নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমরাই পারি

Want To Be a Good Person

এ. এস. এম. রাহাত

I am student of Feni Polytechnic Institute .... Want to be a Good Person ... I love Bangladesh

এ. এস. এম. রাহাত › বিস্তারিত পোস্টঃ

জোছনা রাতে দেখা হয়েছিল

০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ২:০৩

জোছনা রাতে দেখা হয়েছিল
================

বসে বসে মুরগির মতো ঝিমাচ্ছি। নিজেদের যারা স্মার্ট ভাবে তারাই নাচতেছে। আমি মাঝেমধ্যে চোখ হালকা প্রশস্ত করে তাদের ডিজিটাল নাচানাচি দেখছি আবার ঝিমাচ্ছি। বিশাল দুইটা সাউন্ড বক্স ফাটিয়ে দিচ্ছে চারিদিক । আবার চোখ গুটিয়ে নিলাম। আমিও নাচতেছি, সে কি এক নাচা সবাই খালি হাত তালি দিচ্ছে।আমি নেচেই চলেছি। হাততালির মাত্রা বেড়েই চলেছে?

কেউ কেউ গুন গুন ও শুরু করলো "দেখেছিস একেই বলে নাচ।" নাচ আর শেষ হতে পারলনা এরই মাঝে কে যেন ডাকলো ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে জিজ্ঞেস করলাম," কে?"। অইপাশে কেউ কথা বললনা, আমি আবার ঘুমে মনোনিবেশ করলাম। "একটু কথা বলা যাবে?" ঘুমের মাঝে আবার ভেসে এলো। চোখ অনিচ্ছাকৃত ভাবে খুললাম, "হ্যাঁ যাবে বসুন।"

কিন্ত কাছে কোন চেয়ার ই পেলাম না। বিয়ে বাড়িতে এই এক প্রব্লেম চেয়ার গুলো স্থির থাকেনা, হাঁটতে থাকে কখনো এর হাতে কখনো ওর হাতে। সামনে মুরব্বি দুজন ছিল উনারাও কখন যে চলে গেল খেয়াল করিনি। শাড়ি পড়া একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। সুন্দরী মেয়েরা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা কারণ প্রকৃতি সবসময় তাদের পক্ষে থাকে। বাসে ভীড়ের ভিতরেও তাদের কে মানুষ গর্বের সাথে সীট ছেড়ে দেয়।

আমি ঠায় বসে রইলাম, "ওহ সরি কোন চেয়ার নেই। আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।" মেয়েটির ভিতরে প্রচন্ড রাগ ভর করলো যার কারনে মুখ কালো করে ফেললো আবার সাথে সাথে বেখাপ্পা হাসি দিল," আমি রাফি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। একটু বলবেন?"

একটু নড়েচড়ে বসলাম রাফির নাম শুনে। রাফি কেমনে পারে? একের পর এক মেয়েদের প্রেমে ফাসায়। রাফির সাথে বোধহয় কোনদিন আমায় দেখেছে তাই অসৌজন্যমূলক কিছু না বলেই দড়াম করে রাফির প্রসঙ্গ। চোখ টানটান করলাম,"কি জানতে চান? আর ওর কাছ থেকেই তো জানতে পারেন সব!"

মেয়েটি আবার হাসার ভঙ্গি করলো যদিও হাসির কোন কথাই আমাদের মাঝে হয়নি।তাও হাসি বজায় রেখেছে সে,"আসলে নিজের সম্পর্কে সবাই বাড়িয়ে বলে তো তাই আর কি।" বুঝলাম রাফির আজ খবর না দিলে আর ঝিমানো যাবে না। মুখে বিরক্তিকর রেখা টানলাম,"কি জানতে চান? বলার মতো হলে বলবো।" মেয়েটি এবার দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো,"ও বললো ওর বাবা প্লেনের পাইলট আর ও আম্মু নাকি ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। এগুলো কি ঠিক ?"

