নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সময় সীমাহীন

হুমায়রা হারুন

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং মননের বিনিময়ে। ব্লগে যোগাযোগের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রকাশ ঘটে। আপনি যখন লেখেন, মন্তব্য করেন, কিংবা অন্যের ভাবনা পড়েন — আপনি তখন মানব প্রজাতির মননে অংশ গ্রহন করেন।

হুমায়রা হারুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

আবদার মিয়ার চর দখল

১২ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩


আমেরিকা –মেক্সিকোর বর্ডার এলাকার বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে একদল জিপসিদের বসবাস আছে। যাদের চোখগুলো ছোট ছোট মুখমন্ডল, বোঁচা বোঁচা। বেশ ফর্শা গোছের। তাদের মধ্য থেকে কোন এক দলছুট বোধহয় নদী পেরিয়ে বঙ্গোপ্সাগরে ঢুকে পড়েছিল। তাই বোধহয় সেই মেক্সিকান জিপসির বংশধর হিসেবে আবদার মিয়া এরকম মেক্সিকান চেহারা ধারণ করেছে। বাংলাদেশে থেকেও সে মেক্সিকানদের মতো ধূর্ত , বুদ্ধিসম্পন্ন। বর্তমানে প্রতিভাবান বিজ্ঞানী হিসাবে আবির্ভাব ঘটিয়েছে। আজ সে স্বনামধন্য সর্বত্র। এক নামে তাকে চেনে। ড. আবদার মিয়া বাংলাদেশে দর্শন চিন্তায় শ্রেষ্ঠ আলোকজ্জ্বল শিখা। দেশে এসে কলেজে জয়েন করেছে সম্প্রতি। পিঠে ব্যাক প্যাক নিয়ে ছুটে ছুটে বেড়ায় এ বিল্ডিং থেকে ঐ বিল্ডিং –এ। অনেক বড় এই কলেজ ক্যাম্পাসে এখন সে সবচেয়ে আলোচিত এক নাম। কিন্তু তারপরও কিছুদিনের মধ্যে আবিষ্কার করলো কলেজের বিভাগীয় প্রধান, তাকে যেন সব কথায় ধরে বসে।
আরে বাবা।
কথায় কথায় কি প্রমাণ দিতে হবে কে কত বড় পাঁঠা? বিভাগীয় প্রধান, শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যান স্যার তাকে যে ছাড়বার পাত্র নয়। আর স্যারের যে সবেধন নীলমণি একখানা ছাত্র আছে সেটাও কলেজে সবার কাছে এক গর্বের বিষয়।
আবদার মিয়া কিছুদিনের মধ্যেই খোঁজ খবর নিয়ে ফেলেছে কে এই ছাত্রখানা। চেয়ারম্যানের নামে বরাদ্দ একটা বিশাল বড় ল্যাব আছে। সেখানেই এই ছাত্র কাজ করে। ল্যাবটা চেয়ারম্যানের নামে বরাদ্দ নাকি সমস্ত বিভাগটাই চেয়ারম্যানের নিজস্ব সম্পত্তি –কে জানে।
চেয়ারম্যান যে রুম চাইবে সেটাই তার নামে বরাদ্দ হবে। তাই দোতলার এই পড়ে থাকা ল্যাবটা তিনিই হস্তগত করেছেন। আর সেখানেই তার ঐ ছাত্রটা কাজ করে। এক হাত দেখে নিতে মন চায় আবদার মিয়ার।
আজ তাই ছটফটানি কমাতে রওনা দিল পাশের বিল্ডিং-এর সেই ল্যাবে।
ল্যাবে ঢুকেই ল্যাপটপটা নিয়ে টেবিলে রাখলো ধপাস্ করে।
ড. আবদার মিয়ার আগমণে রুমা বেশ বিস্মিত। এমন প্রসিদ্ধ একজন বিজ্ঞানীর আগমন ঘটেছে এই ল্যাবে। কারণটা কি হতে পারে? বুঝে উঠতে পারছে না রুমা। তাকে কি অফিস রুম বরাদ্দ করা হয়নি?
আগ্রহভরে আগিয়ে গেল সে প্রফেসার সাহেবের দিকে। ল্যাবের খালি টেবিলগুলোর একটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ।
ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে ড. আবদার মিয়া বললেন, hi!
ওরে বাবা!
কি সুন্দর করে কথা বলে।
মাত্র বিদেশ থেকে এলে যা হয় আর কি। একদম বিদেশী। আর বোঁচা বোঁচা ফর্সা গোল মুখটা যেন উপজাতীয়দের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু উপজাতীয় ও না। বাঙ্গালীও না। কেমন জানি। মেক্সিকান নাকি? অতদূরের উপজাতীয় চেহারা এই লোকটা পেল কিভাবে?
