| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
(গুম কমিশনের রিপোর্ট)
গুমের প্রকৃতি (Anatomy of Enforced Disappearances)
কমিশনের মূল্যায়নে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বলপূর্বক গুমের ঘটনায় বাংলাদেশ পুলিশের অধীন বিভিন্ন ইউনিট জড়িত ছিল। বিশেষ করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী, সাক্ষী ও পরিবারের সদস্যদের দ্বারা প্রধান দায়ী সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়াও ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই)-এর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
কমিশনের কাছে নিবন্ধিত ১,৬৭৬টি অভিযোগের মধ্যে ৭৫৮টি অভিযোগের প্রাথমিক পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়েছে, যার সারসংক্ষেপ টেবিল-১-এ উপস্থাপিত হয়েছে।
তাদের অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুসিদ্ধান্ত হলো, গত ১৫ বছরে একটি সুপরিকল্পিত ‘গুম সংস্কৃতি’ গড়ে তোলা হয়েছিল, যা সচেতনভাবে এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে যাতে এর প্রকৃত রূপ ও দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রায়ই সাদা পোশাকে অভিযান পরিচালনা করত এবং নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে অন্য সংস্থার নাম ব্যবহার করত। উদাহরণস্বরূপ, কোনো অভিযান যদি ডিজিএফআই পরিচালনা করত, তারা নিজেদের র্যাব হিসেবে পরিচয় দিত; আবার র্যাবের সদস্যরা নিজেদের ডিবি হিসেবে পরিচয় দিত। ফলে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের জন্য প্রকৃত সংস্থাকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে যে, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে ভুক্তভোগীদের আদান-প্রদানের একটি প্রথা বিদ্যমান ছিল। একটি বাহিনী অপহরণ করত, অন্য একটি বাহিনী আটক রাখত, এবং তৃতীয় কোনো বাহিনী ভুক্তভোগীকে হত্যা বা মুক্তি দিত। এক ভুক্তভোগীর কল রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, অপহরণের অল্প সময়ের মধ্যেই তার সিমকার্ড ডিজিএফআই সদর দপ্তরে সক্রিয় হয়েছিল। পরবর্তীতে তার আটক অবস্থানের বিবরণ এবং সহবন্দিদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হয় যে, তাকে প্রথমে ডিজিএফআই-এর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি)-এ রাখা হয়েছিল। পরে তাকে ঢাকার বিভিন্ন র্যাব আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয় এবং কয়েক মাস পর চট্টগ্রামে র্যাব-৭-এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয়। এই ধরনের বিভ্রান্তিমূলক কৌশলের উদ্দেশ্য ছিল, কোনো ভুক্তভোগী বেঁচে ফিরলেও যেন দায়ী সংস্থাকে নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়।
এছাড়া, একই বাহিনীর মধ্যেও গুম কার্যক্রমকে বিভিন্ন ধাপে বিভক্ত করা হতো। অপহরণকারী দল, আটক ব্যবস্থাপনার দল এবং হত্যা বা মুক্তির দায়িত্বপ্রাপ্ত দল সাধারণত ভিন্ন ভিন্ন হতো। এর ফলে অভিযানে অংশগ্রহণকারী অনেক সদস্যই জানত না যে তারা কাকে আটক বা হত্যা করছে, কিংবা পুরো অভিযানের পটভূমি কী। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার থেকে প্রতীয়মান হয়েছে যে, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এসব কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এ বাস্তবতা নেতৃত্ব পর্যায়ে জবাবদিহিতা ও তদন্তের গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
গুমের ঘটনাগুলোকে আরও অস্বচ্ছ করে তুলতে বাহিনীগুলোর টিম প্রায়ই পরিবর্তন করা হতো, এখতিয়ার মিশ্রিত করা হতো এবং কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট সীমারেখা রাখা হতো না। উদাহরণস্বরূপ, র্যাব-২ সহজেই র্যাব-১১-এর এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় অভিযান পরিচালনা করতে পারত, অথচ এ বিষয়ে কোনো অভ্যন্তরীণ প্রশ্ন বা জবাবদিহিতা থাকত না। এখতিয়ার ও অপারেশনাল এলাকার এই সচেতন মিশ্রণ এমন একটি অস্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, যা মূলত নজরদারি ও জবাবদিহিতা এড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত ছিল।
এই সমগ্র ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ও সুসংগঠিত চরিত্র কমিশনের অনুসন্ধানকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। কারণ ব্যবহৃত পদ্ধতি ও কাঠামোগুলো এমনভাবে নির্মিত ছিল যাতে দায়িত্ব নির্ধারণ করা কঠিন হয় এবং জবাবদিহিতার পথ রুদ্ধ থাকে। তবুও, বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য ও তথ্যের ভিত্তিতেই এই গোপন ব্যবস্থার কিছু অংশ উন্মোচন করা সম্ভব হয়েছে। তাদের সাহস, সহযোগিতা ও সাক্ষ্য এই অনুসন্ধানের জন্য অমূল্য অবদান রেখেছে এবং এজন্য তারা গভীর কৃতজ্ঞতা ও স্বীকৃতির দাবিদার।
©somewhere in net ltd.