নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সৃস্টির আনন্দে ছুটে চলা.......

আরাফাত মুন্ন++

হুমম

আরাফাত মুন্ন++ › বিস্তারিত পোস্টঃ

সুড়ঙ্গ বন্দী

১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ দুপুর ১২:২১

এক



লাজ-লজ্জা, অপমানহীন একটা মানুষ ভাবা যায়! আমাদের ক্লাসে রনিটা ঠিক তেমন, হোমওয়ার্ক করে আনেনি বলে বিষু স্যার ওকে পা ওল্টিয়ে মাথা নিচ দিয়ে দেয়ালে আটকে থাকার শাস্তি দিয়েছেন। এই শাস্তির পরও ওর কোন ভাবান্তর নেই। ক্লাসে বসে আমাদের সবার যেখানে হার্টবিট শুরু হয়ে গেছে (কখন কার ভাগ্যে এই শাস্তি জোটে) ও সেখানে পা নাচিয়ে বান্দর নাচের মতো আমাদের হাসানোর চেষ্টা করছে। ওর উপর রাগটা কী পরিমানে উঠছে স্যার না থাকলে বুঝিয়ে দিতাম!



বিষু স্যারকে আমরা যমের মতো ভয় পাই। স্যারের ক্লাসে একটু অমনোযোগী হলেই ধরা। স্যার যাদু জানেন কিনা জানি না, কোন ছেলে বা মেয়েটা তার পড়ায় মন দিচ্ছে না সাথে সাথেই বুঝে ফেলেন। সেদিন আমি ক্লাসে বসে জানালার দিকে তাকিয়ে ‘শরৎ চন্দ্রের’ বেচারা দেবদাসকে নিয়ে ভাবছিলাম। কাল রাত্রে সদ্য উপন্যাসটা শেষ করেছিলাম কিনা। এমন সময় দেবদাসের পন্ডিতের মতো বিষু স্যার আমার কান টেনে বললেন, “হতচ্ছাড়া কোথাকার! পড়ায় মন না দিয়ে কার কথা ভাবা হচ্ছে? হু!”



আমি থত্মত খেয়ে বললাম, “সত্যি বলছি স্যার, কোন কারো কথা ভাবিনি!”

এতে হাসার কি আছে আমার জানা নেই কিন্তু পুরো ক্লাস হেসে তোলপার হয়ে গেল। রাগে আমার গা ঝা ঝা করতে লাগল। ভাগ্যিস, স্যার চুপ করতে বললেন নইলে নিজেই গলা ফাটিয়ে চুপ করাতাম। সামান্য এই অপরাধের শা¯িত হিসেবে আমার কপালে জুটল, স্কুল মাঠে মাথা পায়ের নিচে দিয়ে এক ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকা। সেদিন আমার কি অবস্থা হয়েছে বলার মতো নয়! সিনিয়র জুনিয়র সবাই আমায় দেখে মুখ টিপে হেসেছে। এখনো দেখা হলে কেউ কেউ সে কথা স্মরণ করে হাসে।



সেদিন থেকে ভাবলাম, স্যারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করব। নজরুল যেমন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কবিতা লেখা শুরু করেছিল আমিও তেমনি স্কুল ম্যাগাজিনে স্যারের বিরুদ্ধে আগুন-জ্বালা সব কবিতা লেখা শুরু করলাম। তবে কবিতায় স্যারের নাম উল্লেখ করার সাহস পাইনি। ইনডাইরেক্টলি লিখেছি, উপমা দিয়ে। স্যার বুঝতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে। মাথাধরা অংকের টিচার, বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞান থাকলেই তো?



আমার কবিতার কারণে কিংবা অন্য কারণে জানি না আমাদের স্কুলে আত্মস্বীকৃত সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাত ‘লতফ শাহম’ স্যার আমায় ডেকে পাঠালেন। স্যারের নাম দেখে চমকে উঠার কিছু নেই। আসলে স্যারের আসল নাম “লতিফুজ্জামান শাহ আলম”। কিন্তু সাহিত্যিকদের নাম নাকি কাব্যিক হতে হয় তাই স্যার পরিবর্তন করে ‘লতফ শাহম’ রাখেন। স্যারের ভাব ভঙ্গিতেও পুরো কবি। সাদা পাঞ্জাবী, একটা চটের ব্যাগ আর গরম ঠান্ডা যাই হোক একটা চাদর সবসময় শরীরে জড়িয়ে রাখেন। স্যারের রুমে যেতেই আমায় সাদরে বললেন, “এসো হে এসো, হৃষ্ট চিত্তে বসো!”

তারপর স্যার আতঁকে উঠে বললেন, “একি! তোমার চেহারায় তো কবিত্বের চিহ্ন নেই। মনের ভিতর ভেজা আবেগটুকুও তো দেখতে পাই না।”

চেহারায় কবিত্বের চিহ্ন ভেসে উঠে কিনা আমার জানা নেই। আর আবেগ যে শুধু ভেজা হবে তার শর্তই বা কে দিয়েছে? গরম, ঠান্ডা, ভেজা, নাতিশীতোষ্ণ ও হতে পারে।

স্যারের কথার কি উত্তর দেব ভেবে না পেয়ে বললাম,“স্যার আমি কিন্তু আপনার কবিতা খুব পছন্দ করি।” কথাটা বলে বোধ হয় ভুলই করলাম।

স্যার বেশ ভাব নিয়ে বললেন, “সেটা তো করতেই হবে। বাংলা সাহিত্যের বর্তমান বলতেই তো আমরা। চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ঞকীর্তন আর রবিঠাকুরের যুগ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। আমার কাব্যের উপমা, ছন্দ, অলংকার সেসব থেকেও নাকি অনেক উঁচু মানের বলে, অনেক পন্ডিত মনে করেন। ”

পন্ডিতগুলো যে কে একটু জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু সাহস পেলাম না।

তারপর আবার বললেন, “তুমি কি আমার ‘নোনা জলে পদ্ম’ কবিতাটা পড়েছ? অসাধারণ এক কবিতা। বাংলা সাহিত্যে সোনার তরীর পরে স্থান দেয়া যায়। তোমাদের মত বালকদের নিয়ে ‘গাঁধাবেলা’ নামে একটা কবিতা লিখেছিলাম। দাঁড়াও শুনাচ্ছি-

মেিস্তষ্কের আহ্বানে

ছেলেগুলো হচ্ছে গাঁধা,

গাঁধাবেলার অনন্ত সুপ্রাতে

পরীক্ষার খাতা সাদা।



কি কেমন হল?বাংলা সাহিত্যে এমন কয়টা কবিতা আছে, হ্যাঁ?”

