| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
জন্ম শব্দটা জন্ম থেকেই কেমন যেন। কবি দাউদ হায়দার ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ‘ কবিতাটা লিখে রাতারাতি যেমন জনপ্রিয় হয়েছিলেন, আবার এই কবিতার কারণেই তাকে রাতারাতি দেশ ছাড়তে হয়েছিল। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে মানবসন্তান জন্মের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের ব্যাপ্তি না থাকলেও এদেশে দশ মাস দশ দিন বলে একটা ব্যাপার আছে। ফকির সাহেবের গানে আছে (ফকির আলমগীর। পুরো নাম না লিখলে উনি মন খারাপ করতে পারেন। তবে গানটা কে লিখেছিলেন এবং কে সুর করেছিলেন সেটা এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না।) ’দশ মাস দশদিন ধরে/ কত কষ্ট করে/ মা আমার পৃথিবীর জানাইল ঠিকানা‘। এ কারণে কিনা জানি না, স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাসের ব্যাপ্তিকে অনেকে কম মনে করে থাকেন। যারা কম মনে করেন তাদের ধারণা যত বেশি কষ্ট বা ত্যাগের পরে জন্ম বা স্বাধীনতা পাওয়া যায়, তত বেশি চেতনা পরবর্তীকালে জাগরুক থাকে দেশ গড়ার জন্য।
জন্ম নিয়ে আদিখ্যেতা আসলে এদেশে কম নেই। ছবির নাম আছে, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি‘। মালামাল পরিবহনের জন্য বাংলাদেশে যত ট্রাক আছে, বেশির ভাগের তেলের ট্যাংকিতে লেখা থাকে- ’আমি ডিজেল বলছি/জন্ম থেকে জ্বলছি‘। গানেও আছে, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো/আর কতোদিন বলো সইব‘? এমন শত শত গানের ভেতর আরেকটা এমন- ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো..’
গানের কথায় পরে আসা যাবে। জন্ম শব্দটা অবশ্য ভিন্ন মাত্রার একটা দ্যোতনা (সবচেয়ে সুখী মাত্রাও বলা যেতে পারে) পায় যখন এর সাথে ‘দিন‘ শব্দটা যুক্ত হয়। শুভ জন্মদিন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখীতম শুভেচ্ছা বাণী।
তবে জন্ম শব্দটা ২০১৪ সালের জুনে এসে অন্যরকম একটা দ্যোতনা এবং আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারণে। তিনি সংসদে বলেছেন, (নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমানের সেন্টিমেন্টাল বক্তব্যের সূত্র ধরে) “ওসমান পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর একটা নিবিড় সর্ম্পক ছিল। ওই পরিবারে বসেই জন্ম হয়েছিল আওয়ামী লীগের। শামীম ওসমানের দাদা খান সাহেব ওসমান আলী এবং বাবা সামছুজ্জোহা খান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত কাছের মানুষ। নাসিম ওসমান বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে একটি যুব ব্রিগেড গড়ে তুলছিলেন। পরে জাতীয় পার্টি করলেও তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের।”
ধরে নিলাম খান সাহেব ওসমান আলি ও তার ছেলে শামসুজ্জোহা খান জন্ম থেকেই আওয়ামী লীগের সাথে ছিলেন এবং পরের প্রজন্মের সন্তানরাও আছেন। এই পরিবারের প্রতি শেখ হাসিনার ভালোবাসা চোখে পড়ার মত। তবে তার চোখ কী সবার জন্য সমান ছিল?
