে ততই অবাক হচ্ছে। গর্তের ভিতরটাকে পুরোপুরি ঘিঞ্জি মনে হতে লাগল। এত বিশাল জায়গা ছেড়ে ওই ছোট গর্তে থাকার কোন মানে সে খুঁজে পায় না।
এখানে এসে সে মাটিতে বিভিন্ন ধরনের শস্যকনা, একটি থালায় কিছু ভাত ও পুরনো কিছু পিঠা দেখতে পেল। রেটির ক্ষুদ্র জীবনে এত খাবার একসাথে সে কখনো দেখেনি। সে কুঁড়িয়ে কুঁড়িয়ে শস্যদানা খেতে লাগল। সে যখন খাওয়ার তালে ব্যস্ত এমন সময় সে দেখতে পেল বিশাল বড় আজব এক প্রানী। তাদের মতোই সারা শরীরে লোমে ভরা। তবে দেখতে সাদার ভিতর কালো ছোপ ছোপ। পায়ে ধারাল নখ। চোখে হিংস্র দৃষ্টি। মুখের দুপাশে বড় বড় গোফ। প্রাণীটিকে দেখেই রেটি ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। তার হৃদপিন্ড ঘড়ির কাটার মত টিক টিক করতে লাগল। সে বুঝল, বাবার কথা না শুনেই তার এ অবস্থা হয়েছে। কি করবে সে বুঝে উঠতে পারল না। তাছাড়া তাকে সাহায্য করার জন্য সাথে কেউ নেই।
সে যখন এসব ভাবছে তখন প্রাণীটি ভয়াল মূর্তি নিয়ে থাবাটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিল। সে তাড়াতাড়ি সরে পড়লেও, থাবার কিছুটা আঘাত তার পিঠে গিয়ে পড়ল। এবার প্রাণীটা আরো ক্ষেপে গেল, ঘোঙ্গানিতে বুঝা গেল। রেটি ভয়ে একটা কোণায় গিয়ে ঢুকলো। কোণাতেও থাবা ঢুকানোর বার বার চেষ্টা করতে লাগল প্রাণীটা। আর একটু হলে ধরেও ফেলত। কিন্তু এমন সময় সে দেখতে পেল তাকে বাঁচানোর জন্য তার বাবা এগিয়ে আসছে। বাবাকে দেখে সে আরো বেশি ভয় পেয়ে গেল। তার বাবা বিড়ালটা থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে বিড়ালটার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। বিড়ালটা ভয়ঙ্কর দৃষ্টি নিয়ে তার বাবার দিকে তাকাতেই একজন এসে তাকে নিরাপদভাবে গর্তে নিয়ে গেল।
এমন অভিজ্ঞতা রেটির জীবনে আর কখনও ঘটেনি। তাই সে এতই ভয় পেয়ে গেল যে, ঠিকমত কথাই বলতে পারল না। বাবার জন্য তার ভীষণ রকম চিন্তা হল, যদি আবার............। ভাবতেই তার শরীরটা নাড়া দিয়ে উঠল। নিজের উপর ভীষণ রকম রাগ হতে লাগল। কেন যে গর্তের বাইরে গেলাম, রেটি নিজেই অনুতপ্ত হয়।যদি জানতাম গর্তের বাইরে অত বড় ভয়ঙ্কর দৈত্য থাকে তাহলে জীবনেও যেতাম না। কিন্তু কই কেউ তো আমায় এ সম্পর্কে কিছু বলেনি। রেটি নিজে নিজেই ভাবতে থাকে। কেউ বলেনি বলে সবার উপরও রাগ হতে লাগল।
অনেক সময় পার হয়ে গেছে কিন্তু রেটির বাবা এখনো ফিরে আসেনি, তাই সবাই বেশ চিন্তিত। অনেকে খোঁজ করতে উপরেও গিয়েছিল কিন্তু তার বাবার কোন দেখা পায়নি। কেউ কেউ ভাবল বুঝি মরেই গেছে। তার বাবার না আসা নিয়ে সবাই রেটির উপর রাগ ঝাড়তে লাগল। পারলে কেউ কেউ তাকে মেরেই ফেলে এমন অবস্থা। নিকের মত নগন্য ইঁদুরেরাও এসে কিনা বলে, এমন ছেলে থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল। আমি হলে কখনো বিড়ালটার হাত থেকে রক্ষা করতাম না। রেটি এতক্ষণ পর জানল যে প্রাণীটার নাম বিড়াল। বিড়ালটাকে একটা উচিত শিক্ষা দিবে বলে ভেবে রাখল।
এক সপ্তাহ হয়ে গিয়েছে রেটির বাবার আসার নাম নেই এখনো। তার বাবার মৃত্যু নিয়ে সবার মধ্যে আর কোন সংশয় নেই। সবাই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে, সে পরলোক গমন করেছে। রেটি এসব বিশ্বাস করে না। তার ধারণা তার বাবা আজ হোক কাল হোক ফিরে আসবেই।
কিন্তু অবাক ব্যাপার, তার বাবা সত্যিই ফিরে এল একদিন। কোন ক্ষতি হয়নি তার, পুরো সুস্থ। তার এ পরলোক থেকে আগমনে সবাই বিস্ময়ে হতবাক। রেটি ভাবল, তার বাবা বুঝি তাকে মারবে কিন্তু না বরং তার জন্য নানা শস্যদানা নিয়ে এসেছে।
সবার ভিতর গভীর বিস্ময় জমা হয় রেটির বাবাকে নিয়ে। সবাই বিস্ময় হতবাক হয়ে জানতে চায়, কিভাবে ফিরে আসলে গো ? বিড়ালটা তোমার কিছুই করেনি? এতদিন কোথায় ছিলে? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। তার বাবা বলল, এত প্রশ্ন একসাথে করলে হয় কিভাবে! পুরো কাহিনী বলছি তাহলে সব উত্তর পেয়ে যাবে। তারপর বলা শুরু করল, বিড়ালটা যখন আমার উপর আক্রমন করল আমি তখন প্রানপণে দৌড়ে দেয়ালের একটা ফোঁকড় দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাই। কী করব ভাবছি এমন সময় দেখা হয়ে গেল মাসির সাথে। তাকে সবকিছু খুলে বলাতে আমায় সাথে করে বাড়িতে নিয়ে গেল। এতদিন আমি তার বাড়িতেই ছিলাম। সবাই বেশ মনোযোগ সহকারে শুনতে লাগল রেটির বাবার কথা। রেটিও ভাল ছেলের মত পাশে বসে রইল। তারপর সে আবার শুরু করল, গর্তে অনেকবার আসার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। হতচ্ছাড়া বিড়ালটা গর্তের মুখ থেকে সরতেই চায় না। তাই এতদিন সুযোগের অপেক্ষা করে দেরি হয়ে গেল।
©somewhere in net ltd.