দড়াম করে দাঁড়াই গেলাম। শক ভালো করেই খাইছি। ওর বাবায় জীবনে হুন্ডা চালাইছে কিনা সন্দেহ প্লেন তো বহুদূর। আর আন্টি যতদূর জানি মেট্রিক পাশ, এই পাশ দিয়ে কেমনে কি? মেয়েটিকে অবাক করে দিয়ে বললাম,"আমিও তো আজ ই ফাস্ট শুনলাম!" মেয়েটি বসা ছাড়া শান্তি পাচ্ছেনা তাও কস্টে দাঁড়ায় আছে।

চোখের পাতা দ্রুত নাড়ালো সে,"আর উত্তরাতে নাকি পাঁচতলা বাড়ি আছে?" এই কথা শুনে মনে হইলো কে যেন বিশাল এক পাথর গিলতে দিসে আমি পারতেছিনা। অসহায় ভাবে তার দিকে তাকাইলাম,"ওর সম্পর্কে আর কি কি জানেন বলবেন প্লিজ? আমারও জানার প্রয়োজন।"

মেয়েটি এবার চোখ বড় করে তাকালো। বুঝলাম এই জাতীয় মিথ্যা বলেই রাফি এদের পটায় আর ভোগ করেই শেষ তারপর নতুন কেউ। ওকে অনেক বুঝিয়েছি শালা বুঝেনা,উল্টো ঝাড়ি দেয়, "টাকা যেগুলো ঢালি অইগুলো কি তোর বাপে দেয়?" এরপর আমার আর কিছু বলার থাকেনা রাফিকে।

মেয়েটি আর দাঁড়াতে পারলনা বোধহয় অভ্যাস নেই। আমার কাছে এগিয়ে এলো,"আপনার নাম্বার দেয়া যাবে?" হঠাৎ করে কারেন্টের শক খেলে যেমন হয় সেভাবেই নড়ে উঠলাম,"আমার সাথেও প্রেম করবেন নাকি?" মেয়েটি ভ্রু কুঁচকে তাকালো,"মানসিকতা চেঞ্জ করুন আমি ওরকম মেয়ে নই। রাফি সম্পর্কে আমার অনেক কিছু জানার আছে। তাই নাম্বার চাচ্ছি।" মুখটা স্বাভাবিক রাখলাম যেন চেহারায় বুঝতে পেরেছি ভাব আসে,"01866********"

নাম্বার টুকে নিল ইয়া বড় একটা মোবাইল বের করে। আজকাল বড় লোকরা দামী দামী মোবাইল ইউজ করে যাতে লোকে দেখেই চিনে ওরা বড়লোক। মুখে আবার অপ্রাসঙ্গিক হাসি দিয়ে বিদায় নিল ললনা। ঘুম বেটা চোখ থেকে হারিয়েই গেছে। যুবক যুবতীদের নাচানাচি এখনো চলছে একজন গান গাচ্ছে আর সবাই নাচতেছে।

বহু সাধনা করেও ঘুম এলো না। যতই চোখ বন্ধ করি এই মেয়ে দড়াত করে কল্পনায় ঢুকে যাচ্ছে। একবার দেখলাম তার সাথে পার্কে বসে বসে প্রেমালাপ করছি। আরেকবার কল্পনায় দেখলাম তার সাথে ফোনে কথা বলছি। এখন আর ঘুম আসবেনা তাই ছাদের দিকে গেলাম এক পাশে এগিয়ে গেলাম জোছনার আলোতে অনুভূত হলো এখানে আমি একা নই সামন কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে।

এসময় রাফির ফোনে চমকিয়ে উঠলাম। মেয়েটির চুড়ির শব্দে আর একটু সরে যাওয়া প্রমাণ করে সে আগে আমার আসা টের পায় নি।

"হ্যালো রাফি বল?", একটু জোরে বললাম।

"আজ আসবিনা? ",রাফি জানতে চাইলো

"নারে আজ আসা যাবে না। তুই ঘুমাই পড়।"

"ধুর। ভাবছিলাম সারারাত তোর সাথে গল্প করমু!"

