নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সুকান্তদাস

যা পাখি উড়তে দিলাম তোকে

সুকান্তদাস › বিস্তারিত পোস্টঃ

কর্ণপুষ্পা (১) শিকারি, শিশু কন্যা এবং এক সারমেয় শাবক

২৬ শে জুলাই, ২০১৩ রাত ৮:৫১

কর্ণপুষ্পা

(১)

শিকারি, শিশু কন্যা এবং এক সারমেয় শাব




জ্যোৎস্নাপরিপ্লাবিতোন্মুক্তোপত্যকাভূমি । কুটিলকৃষ্ণান্ধকার আশ্রয় লইয়াছে নিম্নে পৃথ্বীজঠরে । দূরপর্বতোপত্যকাভূমেচ্ছাদনি অরণ্যভূমে বুঝিবা তাহার সচেষ্ট আত্মপ্রকাশ । আকাশে শুভ্র নির্মল চন্দ্র । সে শুভ্রজ্যোৎস্নাময়ী রজনীতে দূর গ্রাম পানে চাহিয়া কি যেন দেখিয়া চমকাইয়া উঠিল বিহান । শান্ত সে নিশিথে চির পরিচিত মৃদুমন্দ সমীরে দূর প্রান্তরপারে ও কি ও দুলিতেছে ডাইনে ও বাঁয়ে ? যেন নিশিথশশাঙ্কসোমে হাতছানি দিয়া ডাকিতেছে সদ্য প্রস্ফুটিতা দক্ষকন্যা নক্ষত্র, পুষ্পযোনিপ্রাপ্তা । এমনটি তো হইয়াছে বহুবার । অরণ্যচারী দ্রুতপদ মৃগ অথবা বিষম তেজী বন্যবরাহ শিকারোপলক্ষ্যে বহু দিবস-রজনী অরণ্যে যাপিত করিয়া বহুবার গৃহে ফিরিয়াছে সদ্যকৈশোরত্তীর্ন কিরাতপুত্র, মধ্যরাত্রে। কখনোতো মন এমন উচাটন হয় নাই । এমন অজানা শঙ্কায় বারম্বার কাঁপিয়া উঠেনাই বক্ষপিঞ্জর অকস্মাৎ, অকারণে ।

মধ্যবর্তী ব্যাবধানটুকু দ্রুতাতিক্রমনাপেক্ষায় অস্থিরপদচারনারত বিহান যখন গ্রামসমীপে উপস্থিত হইল তখন শরীরে তাহার কিছুমাত্র শক্তি যেন অবশিষ্ট নাই । বক্ষপিঞ্জর উঠিতেছে পড়িতেছে লৌহকারের হাঁপরের ন্যায় । টান টান স্নায়ু সূত্র সকলে কি এক অসম্ভব উত্তেজনা । এখন মধ্য রাত্রি । নিস্তব্ধ গ্রাম নিদ্রাদেবীর মায়াবী জালে অভিভূত । কিন্তু এ নিস্তব্ধতা যেন শ্মশানিক। হিমগন্ধী বাতাস যেন কি এক অশুভ বাষ্পভারাক্রান্ত । জ্বালাধরিয়া যায় নাসারন্ধ্রে । ও কি শুদ্ধ কাষ্ঠখণ্ডদাহিত ধূম্রমিশ্রিত পক্ক আমিষাঘ্রান ? দূরাগত কি এক অস্ফুট আর্তস্মরে সচকিত শিকারি সেই দিক পানে চাহিয়া ভ্রুকুঞ্চন করিল। নুব্জদেহে, শিকারি সুলভ লঘুপদে, দ্রুত নিকটবর্তী হইয়া যাহা দেখিল, তাহাতে স্তব্ধ হইয়া গেল বিহান। ভূমিশায়ে শায়িতা কৃত্তিকা, গ্রামের চিকিৎসাবিদ। কণ্ঠদেশে পশ্চাৎ হইতে এফোঁড় ওফোঁড় বিঁধিয়া আছে সুদীর্ঘ তীর। ক্ষতস্থান হইতে একটি কৃষ্ণ বর্ণ ধারা আসিয়া মিলিয়াছে শুষ্ক প্রস্তরময় মৃত্তিকায়। সে স্থানে চাপ চাপ শুষ্ক জমাট রক্ত । চল্লিশোর্ধ নারীর বামমুষ্ঠিবদ্ধ কোন বস্তু আর দক্ষিন হস্তে বক্ষ সংলগ্ন একটি শিশু কন্যা; দুগ্ধপোষ্য ।

