| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
হাসান বৈদ্য
একজন গ্রামীণ প্রাণী্
হাসান বৈদ্য
মাটির মনীষী আফাজ পাগলা (তিনি নিজেকে পাগল পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন, তাঁর শিষ্যরা এবং এলাকার লোক তাকেঁ পাগলা বলেই ডাকে), যিনি বাংলাদেশে ভেষজ উদ্ভিদ চাষে বিপ্লব এনেছেন। তাঁর উয্যোগে নাটরের লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের ১০ টি গ্রামে চাষ হচ্ছে ভেষজ উদ্ভিদ। গ্রামগুলি হচ্ছে: হাজিগঞ্জ, লক্ষীপুর, বড়বাড়িয়া, টলটলিয়া, কালিতলা, নতুনবাজার, ইব্রাহীমপুর, কাঠালবাড়ি, আমিরগঞ্জ ও খোলাবাড়িয়া খামার। খোলাবাড়িয়া খামার এই গ্রামেই আফাজ পাগলার বাড়ি।
প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘ব্যাধিই সংক্রামক স্বাস্থ্য নয়’। প্রমথ চৌধুরীর কথা ভুল প্রমাণিত করেছেন আফাজ পাগলা। তার কারণ; আফাজ পাগলা একজন ১০০% নিরক্ষর মানুস হলেও তাঁর প্রেরণায় ভেষজ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। প্রায় প্রতি দিনই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক জন আসছেন নানা রকম ভেষজ গাছের সাথে পরিচিত হোতে। তারা ভেষজ চাষ, সংরক্ষণ, বিপনন, গুনাগুন এবং এগুলির প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করছেন। এই দর্শনার্থীর মধ্যে আছেন দেশের নামি-দামি কৃষিবিদ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। তার কারণ আফাজ পাগলা এবং ১০টি গ্রামের বিশাল জন গোষ্ঠির কম-বেশি সবাই মিলে সম্মিলিত যে জ্ঞান ধারণ ও পরিচর্জা করছেন তা প্রচলিত শিক্ষাব্যাবস্থায় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধারণ ও পরিচর্জা করা সম্ভব না।
তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৪ সালে জাতীয়ভাবে এই এলাকাকে ঔষধী গ্রাম হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। এই গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে কম-বেশি ২/১টা ঔষধী গাছ আছে, আর বানিজ্যিক ভাবে চাষ করছেন প্রায় ৪৫০ জন কৃষক, কবিরাজ আছে প্রায় ৪০০ জন এবং হকার আছে ১০০ –এর বেশি। এই কবিরাজ ও হকাররা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের কর্মকাণ্ড বিস্তার করেছেন।
আফাজ পাগলার প্রথম পেশা ছিল বানর খেলা দেখান। প্রায় ৩০ বছর আগে একদিন এক হাটে তিনি বানর খেলা দেখাচ্ছিলেন, তখন পরিচয় হয় আরেক কবিরাজ জলিল পাগলার সাথে। জলিল পাগলা তাঁকে বানর খেলা ছেড়ে কবিরাজি করতে বলেন। তখন তিনি তার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে গ্রামে এসে কবিরাজি শুরু করেন। কিন্তু, কবিরাজি করতে গিয়ে দেখেন প্রয়জনিয় গাছ-গাছড়ার বড্ড অভাব। তখন থেকে শুরু হয় তার গাছ সংগ্রহের পালা।
আফাজের ছোট ভাই পেশায় সাইকেল মেকার তিনি প্রথমে ২-৩টি ঘৃতকুমারির গাছ এনে দেন ভাইকে। সেই ঘৃতকুমারিই তাঁর বাগানের প্রথম গাছ। সেই ঘৃতকুমারিই এখন নাটর জেলাসহ বাংলা দেশের বিভিন্ন জায়গায় বংশ বিস্তার করেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবত ওয়ালাদের কছে যে ঘৃতকুমারি দেখা যায় তার সিংহ ভাগ যায় নাটরের লক্ষীপুর থেকে। নাটর শহর থেকে পাবনার দিকে যাবার পথে ৭ কি.মি দূরে হয়বতপুর, হয়বতপুর থেকে ৪ কি.মি দক্ষিন-পশ্চিমে আমাদের উদ্দিষ্ঠ মনীষীর বাস।