বিদেশে খুব নাম করেছে সে। এখন দেশে এসে ছাত্রদের মাঝে তার জ্ঞান বিতরণ করে দেশকে সমৃদ্ধ করবে। ভীষণ গর্বের বিষয়। রুমাও hi বলল প্রতি উত্তরে। তখনই ল্যাপটপের স্ক্রিনে কি যেন একটা অসুবধা দেখা দিল। প্রফেসর আবদার মিয়া মাউসটা টেবিলের উপর আছাড় দিতে শুরু করলো।
কি অদ্ভুত আচরণ রে বাবা!
রুমা বেশ অবাক!
ঠক্ ঠক্ ঠক্।
আবার ও।
একবার না , দু’বার না, বেশ কয়েকবার। আছাড় দিয়ে ভেঙ্গে ফেলতে চাইছে যেন মাউসটাকে। কি তাকে এতো চঞ্চল করে তুলেছে। সব অস্থিরতা যেন মাউসের ওপর ঝাড়ছে। কিন্তু কেন?
এবার আছাড় দিতে দিতে মাউসের নীচের আবরণটুকু খুলে ফেললো। তারপর যেন সে শান্ত হলো। আবরণ খুলে ভেতরের তারগুলো নাড়াচাড়া শুরু করলো। কিছু একটা ঠিক করতে চাইছে। তার মতো বিরাট এক বিজ্ঞানীর জন্য এটা তো ঠিক করা নস্যি।
কিছুক্ষণ খুটখাট করে আরেকটা আছাড় মেরে আবরণটা লাগিয়েও ফেললো। মাউসটা কাজ করা শুরু করলো। আবদার মিয়ার এই অসামান্য প্রতিভা দেখে রুমা মুগ্ধ হবে না অবাক হবে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। আসলে কিছুই হতে পারলো না। ব্যাক্কল বনে গেলে যেমন হয় তেমন করে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়েই রইলো।
প্রফেসর সাহেবের মনে বোধহয় প্রশ্ন এসেছে মেয়েটির বয়স কত জানতে হবে? তাই বলে বসলো,
: কোন সালে ম্যট্রিক তোমার?
: ২০০৭
: ওহ্ । তাহলে পাঁচ বছরের জুনিয়র তোমরা।
সুতরাং বয়স জানা কমপ্লিট। এবার আর কি তথ্য বাকী রইলো? এই ছাত্রীর বিয়ে শাদীর তথ্য। নাহ্ এ প্রশ্নটা করা ঠিক হবে না। এটা বয়স জিজ্ঞাসার চাইতে বেশী ব্যক্তিগত হয়ে যায়। বয়সটা তো না হয় ম্যট্রিক পাশের বছর দিয়ে জানা যায়। কিন্তু বিয়ে শাদীটা...? কিভাবে জানবে? কলিগদের না হয় জিজ্ঞেস করে নেবে। কলেজের মহিলা টিচারগুলো আছে না,তাদের মধ্যে চিকন করে একটা তো সকলেরর খোঁজ খবর রাখাতে খুব পারদর্শী। আবদার মিয়া নতুন জয়েন করেছে। তার ঘরের খবরও বোধহয় কাঠি বেগমের মুখস্থ হয়ে গেছে। সকলের গুষ্টি উদ্ধার করেই তো ঐ মহিলার দিন কাটে। রুমার আদ্যোপান্ত এই মহিলা তরতর করে বলে দিতে পারবে। প্রফেসর আবদার মিয়ার আমেরিকান আদব কায়দায় মুগ্ধ হয়ে কাঠি বেগম আরো কাছে এসে বসবে।
আরেকটা আছে ব্যারিস্টার কাম দার্শনিক বেগম। ব্যারিস্টারি পড়িতে চেয়েছিল এককালে। কিন্তু দর্শন শাস্ত্রে এসে এন্ডিং। রুমা দেখেছে, এই ভদ্রমহিলা অফিস থেকে পাঁচ মিনিট পরপর লং লাইনে ফোন দিয়ে বাড়ির কাজের মেয়েটাকে খুব আদুরে ভাষায় বলে বলে, ‘কাপড়গুলো ধুয়েছিস?’ অফিসে বসে রান্নাঘর তদারকির এই বুদ্ধি রুমাকে মুগ্ধ করেছিল। তদারকি তো করতেই হবে। হেঁশেল থেকে বের হয়ে একটা মেয়ে- মানুষ বাইরের দুনিয়াতে যে পা রেখেছে এই তো বেশী । কলেজে যে দয়া করে আসে, তা তো কলেজ কেন, সমগ্র বিশ্বের (তার এই ত্যাগের জন্য) তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তাকে প্রশ্ন করলেও আবদার মিয়া রুমার হাঁড়ির কথা শুধু না, আরো সকলের কথা জানতে পেরে যাবে। আর কাঠি বেগমকে জিজ্ঞাসা করলে তো কথাই নাই। আবদার মিয়া তার নিজের সম্বন্ধে যা জানে না তাও জেনে ফেলবে। নতুন জয়েন করাতে তাকে কাঠি বেগম তার বাসায় ইতমধ্যে দাওয়াত করে ফেলেছে কিনা কে জানে । প্রফেসর শ্বেতী সুশীলকে একদফা দাওয়াত দেয়া হয়ে গেছে। সেই লোক বড়ই সুশীল মনা। কাঠি বেগমের নিমন্ত্রণ গ্রহন করায়, আবদার থেকে সে আগিয়ে আছে। আসলে কাঠিরা না থাকলে দর্শন বিভাগ এতো সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারত না। তাদের সারাদিনের কর্মহীনতায় ভরা অমূল্য সময় যে তারা ব্যয় করছে সকলের খোঁজ খবর রেখে, এটাই তো অনন্য সাধারণ একটা ব্যাপার।