দারুণ রৌদ্রে যেমন নুইয়া পড়ে দারুলতা তেমনি মৃতপ্রায় অবস্থা শিশুর । তথাপি বাঁচিবার নিদারুণ প্রয়াসে এক একটি বার হস্ত প্রসারিত করিতেছে শিশু, দূর হইতে উহাই দৃষ্ট হইয়াছিল বিহান কর্তৃক । । আগন্তুককে দেখিয়া ত্রস্ত হইয়া উঠিল শিশু। মৃতার পেশী সকল কঠিন হইয়া আসিয়াছিল। সবলে তাহার বাঁধন ছাড়াইয়া শিশুকে মুক্ত করিল বিহান। পৃষ্ঠ সংলগ্ন বংশ নির্মিত জলপাত্র হইতে সামান্য জলপান করাইতে, শিশু কিয়ৎপরিমান শান্ত হইল। মৃতা রমণীর বামমুষ্ঠি উন্মুক্ত করিতে একটি ধাতু নির্মিত বস্তু গড়াইয়া পড়িল। উহার এক পৃষ্ঠ মসৃণ। অপর পৃষ্ঠে ক্ষুদ্র একটি অঙ্গুরিয় সদৃশ ধাতব অংশ যুক্ত উল্লম্ব ভাবে। তাহাতে সংযুক্ত ছিঁড়িয়া আসা বস্ত্রখণ্ড। হয়তো মৃত্যুর পূর্বে টানিয়া ছিঁড়িয়াছেন মৃতা । বস্তুটি ইতিপূর্বে কদাপি দেখেনাই বিহান। প্রায় দুই আঙ্গুল প্রস্থ এবং আট আঙ্গুল দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট দুইটি ধাতব পাত পরস্পরকে সমকোণে ছেদন করিয়াছে। আর তাহার প্রতিটি প্রান্ত একটি বিশেষ বৃত্তগতিতে সমকোনে বাঁকিয়া গিয়াছে। বস্তুটি তাম্র নির্মিত । কি ভাবিয়া কি জানি পৃষ্ঠদেশে রক্ষিত ঝোলায় বস্তুটি রাখিয়া দিল বিহান। মানসিক টানাপোড়েনে ক্লান্ত শিশু ততক্ষনে নিদ্রা গিয়াছে তাহার কোলে। এক হস্তে সযত্নে তাহাকে ধারন করিয়া অন্য হস্তে ধনুক লইয়া বিহান দ্রুত রওয়ানা হইল গ্রামোদ্দেশে ।

দূর হইতেই নজরে পড়িল প্রথম গৃহটি ধুলিস্মাৎ । নাসারন্ধ্রের জ্বালা তীব্র হইয়া আসিতেছে। যেস্থানে দণ্ডায়মান ছিল সারী সারী গৃহ, সে সকল স্থানে ভস্মীভূত ধ্বংসস্তূপ । ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মৃতদেহ - শিশু, বৃদ্ধ, যুবক, নারী, পুরুষ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় বিহান হোঁচট খাইয়া পড়িতে গিয়া সামলাইয়া লইল। নিম্নে চাহিয়া দেখিল এক বৃদ্ধের শরীর। তাহার মস্তক হইতে নাসিকাদেশ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া গিয়াছে সুতীক্ষ্ণ কোন অস্ত্রের অমোঘ আঘাতে। তীব্র বিবমিষায় আক্রান্ত বিহান ঢোঁক গিলিতে গিলিতে দৌড়াইল আপন গৃহ পানে। পথিমধ্যে প্রতিটি গৃহ , পন্যাগার, দোকান যাহা কিছু, সকলি বিদ্ধস্ত, বিদগ্ধ। শত শত দগ্ধ অর্ধদগ্ধ ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ, অস্থি পঞ্জর, হস্ত, পদ, মস্তক। কাহারো পেট ফাঁসিয়া অন্ত্র বাহির হইয়া পড়িয়াছে, কাহারো বক্ষদেশ এফোঁড় ওফোঁড় ভল্লাঘাতে। এ কোন অশুভ রক্তপিপাশু দুরাত্মা ছারখার করিয়া গিয়াছে সাজানো স্বর্গ। নিজ গৃহ সমীপে উপস্থিত হইয়া বিহান দেখিল, তাহার কিছু মাত্র অবশিষ্ট নাই। পর্ন-কাষ্ঠ নির্মিত গৃহ জ্বলিয়া জ্বলিয়া ছাই হইয়া গিয়াছে। সেই ধ্বংসস্তূপে দাঁড়াইয়া প্রাণপণে চিৎকারে প্রান্তর কাঁপাইয়া বিহান ডাকিল “পিতা” ।