আমি খুব জোড় দিয়েই বললাম,“একটাও না। বাংলা সাহিত্যে এত নিপাতে যায়নি !”

শেষ কথাটা বোধ হয় লক্ষ্য করেননি। তাই খুশি হয়ে গেলেন।

স্যারের এমন উদ্ভট কবিতা শোনার চেয়ে মুক্তি পেলে বাঁচি।

তাই স্যারকে বিনীতভাবে বললাম,“আমায় কি জন্য ডেকেছেন স্যার?”



এবার বোধ হয় স্যারের ভাব একটু ভাঙ্গল। তারপর গলা খেকড়ে বললেন,“হ্যাঁ, যা বলছিলাম, তুমি স্কুল ম্যাগাজিনে যে সব কবিতা লিখেছ তা কবিতা না বলে কপিতা বলা ভাল। বিদ্রোহী কবি মানে নজরুল, শেলী। ওদের ভাব , বাক্য নকল করার কোন মানে হয় না। নকল করে কবি হওয়া যায় না, বুঝলে বাছা। সৃজনশীলতাই হচ্ছে কবিতার মূল শক্তি।এই দেখনা আমাকে,সৃজনশীলতার কতো উদাহরণ রেখে যাচ্ছি। আর তুমি তো আমার কবিতা পড়েছ, সৃজনশীলতার অনন্য উদাহরণ।”

আমার তখন ইচ্ছে করছিল জিজ্ঞেস করি, স্যার আপনি নজরুল আর শেলীর কয়টা কবিতা পড়েছেন? তবে এটা ভেবে বেশ গর্ব হল, আমার কবিতা নজরুলের মতো।

আসার সময় স্যার ডাইরীর একটা পাতা ছিড়ে নিজের স্বাক্ষর দিয়ে বললেন, “আমি জানি তুমি আমার অটোগ্রাফ চাইতে। মুখ ফুটে বলতে পারছ না। তাই নিজেই দিয়ে দিলাম। তাছাড়া অন্য সময় আসলে নাও পেতে পার। জানই তো কবিদের আশেপাশে ভিড় লেগেই থাকে।”









দুই



স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে মেজাজটা পুরো বিগড়ে গেল। স্যারের কথাবার্তায় কবিতা জিনিসটা নিয়ে আমার ভেতর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ শুরু হয়ে গেল। কবি হিসেবে জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেমন ছিলেন ভাবতে লাগলাম। ভেবে পেলাম যে, আধুনিক কালে কেউ কবি হতে পারে না, যারা এদিকে একটু-আধটু এগিয়ে যায় তারা মূলত ভাবের কবি। সুকান্ত, নজরুল, জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ এরাই মূলত আসল কবি। কবিতার নিগূঢ় কথা ভেবে নিজের মনকে কুসাহিত্য থেকে রক্ষার চেষ্টা করলাম।



সাহিত্যের এপাশ-ওপাশ ভেবে আমি যখন সাড়া হচ্ছি তখন স্কুলের বারান্দায় আমার সাথে দেখা হল পেতিœর চেয়েও ভয়ঙ্কর নিশির সাথে। পেতিœর মতো ওর কোন স্বভাব ছিল কিনা জানি না তবে আমার পেছনে লেগে থাকত বলে ওর সাথে দেখা হওয়া মানে ভূত পেতিœর সাথে দেখা হয়েছে বলে মনে হতো। স্বুলের অন্য কোন ছেলের সাথে ওর কোন দ্বন্দ বিরোধ নেই, যত ঝামেলা আমার সাথে। আমিও তাই এ মেয়ের পাশ কেটে চলতাম । কিন্তু আমি যত এর পাশ কাটি এ তত আমার পাশে আসে।



আমাদের স্কুলে ও মাত্র নতুন এসেছে, তিনমাস হলো। এর ভিতরে পুরো স্কুল মাথায় করে নিয়েছে। সকল স্যারের প্রিয় ছাত্রী এই পেতিœ নিশি। ক্লাসেও স্যাররা এই মেয়ে ছাড়া আর কাউকে চিনে বলে মনে হয় না। কিছু হলেই স্যার বলবে,‘নিশি মা, একটু এদিকে আয় তো’। ‘নিশি, এই ছেলেগুলোর পড়া ধরতো।’ আমরা চার বছর এই স্কুলে পড়েও স্যারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলাম না, আর ও তিনমাসেই স্যারদের মধ্যমনি হয়ে বসেছে! এই মেয়ের জন্য আমার স্কুল লাইফ পুরো বরবাদ হওয়ার অবস্থা। কেউ কেউ ভাবছে ও নাকি আমার প্রথম স্থান কেড়ে নিবে। অবশ্য সবার ভাবনাটাকে আমি উড়িয়ে দিতে পারি না। আমার নিজের ভিতরও এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে, এ মেয়ের দ্বারা সব সম্ভব।



আমার হাতে ছিল সদ্য ‘লতফ শাহম’ স্যার থেকে প্রাপ্ত তার বিনামূল্যে অটোগ্রাফ। ছিড়ে ফেলতেও পারিনি তাতে ঝামেলা যে আরো কতগুন বাড়বে সে আমার ভাল করে জানা আছে। নিশিকে সামনে পেয়ে আমার বুকটা ছেদ করে উঠল। স্যারের অটোগ্রাফ লুকিয়ে কোন রকমে ওর পাশ কাটানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু এ মেয়ে আমায় ছাড়ল না। জিজ্ঞাসা করল, “দেখি তোর হাতে কি?” আমি পাত্তা না দেয়ার ভান করে বললাম,“কিছু না।” মেয়েটা এমন পাজি ঠুস করে টান দিয়ে আমার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে নিল। তারপর ‘লতফ শাহম স্যারের অটোগ্রাফ’, ‘লতফ শাহম স্যারের অটোগ্রাফ’ বলে চেঁচাতে লাগল। লজ্জায় আমার পুরো শরীর ঘেমে গেল। কয়েকবার বৃথা চেষ্টা করলাম কিন্তু ওর থেকে কাগজটা উদ্ধার করা সম্ভব হল না।



