| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
হুমায়রা হারুন
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং মননের বিনিময়ে। ব্লগে যোগাযোগের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রকাশ ঘটে। আপনি যখন লেখেন, মন্তব্য করেন, কিংবা অন্যের ভাবনা পড়েন — আপনি তখন মানব প্রজাতির মননে অংশ গ্রহন করেন।
তারিখঃ ৪ঠা এপ্রিল ২০০২
স্থানঃ লেকচার থিয়েটার, দ্বিতীয়তলা
ডিউটি করবে দীপা আর সুমন
সময়ঃ রাত আটটা থেকে ১২টা পর্যন্ত
অর্থাৎ এই চার ঘন্টায় লেকচার থিয়েটারের সকল আসবাবপত্র ঝকঝকে, তকতকে করে, বিশাল বড় বড় কার্পেটের ধুলা ঝেড়ে পরের দিনের অফিস মিটিং এর জন্য লেকচার থিয়েটার উপযুক্ত করে রেখে যেতে হবে।
দীপার জন্মসংখ্যা ১৩, তাই ৪ সংখ্যাটি তারিখ হিসেবে আসলেই তার কেমন যেন ছটফট লাগে। আতঙ্ক ঠিক না। কিন্তু একটা অন্যরকম উৎকণ্ঠা। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, এই ভেবে, খারাপ কিছু নিশ্চয়ই হবে না। কারণ ৪ সংখ্যাটি যে তারi জন্মসংখ্যা ।
কিন্তু আজ যে একটু বেশি ধরণের অন্যরকম লাগছে।
কিন্তু কেন?
শুধু দিনটির সংখ্যা ৪ নয়, দিনটি বছরের চতুর্থ মাসের চতুর্থ দিন। মানে এপ্রিলের ৪ তারিখ। আর ২০০২ সালের সংখ্যগুলো যোগ করলেও তো সেই দুই যোগ দুই- চার।
দীপার ভিতরটা কেমন যেন লাগছে। নিজেকে ঠিক মানাতে পারছে না। আজকে নিজেকে কোনভাবেই শান্ত করতে পারছে না। মন বলছে আজ যেন কিছু একটা অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য। এসব ভাবতে ভাবতেই লেকচার- হলে প্রবেশ করল দীপা। হলের এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত যেন দেখা যায় না। কম করে হলেও ৪০ বা তারও বেশি ছাত্রের আসন বসানো হয়েছে এই থিয়েটারটি। লেকচার থিয়েটারের ঝাড়ামোছার কাজ করছে আজ প্রায় পাঁচ বছর হলো। সাথে সহকর্মী হিসেবে প্রায়শই থাকে সুমন। আজ কেন যে সুমন আসতে এত দেরি করছে। এত বড় লেকচার থিয়েটারের নির্জনতা দীপার কেমন যেন গা ছমছমে ভাবের উদয় করে। এত বছর যাবৎ নাইট ডিউটি করছে, তারপরও লেকচার থিয়েটারের বিশালতা আর নির্জনতার সাথে কেন জানি একাত্ম হতে পারেনি সে। সুমন না আসা পর্যন্ত কি বাইরে অপেক্ষা করবে নাকি ভেতরে যেয়ে কাজ শুরু করে দেবে? আর কতই বা অপেক্ষা করা যায়, এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই কানের কাছে মৃদু শিসের শব্দ। ঘাড় ফিরে তাকালো দীপা। সুমন এসেছে অতঃপর। সেই দুষ্টু ভরা হাসি। দীপার প্রশ্ন সরাসরি, 'দেরি হলো কেন? তুমি জানো না একা এত বড় লেকচার হলের নাইট ডিউটিতে আমার ভীষণ ভয় লাগে একা একা?'
সুমনের আবারও হাসি। আর চকিত উত্তর, 'যদি একেবারেই আর না আসি? একা একা যদি কাজ করতে হয় সারাটা জীবন?'
দীপা হকচকিয়ে যায়।
কি যে বলে সুমন, সে বুঝে উঠতে পারে না। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে শুধু ওর দিকে। সুমন আজ কেমন যেন করে কথা বলছে। কাজ করার কোন মুড যেন তার নেই। হঠাৎ এর মাঝেই সুমন ওর হাতটা ধরে থিয়েটারের একেবারে কোণার দিকে টেনে নিয়ে, কোমর জড়িয়ে ধরে, ওর মুখটা কাছে এনে বলল, 'তোর জন্য একটা চকলেট এনেছি।'
'কোনটা?' দীপার বিস্ময়!
