| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আহমেদ জিসান
আমি সালেহ আহমেদ, পড়ছি যন্ত্রকৌশল বিভাগ, চট্রগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি স্বাভাবিক কৌতূহল থেকে ব্লগিং এর শুরু।
ওয়েভ-পার্টিকেল ডুয়েলিটি বা বস্তু-কণা দ্বৈত তত্ত্বে্র বিশদ আলোচনায় ঢোকার আগে পদার্থবিদ্যার তথা আলোকবিদ্যার ক্রমবিকাশ নিয়ে কিছু কথা বলে নেয়া ভালো। বস্তু, শক্তি আর এদের মধ্যে সম্পর্ক- এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই পদার্থবিদ্যার প্রধান আলোচনা। ক্রমান্বয়ে এর মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে পদার্থের অন্যান্য শাখা যেমন- জোতির্বিদ্যা, আলোকবিজ্ঞান, বলবিদ্যা ইত্যাদি। বিজ্ঞানযাত্রার একেবারে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পদার্থবিদ্যার বিকাশকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- নিউটনীয় পদার্থবিদ্যা এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্স।অবশ্য নিউটনের আগেও নিকোলাস কোপার্নিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও, ফ্রান্সিস বেকন প্রমুখ বিজ্ঞানীরা বলবিদ্যা, জোতির্বিদ্যা ও পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক অনেক শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। কিন্তু পদার্থবিদ্যায় মোটামুটিভাবে একটি নতুন যুগের সূচনা হয় নিউটনের আবির্ভাবে। গণিত (ক্যালকুলাস), আলোকবিদ্যা বলবিদ্যাসহ আরো অনেক ক্ষেত্রে নিউটনের কাজগুলো এখন পর্যন্ত সমানভাবে স্বীকৃত। নিউটনীয় আলোকবিদ্যার মূল ভিত্তি হচ্ছে আলো কে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণা হিসেবে বিবেচনা করে এর বিভিন্ন ধর্ম (প্রতফলন, প্রতিসরণ ইত্যাদি) ব্যাখ্যা করা, যা নিউটনের কণাতত্ত্ব বা ‘করপাসকুলার থিওরি’ হিসেবে সুপরিচিত। কণাতত্ত্বের মূল বক্তব্য মূলত তিনটি-
১- দৃশ্যমান আলো মূলত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গতিশীল কণার সমন্বয়।
২- বস্তুজগতের অন্যান্য বস্তুর মত আলোককণাও পদার্থের স্বাভাবিক ধর্ম মেনে চলে।
৩- কণাগুলোর আকার যথেষ্ঠ ছোট বলে এরা পরস্পরকে বিক্ষিপ্ত করেনা।
আপাতত দৃষ্টিতে তখনকার সময়ে কণাতত্ত্ব মোটামুটি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। কারণ বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটা নীতি হচ্ছে যতদিন না পর্যন্ত কেউ কোন তত্ত্বকে প্রমাণসহ ভূল প্রমাণ করছে ততদিন পর্যন্ত সেটিই সসম্মানে মানা হবে।
কণাতত্ত্ব নিয়ে প্রাথমিকভাবে কিছু স্বাভাবিক পয়েন্ট অব কনফিউশন চলে আসে, যার ব্যাখ্যা নিউটন এবং অন্যান্য পদার্থনিজ্ঞানীরা সফলভাবেই দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরকম একটি উদাহরণ, আলোক কণার উপর অভিকর্ষের প্রভাব। যেহেতু কণাগুলো ভরবিশিষ্ট, অভিকর্ষের প্রভাবে এদের গতিপথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কথা।ফলে আলোর গতি আর সরলরৈখিক থাকেনা। বিষয়টির ব্যাখ্যা দেয়া হয় এভাবে- এক মাইক্রোসেকেন্ডে আলো ৩০০ মিটার ভ্রমণ করে, আর এই সময়ে আলোর অভিকর্ষের প্রভাবে উলম্ব সরণ হয় ০.০০০০০০০০০০০৫ মিটার যা দৃশ্যত নগণ্য।যাইহোক, সব মিলিয়ে কণাতত্ত্ব তখনকার দিনে বিজ্ঞানীদের জানা আলোর সকল ধর্মগুলোই ব্যাখ্যা করতে পারতো। আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ, প্রতিফলন ও প্রতিসরণের স্নেলের সূত্র, আলোক বর্ণালীর ব্যাখ্যা, পোলারাইজেশন ইত্যাদির গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেয়া হয় আলোর কণাধর্মের মাধ্যমে।