রুমার ল্যবে আরেকদিন তার তিনখানা ছাত্র নিয়ে এলো আবদার মিয়া। ল্যাবে তাদের এনে কিছুক্ষণ সময় পার করে তার উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করলো কি না কে জানে। তবে ল্যাবের অধিকার প্রচেষ্টায় সে নেমে পড়েছে এবার। বিশাল খালি এই ল্যাব তাকে পেতেই হবে। ছাত্র তিনটার সামনে মাউস নিয়ে আবার ঠক্ ঠক্ শুরু করলো। মাউস বেঁকে বসলে, সে ও বেঁকে বসে। বলে উঠে FUCK. আমেরিকান কায়দা। ভাগ্য ভাল তার ছাত্রী জুটে নাই এখনো। Fuck শুনলে তো ছাত্রী দৌড়ে পালাবে। আর রুমা পাশে বসা আছে তা তে কি। এ তো গণ্যের মধ্যেই পড়ে না। কিন্তু আবদার মিয়া যে বিকেলে তার মামার টাইলসের দোকানে কাজ করে, সে কথা ছাত্রদের বলার সময় তার গলাটা নীচু করে, বিড়বিড়ানির মতো করে বলে, যেন রুমা শুনতে না পায়। তখন রুমার থাকাটা কেন জানি গণ্যের মধ্যে পড়ে যায় । রুমা বুঝে না Fuck বলতে গলা উঁচু হয়ে ওঠে কেন, আর দ্বিতীয় একটা ব্যবসা করার কথায় সে সংকোচ বোধ করে চিপসে যায় কেন। চুরি তো করছে না। ব্যবসা করছে। দার্শনিক মানুষ গবেষণা ছেড়ে টাইলসের ব্যবসা করছে বলে লজ্জা পাচ্ছে? আগে তো খেয়ে পড়ে বাঁচা। তারপর না দর্শন চর্চা। এতে যদি দ্বিতীয় কোন কাজ করতেই হয় তা দু’ফিট দূরে বসে স্বর নামিয়ে বলতে হবে কেন? রুমার থেকে গোপন রাখার জন্য? এটা একদিক দিয়ে তার জন্য ভালই হয়েছিল। কারণ রুমা কানে একটু কমই শুনতো। বয়ড়া ঠিক না । তবে আশপাশের বিড়বিড়ানি কখনই সে ধরতে পারতো না।