"তোর এত গার্লফ্রেন্ড তো কম নাই! ",এই কথাটাও একটু জোরে বললাম

"আর বলিশ না এরা খালি পারে বকবক বকবক করতে আর তার প্রশংসা না করলে তো ভাব দেখায়। খালি তেল মারা লাগে।"

"আইচ্ছা ঘুমা।", ফোনটি রেখে দিলাম। ছাদে দাঁড়ানো মেয়েটি যে সেই মেয়েটা তা আগেই বুঝেছি যার কারনে কিছু কথা একটু জোরেই বললাম। "এই যে শুনছেন?",জোছনার আলোয় দাড়ানো মানবী বললো। আমি মোবাইল পকেটে রাখতে রাখতে বললাম,"জ্বি বলুন? "

"রাফির কি সত্যিই অনেক গুলো গার্লফ্রেন্ড আছে?", মেয়েটির কন্ঠে একটু কান্নার স্বর। আমার ও মায়া লেগে গেল। এ পর্যন্ত কয়েকটি মেয়েকেই ওর রিয়েল সব কিছু বলে ওর থেকে দুরে সরিয়েছি কারণ আমি চাইনি কোন মেয়ে ওর ফাঁদে পড়ুক। এই মেয়েটিকেও বলা উচিৎ। তাই সব খুলেই বললাম।বালিকা কাঁদতে লাগলো, মেয়েদের কান্না দেখাটা বিরক্তিকর তাই ছাদ থেকে চলে এলাম।

এরপর নিঝুমের সাথে একমাসের মতোই যোগাযোগ ছিল।হ্যাঁ তার নাম ছিল নিঝুম। বন্ধুর মতো ঘুরেছিলাম সে কদিন কিন্ত যখনই তাকে ভালোবাসতে আরম্ভ করলাম তখনই সরে গেলাম তার লাইফ থেকে । তারপর আর নিঝুমের সাথে দেখা হয় নি তবে তাকে কোন এক অজানা কারনে তাকে মিস করেছি খুব বেশি মিস করেছি। দিন গুলো আস্তে আস্তে করেই যাচ্ছিল। লাইফটা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেল সামনে পিছনে ব্যাস্ততা। রাফির সাথেও সৃষ্টি হয়েছিল ফাটল কারণ সেই নিঝুম রাফিকে অনেক কথাই বলেছে সাথে আমার কথাও বলে দিয়েছে। রাফির সাথে আর দেখাও হয় নি সে হারিয়ে গেছে ভীড়ের মাঝে।

এরপর আরো কয়েক বছর গত হয়ে গেল। প্রেম ভালোবাসায় কখনো জড়াই নি জড়ানোর প্রচেষ্টা ও চালাই নি কারণ বাপের খেয়ে পরের পিছনে ছুটার কোন মানেই নেই। কলেজের দুটো ছাত্রীকে পড়াতাম তার মাঝে একজন এর হাবভাব ভালো ছিল না। একদিন তো দ্বিতীয় ছাত্রীর অনুপস্থিতিতে আমায় বললো
"স্যার একটা কথা বলি? "
আমিও স্বাভাবিক ভাবেই বললাম
"বলো কি বলতে চাও?"
সে চারিদিকে কয়েকবার তাঁকিয়ে বললো
"স্যার কথাটি মুখে বলতে লজ্জা লাগছে। চিঠিতে সব লেখা আছে। পড়ে নিয়েন।"

আমি ভেবেছিলাম যত কিছুই হোক প্রেমপত্র তো আর হবেনা। কিন্ত বাসায় গিয়ে সব ধারনা ভুল প্রমাণিত হলো। কাগজ খুলেই তো আমি অবাক

"আপনাকে আমি একটা কথা বলবো বলে অনেকদিন ভেবেছি। বলতে ই পারিনা। আপনার সাথে কথা বললেই আমার কেমন কেমন যেন করে ...........
.........
.............
...... আমি আপনাকে ভালো বাসি।আপনাকে ছাড়া বাঁচবোনা। উত্তর টা জানাবেন কিন্ত।"