কিছুক্ষণের ভিতর পুরো স্কুলে ছড়িয়ে গেল আমি ‘লতফ শাহম’ স্যারের অটোগ্রাফ সংগ্রহের জন্য স্যারের দ্বারস্থ হয়েছি। পুরো ক্লাসের ভিতর ছিঃ ছিঃ রব পড়ে গেল। সদ্য কবিত্ব পাওয়া মজনু এসে আমায় বলল, “তুই লতফ শাহ স্যারের অটোগ্রাফ না নিয়ে আমার অটোগ্রাফ নিলে তোর অটোগ্রাফ সংগ্রহশালা আরো সমৃদ্ধ হতো।”

মজনুর বাচ্চাকে থুক্কু মজনুর বাপের বাচ্চাকে কি বলব ভেবে পেলাম না। সমস্ত শরীর রাগে ঝা ঝা করতে লাগল। আজ ঐ মেয়েকে কিছু না বললে পুরুষ সমাজের উপর যে কলঙ্ক পড়বে তা হয়ত রামায়ণ দ্বারাও শুদ্ধ করা সম্ভব হবে না। তাই পুরুষ জাতির মান রক্ষার্থে সংকল্পবদ্ধ হলাম।



ছুটির পর নিশি ওর বান্ধবীদের সাথে যায়। ওদের বাড়ির পথ আর আমাদের বাড়ি যাওয়ার পথ একই। ভাবলাম, যা সংকল্প করেছি তা চরিতার্থ করতে না পারলে ছেলে হয়ে জন্মানোই বৃথা। তাই সারাদিনের সমস্ত রাগ সাহসে পরিণত করে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম,“তুমি আমার নামে স্কুলে এগুলো রটালে কেন? তোমার সাথে আমার কিসের শত্রুতা?” নিজের সাহস দেখে নিজেই মুগ্ধ হলাম। ভেতর থেকে নিজেকে বাহবা দিলাম, সাবাস বেটা।

আমার এ হুংকানি ভাব দেখে নিশিও কিছুটা অবাক হয়েছে বলে মনে হলো। সে মুখের ভাব পরিবর্তন করে বলল,“যা সত্যি তাই তো বললাম। আর তাছাড়া আমার ইচ্ছে হয়েছে।” শেষ কথাটা শুনে আমার পুরো শরীরে আগুন ধরে গেল। তবু নিজেকে ধরে রেখে বললাম,“ইচ্ছে হলেই সব করবে নাকি?”

আমায় ভেংচি কেটে বলল,“হ্যাঁ, ইচ্ছে হলে সব করব।” এ কথা শুনে আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। সমস্ত রাগ শক্তির রূপান্তরের মতো ওর নরম গালে চড় হিসেবে গিয়ে বসল। আমি আর অপেক্ষা না করে বাড়িমুখো হলাম। ওর বান্ধবীরা গালি দিয়ে আমার বংশ উদ্ধার করল। শুধু এটুকু দেখলাম, পেতিœ নিশি গালে হাত দিয়ে মুহূর্তকালের জন্য স্থির হয়েছিল।



বাড়ি এসে উচিত মত একটা কাজ করেছি বলে মনে হলো। এ শাস্তি যে ওর প্রাপ্য ছিল সে নিয়ে আর বিচার বিশ্লেষণ করলাম না। তবে চড়টা কী আমি দিয়েছি নাকি আমাকে দিয়ে কেউ দিয়েছে সে বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় ছিল। আমার হাত কেমন করে উঠেছিল তা আমার কাছে মহাবিশ্বের রহস্যের মত রহস্যজনক মনে হলো।

মন থেকে রাগ মুছে গেলে মানুষ অনেক কিছু ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে পারে। আমার অবস্থাও হলো ঠিক তাই। মনের ভেতর কেমন যেন অনুশোচনা হতে লাগল। বার বার মনে হতে লাগল কাজটা ঠিক করিনি। সারাদিন কোন কাজে মন বসাতে পারলাম না। মনটা কেমন যেন আকুলি- বিকুলি করতে লাগল।

বিকেলবেলা তুরাব, অনিক আর স্নিগ্ধদের সাথে ক্রিকেট খেলতে মাঠে গেলাম। খেলাতেও ঠিক মন বসাতে পারলাম না । আগে যেখানে বল করতে নেমে এক ওভারে দুই তিনটা উইকেট ফেলে দিতাম আজ সেখানে এক ওভাবে দিলাম, পাঁচ-পাঁচটা ওয়াইড। ব্যাটিংয়েও ব্যর্থ, দশ রানের বেশি করতেই পারলাম না। সবাই বলল,“কিরে আজ তোর এ অবস্থা কেন? একেবারেই যে পারছিস না।” আমি কোন উত্তর দিলাম না।

রাতের বেলা পড়তে গিয়েও একই অবস্থা হল। বার বার উচ্চস্বরে পড়েই যাচ্ছি কিন্তু মাথায় কিছু ঢুকল বলে মনে হয় না। সামনে বই খোলা রেখে নিশির গালে হাত ধরা সেই স্তম্ভিত মূর্তিটা চোখে ভাসতে লাগল। মনের ভেতর থেকে পেতিœ ভাবটা কেটে গিয়ে সদা হাস্যোজ্জল, সবার সাথে বন্ধুসুলভ একটা মেয়ের ছবি ভাসতে লাগল। ওর সাথে পূর্বেকার ঘটনাগুলো মনে পড়তে লাগল। আর নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হল। কী করব ভেবেও পেলাম না। শুধু নিজেকে শাসন করে বললাম, “একটু না হয় বাদরামি করলই, তাই বলে চড় মারতে হয় নাকি।”

তিন



শুক্রবার দিন। তাই ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরিই হল। বিছানায় বসেই ভাবলাম, নিশির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। কিন্তু ওর সামনে যাওয়ার মত সাহসই আমার নেই। তাছাড়া সে আমায় ক্ষমা করবে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। যা রাগি মেয়ে উল্টা-পাল্টা কিছু বললে উত্তরও দিতে পারব না। আর যদি ঝাড়– কিংবা ঝাঁটা নিয়ে তেড়ে আসে তাহলে তো কথাই নেই। প্রেস্টিজ যে কোথায় যাবে, ভাবা যায় ! এ সামান্য ব্যাপার নিয়ে যতক্ষণ ভাবলাম ততক্ষণে হয়ত তিনটা কবিতা লিখে ফেলা যেত। কিন্তু তারপরও কবিতার দিকে হাত বাড়ালাম না।