বঙ্গবন্ধুকে নিজের পিতার মত ভালোবাসেন, কথাবার্তা, আলোচনা কিংবা রাজনৈতিক জনসভায় কোনদিন যারা বঙ্গবন্ধুকে খাটো করেননি, বাংলাদেশের জন্মলাভের সময়কার স্বাধীনতা যুদ্ধে যাদের অবদান এই জাতি কখনো ভুলতে পারবে না, সেই কামাল হোসেন এবং বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সম্পর্কে শেখ হাসিনার আলোচিত বক্তব্যটি ছিল এমন- ‘উনি (ড.কামাল হোসেন)বাংলা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারতেন না। আমি শুদ্ধ করে দিতাম। এখন উনি এক ‘ক‘ আরেক ‘ক‘ (কাদের সিদ্দিকী)কে নিয়ে আমার বিরুদ্ধে কা কা করেন।‘
এবার আমরা শামীম ওসমানের একটা আবেগীয় হিট বক্তব্য শুনে আসি- ‘আততায়ীর গুলিতে তার মৃত্যু হতে পারে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বােমা হামলায় মরি নাই, এক্সটেনশন লাইফে আছি কীভাবে মরব, ঠিক জানি না। স্বাভাবিক মৃত্যু হবে, না অস্বাভাবিক হবে তাও জানি না। কার গুলিতে মরব, সেটাও বুঝি না। খুনি তাে চারদিকেই ঘােরে। যদি মৃত্যু হয়, তাই আপনাদের কাছে অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিলাম। ভুল থাকলে আমাকে মাফ করে দেবেন।”
মন খারাপ করে তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন- “যদি তাদের প্রয়ােজন হয়, দেখাশােনা করব।” অপরাধ করলে কেউই ছাড় পাবে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “ওসমান পরিবারকে নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করেন। কিন্তু এর চেয়ে অনেকে বেশি অপরাধ করার পরও সেই সব অপরাধীদের নিয়ে লেখা হয় না। তাদের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে এই পরিবারের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বারবার এই পরিবারের প্রতি আঘাত এসেছে।”
এবার নাসিম ও শামীম ওসমানের মতো যাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভালোবাসা আছে তাদের একজনের দিকে নজর দেই। ভদ্রলোকের নাম জয়নাল হাজারী। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ফেনীতে ভদ্রলোক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। সব সংবাদপত্রই তখন ফেনীকে সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে আখ্যায়িত করত। ২০১৪ সালের মে মাসে ফেনীর একটি উপজেলার চেয়ারম্যান একরামুল হককে গুলি করে আহত করার পর পুড়িয়ে মারা হয়েছে। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুসারে জয়নাল হাজারী ও ফেনীর সাংসদ নিজাম হাজারীর দ্বন্দ্বের জের ধরে এটা ঘটে থাকতে পারে। যদিও এক বিএনপি নেতা খুনের জন্য টাকা দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর বেরিয়েছে। ২০০১ সালের অক্টোবরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় ফেনীতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “জয়নাল হাজারীর দায়দায়িত্ব আমি নিলাম“। ২০০১ সালে হাজারীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা, ২০১৪ সালে এসে শামীম ওসমানদের দেখাশোনার ভার নিচ্ছেন তিনি। অবশ্য এদিকে খালেদা জিয়াও কম যান না। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকার লালবাগে এক নির্বাচনী জনসভায় নাসিরউদ্দীন পিন্টুকে পাশে রেখে খালেদা জিয়া উপস্থিত মানুষদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন পিন্টু আপনাদের ছেলে। দুষ্টুমী আর বেয়াদবি করলে বকে দেবেন।
তবে শেখ হাসিনাকে ভালো লাগে একারণে যে তিনি দায়িত্ব নিতে জানেন। সবাই দায়িত্ব নিতে ও পালন করতে পারে না। পুরোনো ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে (২০০৯ সালে) অনেক মানুষ মারা গেলে দুই পরিবারের দুঃখের কথা উঠে আসে পত্রপত্রিকায়। এই দুই পরিবারের দুজন মেয়ের বিয়ে হবার কথা ছিল, যাদের বাবা-মা আগুনে পুড়ে মারা যান। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়ে এদের বিয়ের আয়োজন করেন। এটি যেমন সত্য ঠিক তেমন সত্য হচ্ছে এখনও পুরোনো ঢাকার অলি গলি থেকে এধরনের কারখানা উচ্ছেদ করা হয়নি। মেঘ নামে চিরদুঃখী এক ছোট্ট ছেলের দায়দায়িত্বও নিয়েছেন শেখ হাসিনা। মেঘের বাবার নাম সাগর সারোয়ার আর মার নাম মেহেরুন রুনি। দিন যায় বছর যায় কিন্তু এই সাংবাদিক দম্পতি হত্যা-রহস্যের কূলকিনারা করতে পারেন না শেখ হাসিনার সরকার।
তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে ব্যাপারটা? কাদের ভালোবাসেন শেখ হাসিনা আর কাদের দায়দায়িত্ব তিনি নেন? যাদের দায়দায়িত্ব তিনি নেন তাদের সাথে কী শেখ হাসিনার কোন মিল আছে? একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।
এক