এবার আশা যাক কণাতত্ত্বের এতো গ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও আলোর তরঙ্গধর্মের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে। সর্বপ্রথম আলোর তরঙ্গতত্ত্বের ধারণা দিয়েছিলেম ডাচ গণিতবিদ ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন, ১৬০০ খৃষ্টাব্দের দিকে। একইসাথে নিউটনও তার কণাতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় ছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে এবং তখনকার বিজ্ঞানীমহলে নিউটনের প্রভাব প্রতিপত্তির সুবাদে হাইজেনের তরঙ্গতত্ত্ব তেমন একটা সুবিধা করতে পারেনি। ফ্রান্সিস মারিয়া গ্রিমাল্ডি নামক আরেকজন বিজ্ঞানী ১৬৬৫ সালে তার এক প্রকাশিত গবেষণাপত্রে ‘অপবর্তন’ নামের আলোর এক নতুন ধর্মের আবিষ্কারের কথা তুলে ধরেন যা নিউটনীয় কণাতত্ত্বের সাহায্যে পুরোপুরিভাবে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না। গ্রিমাল্ডির প্রস্তাবনা অনুযায়ী আলোকে যদি স্থিতিশীল কোন প্রবাহী পদার্থের উপর সৃষ্টি হওয়া তরঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবেই অপবর্তনের ঠিকঠাক ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব। যদিও নিউটন এই অপবর্তনকে ‘অন্য ধরণের প্রতিসরণ’ বলে কণাতত্ত্বের সাহায্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেটা বিজ্ঞানীদের ঠিক মনে ধরেনি। পরবর্তীতে রয়েল সোসাইটির ফেলো সদস্য রবার্ট হুকও আলোর তরঙ্গতত্ত্বের পক্ষে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যার মূলভাব গ্রিমাল্ডির প্রস্তাবিত তত্ত্বের সমার্থক। পরবর্তিতে দেখা গেল আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরন সহ প্রায় সকল ধর্মই নতুন প্রস্তাবিত তরঙ্গতত্ত্বের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যাছে। প্রসঙ্গত বলে রাখা উচিত, ওই সময় আলোকে যান্ত্রিক তরঙ্গ হিসেবেই ধরে নেয়া হয়েছিল, অর্থাৎ গোটা মহাবিশ্বে ইথার নামক এক কাল্পনিক স্থিতিস্থাপক মাধ্যমের উপস্থিতি ধরে নিয়ে আলোকে তার মধ্য দিয়ে সঞ্চার হওয়া তরঙ্গ হিসেবে ধরে নেয়া হত।যদিও পরবর্তীতে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন এবং মর্লি নামক দুই বিজ্ঞানী ইথার নামক কোনকিছুর অনুপস্থিতি প্রমাণ করেন, তবুও তখনকার সময়ে তরঙ্গতত্ত্ব আলোকবিদ্যার এক অনন্য আবিষ্কার হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল।
বিজ্ঞানের স্বাভাবিক ধারা অনুযায়ী এক্ষেত্রে নিউটনের কণাতত্ত্বের বদলে হাইগেনের তরঙ্গতত্ত্বের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাধ সাধলো বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর। কণাতত্ত্বের সাহায্যে আলোর যেসব ধর্ম ব্যাখ্যা করা যায়নি (অপবর্তন, ব্যাতিচার), সেসব আলোর তরঙ্গধর্মের মাধ্যমে সহজেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। কিন্তু উনিশ শতকের শেষের দিকে জিওফ্রে টেইলর নামক এক তরুণ বিজ্ঞানী একবর্ণী আলোকে কাছাকাছি অবস্থিত দুটি ক্ষুদ্র ছিদ্রের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন তীব্রতায় অতিক্রম করিয়ে একটি আলোক সংবেদনশীল ক্যামেরার মাধ্যমে এদের উপরিপাতন পর্যবেক্ষন করেন। তিনি দেখতে পান আলোর তীব্রতা যখন যথেষ্ট বেশী, তখন আলোকতরঙ্গ দুটি উপরিপাতনের মাধ্যমে ব্যতিচার সৃষ্টি করে, যা কিনা আলোর তরঙ্গধর্মের সাহায্যে সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। তিনি আলোর তীব্রতা আস্তে আস্তে কমিয়ে আনতে থাকলে দেখা গেল, একটা পর্যায়ে আলোক রশ্মি পরস্পর উপরিপাতনের বদলে ছোট ছোট বিক্ষিপ্ত কণার মত ক্যামেরায় ধরা পরছে, যা কিনা পুরোপুরি আলোর কণাধর্মের সমার্থক। হাইগেনের তরঙ্গকণাতত্ত্বের আরেকটি দূর্বলতা ধরা পরে ১৬৬৯ সালে, নিউটনের কণাতত্ত্বের আবির্ভাবেরও তিন বছর আগে ঘটে যাওয়া আরেক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ব্যাখ্যা প্রদানের সময়। পরীক্ষাটি সর্বপ্রথম করেন ড্যানিশ পদার্থবিদ বার্থলিন। তিনি দেখান যে, ক্যালাসাইট ক্রিস্টালের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত আলোর দুই ধরনের প্রতিসৃত ছবি দেখা যাচ্ছে। একটি স্বাভাবিক ক্যালাসাইট ক্রিস্টালের মধ্য দিয়ে মূল ছবির উপরের দিকে, আরেকটি ছবি দেখা যাচ্ছে ক্যালাসাইট পাথরটিকে ১৮০ ডিগ্রী ঘুরিয়ে দেয়ার পর- মূল ছবির নিচের দিকে।
