নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সুকান্তদাস

যা পাখি উড়তে দিলাম তোকে

সুকান্তদাস › বিস্তারিত পোস্টঃ

কর্ণপুষ্পা (৩) চক্ষূন্মীলন

০৩ রা আগস্ট, ২০১৩ রাত ৯:১৮

(৩)

চক্ষূন্মীলন


অকস্মাৎ উচ্চশৃঙ্গনাদে বনান্তরাল কম্পিত হইল । চমকিত বিহান ত্বরিত গতিতে স্রোতধারা ত্যাগ করিয়া উঠিয়া আসিল । বারম্বার নিনাদিত এই শৃঙ্গরব তাহার পরিচিত । সার্বভৌম মনিপুরাধিপের সেনাবাহিনীর সেই শৃঙ্গরব । শব্দের তীব্রতার ক্রমপরিবর্তনে বিহান বুঝিল সেনাদল এই দিক পানে আসিতেছে । বিপন্মুক্তিরাশায় আলোকিত হইয়া উঠিল তাহার হৃদয় । পশ্চাতে ফেলিয়া আসা নিজগ্রামের যেই করুন পরিণতির বিহান সাক্ষ্মী, তাহাতে আগন্তুক অলক্ষ্যচারীগণের নৈকট্য তাহাকে সাহস প্রদান করিয়াছে । ইতিমধ্যে দূরাগত জনতার কোলাহল স্পষ্ট শ্রুতিগচর হইতেছিল। শিকারি কান পাতিয়া শুনিল, বুঝিল সংখ্যায় উহারা সহস্রাধিক হইবে । শিশুকে কক্ষে ধারন করিতেই বিহান বিহ্বল হইয়া গেল । শিশুর অক্ষিদ্বয় যেন কোটর হইতে বাহির হইয়া আসিতেছে । শীর্ণ রুগ্ন মাংসপেশী সকল টান টান । শীর্ণ মুষ্টিদ্বয় প্রস্তরবৎ কঠিন । দূরাগত শৃঙ্গনাদ সাথে তাহার সমস্ত শরীর কম্পিত হইয়া উঠিতেছে । শিকারি বিহান এই দৃষ্টিসাথে পরিচিত । প্রাণঘাতী অস্ত্রপানি ব্যাধ যবে কোনঠাঁসা করিয়া ফেলে পার্বত্য ছাগশিশুকে ; অথবা যখন অসম শক্তির দুই শ্বাপদ মিলিত হয় রনংদেহি মুখোমুখি , যেখানে ফিরিবার অন্য রাস্তা নাই ; সেই সময় অনিবার্য ভবিষ্যৎপানে যে চাহনিতে চায় মৃত্যুভীত, তেমনি চাহনিতে শিশু ঘাড় ঘুরাইয়া তাকাইতেছে শৃঙ্গনাদের উৎসদিশায় । কি মনে করিয়া শিশুকে বক্ষলগ্ন করিয়া বিহান সারমেয়শাবক কেও তুলিয়া লইল । ত্বরিতে বস্ত্র এবং ভূপরি রক্ষিত তাহার সম্বল সকল উঠাইয়া ঝর্ণাস্রোত অতিক্রম করিয়া অপর পারে গিয়া উঠিল । তটিনী তীরবর্তী উন্মুক্তস্থানে অবস্থান সুবিবেচনা প্রসূত হইবেনা দেখিয়া বিহান দ্রুত তীরভূমি পার তৃণভূমিতে পদার্পণ করিল । তথায় দীর্ঘ তৃণ তথা গুল্মরাজি মধ্যে সকলকে রাখিয়া তৃণভূমি প্রান্তে আপনাকে লুকাইয়া স্রোতধারার অপর পারে মননিবেশ করিল ।