কোন উত্তর নাই। শুধু দূরপর্বতগাত্রে প্রতিধ্বনিত চিৎকার ফিরিয়া আসিতে লাগিল বারম্বার নিঠুরা নিয়তির নির্মম পরিহাসসম। মস্তিষ্কমধ্যে গ্রাস করিয়া আসিল এক অদ্ভূত অন্ধকার। সংজ্ঞা হারাইল বিহান।

মনে হইতে ছিল শীতল হস্ত আলগোছে কেহ বুলাইয়া দিতেছে তাহার কপালে অধরে-গালে। চেতনা পাইয়া বিহান দেখিল এক সারমেয় শাবক জিহ্বা বাহির করিয়া লেহন করিতেছে তাহার মুখ নাক। হয়তো বিগত সংহারোৎসবের এক মাত্র জীবিত সাক্ষ্মী। বিহান উঠিয়া বসিতে খানিক তফাতে গিয়া অনুযোগের সুরে সে জানাইল “কেউউউ”।

ভালো বলিতে হইবে চিৎ হইয়া পড়িয়াছিল বলিয়া তাহার বক্ষদেশে সংলগ্ন শিশুটি সুরক্ষিত ছিল। সে এখনো নিদ্রাতুর। দিগন্তরেখার পর্বতসকল তখন পরিস্কার হইয়া আসিতেছিল। প্রভাত হইয়া আসিতেছে। এমন এক প্রভাত যাহাতে এই ক্ষুদ্র গিরিগ্রাম আর কখনো জাগিয়া উঠিবে না। গৃহস্থের দ্বারদেশে আর শ্রুত হইবেনা কর্মকাণ্ডের শব্দ। গরুর পাল লইয়া রাখাল হাঁটিবেনা প্রান্তরপানে। সকলই শেষ হইয়া গিয়াছে।

পর্বতময় এই উপত্যকাভূমে অরন্য ঘেরা এই ছোট্ট গ্রামে জন্ম হইতে চতুর্দশ বৎসর পূর্বক তাহার জীবনে, অরণ্যচারী শিকারি জীবনের হাতেখড়ি হইবার পর পর্যন্ত যাহাকিছু বিহান শিখিয়াছে, তাহাতে সে বেশ বুঝিয়াছিল, এমত পরিস্থিতিতে সকালের আলোক স্পষ্ট হইবার পূর্বে তাহাকে এ স্থান ত্যাগ করিতে হইবে। নতুবা শত্রুদল, যদি তাহারা নিকটে অবস্থান করে, তাহাকে দেখিয়া ফেলিলে, তাহারও প্রাণসংশয় উপস্থিত অনিবার্য। উঠিয়া পৃষ্ঠের ঝোলা এবং জলপাত্র ঠিক ভাবে বাঁধিয়া লইল বিহান। কটিদেশে রক্ষিত ছুরিকা সযত্নে আঁটিয়া শিশুকন্যাকে কোলে লইয়া অপর হস্তে ধনুক উঠাইয়া বিগত নিশিতে যেই পথে আসিয়াছিল সেই পথে ধীরে প্রত্যাগমন করিল। কিয়দ্দুর অগ্রসর হয় নাই, পদপ্রান্তে কোমল কস্চিৎ স্পর্শ হইতে চকিতে চাহিয়া দেখিল, নিতান্ত বিশ্বাসী অনুচরের ন্যায় সাথী হইয়াছে ক্ষুদ্র সারমেয় শাবক ।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.