| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রসের হাড়ি
মনের বেতার কেন্দ্রে আমি গল্প বলতে ভালোবাসি। সাধারণ মানুষের গল্প....
(১) দুপুরের প্রচন্ড খাঁ খাঁ রোদ। এই রোদ মাথায় নিয়ে অনেকক্ষন ধরেই হাটছি। আবার মরার উপর খাঁড়ার হলো বাম পায়ের স্যান্ডেল টা একটা আগেই ছিড়েঁ গেছে। তাই হাতে নিয়ে হাটছি। গায়ক তপু আমাকে এখন দেখলে গুনগুন করে হয়তো নিজের গানটাই গাইতো- এক পায়ে স্যান্ডেল আর অন্য পা খালি।
এখন আমার আগে-পিছে অনেক মানষ। ফুটপাত দিয়ে হাটছি। মাথায় সামান্য একটা বিষয়ে চিন্তা করছি। তবে আমার কাছে এখন বিষয়টা গুরুতর। এই প্রচন্ড রোদে ঠান্ডা কোক বা পেপসি খেলে বড়ই আরাম পেতুম। পকেটে অর্থ সংকট। তাই সস্তায় ডাব পাওয়া যায় কিনা খুঁজছি। ৬/৭ টাকায় ছোট একটা পাওয়া যাবে কিনা সেটাই এখন চিন্তার বিষয়। গরিব মানুষ, গরীব নিষ্পাপ চিন্তা। ধনী মানুষগুলোর চিন্তাও বড় বড় হয়। প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে এরা চিন্তা করতে থাকে,, কিভাবে আরো বেশি টাকা আয় করা যায়....দামী ঘুমের ঔষুধও এদের জন্য শান্তির ঘুম আনতে ব্যথ হয়।
মাথা ঘুরিয়ে পিছনে ফিরলাম। একটা কালো মাইক্রো গাড়ির দিকে চোখ গেলো, এদিকেই আসছে। আমার পাশে গাড়িটা হটাৎ শব্দ করে ব্রেক করলো। চাপা দেয়ার শখ ছিলো হয়তো। বাতাসের ধাক্কাটা বেশ লাগলো কিন্তু সেই সাথে একরাশ ধুলো এখন সারা মুখে আমার। ধুলোটা বিষয় না। বিষয় হলো, গাড়ির পিছনের কাঁচ থেকে ১২/১৩ বছরের একটা ছেলে আর ৬/৭ বছরের একটা মেয়ে হাত নাড়ছে আমার দিকে। আপনজনদের হাই দেওয়ায় ভঙ্গি।
বিষয়টা অসস্থিকর। কেননা আমি এদের কাউকেই চিনতে পারছি না।
মাঝখানের বড় গেটটা শব্দ করে খুললো। আমার চোখের দৃষ্টি মাঝের সিট টায় আটকে আছে।
মোটামুটি হস্তীদেহী একজন মহিলা এবং হালকা দেহের একটা যুবক আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মজার বিষয় আমি এদের কাউকেই কখনো দেখেছি বলে মনে করতে পারছিনা অথচ এদের মুখেও একই পরিচিত হাসি। আমি যথাসম্ভব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাকালাম।
এই মহিলাটি যে প্রাকৃতিক প্রয়োজন বাদে দিনের ২২ ঘন্টা পার্লারে সময় কাটান, এটা কেউ না বলে দিলেও দিব্যি বুঝতে পারছি। পুরো মুখ জুড়ে মেকআপ।
আহহা.. চৈত্রের এই কড়া রোদে ঘন্টাখানেক দাড় করিয়ে রাখতে পারলে মেকআপ উঠে গেলে আমি নিশ্চিত বাচ্চা দু’টোও উনাকে চিনতে পারবে না।
ছেলেটি একগাল হেসে বললো : দোস্ত চিনতে পারছিস?
আমি খুব চিনতে পারার ভঙ্গিতে হাসলাম, যদিও চিনলাম না। আমার সমবয়সী ছেলেটির মুখভরা দাড়ি।
ছেলেটি এবার বেশ অভিমানী সুরে বললো- মোটেও চিনিসনি, আমি বিপুল ।
এবার কিন্তু সত্যিই ধাক্কা খেলাম। কারণ, বিপুল ছিল স্কুল-কলেজে সবচেয়ে কাছের বন্ধুর নাম। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার পর ওর সাথে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। মোটামুটি ভাবে ওকে প্রেম বিষারদ বলা যায়। বন্ধুমহল থেকে নারী মহলেই ওর বেশী পরিচিতি ছিল। ওর কপালটা খারাপও ছিল বলা যায়। যে মেয়ের সাথেই ওর প্রেম হতো, তারই অন্য কোথাও বিয়ে ঠিক হয়ে যেতো। তখন বলতো, যদি ওর অনেক টাকা থাকতো তাহলে প্রেমিকার বিয়ে অন্য জায়গায় বিয়েটা হতোনা। জীবনে টাকাই সব!!