রুমা এরকম টাট্কা বিদেশ ফেরৎ মানুষ আগে কখনো দেখেনি। তারপর রুমার ল্যাবে তার হুটহাট আসা যাওয়া, ছটফট করা, ল্যাব দখলের ইচ্ছে, রুমাকে ভাবাতো লোকটা কি চর দখল করার ফন্দি আঁটতে বার বার আসে নাকি?
তার তিন ছাত্রের সাথে কথা শেষ করে, তাদেরকে নতুন বিশাল এই ল্যাব চিনিয়ে দিয়ে তারা চারজন প্রস্থান গ্রহন কালে আবদার মিয়া দরজার কাছে থেমে দাঁড়ালো।
জিজ্ঞাসা করলো রুমাকে ‘তুমি কি তোমার টিচারের অপেক্ষায়?’ রুমায় উত্তর ,’জ্বী।‘ দরজা পেরিয়ে বের হতে যাবে মাত্র, রুমার জ্বী উত্তর শুনেই তার কন্ঠ যেন হাহাকার করে উঠলো। তার দীর্ঘশ্বাস ভরা কন্ঠে বলে উঠলো তৎক্ষনাত , ‘enjoy ... your solitary confinement.’
ছোটবেলায় উইলিয়াম ওয়ার্দসওয়ার্থের Solitary Reaper কবিতাটি রুমার মনে পড়ে গেল। কিন্তু রুমার solitary confinement মার্কা অবস্থা রুমা নিজে না বুঝলেও সে বুঝে ফেলেছে। কি পর্যবেক্ষণ রে বাবা! না হলে তাকে সবাই বলে বাংলার আইন্সটাইন বলে। তার সুপারভাইজারকেও তো বলতো। উত্তরাধিকার সূত্রে ছাত্রও তো টুকটাক পায়। যেমন সে পেয়েছে বিজ্ঞানী হিসাবে গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা।


পরশু দিনও রুমা বেশ মনোযোগ দিয়ে তার সুপারভাইজারের কম্পিউটারের পিছনে দাঁড়িয়ে স্ক্রিনে কাজ দেখছিল। রুমার মনোযোগ ভেঙে দিয়ে তার দৃষ্টি স্ক্রিন থেকে সরিয়ে তার দিকে ফেরানোর জন্য চেয়ারম্যানের কক্ষেই তার পাশ কেটে পেছন দিয়ে যাওয়ার সময় শিস ধরলো। আমেরিকায় বোধহয় দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য শিস দেয়ার চল আছে। ইয়র্কে থাকতেও দেখেছিল রুমা, এক উদাস মনা প্রফেসর রুমাকে দেখলেই শিস দিয়ে সুর তুলতো। নির্জনতা ভেদ করে গানের সুর কোথা হতে আসে তা কানে আসলে দৃষ্টি তো ঘুরে যাবে। এতেই ইনাদের জিত।
আবদার মিয়ার ও তো নর্থ আমেরিকান আদব কায়দান বলে কথা। আর সাথে Fuck বললে তো আরোও আধুনিক।
কিন্তু নর্থ আমেরিকায় কি চর দখলের চল আছে? রুমা তো মনে হয় স্থানচ্যুত হবে তার কাজের আস্তানা থেকে। ভাসমান হয়ে ঘুরে বেড়াবে এ বল্ডিং থেকে ও বিল্ডিং এ। এ ভাগ্য নিয়েই কি সে এসেছে ? ইয়র্কেও তার কোন অস্তানা ছিল না রিসার্চ স্টূডেন্ট হিসাবে। পাক্কা এক বছর তল্পি তল্পা নিয়ে বারান্দায় বসে থাকতো ক্লাশ শেষে। সেখানে আবদার মিয়া ছিল না কিন্তু তার আছর্ ছিল বোধহয়!


