নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অদ্ভুত ছেলেটি

মেহেদী আনোয়ার

জানিনা

মেহেদী আনোয়ার › বিস্তারিত পোস্টঃ

আওয়ামী গুম এবং হত্যা নৃশংসতার ১৬ বছরের হালখাতা , পর্ব ০৫

১৫ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩

(গুম কমিশনের রিপোর্ট)



নির্যাতনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্মোচনঃ

এই প্রতিবেদনে আমরা ৫ আগস্টের পূর্বে বাংলাদেশে চালু থাকা গুম ও নির্যাতনের পদ্ধতিগত চর্চা উন্মোচনের চেষ্টা করেছি, যা রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু অংশ দ্বারা-বিশেষ করে RAB ও DGFI-এর মতো নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে-বাস্তবায়িত হতো।
প্রমাণ ধ্বংসের চেষ্টাসত্ত্বেও, আমরাএমন উপাদান সংগ্রহ করেছি যা ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলে যায়। যেমন: RAB-2 এবং CPC-3- এ ব্যবহৃত ঘূর্ণায়মান চেয়ার, TFI সেলে মানুষ ঝুলিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত পুলি-সিস্টেম (pulley system), এবং একাধিক স্থানে শব্দনিরোধক ব্যবস্থা, যা নির্যাতনের সময় ভুক্তভোগীদের চিৎকার বাইরের কেউ না শুনতে পারে সে জন্য ব্যবহৃত হতো।
 বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদের “গুম(enforced disappearance)”
করা হতো, অর্থাৎ তাদের আটকের কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড থাকত না। এর ফলে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো দায়মুক্তভাবে নির্যাতন চালাতে পারত ।

 পরবর্তীতে জনসমক্ষে হাজির করার আগে নির্যাতনের চিহ্ন লুকাতে কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের ওষুধ বা মলম দেওয়া হতো, যাতে ক্ষতচিহ্ন সহজে নজরে না আসে। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের চিহ্ন মুছে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেই তাদের মুক্তি দেওয়া হতো।
 তবে এটাও সত্য যে, অনেক ভুক্তভোগী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হয়েছিলেন স্পষ্ট নির্যাতনের চিহ্নসহ, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই সেসব উপেক্ষা করা হয়েছিল।
এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত চিত্রগুলো ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নির্মিত পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

১। সর্বব্যাপী অস্বস্তি (Generalised Discomfort )
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সম্মিলিত প্রভাবে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘ সময় ধরে চরম অস্বস্তিকর (prolonged discomfort) পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছেন।
তাদের প্রায়ই প্রহরীদের অর্ধেক পরিমাণ খাবার দেওয়া হতো। হাতকড়া পরিয়ে ও চোখ বেঁধে একাকী সেলে (solitary
confinement) রাখা হতো। নিজের ভাগ্য কী হবে সে অনিশ্চয়তার সঙ্গে এই কঠোর অবস্থার সম্মিলন তৈরি করত এক ধরণের নিরবিচ্ছিন্ন মানসিক চাপ ।
গুমের এই প্রক্রিয়া ভয় ও অপমানের একটি সংস্কৃতির সাথে একত্রে কাজ করত, যেখানে শরীরের স্বাভাবিক কাজ করাও পরিণত হতো আরেক ধরণের নিপীড়নের অভিজ্ঞতায় ।


১ থাকার স্থানের ভয়াবহ ও অমানবিক অবস্থা
অত্যন্ত ছোট ও সংকীর্ণ কক্ষগুলো বন্দিদের জন্য সর্বোচ্চ অস্বস্তি তৈরি করতো। ভুক্তভোগীদের শরীর অস্বাভাবিক ভঙ্গিমায় দীর্ঘ সময় রাখা হতো।
“... ঘুমাতে নিলে, একজন আইসা বলতেছে, 'এই ঘুমাতেছেন কেন?' মানে ঘুমাইতে দিতো না। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে যাওয়ার পরে বালিশ সরাই ফেলতো। একদম শীতের মধ্যে কম্বল- বালিশ সব সরাই ফেলছে। আর এমনি শাস্তি দিতো। চেয়ার ছাড়া [খালি পায়ের ওপর ভর দিয়ে] বসায় রাখতো। .. আবার দেখা গেছে, হ্যান্ডকাপ পরায় বিছানার পাশ আটকে দিয়ে রাখতো। তা আমার এই হাতে মশা হইলে আমি তো মারতে পারতাম না। মশা কামড়াইতো। পাইতাম আর কি । এরকম শাস্তি দিছে আর কি”

৪৬ বছর বয়সী পুরুষঃ ২০১৫ সালে DGFI, RAB-10 ও RAB-2 কর্তৃক অপহৃত; ৩৯১ দিন গুম ছিলেন।

২) গোপনীয়তাহীন, অস্বাস্থ্যকর ও অপমানজনক সেল জীবন


ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ কক্ষ । স্যানিটেশনের জন্য শুধু একটি বিল্ট-ইন প্যান ব্যবহার করতে হতো। প্রাকৃতিক প্রয়োজন মেটানোর সময়ও সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারির মধ্যে থাকতে হতো ।
• পুরুষ ভুক্তভোগীদের জন্য সেলের ভেতরে গোপনীয়তার অভাব ছিল বিশেষভাবে নির্মম।
সেলগুলো ছিল ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ। সেলে টয়লেট ব্যবহারের জন্য নিচু বিল্ট-ইন প্যান বসানো ছিল। তবে, মাঝে কোনো দেয়াল না থাকায়, ভুক্তভোগীরা যখন শুয়ে থাকতেন, তখন তাদের শরীর প্রায়শই ওই প্যানের উপরেই পড়ে থাকত। যার ফলে তারা ময়লা, প্রস্রাব ও মলের অস্বাস্থ্যকর অবস্থার মধ্যে থাকতে বাধ্য হতেন।