আমার জায়গায় ফেলুদা থাকলে নিশ্চয় নতুন একটা আইডিয়া বের করে ফেলত। অবশ্য ফেলুদা আমার মতো বোকামিটা করতো না নিশ্চয়। ফেলুদার মাথার দুই একটা বুদ্ধিও যদি আমার মাথায় আসত তাহলে হয়ত অনেক বিপ্লবের সমাধান করা যেত। আর টেনিদা হলে নিশ্চয় বিজ্ঞের মতো একগাদা উক্তি ছাড়ত।

বন্ধুদের ভিতর অনিক একমাত্র আমার বাড়ির পাশে থাকে। বলতে গেলে, ও আমার সকল কাজের সঙ্গী। বিজ্ঞানের সকল বিরক্তিকর বিষয়ে ওর আগ্রহ। নতুন কোন যন্ত্র দেখলে সেটার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব খুলে কী আছে দেখতে চায়। আমি আর অনিক মিলে একটা ওষুধ আবিষ্কার করেছিলাম। যেটা কুকুরের পাগলামি রোগ নিরাময় করে। আমাদেও গাঁয়ের হাসু পাগলার পাগলামি ভালো করার জন্য ওষুধটা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু ওষুধটা গেলানোর পর তার পাগলামি আরো বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের দেখলেই তেড়ে আসে।কিন্তু হাসু পাগলার কুকুরটার পাগলামি ঠিকই ভালো হয়েছিল। গতবারের আন্তঃজেলা বিজ্ঞানমেলা প্রতিযোগিতায় আমাদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটা দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছিল। বর্তমানে আমরা ‘লাফিং গ্যাস’ নিয়ে কাজ করছি। গরু-ছাগল তো হাসে না, লাফিং গ্যাস দিয়ে এদের হাসানো যায় কিনা ভাবছি।

অনিক যে শুধু বিজ্ঞানের কলকব্জা আর থিওরির হিসাব রাখে তা নয়। সব দিকেই ওর খেয়াল থাকে। আমি ভাবি স্কুলের অনেক ব্যাপারই ও জানে না কিন্তু গল্প শুরু করলে উল্টো আমায় আরো বেশি শুনিয়ে দেয়। তাই নিশির ব্যাপারে পরামর্শ নিতে অনিকই একমাত্র সহায়। এছাড়া আর কারো কাছে শুভবুদ্ধি পাব বলে মনে হল না। একটা শার্ট পড়ে তাই অনিকদের বাড়ি চলে এলাম।

অনিকের ঘরে গিয়ে দেখলাম ও একটা পাথর নিয়ে কী যেন করছে। একবার পাথরটাকে উপরে মারছে তারপর সেটা সোজা এসে ওর মুখে পড়ছে। ওর এই ছেলেখেলার কোন মানে বুঝলাম না।

তাই জিজ্ঞেস করলাম,“পাথর খাওয়ার প্রাকটিস করছিস নাকি?”

আমায় দেখে ও মুখ থেকে পাথরটা বের করে বলল,“কৃষগহ্বর নিয়ে ভাবছি। কৃষ্ণ গহ্বর জিনিসটা আসলে খুবই জটিল। সবই আলোর খেলা। কৃষ্ণগহ্বর থেকে কোন বস্তু ফিরে আসে না কেন, ওটাই মাথায় ঢুকছে না। মনে কর, কোন একটা বস্তু শক্তির প্রভাবে.................”

আমি ওকে থামিয়ে বললাম, “থাক, থাক আর বলতে হবে না। এগুলো আপাতত আমার মাথায় ঢুকছে না।”

“ও হ্যাঁ, একটা কথা মনে পড়েছে। জানিস, নিউটনের আগে মহাকর্ষ বল সম্পর্কে ইবন হাইসাম ধারণা দিয়েছিল। দেখ, বিজ্ঞানের ইতিহাসকে কেমন, করে বিকৃত করা হয়েছে। বীজগনিত, ভূগোল, রসায়ন আর পদার্থ বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদানের কথা শুনলে পুরো টাকশি খাবি। পশ্চিমা শয়তানগুলো সব পাল্টে দিয়েছে। নিম গাছ প্রথম জন্মেছে আমাদের দেশে অথচ এর পেটেন্ট নেয় ওরা। ভাবতে পারিস, কত অবিচার।”

ওর কথাগুলো চিন্তা করার মতো হলেও বর্তমানে আমার মস্তিষ্কে কোন প্রভাব পড়ল না। কবিতার আলোচনা হলেও হতো তাহলে বেশ ভাব নিয়ে কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কিংবা কায়কোবাদের ‘মহাশ্মশান’ থেকে কিছু উচু দরের কথা শুনিয়ে দিতাম। শেষে বাধ্য হয়ে বললাম, তোর এই তত্ত্বালোচনা পরে হবে। আগে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। কাজ না অবশ্য, ঝামেলার সমাধান।

“ঝামেলাটা কী বলতো? নিশ্চয় নিশির সাথে।”

“নিশির সাথেই যে ঝামেলা কেমন করে বুঝলি?”

“এতো সোজা ব্যাপার। মনে কর বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতার আড়ালেই ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। আপেক্ষিকভাবে কোন বস্তুকে ....”

“তুইতো খুব ঝামেলা শুরু করেছিস। কিছু বলতে গেলেই শুধু বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান। তোর মাথায় এছাড়া অন্য কিছু নেই।”

“এটা তুই কি বললি? মানুষের সমস্ত জীবন জুড়েই তো বিজ্ঞান। আইনস্টাইন, নিউটন কিংবা এডিসনের মতো বিজ্ঞানীরা....”

“আবার!”

“ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। নিশির কোন নাম্বার চাই তো? এই নে। সামনে যাওয়ার সাহস না থাকলে তাহলে মেসেজে সরি বলতে পারিস। মেয়েদের সাথে ঝামেলা করে লাভ নেই। উল্টো ফ্যাসাদে পড়বি। তারচেয়ে বন্ধুত্ব করে ফেল, সেটাই ভাল।”

“শালা, তুই সব জেনেও ঢং করছিলি কেন? আর তোকে এগুলো কে বলল?”

“কে আর বলবে, নিশি থেকেই সব জেনেছি। তুই না বললে কি হবে নিশি ঠিকই আময় ফোন করে সব বলেছিল।”

“করেছিল বুঝি? আমায় নিয়ে কিছু বলেছে?”

“না ,তেমন কিছু বলেনি।”

“তাই । কিছুই বলেনি না?”

নিশির ফোন নাম্বারটা নিয়ে সোজা আমার ঘরে চলে এলাম। মোবাইল নিয়ে বসলাম মেসেজ লিখব বলে। কিন্তু হায়, মেসেজে কী লিখলে যে ভাল হবে তাই বুঝে উঠতে পারলাম না। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর লিখলাম-“কাল যে ব্যাপারটা ঘটেছিল তার জন্য আমি নিতান্তই দুঃখিত এবং শঙ্কিত। কাজটা আমার করা উচিত হয়নি। তাই বিশেষভাবে ক্ষমাপ্রার্থী -শিশির।” তারপর সেন্ড করে দিলাম নিশির নাম্বারে। উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করে রইলাম, উত্তরের আশায়। অনেকটা তীর্থের কাকের মত।



কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলো তবু মেসেজের কোন উত্তর এল না। সারাদিন মনে হল এই বুঝি মেসেজ এলো তাই মোবাইলের কোন সংকেত ছাড়াই ইনবক্স ঘাটতে হল। সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন উত্তর না পেয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। যশপাড়ার সাথে আজ টুনামেন্টে খেলার কথা ছিল। মোমেনের বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও খেলতে গেলাম না। নিজেকে স্বান্তনা দিয়ে বললাম, “ইস উত্তর না দিলে মনে হয় মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে! দোষ করেছি ক্ষমা চেয়েছি, তাতেও মান না ভাঙ্গলে আমি কি করব।” এসব ভেবে পরক্ষণেই আবার মনটা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ব্যাপারটা কাটার মত বিধতে লাগল।

সন্ধ্যাবেলা আমি যখন বার বার পড়ার চেষ্টা করেও পড়তে পারছিলাম না তখন আমার ছোটবোন মিশু এসে বলল,“ভাইয়া, তুই কি ছেকা খেয়েছিস?”

“ছেকা খেয়েছি মানে?”

“জানিস ভাইয়া, আজ নুসরাত বলেছে প্রেমে ছেকা খেলে নাকি মানুষের মন খারাপ থাকে। তোর মন খারাপ তো তাই বললাম।”

“বেশ তো কথা শিখেছিস। এমন লাথি মারব দাঁতগুলো পড়ে এই বয়সে বুড়ি হবি। পাজি মেয়ে। ভাল কথা শিখতে পারিসনে।”

আমার বকুনি খেয়ে মেয়েটা একবার ভেংচি কেটে রুম থেকে চলে গেল। ছোট ভাই বোনের জ্বালাতন যে কত সে আমি হারে হারে বুঝি। এই মেয়ের আমার প্রতি টান থাকলেও উচিত কথা বলতে আমায়ও ছাড়ে না। আমার ছোট ভাই হৃদয়টা আমার সকল গোপন কথা বাবা-মার কাছে ফাস করে দেয়।



রাত দশটায় আব্বু যখন আমার মোবাইলের কললিস্টে মেয়েদের নাম্বার খোঁজায় ব্যস্ত, সে সময় একটা মেসেজ এল। কে পাঠাল জানি না, তারপরও মনে হল নিশি। আব্বুর হাতে মোবাইল তাই আত্মারাম খাঁচাছাড়া। পুরোদমে আল্লাহ-নবীর নাম জপে গেলাম। কিন্তু আব্বু তেমন কিছু না বলে আমার হাতে মোবাইলটা দিয়ে বললেন,“নিশি মেসেজ পাঠিয়েছে।” আমি শুধু চেয়েই রইলাম, মেসেজটা খোলা হয়নি বলে হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। আব্বু আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, “নিশি কে রে? এ নামে আগে তো তোর বন্ধু শুনিনি।”

আমি আমতা আমতা করে বললাম, “স্কুলে নতুন এসেছে তো।”

আব্বু কেমন যেন সন্দেহের সুরে বললেন, “নাম শুনে তো কেমন যেন মেয়ে মেয়ে লাগে । কী অদ্ভুদ! ইদানিং নাম শুনে ছেলে মেয়ে আলাদা করা যায় না।” বলতে ইচ্ছে করছিল নিশি ছেলে নয় মেয়েই। কিন্তু নিজের বিপদ কী নিজেই ডেকে আনতে পারি বলো?



আব্বু চলে যাওয়ার পর সাথে সাথেই মোবাইলটা নিয়ে বসলাম। ইনবক্স ওপেন করে মেসেজটা পড়তেই থ বনে গেলাম। এতে লেখা আছে,- “শালা, থাপ্পড় মারবি তো আস্তে দিলেই হয়। অবশ্য তোর মতো চ্যাংড়ার হাতে যে এত শক্তি, থাপ্পড়টা না খেলে বুঝতাম না। বন্ধুদেরে ভিতর ক্ষমা কিসের রে? মারব চাট্রি। ও হ্যাঁ, মোবাইলটা আম্মুর তো তাই উত্তর দিতে দেরি হল। রাগ করিস নে- নিশি।” আমায় চ্যাংড়া বলেছে তো কী হয়েছে, তারপরও মেসেজটা পড়ে মনে হল মন একটা পাথর সরে গেছে। তবে মেয়েটা এত সুন্দর মনের মানুষ ভেবে খুব দুঃখ হল। কতজনে এত বন্ধুসুলভ হতে পারে? আর আমি কিনা এই মেয়ের উপর হাত তুলেছি ভেবেই খারাপ লাগল।

এর মেসেজের একটা সুন্দর জবাব দিব বলে ভাবছিলাম। কিন্তু সুন্দর কোন উত্তর খুঁজে পেলাম না। তাই ভাবতে ভাবতে রাত কাবার।







চার



পরদিন স্কুলে একটু দেরি করেই গেলাম। ক্লাসেও প্রবেশ করালাম স্যার ঢুকার সাথে সাথে। ইচ্ছে করেই করেছিলাম। পাছে ঐ মেয়ে যদি রাস্তায় ধরে কিংবা ক্লাসে সবার সামনে চর মারে। ভেবেই শিহরিত হলাম। বলা তো যায় না মানুষের মন। কখন যে পরিবর্তন হয় স্বয়ং গণকও বলতে পারবেনা। তাছাড়া বইয়ে পড়েছি সকল মানুষের মন প্রতিশোধ পরায়ন। সুতরাং ও যে প্রতিশোধ নেবে না তার কী গ্যারিন্টি আছে(?!)