ইয়র্ক তো বিদেশ বিভূঁই।
কিন্তু নিজের দেশে, নিজের কলেজে, নিজের লোকদের দিয়ে এত নাজেহাল ? দীর্ঘ তিন বছর খাড়া পায়ের উপর দাঁড়িয়ে পড়া শুনা করেছে। সুপারভাইজার তোয়াক্কা করেনি। রুমা ভাবতো, একটা ফোল্ডেবেল চেয়ার আর ফোল্ডেবেল টেবিল কি ল্যাবে এনে রেখে দেবে ? রেখে দিলে তো পরের দিন উধাও হয়ে যাবে। নাকি প্রতিদিন সঙ্গে করে বাসা থাকে আনবে? আবার নিয়ে যাবে। এত বড় ল্যাবে এত বিশাল বিশাল এক্সপেরিমেন্টাল অ্যাপারেটাস রারার জন্য টেবিল আছে কিন্তু সবই তো ল্যাবের কাজের জন্য নির্মিত। যেখানে ছাত্ররা দাঁড়িয়ে কাজ করবে।
সম্প্রতি কোন সিলেকশান কমিটির মিটিং হয়েছিল এই ল্যাবে। সেই সুবাদে একটা পড়ার টেবিল আর চেয়ার জুটেছে রুমার। এতো চমৎকার করে তা নিয়ে গুছিয়ে বসাটা যেন গত তিন বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতিদান। চেয়ার টেবিল নিয়ে রুমা যে ল্যাবের এক কোণে বসার আয়োজন করেছে, তা দেখে কিছুদিন যাবৎ অনেকের কেন জানি সহ্য হচ্ছে না। এদের সকলেরই তো আস্ত অফিস কক্ষ আছে। এরকম গড়ের মাঠ মার্কা ল্যাব তো নয় তাদের কক্ষগুলো ।অনেক কম্প্যাক্ট । প্রপার অফিস রুম। তাহলে রুমার টেবিল পেতে বসাটাতে সমস্যা কি ওদের?
সহ্য হচ্ছে না কেন?
কেঙঠি নতুন জয়েন করেছে কলেজে। । সাথে সাথেই অফিস রুম পেয়েছে। তাও রুমার অফিস দেখে আজ তার সমতল বুকের ভেতরটা যেন চিন্ চিন্ করে উঠেছে। কেঙঠি একদিন বলেই ফেলেল, ‘রুমা... অফিস।‘ সুন্দর একটা হ্যান্ড ব্যাগ দুলাতে দুলাতে রুমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেল তখন ভেতরের রুমে। একমাত্র সেদিন রুমা দেখেছে কেঙঠির প্রশান্তময় চেহারা । এতদিনের সহপাঠী কিন্তু কখনো তাকে সাপ ছাড়া কিছু মনে হয় নি। সেদিন একদম অন্যরকম ছিল । কিন্তু স্বভাবে তার সেই আফসোস- রুমা অফিস বানিয়ে ফেলেছে এই ল্যাবটাকে।

