| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
-রাহাত, আমার হাসিবের সাথে বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
-কি বলছিস এসব? দেখ অনন্যা, সবসময় ফাজলামো ভাল লাগেনা।
-রাহাত, আমি সিরিয়াস। এক বছর আগেই আমাদের বিয়ে হয়েছে। বিয়েটা আমি নিজের ইচ্ছাতেই করেছি। এর মধ্যে আমাদের ফিজিক্যাল রিলেশনও হয়েছে।
-তো এতদিন বলিসনি কেন?
-জানিনা। কখনো বলতেও চাইনি। কিন্তু আজকে মনে হচ্ছে বলে দিলেই ভাল হয়।
-আজকে কেন এটা মনে হচ্ছে? আর শোন, তোর কথা আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা।
-আমি জানতাম তুই আমার কথা বিশ্বাস করবিনা। তাই আমি ঠিক করেছি তোকে পরশু কাজী অফিসে নিয়ে যাব। আমাদের বিয়ের রেজিস্ট্রি দেখাব। দেখলে অবশ্যই বিশ্বাস করবি। আর হ্যাঁ, আজকে তোকে এসব কথা বলে দিলে ভাল হবে বলে মনে হচ্ছে কারণ আমার মনে হয় আমাদের সম্পর্কটা এখানেই শেষ করলে ভাল হয়। তুই আমার সবচেয়ে ভাল ফ্রেন্ড। কিন্তু অনেক ভেবে দেখলাম, আমাদের সম্পর্কটা অন্যদিকে গড়াচ্ছে। আমি চাচ্ছিনা তুই আমার সাথে ইনভল্ভ হয়ে নিজের লাইফটা নষ্ট করিস। পরশু আমাদের দেখা হচ্ছে। ওকে?
-কিন্তু কাল তো আমার জন্মদিন। তুই নিজেইতো এতদিন ধরে এত প্ল্যান করলি যে আমার জন্মদিনে পুরা দিন আমার সাথেই কাটাবি।
-তা বলেছিলাম ঠিক। কিন্তু আম্মু বলছে কাল নাকি বাসার সবাই গ্রামের বাড়ীতে যাবে। আমাকে অবশ্যই যেতে হবে। আমাকে একা বাসায় রেখেতো আর সবাই যেতে পারেনা। সরি। প্লিজ বোঝার চেষ্টা কর।
-ওকে রাখি।
-প্লিজ রাহাত, মন খারাপ করিসনা। আমারতো বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আমার জন্য মন খারাপ করে কি লাভ? তুই না বলেছিলি তোর কাজিন সায়মা অনেক কিউট? ও তো নিজেই তোকে মনে মনে পছন্দ করে। তুই বরং ওর দিকেই কনসান্ট্রেট কর। প্রয়োজনে আমি ওর ব্যপারে তোকে সব হেল্প করবো।
-না দরকার নাই হেল্প করার। আমার সায়মার দিকে কনসান্ট্রেট করা লাগবেনা। আমি একাই ভাল আছি। আর শোন, পরশু আমি দেখা করতে পারবনা। আমি বিশ্বাস করেছি তোর বিয়ে হয়েছে। এবার রাখি। অনেক ঘুম আসছে। বাই।
-আমি জানি তুই সব রাগ করে বলছিস। তুই পরশু একবার আমার সাথে দেখা কর। পরশুই আমাদের লাস্ট দেখা হবে। আমি আর কখনো তোর সাথে দেখা করবনা। প্লিজ।
-আচ্ছা এটা পরে দেখা যাবে। এখন রাখি। আর কথা বলতে ভাল লাগছেনা। বাই।
-প্লিজ রাহাত রাগ করিসনা। পারলে আমাকে মাফ করে দিস। আমি কখনো এটা চাইনাই। কিন্তু নিয়তি আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে। আমার আর কিছু করার ছিলনা। আর প্লিজ, তুই নরমাল থাকিস। তোর মন খারাপ দেখতে আমার যখন ভাল লাগেনা, আর কারো ভাল লাগবেনা। প্লিজ।
-রাখি। বাই।
-আচ্ছা তুই যখন কথা বলতে চাচ্ছিসনা, রাখি। ভাল থাকিস। পরশু দেখা হবে। বাই।
ফোনটা রেখে রাহাত ওয়াশরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে নিতে হবে। ফোনে কথা বলার সময় নিঃশব্দে প্রচন্ড কান্না করেছিল। এখন চোখমুখ ফুলে উঠেছে। মা দেখলে অনেক প্রশ্ন করবে। এত প্রশ্ন ফেস করতে ইচ্ছে করছেনা। ঘড়িতে সময় দেখে নিল। রাত এগারোটা পঞ্চাশ। প্রচন্ড যন্ত্রনা হচ্ছে। ঘুমও আসছেনা। তাই একটা পিল খেয়ে নিল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
সকাল সাতটা চল্লিশ। সায়েমের ফোনে রাহাতের ঘুম ভাঙল। ফোন রিসিভ করার ইচ্ছা না থাকা সত্বেও রিসিভ করল।
-কিরে কালকে রাত্রে এতবার কল দিলাম। ধরলিনা যে?