আরো ভয়াবহ ছিল, এসব সেলে স্থাপন করা সিসিটিভি ক্যামেরা, যা প্রতিটি কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করত। ফলে ভুক্তভোগীদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত মুহূর্তেও, যেমন প্রাকৃতিক কাজের জন্য টয়লেট প্যান ব্যবহারের সময়ও, চরম অপমান ও লজ্জার মধ্যে থাকতে হতো।
৩) নারীদের জন্য বিশেষ শাস্তি
নারীত্বকে কেন্দ্র করে নারী বন্দিদের জন্য বিশেষ অপমান ও সহিংসতার বর্ণনা এসেছে।
“অনেকটা ক্রুসিফাইড হওয়ার মত করে হাত দুই দিকে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখছে। ওরা আমাদের ওড়না নিয়ে নিছিল; আমার গায়ে ওড়না ছিল না। আর যেহেতু জানালার দিকে মুখ করা ছিল, অহরহ পুরুষ মানুষ যে কতগুলা আসছে দেখার জন্য এটা বলার বাহিরে। মানে তারা একটা মজা পাচ্ছে। বলাবলি করতেছিল যে, ‘এমন পর্দাই করছে, এখন সব পর্দা ছুটে গেসে। আমার পিরিয়ড হওয়ার ডেট ছিল অনেক লেটে। কিন্তু যেই টর্চার করে তাতে আমি এত পরিমাণ অসুস্থ হয়ে যাই যে, সাথে সাথে আমার পিরিয়ড আরম্ভ হয়ে যায়। তারপর উনাদেরকে বলি যে, “আমার তো প্যাড লাগবে” এটা নিয়ে অনেক হাসাহাসি করে ওরা।”

২৫ বছর বয়সী নারী; ২০১৮ সালে পুলিশ তাকে অপহরণ করে; তিনি ২৪ দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন ।

৩) নির্মম প্রহারের অভিজ্ঞতা
প্রহার ছিল নির্যাতনের সবচেয়ে সাধারণ সর্বব্যাপী রূপ। প্রায় প্রতিটি স্থানে এবং প্রায় প্রতিটি ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রেই এটি ঘটেছে; এমনকি তাদের ক্ষেত্রেও, যাদের ওপর অন্য কোনো ধরনের নির্যাতন প্রয়োগ করা হয়নি।

“চোখে কখনো গামছা দিয়া, কখনো ওই যে জম টুপি, এগুলা দিয়ে বাঁধা থাকতো। হাত কখনো সামনে, কখনো পিছনে। আর যখন বেশি মারবে, তখন এই হাত পিছনে দিয়ে রাখতো আর আমার এই কনুই গুলো, দুই হাটু এগুলোতে খুব জোরে জোরে মারতো মোটা লাঠি দিয়ে। ... তো আমি মনে করতাম যে, আমার হাড়গুলো বুঝি ভেঙ্গে যাবে, কিন্তু পরবর্তীতে দেখলাম যে ফুলে অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে, কিন্তু হাড় ভাঙছে এরকম বুঝি নাই। এক পর্যায়ে আমাকে বলল যে, “তোর হাড় থেকে মাংস আলাদা করে ফেলবো।...”

৪৭ বছর বয়সী পুরুষ; ২০২৩ সালে CTTC কর্তৃক অপহৃত: ১৬ দিন গুম ছিলেন।


৪) স্থায়ী আঘাতের চিহ্নসমূহ

এই ভুক্তভোগীকে DGFI-এর JIC-তে আটক রাখা হয়েছিল, যেখানে টর্চারের কারণে তার নাভির দুই পাশে আঘাতের চিহ্ন সৃষ্টি হয়।

..আমার পা বেঁধে উপর দিকে করে ঝুলাইছে। মাথা নিচের দিক, পা উপর দিক দিয়ে। আমার শরীরে কোনো পোশাক রাখে নাই তখন, একেবারে উইদাউট ড্রেস।
তারপরে এলোপাথাড়ি আমাকে দুইজনে একসঙ্গে পিটাতে থাকে। খুব সম্ভব বেতের লাঠি দিয়ে। পরবর্তীতে আমাকে অসংখ্যবার টর্চার করেছে এবং মারতে মারতে আমার এমন . হয়েছে, চোখের কাপড় খুলে গেছে। নাকে-মুখে চড়ানো, থাপড়ানো। মারছে। ওই সময়ে চামড়া ছিঁড়ে, মানে চামড়া ফেটে রক্ত ঝরে গেছে। ... '

২৩ বছর বয়সী পুরুষ; ২০১৭ সালে RAB-11 কর্তৃক অপহৃত; ৭২ দিন গুম ছিলেন।
৫) স্থায়ী আঘাতের চিহ্নসমূহ
এই ভুক্তভোগীকে CTTC-তে টানা প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে নির্যাতন করা হয়েছিল; নির্যাতনকারীরা পালাক্রমে চার ঘণ্টার শিফটে তাকে মারধর করত। তার শরীরজুড়ে এখনও স্থায়ী আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এই নির্যাতনের ঘটনা একজন সহবন্দী নিশ্চিত করেছেন, যিনি সেই সময় তার কষ্ট স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন ।

৪৬ বছর বয়সী পুরুষ; ২০২২ সালে CTTC কর্তৃক অপহৃত; ২৫৩ দিন গুম ছিলেন।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.