মেয়েটিকে আর উত্তর জানানো হয় নি কারণ এসব প্রেম ভালোবাসা অর্থহীন মনে হতো তখনো। এরপর আর যাওয়া হয় নি তাদের বাসায়।

পড়ালেখা শেষে সার্টিফিকেট হাতে চাকরির বাজারে এসে আজ মূল বাস্তবতা টের পাচ্ছি। এতদিন মামা খালু এইসব নাম লোক মুখেই শুনেছি এখন তা নিজেই প্রত্যক্ষ করছি।কিন্ত টাকা ছাড়া মামাও নাই

প্রায় কয়েক মাস কোথাও চাকরি না পেয়ে যখন পাওয়ার আশা ছেড়ে সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছিলাম তখনই একদিন নিঝুম এর সাথে দেখা তাও আবার অফিসে ইনটারভিউ বোর্ড এ। আমায় দেখে চশমাটা নামিয়ে ডেস্কে রাখলো নিঝুম। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো, "আপনারা একটু বাইরে যাবেন?" যারা ইন্টারভিউ বোর্ড এ ছিল সবাই 'ইয়েস ম্যাডাম ' বলে বেরিয়ে গেল।

নিঝুম কে আগে চশমা ছাড়াই দেখেছি, চশমায় মানিয়েছে তাকে। আমি লজ্জায় নিচে তাকিয়ে আছি। অইপাশ থেকে ডাক এলো, "এইযে মিস্টার এদিকে তাকাও?" আমি লজ্জায় তাকাতে পারলাম না। নিজের লজ্জা দেখে নিজেই অবাক হলাম আমি। "কোথায় ছিলে এতদিন?", মেয়েটির কন্ঠে শুন্যতার ছাপ।

আমি এখনো চুপ দেখে উঠে দাঁড়িয়ে হুংকার দিল নিঝুম," অর্ক তুমি এমন কেন?" আসলে আমি কেমন সেটা জিজ্ঞেস করার সাহস হয় নি। "আহ কি লজ্জা যেন উনাকে কেউ লজ্জার সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছেন!",গড়গড় করে বললো নিঝুম।

এতক্ষনের বাক্যালাপ এ একতরফা ঝাড়লো নিঝুম। তবে কি ঝাড়ার মতো কিছু ঘটেছিল সুদূর অতীতে? ন্যায্য ভেবেই চুপ করে ছিলাম এতক্ষণ। এবার মাথা তুলে তাকালাম তার দিকে। বাপরে চুল সবগুলো এলোমেলো চোখ লাল হয়ে আছে, মুখের হাবভাব দেখে বুঝাই যাচ্ছে ঝগড়া করার মানষিকতা নিয়ে আছে সে। "বসুন ম্যাডাম।",আস্তে করে বললাম আমি

নিঝুম আমার মুখে নিজেকে ম্যাডাম ডাক শুনে যতটা অবাক হওয়ার তার চেয়ে বেশি ই হলো। এবার কিছুই বলতে পারলোনা। নয়ন্ত্রন হীনভাবে চেয়ারে বসে পড়লো সে। কিছু বলতে পারছেনা। কাজল মাখা ঘন কালো চোখের চারপাশে পানির ঢেউরাজি ফুলে ফুলে উঠছে সবই আমার প্রত্যক্ষ হলো কিন্ত কিছুই বললাম না।

চুলগুলো গুছিয়ে চোখের পানি ও কিছুটা মুছার বৃথা চেষ্টায় ফেল মারলো নিঝুম,"জানো তোমাকে আমি কত খুঁজেছি? তোমার মেসে কিছুই পাইনি তোমার ডায়েরীটা ছাড়া। আমাকে কাঁদাতেই ডায়েরি টা রেখে গেছিলে তাই না?" আমার বুকের ভিতরে প্রচন্ড এক ঝড় বয়ে গেল তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রাখার সবগুলো প্রচেষ্টা ই করেছি, "অতীতে না গেলে হয় না?"