-না, অনেক তাড়াতাড়ি ঘুমাইছিলাম। কেন ফোন করছিস বল।
-কেন ফোন করছিস মানে? আজকে তোর জন্মদিন, আর আমি ফোন দিবনা? তাড়াতাড়ি বাসা থেকে বের হ। আমি তোর বাসার সামনে আসতেছি।
-না রে দোস্ত। আজকে বের হবনা। ভাল লাগতেছেনা।
-ও আচ্ছা। আমিতো ভুলেই গেছিলাম। তুমিতো আবার অনন্যার সাথে বের হবা। বিপদে পড়ছিলাম একটা কাজে। মনে করছিলাম তোমারেই নিয়া যাব। আমি কি জানতাম নাকি যে আমার জিগরী দোস্তর কাছে আমার চেয়ে অনন্যার প্রায়োরিটি বেশী?
-ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল।
-তুই আসবি কিনা তাই বল।
-আচ্ছা আসতেছি। আর শোন, অনন্যার সাথে দেখা করার প্রোগ্রাম ক্যানসে্লড। আমার এমনিতেই বের হতে ইচ্ছা করতেছিলনা। তুই ইমোশনাল অত্যাচারটা না করলে বাসায়ই থাকতাম।
-হইছে আর ইমোশনাল কথাবার্তা বলা লাগবেনা। তাড়াতাড়ি বের হ।
রাহাত তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। মা পেছন থেকে অনেক ডাকাডাকি করল নাস্তা করে বের হতে। কিন্তু তার কিছু খাওয়ার মুড এই মুহুর্তে নাই। গতকাল রাতে অনন্যার সাথে কনভার্সেশনের কথাগুলো ওর কানে এখনো বাজছে।
কি আছে এই হাসিবের মধ্যে যার কারণে অনন্যা তার সাথেই বিয়ে করেছে? তাও আবার কাউকে না জানিয়ে। হাসিবের সাথে অনন্যার এক বছরের রিলেশন তা সে জানে। অনন্যা ওকে বলেছিল এই ব্যপারে। এটাও বলেছিল যে সে হাসিবের সাথে সুখী না। মেয়েটা ওর কাছে কোন কিছুই লুকায়না। কিন্তু এই কথাটা সে কেন লুকিয়ে রেখেছিল তা এখনো সে ভেবে পাচ্ছেনা।
সায়েমের সাথে দেখা হওয়ার পর রাহাত যথেষ্ট সাবধান ছিল যাতে সায়েম ওর মন খারাপের ব্যপারটা টের না পায়। কিন্তু যথারীতি সায়েম বুঝেই ফেলে যে রাহাতের মন খুব খারাপ। সোলমেট বলে কথা। সায়েমের সাথে কিছুই লুকানোর নেই। সে সায়েমকে সব বলে দিল। রাহাত অনন্যার সম্পর্কের ব্যপারে সায়েম মোটামুটি সবকিছুই জানে। কিন্তু সায়েম এই মুহুর্তে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেনা। অনেকক্ষণ চিন্তাভাবনার পর রাহাত বলে,
-আচ্ছা বাদ দে। এসব নিয়ে পরে কথা হবে। তোর না কি বিপদের কথা বলছিলি ফোনে? কি প্রবলেম হইছে?
-আচ্ছা তুইতো সালমানকে চিনিস তাইনা?
-হ্যা চিনি। তোর কাজিনের বয়ফ্রেন্ড। সেদিনই তো তোর সাথে ঝামেলা বাধাইছিল। এখন আবার কি করছে?
-এখন আবার ঝামেলা বাধাইছে। টি এস সি তে দেখা করতে যাচ্ছি এখন। ব্যাপক ঝামেলা হইতে পারে। তুইতো মারামারির ব্যপারে অনেক ইন্টারেস্টেড। তাই তুইও যাবি। এটা আমার পক্ষ থেকে তোর জন্য বার্থডে গিফট।
-আচ্ছা এই ব্যপার তাহলে?