‘ডাবল ডিফ্রাকশন’ নামের এই অদ্ভুত ঘটনার যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা তখনকার কণা কিংবা তরঙ্গ, কোন তত্ত্বের সাহায্যেই দেয়া সম্ভব হয়নি। মোটকথা আলো যে পাকাপাকিভাবে কণা বা তরঙ্গ কোনটিই না, এরকম একটি ধারণা ক্রমান্বয়ে বিজ্ঞানীদের মনে থিতু হচ্ছিল।
যেহেতু ইথারের অনুপস্থিতি আগেই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল, সুতরাং আধুনিক বিজ্ঞানীদের কাছে আলোকে যান্ত্রিক তরঙ্গ অর্থাৎ মাধ্যমবিশিষ্ট তরঙ্গ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টাটা অসাড় হয়ে উঠেছিল। বিখ্যাত স্কটিশ বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েল ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্রমাণ করেন যে একি সময়ে পরস্পর লম্বভাবে থাকা একটি বিদ্যুৎক্ষেত্র এবং একটি চৌম্বকক্ষেত্র হতে সৃষ্ট তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ শূণ্য মাধ্যমে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে। আলো যে আসলে এই ধরণেরই একটি তাড়িতচৌম্বক বিকিরণ সেটিও এই বিজ্ঞানী প্রমাণ করেন। মূলত তখন থেকেই আলোকে তথ্য ও শক্তি পরিবহনের বাহন হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা বিজ্ঞানীদের মাথায় আসে, যার অভিনব প্রয়োগ আজকের অপটিক্যাল ফাইবার।
ম্যাক্সওয়েলের এই আবিষ্কারের পর আলোর সকল ধর্মের এতো নিখুত ব্যাখ্যা দেয়া যাচ্ছিল যে, নিউটনের কণাতত্ত্বের কফিনে প্রায় শেষ পেরেক ঠোকা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখানেও বিপত্তি! জার্মান পদার্থবিদ ফিলিপ লেনার্ড সাদা আলোকে প্রিজমের মাধ্যমে সাত বর্ণের আলো সৃষ্টি করেন। এরপর প্রত্যেক বর্নের আলোকে আলাদাভাবে অভিসারী উত্তল লেন্সের মাধ্যমে একটি ধাতব পাতের উপর ফেলেন। তিনি লক্ষ্য করেন নির্দিষ্ট রঙ(তরঙ্গদৈর্ঘ্য)এর আলোর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলেক্ট্রন প্রবাহ অর্থাৎ তড়িচ্চালক বল সৃষ্টি হচ্ছে।
আলোর তীব্রতা বাড়ালে অথবা কমালে নিঃসৃত ইলেকট্রনের পরিমাণ বাড়ছে অথবা কমছে, কিন্তু তড়িচ্চালক বলের মানের অনুরূপ পরিবর্তন হচ্ছেনা। সুতরাং প্রমাণিত হল যে, নিঃসৃত ইলেকট্রনের তড়িচ্চালক শক্তির মান আলোর তীব্রতা নয়, বরং তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর নির্ভরশীল। আর সেখানেই বিপত্তি! তরঙ্গতত্ত্ব অথবা তাড়িতচৌম্বক তত্ত্ব অনুযায়ী ঠিক এর বিপরীতটা হওয়া উচিত ছিল। সুতরাং এক্ষেত্রে আগের সকল তত্ত্বই ব্যর্থ্ প্রমাণিত হল!
আলোর বস্তু-কণা দ্বৈত ধর্মের সবচাইতে আধুনিক যে ব্যাখ্যা, তা হল কোয়ান্টাম তত্ত্ব। ম্যাক্সওয়েলের তাড়িতচৌম্বক তত্ত্ব হতে উৎসৃত, এবং আইন্সটাইন, ম্যাক্স প্লাঙ্ক, ব্রগলি, বোর, স্রোডিঞ্জার প্রমুখ বিজ্ঞানীদের অবদানসমৃদ্ধ আজকের কোয়ান্টাম তত্ত্ব। সবচেয়ে চমকপ্রদ যে বিষয়টি, পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীরা আলোর কণাতত্ত্ব ও তরঙ্গতত্ত্বের যেকোন একটিকে সত্য বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্বের ব্যাখ্যায় আলোকে একই সাথে তরঙ্গ এবং কণা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হল!
(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য)
©somewhere in net ltd.
১|
২২ শে মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৩:২২
খেপাটে বলেছেন: ভাল লাগলো