আমি চোখের সামনে পিরামিড দেখার মতো ওর দিকে তাকালাম। এই সময় বাচ্চা দু’টোকে ও বললো; আঙ্কেল কে সালাম কর। বাচ্চা দু’টো পা ধরে সালাম করতে এলো বোধহয়। আমি একটু আৎকে উঠে বললাম- আরে .. ঠিক আছে ..ঠিক আছে।
মাথার ভিতরে আলতু-ফালতু চিন্তা শুর হলো এবার। তার মানে কি..টাকার জন্যই..
ও খুব তাড়াহূড়ো করে পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কাড বের করে আমাকে দিয়ে- আসিস..... জরুরী কথা আছে!! বলে একটা চোখ মারলো। আমি ও সব বুঝে ফেলার ভঙ্গিতে মুচকি হাসি ব্যাক করলাম।
গাড়ি স্টাট দিয়ে রওয়ানা হলো। আমি আবার হাটাতে শুরু করলাম। আমারো জরুরী কাজ আছে। ছেঁড়া স্যান্ডেল টা সেলাই করার জন্য পাদুকা মেরামতকারীকে খুঁজতে হবে।
মোবাইল টু মোবাইল এর দোকানে ঢুকে ফোন করলাম এক ছোট ভাইকে। ওর বাসা বিপুলের গ্রামের বাসার কাছে। কিছু তথ্য দরকার।
(২)এই রুমটায় এসি দেওয়া। বাইরের দূবীসহ গরম থেকে সম্পূণ আলাদা। বোঝার উপায়ও নেই আজ চৈত্র মসের ১৯ তারিখ। আমার সামনের বড় টেবিলটার উল্টোপাশে বড় চেয়ার হেলান দিয়ে বসা অফিসের বড় সাহেব তথা জনাব বিপুল সাহেব।
তারপর বল কি খাবি- ঠান্ডা না গরম?
হালকা গরম পানি খাবো। তোর রুমে এসে মনে হচ্ছে কাশ্মিরের বডারে বসে আছি। কিঠান্ডা।
তিনি সুইচ চাপতেই পাতলা একটা ছেলে রুমে দৌড়ে আসলো এবং অডারের হালকা গরম পানি আনতে রওয়ানা হল ।
আমি বললাম- তোর মা বাবা কেমন আছেন?
না রে যোগাযোগ করিনা অনেকদিন। পৃথিবীতে কেউ কারো নারো বন্ধু টাকা নাথাকলে বাপ মা ভাই বোনের কাছেও দাম নাই। বাদ দে ওদের কথা।
বুজলি...সবই কপাল। কপালে ছিল তাই আমি এখানেরে বন্ধু। শিল্পপতির বিধবা বউ- আমার তো লাইফ টারে চেন্জ করে দিলোরে দোস্ত। রাজ্য, রাজকণ্যা সবই পাইছি। সাথে অবশ্য দুইডা বাচ্চাও ফ্রি পাইছি। হাসতে হাসতে বললো ও। মহিলার বয়স একটু বেশি কিন্তু দিলডা একদম ঝঁকঝঁকা পরিষ্কার। কিন্তু পুলাপান দুইডা দুনিয়ার বদ। সারা ক্ষণ জিনিপত্র ভাংচুর করে আর আমার ঘাড়ে উঠে হিসু করে !! থুহহহ !!! ও এখন এমন ভাবে টেবিলের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছে, যেন টেবিলের উপরে বাচ্চা দুটো ময়লা ন্যাপি পরে দাড়িয়ে আছে।
আমি হাসতে হাসতে বললাম- এইটাই তাহলে তোর প্রবলেম?
আরে নাহ। এসব মানাই নিছি এখন ঘটনা হলো ইয়ে.. মানে.. আমার দিকে একটু ঝুকে এসে আস্তে আস্তে বললো- তোর ভাবি সারাক্ষণ হিন্দি সিরিয়াল নিয়াই পরে থাকে। মাইয়্যা মানুষ তো। নাটক- সিরিয়ালই ওর জীবন। সকার 2 রাত। শুধু টিভি দেখে। এরমদ্ধ্যে কবে নাকি পাশের বাড়ীর ভাবীরে দেখা গেছে টিভির খবরে... আরে ওই যে রাস্তা ঘাটে সাক্ষাতকার নেয়না...ওইসব। ইজ্জতকা সউয়াল।।তাই ওর এখন শখ হইছে টিভির বিজ্ঞাচিত্রের মডেল হইবো!! সারা রাত একই ঘ্যানঘ্যান। ঠিকমতো ঘুমাইতেও পারিনা। ক কি বিপদে আছি!
মাঝে শুনছিলাম তুই নাকি টিভির বিজ্ঞাপন প্রডাকশন অফিসে কি জানি কাজটাজ করিস! দোস্ত..তোর আল্লাহর দোহাই লাগে.. একটা লাইনঘাট করে দেনা ভাই। টাকা লাগলে, ঘটণা না, দিব কিন্তু বাঁচা আমারে। করুন দৃষ্টি বেচারার চোখে।
এখন হাসা উচিত হবে কিনা বুজছিনা। আমি বললাম- আচ্ছা দেখি। কিন্তু পয়সাকড়ি লাগবে কিন্তু..