ক্লাসে বসেও কোন কোন দিকে তাকানোর চেষ্টা করলাম না । যদিও ঐ মেয়ের পেতিœ মূর্তির পরিবর্তন ঘটেছে কিনা তা দেখার ইচ্ছা করছিল। কিন্তু প্রতিশোধ পরায়ন দুটি চোখ দেখতে পাব বলে সেদিকে তাকানোর আর দুঃসাহস করলাম না। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে এসেছি, এই মেয়ের আর দুই জনমেও ঝগড়া করব না। ও চাইলেও না,পারলে বন্ধুত্ব করে ফেলব।

নিশি গনিতে ভাল ছিল। কারো কোন অংক করতে কিংবা বুঝতে হলে সে সব সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দিতে পারত। তাই অংকের ব্যাপারে সবাই ওর দ্বারস্থ হতো । তাই ভাবলাম, অংকের ছুতো দিয়ে ওর সাথে কথা বলে আসি।অংকটা যদিও আমি পারতাম তারপরও ক্লাসে ফাঁকা আওয়াজ ছেড়ে বললাম,“ অনুশীলনী দশের ছয় নম্বর অংকটা কারো করা থাকলে দিলে উপকার হতো।”

আমার কথার প্রতিত্ত্যুরে ও বলল,“এই অংকটা কেউই করেনি একমাত্র তোর খাতায় আছে।”

আমি কনফিডেন্ট নিয়েই বললাম,“কে বলল আমার খাতায় করা আছে?”

ও বেশ নমনীয় হয়েই বলল,“সে আর বলতে হয়না। সবাই জানে আজ অংক ক্লাস হবে না । দেরী করে আসায় তুই ঘোষনাটা শুনতে পাসনি।”

সত্যিই তো আমি জানতামই না যে আজ অংক ক্লাস হবে না। ওর কথায় সবার সামনে বেশ লজ্জাই পেলাম। তবে এই মেয়ের দৃষ্টিশক্তি দেখে অবাক হলাম। বিচক্ষণ বলা যায় । ভবিষতে ভাল গোয়েন্দগিরি করতে পারবে।

তবে যা ভেবেছিলাম তার কিছুই হয়নি দেখে খুশিই হলাম। ওর কারণে হলেও নিউটনের তৃতীয় সূত্র ব্যর্থ হয়েছে। ওর আমার প্রতি কোন আক্রোশ তো নেই-ই উল্টো দু’জনে ভাল বন্ধু হয়ে হয়ে গেলাম। টিফিন পিরিয়ডের আগে নিঃশঙ্কোচে ওর সাথে মিশে গেলাম। যদিও প্রথমে তুই-তুমি নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল কিন্তু ওর দেখা দেখি নিজেও তুই করে বলে ফেললাম। ওর সাথে বন্ধুত্ব করার আগে মেয়েদের সাথে যে, বন্ধুত্ব করা যায় সে বিষয়ে ধারণাই ছিল না। আর যারা করত তাদের আতেঁল বলেই মনে হতো।



টিফিন পিরিয়ডের পরে বিখ্যাত বিষু স্যারের গনিত ক্লাস হয়। কিন্তু আজ গনিত ক্লাশ হবে না আমার মতো ভাবুক কবির অজানা থাকলেও সবার জানা ছিল। গনিত ক্লাসে এলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় হেডস্যার। ওনার মত মানুষ পাওয়া আসলে দুষ্কর। একেবারে মাটির মানুষ। দীর্ঘ তিরিশ বছর ধনে ওনি সম্মানের সাথে একেই স্কুলে শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। স্যার ক্লাসে প্রবেশ করার পর অনিক আমায় খোঁচা দিয়ে বলল, “জানিস নিশি আমাদের হেডস্যারের নাতনী”। কথাটা শুনে কেমন যেন আতঁকে উঠলাম । স্যার যদি জানতেন তার নাতনীর গায়ে হাত তুলেছি তাহলে অবস্থাটা কী হতো (!?) নির্ঘাত টিসি হয়ে যেত। মনে মনে ভাবলাম, এমন ভাল মানুষেরই এমন ভাল নাতনী হয়।

হেডস্যার ক্লাসে এসেছেন আমদের বার্ষিক-ক্রিয়া প্রতিযোগিতা নিয়ে কথা বলতে। স্যার বললেন, “শিক্ষকদের অনুরোধে এবার বার্ষিক ক্রিয়া প্রতিযোগিতায় একটা নতুন ইভেন্ট যোগ হবে। এতে অংশগ্রহন করবে ছাত্র শিক্ষক সবাই। ছাত্র শিক্ষদের ভিতর প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। স্কুলে সিনিয়র হিসেবে তোমাদের ক্লাস থেকেই দল বাছাই করা হবে।” উল্লাসে সবাই হাত তালি দিতে লাগলাম।

স্যার আরো বললের,“তোমাদের ভিতর থেকে একজন দাঁড়াও যে দলের ভাল ক্যাপ্টিনসি করতে পারবে।”

সবাই জানে আমি ভাল ক্রিকেট খেলি, তাই ক্যাপ্টিন হলে আমাকেই হতে হবে। তাছাড়া এলাকার ক্রিকেট দলের নেতৃত্ব তো আমিই দেই। তাই সগর্বে দাড়িয়ে গেলাম। কিন্তু আমার সাথে আর একজন দাঁড়ালো, ইভটেজার রকি। যে কিনা ইভটিজিংয়ের জন্য পুলিশের হাতে ধরা খেয়েছিল।“ আমি একজন ইভটেজার” লেখা সাইন বোর্ড ওর গলায় ঝুলিয়ে প্রুরো এলাকা ঘুরানো হয়েছিল।তারপরও দমে যায়নি, নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে স্বগর্বে।