স্বৈরাচার এরশাদের আয়োজনে ১৯৮৮ সালে মহাতামাশার এক নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন নাসিম ওসমান। এরপর নারায়ণগঞ্জের ডাবল মার্ডার আলোচনার জন্ম দেয়। তারু মিঞা সর্দারের ছেলে কামাল ও কালাম নামের অন্য একজন কোরবানী ঈদের আগের দিনে খুন হন। সবাই তখন ওসমান পরিবারের দিকেই সন্দেহের চোখ রেখেছিলেন। বহু বছর পরে এসে ২০১৩ সালে নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যা মামলায় নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরি ওসমানের নাম উঠে আসে এবং অন্তত দুইজন অভিযুক্ত তাদের স্বীকারোক্তিতে আজমেরি ওসমানের জড়িত থাকার ঘটনা ও তার টর্চার সেলের সব ধরনের অত্যাচারের কথা আইনশৃংখলা রক্ষীকারী বাহিনীকে জানায়! খান সাহেব ওসমান আলি এবং শামসুজ্জোহা সাহেব, যারা আওয়ামী লীগের জন্ম থেকেই এর সাথে যুক্ত ছিলেন তাদের নামে কোন ধরনের অভিযোগ না উঠলেও নাসিম ওসমান এবং তার ছেলের নামে সন্ত্রাস ও খুনের অভিযোগ উঠেছে। জানি না পানি এবং স্নেহের মতো সন্ত্রাসও ক্রমশ নিম্নগামী কিনা।
দুই
১৯৯৮ সালে টানবাজারে খুনের ঘটনা ঘটে এবং এর অল্প কয়েকদিনের ভেতরে কোন রকম পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই রাতের আধারে যৌনকর্মীদের উচ্ছেদ করা হয়। শামীম ওসমান এই উচ্ছেদের ব্যবস্থা করেছিলেন।
তিন
খালেদা জিয়া শান্তিচুক্তির প্রতিবাদে দেশব্যাপী লংমার্চের আয়োজন করলে নারায়ণগঞ্জে তার গাড়িবহরকে আটকে দিয়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিলেন শামীম ওসমান।
চার
এরপর ফেনীর মতো সারা নারায়ণগঞ্জ জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন শামীম ওসমান। টেন্ডারবাজি, হত্যা, সন্ত্রাস, গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ সব কিছুতে শামীম ওসমানের জড়িয়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে নামটি ভীতিকর এক নাম হিসেবে কুখ্যাতি পেয়ে যায়। ২০০১ সালের নির্বাচনে এমন ভিআইপি সন্ত্রাসের কারণে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হয় এবং পহেলা অক্টোবর রাতে বীরের বেশে পলায়ন করেন শামীম ওসমান। ২০০১ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত (মাঝখানে সামান্য কয়েকদিন বাদে) পুরোটা সময়ে এই বীরপুরুষ দেশের বাইরেই ছিলেন।
দেশে ফিরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের কল্যাণে তিনি আবারও নারায়ণগঞ্জে জাকিয়ে বসেন এবং ২০১৪ সালের আরেক মহাতামাশা ও কলঙ্কময় নির্বাচনে এমপিও হয়ে যান। মাঝখানে নারায়ণগঞ্জের মেয়র নির্বাচনে প্রশাসনের সব ধরনের সহযোগিতার পরও তিনি সেলিনা হায়াত আইভির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনার মূল আসামী নূর হোসেনকে পালাতে সহায়তা করার প্রমাণ সংবলিত একটা টেলিফোন সংলাপও ছড়িয়ে পড়ে যা দারুণ বিতর্কের জন্ম দেয়।
পাঁচ
শামীম ওসমানের মত শেখ হাসিনার ভালোবাসা পাওয়া আরেক ভিআইপি সন্ত্রাসের জন্মদাতা জয়নাল হাজারীও রাতের আধারে ফেনী থেকে পালিয়েছিলেন বোরকা পরে। জানি না ভবিষ্যতেও এমন কোন পলায়নের ঘটনা আমাদের দেখতে হবে কিনা।
জন্ম নিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম। শেষ করা উচিত জন্ম প্রসঙ্গ দিয়েই! গানে আছে, ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো‘। কবিতায় আছে, ‘জন্মেছি এই দেশে‘। তবে এই দেশে শামীম ওসমান, জয়নাল হাজারী, হাজি মকবুল এবং হাজি সেলিমরাও জন্মেছেন। এই দেশে চিরদুঃখী হয়ে রুনি আর সাগরের ছেলে মেঘও জন্মেছে। তবে জন্মের সাথে জীববিজ্ঞানেরও একটা সম্পর্ক আছে। কেউ স্বীকার করুক আর নাই করুক।
আরিয়ান নামের একটি ছেলে ক্লাশ টুতে পড়ে। তার ভাই পড়ে ক্লাশ নাইনে। সে একদিন ক্লাশ রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে তার ভাইয়ের জীববিজ্ঞান ক্লাশের পুরোটা মনোযোগ দিয়ে শুনল। তারপর সে বাসায় এসে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল- বাবা আমি কোথা থেকে এসেছি? বাবার উত্তর- তোমাকে বেহেশতের ফুল বাগান থেকে কুড়িয়ে এনেছি। আরিয়ানের পাল্টা প্রশ্ন- বড় ভাইয়াকেও কী সেখান থেকে পেয়েছ?তোমার বাবাও কী তোমাকে সেখান থেকে কুড়িয়ে এনেছিলেন?বাবা হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলেন। বাবার উত্তর শুনে আরিয়ান বিজ্ঞের মত বলল- বুঝেছি আমাদের বংশে জীববিজ্ঞানের ব্যাপারটা নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তরাধিকার আছে, দায়িত্ব নেয়া কিংবা আরও অনেক কিছু আছে, জীববিজ্ঞানের মতো শুধু গণতন্ত্রের বিজ্ঞানটা নেই।
লেখক: রম্য লেখক ও অভিনেতা।
[email protected]
প্রকাশিত: এখানে
©somewhere in net ltd.