: এই দেখ।
ক্যাডবারির মুখটা খুলে চকলেট - বারটা দীপাকে না দিয়ে নিজের মুখে আধেক টুপ্ করে পুরে দিল। তারপর দীপার কাছে মুখটা এনে বলল, 'নাও। খাও।'
দীপার পক্ষে এই দুষ্টমি কি বোঝা সম্ভব? কিভাবে খাবে ওর মুখ থেকে? দীপাকে আরো কাছে টেনে নিয়ে বুকের মাঝে চেপে ধরলো এবার সুমন। তারপর বলল, 'আমার মুখ থেকে নিয়েই খাও না।' চক-বারটি তার মুখে আবার পুরে দিয়ে, মুখটা এগিয়ে নিয়ে এলো একদম নাক বরাবর দীপার সামনে।
এমনভাবে জাপটে ধরে আছে কেন সুমন? কখনো তো এমন সে করেনি। কি হয়েছে আজ তার? দীপা না পারছে নিজেকে সুমনের হাত থেকে ছাড়াতে, না পারছে ওর হাত দুটো নাড়াতে। ও খুব শক্ত করে জাপটে ধরেছে দীপাকে। অতএব দীপা এখন বাধ্য। সুমনের আদেশ তাকে পালন করতেই হবে। এছাড়া উপায় নেই ওর বন্ধন থেকে মুক্ত হবার। দীপা মুখটা এগিয়ে চকবারের কাছে নিজের মুখটা স্পর্শ করতেই, সুমনের নাকের সাথে নাক আর কপোলের সাথে কপোলের স্পর্শ কেমন যেন এক শিহরণ জাগালো। আজ প্রথম সুমনের এত ঘনিষ্ঠ হয়েছে সে। এত বছর দু'জন কাজ করেছে, সপ্তাহে প্রায় দুইদিন একসাথে ডিউটি থাকতো তাদের, কিন্তু কখনো দীপা এমন ঘনিষ্ঠতার কথা চিন্তা করেনি। সুমন তার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু আজ যেন সুমন একদম অন্যরকম। দীপাকে তার বুকের মাঝে যেন আগলে রেখে দিতে চাইছে। এমন চাপ দিয়ে ধরে রাখলে আর কিছুক্ষণ পর দম বন্ধ হয়ে দীপা বুঝি চ্যাপ্টা হয়ে যাবে। একটু নিজেকে ছাড়াবার জন্য, হাতটা সরাতে চাইলেও সুমন আরো কাছে নিয়ে যেন ওকে বেঁধে ফেলছে।
দীপা প্রশ্ন করবে কিভাবে? কন্ঠ যেন জড়িয়ে আসছে। তারপরও বলল, 'কি হয়েছে আজ তোমার সুমন? কত কাজ বাকি, জানো? পুরো হলঘর পরিষ্কার করতে হবে। কাল কনফারেন্স আছে তো, মনে নেই?'
সুমনের কোন হুঁশই নেই যেন। ওর চোখের মাঝে সে ডুবে আছে।
দীপার চোখ পিঙ্গল বর্ণের। সাধারণ বাঙালি ধাঁচের নয়। চুলগুলো লালচে, কিন্তু বাঁ পাশের একখানা চুল একদম সোনালী। আর সুমনের চোখগুলো একদম সবুজাভ নীল। সারা দক্ষিণ অঞ্চলের কোন মানুষের চোখ এমন নীলাভ সবুজ হয় না। লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী সুমন, তার চেহারার জোরে আরো ভালো কোন কাজ যোগাড় করতে পারতো। কেন যে এখানে ধোয়া মোছার কাজ নিয়েছে সে, দীপা বুঝতে পারে না। কখনো জিজ্ঞেস করেনি যদিও। জীবনের প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে একটা কাজ যে জুটেছে সেটাই বড় কথা। তাও আবার এত বড় একটা প্রতিষ্ঠানে, এইতো বেশি। হতে পারে ছোটখাট দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এই কাজ, কিন্তু তারপরও চাকরির এই দুর্মূল্যের বাজারে দু'জনের জন্য খুবই জরুরি এই কাজটা। কিন্তু কাজ বাদ দিয়ে চকলেট -বার দেবার উছিলায় দীপাকে এভাবে বুকের মাঝে ধরে রাখার কি কারণ? এটা কি ভালো দেখায়?
সহকর্মী থেকে বন্ধু । কিন্তু প্রেমিক তো নয়। আর আজ সুমনেরই অন্তরঙ্গতায়, প্রথম যেন দীপা নিজেকে অনুভব করল একটু অন্যভাবে। প্রতি রোমকূপে আজ তার অন্যরকম শিহরণ। ইচ্ছে করছে হারিয়ে যেতে সুমনের সাথে দূরে কোথাও। অনেক দূরে। অজানার উদ্দেশে।
সুমন খুব বুঝে দীপাকে। দূরে কোথাও অনেক দূরে চলে যাওয়ার কথা ভাবনায় আসাতেই সুমন প্রশ্ন করে বসলো,
: কি ভাবছিস রে?
: না কিছু না।
: কিছু না মানে কি?
: কিছু না মানে কিছু না। ছাড়ো এবার। যাব আমি।
সুমনের প্রশ্ন, 'কোথায় যাবে?' দীপার উত্তর, 'কাজে।'
সুমনের আবার প্রশ্ন, 'কিসের কাজ?'