স্যার একটু ভেবে বললেন,“এক দলে তো দুই ক্যাপ্টিন হতে পারে না । তাই তোমরা (সকল ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে) যে যাকে সাপোর্ট কর তার পাশে গিয়ে দাঁড়াও। ”

হায় অল্লাাহ! আমার ভাগ্যে যে এই হাদারামগুলি পড়বে তা জানলে কখনই ক্যাপ্টিন হবার দুঃসাহস দেখাতাম না। আধাপাগল অনিক, আতেল জনি, চিকা ইরফান, বোবা শামসু, ক্ষুদ্র বালক সিদ্দিক----- এরা নাকি আমার দলের খেলোয়ার ! আর আমি যে মেয়েদের ভিতর এক জনপ্রিয় আজ তা জানতে পারলাম। তাছাড়া মেয়েরা ইভটেজারকে সাপোর্ট করবেই বা কেন? ছেলেদের সাথে মেয়েরাও তাদের ক্যাপ্টিন বাছাই করে নিল। এ ব্যাপারে মেয়েদের উৎসাহ দেখে স্যার বললেন,“আরে! তোমরাও খেলবে নাকি?” এ কথা শুনে ছেলেরা সব হাসতে লাগল।

কিন্তু আমাদের হাসিকে তুচ্ছ করে নিশি বলল,“জ্বি স্যার আমরাও খেলব।”

স্যার ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিয়ে বললেন,“ঠিক আছে, তোমাদের দু’ দলের ভেতর অন্তত তিনজন মেয়ে রাখবে। আর দু দলের ভিতর যে চ্যাম্পিয়ন হবে সে দল খেলবে টিচারদের সাথে ফাইনাল ম্যাচ।” এ ঘোষণায় ছেলেরা কেমন যেন বিমর্ষ হলো। মেয়েদের সাথে খেলতে হবে বলে কেউ কেউ উৎসাহই হারিয়ে ফেলল। ধর্মভীরু নাহিদ ‘নাউযুবিল্লাহ’ বলে বুকে থুুতু থুতু দিয়ে বসে পড়ল।

ছুটির পর সবাইকে বটতলায় অপেক্ষা করতে বললাম, দল বাছাই করব তাই। স্কুলের টিউবওয়েলে পানি খেতে গিয়ে দেখা হল ফয়সালের সাথে। মাথায় আবার ব্যান্ডেসও করা। ও সব সময় আমার গুনগ্রাহী হয়েও কেন ইভটেজার রকির দলে গেল ব্যাপারটা বুঝলাম না।

ওকে বললাম,“কিরে তুই মেয়ে পাগল রকির দলে গেলি যে!”

ও কেমন যে অবাক হয়ে বলল,“সত্যিই কী আমি রকির দলে গিয়েছি?”

“বেশি ঢং করবি না, মনে হয় কিছুই জানিস না ! ঐ ইভটেজারটা তোকে কত টাকা দিয়েছে?”

“ আসলে কাল রাতের ঘটনার পর মাথাটা কেমন যেন গোল বেধে আছে! কী করি কিছুই বুঝতে পারি না!”

“কাল রাতে কী হয়েছিল?”

“ও তোকে তো বলাই হয়নি, আমাদের বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল। আমার সখের ব্যাটটাও ভেঙ্গে ফেলেছে। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে যাহোক কিনেছিলাম।”

“ ব্যাট ভাংলো কেমন করে?”

“কী বলব দু:খের কথা, আমার মাথায় বাড়ি দিয়েই ব্যাটটা ভাংলো। ঘরে টাকা পয়সা যা ছিল সব নিয়ে গেছেরে। আমরা ফকির হয়ে গেছিরে, শিশির।”

“থাক থাক, আর দুঃখ করিসনে। যা হবার তো হয়ে গেছে। কিপটের ধন কী আর বেশী দিন থাকে রে?” বলে চলে আসলাম। ফয়সালের বাবা যা কিপটে, আল্লাহ হয়ত ফেরেস্তা পাঠিয়েছে কিপটের ধন নিতে।



বট বৃক্ষের নিচে সবাইকে বেশ আগ্রহ নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করতে দেখলাম। মেয়েদের ভেতরও উৎসাহের কমতি নেই। ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে সর্বমোট তেরজনের একটা দল তৈরী করলাম। আজ থেকেই প্রাকটিস শুরু করব বলে বিকেলে সবাইকে মাঠে আসতে বললাম। বিকেল বেলা মেয়েদের খেলা দেখে মনে হলো, ক্রিকেট একটা তামাসার খেলা। আসলে যার কাজ যা নয় তাকে দিয়ে তা করানোই মুশকিল। মেয়েদের দিয়ে কখনো ক্রিকেট হবে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। যদিও ইদানিং মেয়েদের ক্রিকেট দলই বেরিয়েছে। নিজেদের ভেতর খেলে ভাল করলেও ছেলেদের অনুর্ধ-১৭ এর সাথে খেলে তো চব্বিশ রানেই অলআউট হয়।

আমাদের দলে যে মেয়ে গুলো আছে তো খেলা পারবে না, উল্টো আমাদের খেলা ভুলিয়ে ছাড়ছে। এদের বাদ ও দিতে পারছিনা তাহলে হয়তো আমাদের টিমই বাতিল হয়ে যাবে। ভালই ফ্যাসাদে পড়া গেল। অগত্যা বিপদে পড়েই রাত দিন খেটে এদের খেলা শেখাতে হচ্ছে। তবে ওদের ভিতর উৎসাহ থাকাাতে ব্যাপারটা কিছুটা হলেও সোজা হল।