পদভারে মেদিনী মৃদু কম্পিত হইতেছে । দ্রিম দ্রিম নাদে তালে তাল মিলাইয়া বাজিতেছে ডম্বরু । আর তাহারি সাথে তাল মিলাইয়া ঝঞ্ঝার ন্যায় তটিনীর অপর তীরে আসিয়া পড়িল সৈন্যদল । সশস্ত্র সুদীর্ঘ্য সৈন্যসারি ভূতল প্রকম্পিত করিয়া অগ্রসর হইতেছে ঝর্ণার তীর বরাবর । অগ্রগামী সৈন্য হস্তে রাজ চিহ্ন লাঞ্ছিত নিশান । সুদীর্ঘ্য বর্শা, তীক্ষ্ণ ভল্ল, কোষবদ্ধ অসি, টান টান ধনুষ, পৃষ্ঠদেশে বান পূর্ণ তূণীর, মুষল, মুদ্গর, খড়গ হস্তে রনসাজে সজ্জিত সেই সেনাবৃন্দ দেখিয়া চক্ষে ধন্দ লাগিয়া যায় । উহারা যাইতেছে দক্ষিন তীর ধরিয়া পশ্চিমপানে । পুনঃ পুনঃ নিনাদিত হইতেছে শৃঙ্গরব । তটিনীর এই তীরেও ত্রস্ত হইয়া উঠিল লুক্কায়িত ক্ষুদ্র বন্য প্রাণীকূল । গুল্মান্তরালে কাঁপিতে লাগিল ভীরু শশক । অনন্ত বুঝি বা সেই সৈন্যসারি । কতক্ষন চাহিয়াছিল, বিহান জানেনা । অকস্মাৎ মনে হইল সেই অনুশাসিত পদাতিকদলমাঝে যেন ছন্দপতন ঘটিল । এ কাহারা আসিতেছে ? ছিন্ন বস্ত্র, ক্লিন্ন দেহ, নারী, বালক, বালিকা ! উহাদের হস্ত পশ্চাতে মুড়িয়া বাঁধা । দীর্ঘ রজ্জু অগ্র হইতে তৎপশ্চাৎবর্তীর হস্ত ক্রমান্বয়ে বাঁধিয়া রাখিয়াছে । যেন এক দীর্ঘ শৃঙ্খল আবদ্ধ পশুদল । বিহ্বল বিহান দেখিল অরণ্যচারী উপত্যকাবাসিদের এক দীর্ঘ সারি রাজসেনা হস্তে বন্দী । উহাদের লইয়া যাওয়া হইতেছে । কিন্তু কোথায় ? কোন অপরাধে ? একটি বালিকা, দূর হইতে দেখিয়া বয়স যাহা বিবেচনা হয়, বড় জোর দশ, পদস্খলিতা হইলে তাহাকে কিছুদূর তেমনি হিঁচড়াইয়া লইয়া গেল সেই মুমূর্ষু বন্দীদল । জনৈক সৈনিক তাহাকে খাঁড়া করিয়া দিল চলিতে চলিতেই, দক্ষিন হস্তমূষ্ঠিতে তাহার কেশাকর্ষণ করিয়া । ঘোর বাদ্যনাদে চাপা পরিয়া গেল বালিকার চিৎকার । অদম্য এক ক্রোধে, ঘৃণায়, ধিক্কারে টুটিয়া পড়িতে লাগিল বিহানের হৃদয় । স্বীয় রাজশক্তি হস্তে এ কি নিদারুণ লাঞ্ছনা স্বীয় জনতার ?

অতঃপর আরও পরিবর্তিত হইল দৃশ্য । অসহায় বন্দীগনের পর আসিতে লাগিল যুবকবৃন্দ । উহারাও বন্দী, তাহা কহিবার অপেক্ষা রাখে না । লুণ্ঠিত দ্রব্য সামগ্রী স্কন্ধে বহিয়া চলিতেছে । কন্টকাকীর্ন কষাঘাতে শিহরিয়া উঠিতেছে ক্লান্ত শ্রান্ত ভারবাহী দাসের দল । সঙ্গে লইয়া যাইতেছে সহস্র সংখ্যায় গাভী, বলীবর্দ, তুরঙ্গ শ্রেণী, বর্কর, পঞ্জরাবদ্ধ কুক্কুট, হংসচক্র । লইয়া যাইতেছে ভান্ডিনি পূর্ণ শস্য । বিহানের অন্তস্থল হায় হায় করিয়া উঠিল । এই সম্পদ উপত্যকাবাসীর পুরুষানুক্রমে আপন স্বেদ-রক্ত ক্ষরনে সঞ্চিত ; শীত গ্রীষ্ম বর্ষা নির্বিশেষে আপন ক্ষেত্রে পরম যত্নে উপজাত । রাজ সৈন্য হত্যা করিয়াছে ইহাদের প্রিয়জনদিগে, লুণ্ঠন করিয়াছে সর্বস্ব । অতঃপর অসহায় প্রজাকূল ভারবাহী পশুর ন্যায় বহিয়া লইয়া চলিয়াছে সেই লুণ্ঠিত সম্পদ রাজদস্যুহস্তে সমর্পণ করিতে ; নিজ জীবন, মনুষ্যত্ব, স্বাধীনতা, স্ত্রী, কন্যা, পুত্র নির্বিশেষে সব কিছু ।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.