: ওমা কাজ আছে না? কালকে কনফারেন্স। তার জন্য থিয়েটার রেডি করতে হবে না?
সুমন অবাক হয়ে বলল, 'সেই সময় যদি না পাই?'
দীপার অবাক প্রশ্ন, 'কেন সময় পাবো না?'
সুমনের কন্ঠস্বরটা যেন একটু দৃঢ় হয়ে গেছে। এবার একটা চাপে যেন মিশিয়ে ফেলবে দীপাকে তার সাথে। মুখটা আবার কানের কাছে এনে বলল, 'সময় নেই দীপা। যেতে হবে আমাকে।' দীপার অবাক চোখে প্রশ্ন,'কোথায়?' সুমনের ওম্ পেয়ে দীপা যেন গলতে গলতে একদম একাকার। সুমনের বুকের ভিতর মিলে মিশে সে শিহরিত। সুমন খুব ধীরে ধীরে বলল, 'দীপা আমাকে আজ যেতে হবে আমার বাড়িতে। যেখান থেকে আমি এসেছি।'
দীপার মনে হলো, আজ এতদিন একসঙ্গে সুমনের সাথে কাজ করেছে, অথচ জানাই হয় নাই, সুমনের আদি বাড়ির ঠিকানা। আসলে সুমন তাকে যদি এমন ঘোরের মাঝে না ফেলতো, দীপা হয়তোবা এতো গভীরভাবে ওকে নিয়ে কখনোই ভাবতো না। আজ তার এই গভীর আলিঙ্গন, প্রথম স্পর্শ আর বুকের ওম্ নতুন ভবানা জাগাতো না। কিন্তু এমন তো কখনো আগে হয়নি। আজ হঠাৎ কেন? কি হলো সুমনের?
আজকের দিনটা চতুর্থ মাসের চতুর্থ দিন। দীপার জন্মসংখ্যার দিন। ওর কাছে যেন ঝাপসা ঠেকছে সবকিছু। এমন হচ্ছে কেন?
দীপা আবার ছাড়াতে চাইছে নিজেকে, সুমনের বাহুডোর থেকে। না সে উপায় নেই । সুমনের শক্ত বাহুর আগল থেকে, দীপার ছুটে বেরিয়ে পড়া একেবারেই অসম্ভব। তাই তার শেষ চেষ্টা, শেষ প্রশ্ন,' কতদূর তোর বাড়ি? আজ হঠাৎ যাবার সিদ্ধান্ত কেন? ক'দিন পরে ফিরবি?'
সুমন শুধু তাকিয়ে আছে দীপার চোখের দিকে। অনেকটা ক্ষণ পার হলে সুমন বলল, 'আমার ঠিকানা তো এই গ্রহে নয়। আমি এসেছি ভেনাস থেকে। তোদের পৃথিবীর প্রেমের দেবী ভেনাস যে গ্রহের অধিকর্তা, সেখান থেকে। এখানে থাকার সময় আমার শেষ। আমাকে যেতে হবে।
দীপা বিহবল এসব শুনে। সুমন কি তাহলে ভীনগ্রহী এক্সট্রা -টেরেস্ট্রিয়াল (ET) নাকি? ET-রা তো এত রক্ত মাংসের মানুষ হয় না। হতে পারে না। তারা যে অন্য গ্রহের অন্যরকম এন্টিটি, অন্য ধরণের সত্তা। সেই সত্তা তার বুকের চাপে, তার সর্বাঙ্গ দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে দীপাকে অনুভব করিয়েছে তার হৃদস্পন্দন, তার প্রতিটি ধমণীতে বয়ে যাওয়া শিহরণ। ওর সবটুকু দীপা অনুভব করছে তাকে আগলে রাখার মাঝে। কিভাবে তাহলে বিশ্বাস করবে যে সুমন মানুষ নয়। সে ভীনগ্রহের বাসিন্দা। সুমন যদি নিমেষে চলে যেতে পারে তার গ্রহে, নিমিষে কি আবার আসতে পারে না সেই ভেনাস থেকে পৃথিবীতে?
দীপার সাথে সপ্তাহে দুবার ডিউটি পড়তো তার। লেকচার থিয়েটারে রাত আটটা থেকে বারো টা পর্যন্ত। এবার ওর শিফটে অন্য কেউ হয়তোবা আসবে। কিন্তু সুমন এই পৃথিবীতেই থাকবে না?
তার কি মনে পড়বে পৃথিবীর কথা? পৃথিবীর মানুষগুলোর কথা? নিজের বুকের মাঝে পিষে ফেলে দীপাকে যতক্ষণ ধরে রেখেছিল, সেই সময়টুকুর কথা? ওদের গ্রহে কি সময় বলে কিছু আছে? দীপা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। সুমন যদি ভীনগ্রহী হয়, তাহলে দীপাকে পছন্দ করার দরকার কি ছিল?
আজ থেকে দীপা যে ভীষণ একা।
©somewhere in net ltd.