আর একদিন পরেই রকিদের টিমের সাথে আমদের খেলা। স্যারদের সাথে ফাইনাল খেলতে হলে ওদের সাথে আমদের জিততেই হবে। ওদের টিম আমাদের থেকে শক্তিশালী । আদনান, জোবায়ের , হামিদ, মিরাজ আর আতিকের মতো ঘাঘু খেলোয়ার ঐ টিমে আছে। আর আমার টিমে আছে যওসব জ্ঞানী-গুনীর দল। অনিককে শট শেখাতে গেলে ও বলবে,“বিজ্ঞানের সূত্রকে যদি আমরা কাজে লাগাই তাহলে আমরা খুব সহজে জিততে পারি। এ ক্ষেত্রে প্রাসের সূত্র সর্বোত্তম। আমরা যদি বলকে ৪৫০ কোণে মারি তাহলে সেটা ছক্কা হতে বাধ্য। অভিকর্ষ বলকে কাটাতে হলে বলকে অনেক দ্রুত কাজ করতে হবে।”

তখন আমি বললাম, “হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছিস। মাঠে নামার সময় চাঁদা আর পেন্সিল কম্পাস নিয়ে যাস। তারপর বলারকে বলবি, ভাই একটু দাঁড়ান হিসাব করে নেই।”

ও তখন আহলাদে গদগদ হয়ে বলল, “বাহ্ তোর বুদ্ধিটা তো খারাপ নয়।”

আরেকজন আছে কবি মজনু। কারো কিছু দেখলেই গলা উচিয়ে স্বরচিত নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করে-

“ হে তরুণ, জাগিয়াছ পৃথিবীর বুকে

তুলিয়াছ ধার

কেন মানিবে হার

কার আছে হিম্মত, তোমায় আজি রুখে।

আজিকার বায়ু

বাড়ায়েছে আয়ু

বিজয় রবি দেখিতেছি তব মুখে।”







পাঁচ



সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে প্রাকটিস করতে সবাই মাঠে চলে আসলাম। পুরো একাদশ আমাদের ঠিক করা আছে। সিদ্দিক আর আঁতেল জনিকে এক্সটা খেলোয়াড় হিসাবে রাখলাম। বলা তো যায়না, কার কখন কী বিপদ ঘটে। এ কয়েকদিনে মেয়েগুলোও ক্রিকেকটাকে বেশ ভালো রপ্ত করে নিয়েছে। অনেক ছেলে থেকেও ভাল খেলছে ওরা। নিজেদের প্রমাণ করার চেষ্টা আছে। ওদের এমন ভাব যেন, সুযোগ পেলেই দেখিয়ে দিতে পারে!

ইভটেজার রকিদের সাথে খেলা শুরু হতে বেশি দেরি নেই। এর আগে গা গরম করার চেষ্টা করছি। দলের সবাই কিছুটা হলেও আত্মবিশ্বাসী। এত ফলতু খেলোয়াড় পেয়ে আমি তো পুরো হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। একমাত্র নিশি আর অনিকের উৎসাহে সবাইকে নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। কিছু হলেই নিশি বলত, “চিন্তা করিসনা আমরাই জিতব। ইভটেজার দল কি কখনো জিততে পারে? এমন ছক্কা মারব না, যুবরাজের রেকর্ড ভেঙ্গে দিব।” এমন কথায় কি হতাশ হওয়া যায় বলো?

খেলা শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে খবর পেলাম তুরাব খেলতে পারবেনা। বর্তমানে হাসপাতালে আছে। কথাটা শুনে পুরো আতঁকে উঠলাম। ওর উপরই আমার ভরসা ছিল সবচেয়ে বেশি। আমাদের হার্ড-হিটার ওপেনিং ব্যাটম্যান ছিল একমাত্র ওই। বলিষ্ট দেহ তাই দাঁড়িয়ে একের পর এক ছয় মারতে পারে। খবর নিয়ে জানতে পরলাম ডাকাতের আক্রমনে ওর এ অবস্থা হয়েছে। অনেক রক্তপাত হয়েছে বলে জানা গেল। অবস্থা খুব ঘোরতর বলেই মনে হলো। সব জায়গায় শুধু ডাকাত আর ডাকাতের উৎপাত! তুরাবের এই দুরাবস্থার কথা শুনে খেলা থেকে মনটাই সরে গেল। আজকের খেলাটা কোন রকমে শেষ হলেই যেন বাঁচি! শুধু আমার নয় সবার মনই মোটামুটি খারাপ হয়ে গেল।

তুরাব না থাকলে কী হবে ম্যাচ তো আমাদের শুরু করতেই হবে, তাই তুরাবের বদলে ক্ষুদ্র বালক সিদ্দেককে একদশে নিতে হলো। এটাই বোধ হয় সাপে বর হল!

রকিদের ও বেশ কনফিডেন্ট মনে হলো। ওদের এমন ভাব যেন আজ আমাদের গুড়িয়ে দেবে। তুরাব নেই দেখে ওদের ভাবটা যেন আরো বেশি। তবে যারা খেলা দেখতে এসেছে তাদের ভেতর কয়েকজন দেখলাম, “ বি যধঃব বাঃবংবৎ” লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর রকি এদের তাড়ানোর কয়েকবার বৃথা চেষ্টা করল। মেয়েরা এতে বেশ মজাই পেল।

কয়েন দিয়ে আম্পায়ের টস করলেন, টসে ওদেরই জিত হলো কিন্তু আমাদের ব্যাটিংয়ে পাঠালো। আমি আর অনিক ওপেনিং এ নামলাম। ‘রিক্শা এক্সপ্রেস’ খ্যাত আতিক বল করল। এত ¯েলা বল যে ছয় হাকাতে গিয়ে কট বিহাউন্ড হলাম। একেবারে ডাক মেরে মাঠ ছাড়তে হল। বিপরীত দলের খেলোয়ারদের খুশি যেন ধরে না। পূর্ব পরিকল্পনা মত নিশি নামল। বুদ্ধিমান মেয়ে ছোট ছোট শট খেলে রানের চাকা সচল রাখল। আর অনিক মনে হল প্রাসের সূত্র ভালভাবে কাজে লাগাচ্ছে। এই দুজনকে নিয়ে একটু ভরসা পাওয়া গেল। ওরা যত রান করছে আমার নিজের লজ্জা তত বাড়ছে। তবু ফপর দালালির মত ভাব বজায় রাখলাম।

কিন্তু খেলা বেশিদূর এগোল না, দশ ওভারে পঞ্চাশ রান করে সবাই সাজ ঘরে ফিরে আসল। অনিক আর নিশি আউট হওয়ার পর একজনও খুব একটা সুবিধা করতে পারল না। আর আমাদের দলের সুন্দরী ব

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.