| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বসন্ত কেবলমাত্র শুরু হয়েছে । একটা দুইটা কোকিলের হাক ডাক শোনা যায় যদিও এখনো তার সুরেলা কণ্ঠের আহবান জেগে উঠেনি । গাছে গাছে নতুন পাতা, হালকা সবুজ রং এক ধরনের মোহ ছড়াচ্ছে চারপাশে । কিছুদিন আগেও শীতে বিবর্ণ আর ধূসর হয়ে গিয়েছিল পরিবেশ । শীতের অনার্দ্রতায় চারপাশে তাকানোর ইচ্ছা তাকলেও একাগ্রচিত্তে দেখা হয় না । তাকাতে গেলেই কনকনে হাওয়া আর ঠোঁট ফাটা যন্ত্রণা ধমকের সুরে খোলসের ভেতর ঢুকিয়ে দেয় । কিন্তু বসন্ত তার আগমনী বার্তা নিয়ে আহবান জানায় ¯িœগ্ধ ও নির্মল পরিবেশ উপভোগের । বারান্দায় শুয়ে আছে মোহন লাল । ইদানিং তার কাশিটা খুব বেড়েছে । একটু পানির জন্যে তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু পানি দেওয়ার মত কেউ নেই । তার চোখের সামনে ভেসে উঠে এই বুঝি তার মা এসে পানি দিয়ে যাবে । মা’কে নিয়ে একের পর এক স্মৃতি মনে পড়ে যায় কিন্তু মা আর আসে না । ছোট থাকতেই মা’কে হারিয়েছে সে । দিন দিন তার স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে । এত কিছুর মধ্যেও সে প্রকৃতির পরিবর্তন বুঝতে পারে , কোকিলের ডাকে জেগে উঠে । ছোট কুঁড়ে ঘরে বসবাস হলেও এখন তাকে সারাদিন-ই বারান্দায় শুয়ে বসে থাকতে হয় । যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই তাই তেমন কেউ খোঁজখবরও নিতে আসে না । মোহন অবাক হয়ে যায়, স্তব্ধ হয়ে যায় । যে দেশের ¯বাধীনতার জন্যে তার মা প্রাণ বিসর্জন দিল সেই মায়ের সন্তানকে আজ দেখার কেউ নেই । এসব কিছু ভাবতে থাকে মোহন আর অজান্তেই চোখের কোণা দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে ।
আগষ্ট মাসের মাঝামাঝি, চারপাশে গোলাগোলির শব্দ ইদানিং অনেক বেশি শোনা যায় সাথে হাহাকার, আগুন, বারুদের গন্ধ । এমন একটা সময়ে পরপারে চলে যায় রূপার স্বামী । ক্যান্সারের চিকিৎসা করার সক্ষমতা তাদের ছিল না । যেখানে কোনরকম দু’বেলা কেয়ে বেঁচে থাকা সেখানে চিকিৎসা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয় । স্বামীর বিদায়ে দিশেহারা হয়ে যায় রূপা, বুঝে উঠতে পারেনা দেশের এমন অবস্থায় কিভাবে দুই ছেলেকে নিয়ে বেঁচে থাকবে । উপায়ন্তর না পেয়ে কাজ নেয় মানুষের বাড়ি । দেশের এমন অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যেও ভয়ে ভয়ে গ্রাম থেকে নদী পেরিয়ে শহরে যায় । শহরে মানুষের বাড়ি কাজ করে কোনরকমে দুই ছেলে নিয়ে চলে যায় । এভাবেই চলতে থাকে রূপার দিন । কিছুদিন পরেই সে বীভৎস দৃশ্য দেখতে থাকে । প্রতিদিন লাশের পর লাশ নদী দিয়ে ভেসে যায় । আর কাক,শকুন, কুকুরের কাড়াকাড়ি দেখে রূপার মনে তীব্র রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা জেগে উঠে । প্রতিশোধের নেশা তার মনে তীব্র হয়ে উঠে । এমন সময় একদল মুক্তিযোদ্ধার সাথে পরিচয় হয় । তাঁদের সাথে কথা বলে নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে উঠে প্রতিশোধের নেশায় । গ্রামের মিলিটারি আর রাজাকারদের খোঁজ খবর এনে দেওয়ার দায়িত্ব সে নেয় । ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে সে কাজে নেমে যায় । কিছুদিন যাওয়ার পর রাজাকার বাহিনীর প্রধান মোল্ল্যা মিয়া রূপাকে মিলিটারী বাহিনীর কাছে নিয়ে যায় । মোল্ল্যা বলে- হুজুর, এই মহিলা ভিক্ষঅ করে, বিভিন্ন জায়গায় আসা যাওয়া আছে । তখন পাক সেনা বলে - তুমি যদি মুক্তিযোদ্ধাদের খবর এনে দিতে পার তাহলে বখশিস্ পাবে । দেশের জন্যে কিছু করার কাজটা সহজ হয়ে যায়, যদিও সাহসিকতার দিক থেকে সহজ ছিল না । রূপা মুক্তিবাহিনীকে এক জায়গায় প্রস্তুত রেখে আসে আর এদিকে পাক সেনাদের বলে মুক্তিবাহিনী নদীর ধারে আছে । মিলিটারীরা তাদের পর্যাপ্ত শক্তি নিয়ে অপারেশনে যায় । কিন্তু নদীর ধারে তাদের পাওয়া যায় না বরং ফেরার পথে মুক্তিবাহিনীর অতর্কিত হামলায় নাজেহাল অবস্থা হয়ে যায় পাক সেনাদের । এভাবেই চলতে থাকে রূপার অপারেশন । পাক সেনাদের ভুল তথ্য দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায় অথচ মুক্তিযোদ্ধাদের পাওয়া যায় না,উল্টো অতর্কিত হামলার শিকার হয় । একের পর এক অতর্কিত হামলায় মিলিটারী বাহিনী নি:শেষ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা । এভাবে একদিন ভুল তথ্য দিতে গিয়ে রূপা ধরা পড়ে যায় । মোল্ল্যা মিয়া বলে - হুজুর আমার মনে হয় এই মহিলাই একের পর এক ভুল তথ্য দিয়ে আমাদের বিপদে ফেলতেছে । চিরতরেই ধরা খেয়ে যায় রূপা । রশির এক প্রান্ত হাতে আরেক প্রান্ত মোটরসাইকেলে বাঁধা হয় । তারপর পুরো শহর ঘোরা হয় রূপাকে এভাবে বেঁধে। তাঁর জামা ছিড়ে রক্তে মাংসে একাকার হয়ে যায় পিচঢালা পথ । এখনো রক্তের দাগ লেগে আছে রাস্তায়, এ দাগ যে মুছে যাবার নয় । এমন নির্যাতনের পরও যখন দেখা গেল তাঁর প্রাণ আছে, এখনো শ্বাস-প্রশ্বাস চলতেছে । তখন শুরু হল আরেক নারকীয় নির্যাতন । তাঁর দুই পা দুই জিপে বেঁধে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয় আর শরীর দুই ভাগ হয়ে দুই দিক চলে যায় । সেদিন পুরো শহর নিশ্চুপ হয়ে দেখেছে, আর নিরবে চোখের ঝল ফেলেছে । তাঁর ছিন্ন ভিন্ন দেহাবশেষ নিক্ষেপ করা হয় বলেশ্বর নদে । এ সাহসী নারী রূপাকে বক্ষে ধারণ করা বলেশ্বর নদ কুলুকুলু রবে বয়ে যাওয়াকে আজও মনে হয় এ নৃশংস হত্যাকান্ডের করুণ বিলাপ ।
এতক্ষণে মোহনের বালিশ ভিজে গেছে চোখের জলে । সাহসী মায়ের আত্মত্যাগ, অকুতোভয় দেশপ্রেমের কথা মনে করে গর্বে তাঁর বুকটা ভরে উঠে । এমন মায়ের সন্তান ক’জন হতে পারে ।
বিজয়ের দীর্ঘ দিনেও স্বীকৃতি মেলেনি এক অকুতোভয় মহান নারীর । কার্পণ্যতার হীনমানসিকতার চাদরে ডেকে রাখা হয়েছে তাঁর স্বীকৃতির সনদ । নেই শহীদ গেজেটের কোথাও তাঁর নাম । শুধু তাই নয় রূপার ছেলে মোহন লাল যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ
©somewhere in net ltd.