-চল যাই।
টি এস সি তে প্রায় এক ঘন্টা ধরে বসে আছে দুইটি ছেলে। এখনো কেও আসার নাম নেই। সায়েমের কয়েকটা কল এসেছিল। ও বিড়বিড় করে বলছিল, “আমি অনেকক্ষন ধরে এসে বসে আছি। তুমি কই?” রাহাত কে ফোন করেছিল তা জানতে চাইলে সায়েম বলে যে সালমান ফোন করেছে।
এভাবে আরো প্রায় আধা ঘন্টা বসে ছিল তারা। এবার রাহাত সত্যিই বিরক্ত হয়ে গেল। যাওয়ার জন্য রাহাত উঠে দাঁড়াবে এমন সময় দূর থেকে দুইজন মেয়েকে আসতে দেখে সে থমকে দাঁড়ায়। অতি পরিচিত দুইটি অবয়ব। ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। যত কাছে আসতে থাকে, ওদের চেহারা ততই স্পষ্ট হয়। অবশেষে দুইজনই কাছে এসে দাঁড়ায়।
অনন্যা আর অনন্যার সবচেয়ে কাছের বন্ধু নওরীন। অনন্যার হাতে ছিল একটি বক্স আকৃতির কিছু।
রাহাতের দু চোখে বিশ্বাস হচ্ছেনা। সে বোকার মত অনন্যার দিকে তাকিয়ে আছে। অনন্যা ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। বোঝাই যাচ্ছে, সে রাহাতের চেহারা দেখে মজা পাচ্ছে।
-তুই না আজকে তোর গ্রামের বাড়ীতে যাওয়ার কথা ছিল?
-ছিল।
-তো যাসনি কেন?
-আজব! আজকে তোর বার্থডে না? পুরা দিন তোর সাথে থাকব। বাড়ীতে যাওয়ার প্রোগ্রাম ক্যানসেল করেছি।
-আমার বার্থডের জন্য ফ্যামিলি প্রোগ্রাম ক্যানসেল করলি কেন?
-প্রায়োরিটি।
-তো আজকেই কাজী অফিসে যাবি নাকি? তোর সেই প্রমাণ দেখাতে?
-কিসের কাজী অফিস? কিসের প্রমাণ?
রাহাত এবার সব বুঝতে পেরেছে। সবকিছু তাহলে ওদের সেটআপ ছিল। রাহাতের এবার সত্যিই রাগ হল। এসব ব্যপারে কেও সারপ্রাইজ দেয় নাকি? সায়েমও অভিনয় করতে পারে ভাল। অনন্যা ওর দিকে তাকিয়ে এখনো হাসছে। নওরীনও মুখ টিপে হাসছে।
যাক, বার্থডের দিনটা তাহলে ভালই যাবে।
আজ রাহাতের জন্মদিন। রাহাতের হাতে অনন্যার একটি ছবি। সেই মায়াবী হাসির ছবিটি এখনো সে বারবার দেখে। আজও দেখছে। আর দুই বছর আগের জন্মদিনের স্মৃতি মনে করছে। চোখ থেকে গাল বেয়ে এক ফোঁটা পানি পড়ল ছবিটির উপর। আচানক সম্বিত ফিরে পেল রাহাত।
ওর সাথে আজ অনন্যা নেই। প্রায় ছয়মাস আগেই সে রাহাতের হাত ছেড়ে দিয়েছে। হাত ছেড়ে যেখানে গিয়েছে সেখান থেকে আর কখনো ফিরে আসা সম্ভব না। ওর বিশ্বাস, অনন্যা ওখান থেকে দেখছে ওকে।
আরো অনেক কথা মনে পড়ে যায় রাহাতের। অনন্যা তার ফ্যামিলির সাথে রাহাতের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তার ফ্যামিলি রাহাতকে মেনে নিতে চায়নি। ওরা অন্য ছেলের সাথে অনন্যার বিয়ে ঠিক করে। আর কিছু করার ছিলনা। আর তাই রাহাতকে না জানিয়েই জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে অনন্যা। সায়ানাইড আগে থেকেই কোথা থেকে যোগাড় করে রেখেছিল। বিয়ের আগের দিন তা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। রাহাত অনেক ডাকাডাকি করেছিল। কিন্তু অনন্যা ওঠেনি।
অনন্যার নিথর দেহের ছবিটি আজও ওকে তাড়া করে বেড়ায়।
রাহাতের হাতে অনন্যার ছবি। আজও সে তার বার্থডের পুরোদিন অনন্যার সাথেই কাটায়। ওর সাথে অনন্যার শরীর নেই তো কি হয়েছে? ওর স্মৃতির প্রতিটা কোণে কোন এক অশরীরি অনন্যার অস্তিত্ব।
মানুষ নাকি ওপারে গেলে আকাশের তারা হয়ে যায়। রাহাত রাতের আকাশের তারাগুলো দেখে। অনেক তারার মধ্যে সে তার অনন্যাকে খোঁজে। তার বিশ্বাস, অনন্যা তাকে দেখছে।
©somewhere in net ltd.