সাপ্তাহিক ছুটি শেষে পরের সপ্তাহে ল্যাবে এসে দেখলো, রুমার চেয়ারটা উধাও। হতেই পারে। যার অফিস কক্ষ থেকে ওটা আনা হয়েছিল তিনি হয়তো বা নিয়ে গেছেন। কিন্তু পড়ার সেই ছোট্ট ভারী টেবিলটা গেল কোথায়? রুমা চারপাশ তাকায় । আবিষ্কার যা করে তাতে তার চোখ ছানাবড়া। বেশ ভারী কিন্তু একটু ছোট সাইজের পড়ার টেবলটি সুন্দর মতো বেশ কায়দা করে দুইটা ভারী ভারী L আকৃতিতে বসানো এক্সপেরিমেন্টাল টেবিল দুটির মাঝে, খাপ মতন করে বসানো হয়েছে। ঐ জায়গা থেকে আর টান দিয়ে টেবিল টেনে বের করা যাবে না। যেমন উঁচু করে নিয়ে ওখানে বসানো হয়েছে তেমনি উঁচু করেই বের করতে হবে। বেশ চিন্তা করে যেন কেউ এই জায়গাটুকুর সদ্বব্যবহার করেছে। কম করে হলেও চারজন মানুষ লাগবে এই কাজটা করতে। অর্থাৎ একা একজন নয়, অনেক মানুষ ডেকে, কারোর নির্দেশে রুমার এই আস্তানাটা সরানো হয়েছে।

এত প্রতিহিংসা?
কিন্তু কেন?
পড়ে থাকা এই ল্যাবের সব জায়গা কি সে একাই দখল করে ফেলছে?
অর্থাৎ এখন থেকে রুমাকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হবে। পাঁচ মিনিটের জন্য কথা বলতে তো সে ল্যাবে আসে না, ঘন্টার পর ঘন্টা কাজ করতে হয়। তাহলে এখন গতি কি? পিওন-দের জিজ্ঞেস করলো রুমা। কোন সদুত্তর পেল না। তারাও বেশ বিনয়ের সাথে বলল, যে তারা জানে না কারা , কখন সরিয়েছে এই টেবিলটা।
কেউ জানে না? তাহলে তো সুপারভাইজারকে জানাতে হয়!
পরেরদিন ল্যাবে এসে, রুমার তার রিডিং টেবলের এই উড়াল দেখিয়ে সুপারভাইজারকে বলল, ‘স্যার, দেখেছেন, টেবলটি সরিয়ে কোথায় রেখেছে?’ সুপারভাইজার আরো এক কাঠি উপর দিয়ে গেল। ভাবখানা এমন, যেন কিছুই হয়নি। বেশ পাশ কাটিয়ে স্যার একটা হালকা উত্তর দিলেন। বললেন, ‘অন্যন্যদের চলাচলে অসুবিধা হয়। তাই সরিয়ে রেখেছে হয়তো বা কেউ।।‘
লও ঠ্যালা।
তিনিও জানেন না আসলে কে সরালো টেবলটা এত সুনিপুণ ভাবে ঐ দূরে কর্ণার বরাবর। তাই বললেন, ‘হয়তো বা কেউ।‘ তবে কারণ টা জানেন – চলাচলে অসুবিধা।
রুমার বসার ব্যবস্থার ইতি ঘটেছে।
রুমাকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
চর দখল শেষ। এবার রুমা ভাসমান।

পরের দিকে রুমা বাইরে থেকে কাঁচের জানালা ভেদ করে দেখতো ল্যাবে আবদার মিয়া এক হাবা গোবা ছাত্রকে পড়াচ্ছে । তাহলে বিভাগের টপ্ ছাত্ররা প্রফেসর আবদার মিয়াকে গাইড হবার জন্য অ্যাপ্রোচ করেনি? নাকি প্রফেসরের প্রতিভার ঠ্যালায় তার কাছে আসতে সাহস পায় নি? রুমা আর কি বলবে নিজেকে? রুমা ঠিক জানে না।
তবে নিভু নিভু দীপের মত ঐ গো- বেচারা ছাত্রকে আবদার মিয়া তার রিসার্চের শেষ সম্বল হিসেবে পেয়েছে তার ল্যাবের নতুন ডেকোরামে।

পুনশঃ বহু বছর পর আবদার মিয়া কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে বিবাদে জড়িয়ে কলেজ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।
চর দখলের এই -ই তাহলে পরিণতি?
.............
শুরু ২৬/০২/২৬
শেষ ৩০/০৩/২৬
ঘাড় ঘুরানি

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.