না দোস্ত দেখি দেখি বললে হবেনা। কবে সুটিং ফুটিং হবে আমারে জানাস। তোর ভাবীরে এটা বলে আপাতত বাঁচি।
আমি বললাম- খরচ আছে বিশ হাজার।
ড্রয়ার খুলে নতুন কড়কড়ে নোটগুনে বিশ হাজার টাকা দিল। বাঁচালি দোস্ত -বলে কোলাকুলি করলো। আমিও টাকা হাতে নিয়ে কোলাকুলির কাজটা সেরে ফেললাম।
আমি বললাম-আরো বিশটা টাকা দে তো, দরকার। টাকা পকেটে নিয়ে রাস্তায় নামলাম। মোবাইল টু মোবাইলের দোকানে ঢুকে এক প্রডাকশন হাউসের পরিচিত বড়ভাকে ফোন দিলাম। এই মানুষটার সাথে আমার পুরানো পরিচয়। জানা গেল- নতুন বল সাবানের মডেল এর চান্স দেওয়া যাবে । দ্বিতীয় ফোনে বিপুলকে জানালাম সুখবরটা।
সব ঠিক ভাবেই হলো। হাতির মতো শরীর নিয়ে শ্রদ্ধেয় ভাবীজান পটল কোম্পানী তরমুজ সাইজের একটা বলসাবান দিয়ে নিমিষেই দেশের সব ময়লা কাপড় ধুয়ে সাফ করে ইস্ত্রি আলমারীতে সাজিয়ে ফেললেন .. আর হাসি মুখে বললেন- আমার আছে পটল বলসাবান। আর আপনার....??
আজ প্রথম এ্যাড প্রচারিত হবে। তুমুল উৎসাহ বিপুল আর ওর পরিবারের মধ্যে। ভাবি পুরো এলাকার সব ভাবিদের জানিয়ে এসছেন কখন কোন কোন চ্যনেল এ দেখাবে। বিপুলের ঘরে আজ মিষ্টি উৎসব।
এখানে এখন আমার কাজ নেই। বের হলাম।
মাকেটে যেয়ে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে মোটামুটি মানের দুটো শাড়ি আর দুটো পাঞ্জাবী কিনলাম। আর একটা চার হাজার টাকা দামের একটা বাইসাইকেল। বাসের টিকিট নিলো পাচশ টাকা। বাসে উঠে রওয়ানা দিলাম দেশের বাড়ী।
অতপর সাড়ে পাচ ঘণ্টা পরঃ
বৃদ্ধ বাবা-, মা আর ছোট ভাই এর ছোট্ট কেনাকাটা... নিষ্পাপ অপরাধ। কতো খুশি হবে এগুলো দেখলে। একজন মা যিনি এক ছেঁড়া শাড়ীতে কাটাচ্ছেন, বাবার ভাল একটা পান্জাবী নেই আর ছোট ভাইটার স্কুলে যাবার জন্য একটা বাসাইকেল। আর বাকি দশ হাজার টাকাতাদের হাতে দিয়ে বলবো- আপনার বড়ছেলে বিপুল এগুলো পাঠিয়েছে। ঢাকায় চাকরী, বড় অফিসার তাই সময় হয়না কিন্তু এবছর ঈদে বাসায় ঈদ কাটাবে। আপনাদের অনেক মনে করে ও...
সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে প্রায়। মোবাইলে পরিচিত ছোট ভাই বলেছিল এই রাস্তার শেষ বাসাটা বিপুলদের। ওদিকেই গেলাম।
বিপুলের বাসার সামনে অনেক মানুষ ভীর করে আছে। কান্নাকাটি..
ক্যান্সার আক্রান্ত বিপুলের মা আজ দুপুরে বাবা মারা গেছেন। বৃদ্ধ বাবা পাশে বসে কাঁদছে । ছোট ভাইটা দূরে। তাকেও সান্তণা দেওয়ার ক্ষমতা এখন কার ??? কোন কিছুই বলার ভাষা নেই এখন আমার। আনন্দের একটা ছোট্ট মূহুত্ব উপহার দিতে এসেছিলাম। কিন্তু তাদের বিশাল সমুদ্র বেদনার কাছে এই এক বিন্দু আনন্দের যে মূল্যই নেই ।।।।
২|
১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দুপুর ১২:১৯
বিকেল বলেছেন: অসাধারণ
৩|
১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দুপুর ১:৪৪
রসের হাড়ি বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই
©somewhere in net ltd.
১|
১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সকাল ১১:২৪
কালা মনের ধলা মানুষ বলেছেন: চমৎকার লেখারে ভাই। অসাধারন।
+++++++++++++++