আফাজ পাগলা এখন নিয়মিত কবিরজী করেন। বাড়িতেই তার ডিসপেন্সারী। তাঁর তিন মেয়ের দু’জনের বিয়ে হয়েছে। স্ত্রী হেলেন তাঁর কম্পাউণ্ডার। তিনি মাইজ ভাণ্ডারি তরিকার অনুসারি।
দেখাদেখি চাষ দেখাদেখি বাস,
দেখাদেখি কেটে আনলাম বারো আটি ঘাষ।
এই এলাকায় চাষ হচ্ছে প্রায় ৫০ রকমের ঔষধী গাছ। গাছগুলি: ১) শতমূল, ২) তালমূল, ৩)শঙ্খমূল, ৪)অনন্তমূল, ৫)ঈশ্বরমূল, ৬)শিমুলমূল ৭) সর্পগন্ধা (রাউলফিয়া সার্পেণ্টিনা) ৮) ঘৃতকুমারী(এ্যালভেরা), ৯) অশ্বগন্ধা ১০) হস্তীকর্ণ পলাশ ১১) রাহু চণ্ডাল ১২) গুরু চণ্ডাল, ১৩)ভাই চণ্ডাল, ১৪)বন চণ্ডাল, ১৫)তুরুক চণ্ডাল, ১৬) রক্ত চণ্ডাল, ১৭) ব্রহ্ম চণ্ডাল, ১৮) রাজ কণ্ঠ, ১৯) রাণী কণ্ঠ ২০) নীল কণ্ঠ ২১) লাল লজ্জাবতি ২২) শ্বেত লজ্জাবতি ২৩)সাদা কুঁচ ২৪)লাল কুঁচ (যষ্টি মধু), ২৫)একাঙ্গী, ২৬)কালমেঘ, ২৭)থানকুনি, ২৮)মিছরিদানা, ২৯)বাসক, ৩০)তেজবল, ৩১)আকন্দ, ৩২)মাসিন্দা, ৩৩) তেলাকুচা, ৩৪) সাদা ধুতরা, ৩৫)কালো ধুতরা, ৩৬) ভূঁই কুমড়া, ৩৭) নিম, ৩৮)নিশিন্দা, ৩৯)বাবর তুলসী, ৪০)লাল তুলসী, ৪১)কৃষ্ণ তুলসী, ৪২) শ্বেত তুলসী, ৪৩)দুর্গা তুলসী, ৪৪)রাজ তুলসী, ৪৫)গন্ধরাজ তুলসী, ৪৬)পাথর কুঁচি, ৪৭)ক্ষেত পাপড়া ৪৮) আপাঙ প্রভৃতি।
অবশ্য এখানে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় ঘৃতকুমারীর। এর পরে শতমূল, শিমুল, হস্তিকর্ণ পলাশ, তাল মূল, ভূঁইকুমড়া, মিছরিদানা, রাজ কণ্ঠ, রাণী কণ্ঠ, নীল কণ্ঠ প্রভৃতির।
এই গ্রামে একটি আরত আছে। আরতের মাধ্যমে প্রতিদিন ট্রাকে এবং বাছের ছাদে করে এখানকার ভেষজ পণ্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠান হয়। সবচেয়ে বেশি ঘৃতকুমারী যায় ঢাকার কাওরান বাজার ও মালিবাগ কাঁচা বাজারে।
গত ১০ই এপ্রিল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আফাজ পাগলাকে চ্যানেল আই কৃষি পদক প্রদান করা হয়েছে।
২০০৬ থেকে এ পর্যন্ত এই পদক পেয়েছেন-
১)হরিধানের আবিষ্কারক ঝিনাইদহের সাধুহাটি ইউনিয়নের আসান নগর গ্রামের হরিপদ কাপালি ২) বৃক্ষ প্রেমিক চাঁপাইনবাবগঞ্জের তারাপুর গ্রামের কার্ত্তিক প্রামাণিক ৩) মিঠা পানিতে গলদা চিংড়ি চাষের উদ্ভাবক বাগের হাটের মোল্লাহাট উপজেলার ফলতিতা গ্রামের সৈয়দ কেরামত আলী। ৪) ভেষজ উদ্ভিদ চাষের পথ প্রদর্শক নাটর সদর থানার লক্ষীপুর খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের আফাজ উদ্দিন পাগলা।
আর্থিকভাবে হতরিদ্র কিন্তু মনের দিক দিয়ে অনেক বড় আফাজ পাগলার মনের ইচ্ছা এক সময় এই গ্রামে ওষুধেরে কারখানা হবে, সেই ওষুধ প্লেনে করে বিদেশ যাবে, আমার দেশের মানুষ কাজ পাবে, দু’টা পয়সার মুখ দেখবে। তাঁর নিজের জন্য কোন মানুষের কাছে কোন চাওয়া পাওয়া নেই। সবচেয়ে অদ্ভূত লাগে স্রষ্টার কাছেও তাঁর ব্যাক্তিগত
কিছু চাওয়ার নেই। বরং আসমানের দিকে মাঝে মাঝে মুখ তুলে স্রষ্ঠার উদ্দেশ্যে বলেন, “ছান্তিতে থাহিছ মালিক, ছান্তিতে থাহিছ”।
২|
২৯ শে মে, ২০০৯ সকাল ৯:৩২
হাসান বৈদ্য বলেছেন: জ্বী স্যার
©somewhere in net ltd.
১|
২৯ শে মে, ২০০৯ রাত ৩:০৪
শয়তান বলেছেন: একজন গ্রামীণ প্রাণী্ ???