নিঝুম মুখ চেপে কাঁদলো হয়তো চাচ্ছিল না অফিসের আর কেউ বুঝে না ফেলুক সে কাঁদছে। দুহাত চোখের মনির পাশে চেপে নিল নিঝুম,"না গেলেই হয়তো হতো কিন্ত অতীতে যে আমায় ছাড়েনা। ডায়েরিতে লিখেছো তুমি আমায় ভালোবাসো?" আমি দীর্ঘ এক নিশ্বাস টেনে নিলাম বাতাসের শীতল ঝাপটার পরশে,"সেটা বহুকাল আগের ঘটনা।"বিড়বিড় করে বললাম আমি। নিঝুমের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে কিন্ত কান্নার ছাপ রয়েই গেছে তার মুখে।

লাষ্ট একটা কোয়েস্চেন করি? নিঝুম কথাটা বলে কেঁপে উঠলো। আমি জানি সে কি প্রশ্ন করবে তাও না জানার ভাব টেনে সিরিয়াস ভাব ফুটালাম মুখে," কি বলুন?" নিঝুম নিচের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আস্তে জিজ্ঞেস করলো,"বিয়ে করেছো?" জানতাম এই প্রশ্নটাই সে করবে। এর জন্য অবশ্যই বিজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে উত্তর দিলাম স্বাভাবিক ভাবেই,"না।" আমার উত্তরে সে খুশি হবে জানতাম কিন্ত আমার নিজের ও মনের ভিতরে একটা প্রশ্ন জেগেছিল "নিঝুমের কি বিয়ে হয়ে গেছে?" কিন্ত প্রশ্নটা মনের ভিতরেই রেখে দিলাম। "ম্যাডাম ইন্টারভিউ কি শুরু হবে?",স্মরণ করিয়ে দিলাম আমি ক্যান্ডিডেট চাকরির।

নিঝুম সবার কানে কি সব ফুস মন্তর দিল বুঝতে দেরী হলো আমার। সবাই যখন প্রশ্ন করছিল তখন নিচু হয়ে ছিলাম আমি। প্রশ্নগুলো অতি সহজ ছিলো। নিঝুম এর ফুসমন্তর হয়তো এটাই ছিল সহজ প্রশ্ন করবে। সবার শেষে প্রশ্ন করলো নিঝুম, "থাকেন কোথায়?" আমি স্মার্টলি উত্তর দিলাম,"মোহাম্মদপুর।"

"ঠিকানা বলুন?", নিঝুমের করা ব্যাক্তিগত প্রশ্নে নড়েচড়ে বসলাম আমি,"ম্যাডাম ব্যক্তিগত প্রশ্ন হয়ে যাচ্ছে না?" নিঝুম চোখ মুখ টানটান করলো আর একটি কলম অনবরত হাত দিয়ে নাড়াচ্ছিল আমি কলমের দিকেই তাকিয়ে আছি। নিঝুম এবার আবার বললো, "আপনাকে চাকরি দিলে অবশ্যই আমার জানা উচিৎ আপনার ঠিকানা। কি বলেন মুজিব সাহেব?",নিঝুম আধাটাক একটি লোকের দিকে ইংগিত করল। লোকটাও সুর মিলালো,"অবশ্যই মেডাম।"

মন চাচ্ছিল টাকলার মাথায় একটা বাড়ি দেই। নিঝুম আরো বেশি ব্যাক্তিগত প্রশ্ন করতে লাগলো একের পর এক। একসময় মন চাইলো জোরে একটা চিৎকার দেই কিন্ত দিলাম না পাছে চাকরিটা নট হয়ে যায়। "ফেসবুক আইডি লিঙ্কস বলুন?", নিঝুমের প্রশ্নে আমার পুরো শরীর নড়েচড়ে উঠলো।

যেই আইডিটা চালাই না অইটাই দিলাম কিছুটা মুসকি হেসে। নিঝুম ও কিছুটা হাঁসলো কিন্ত টাকলা হা করে আছে মশা মাছি ঢুকার সম্ভাবনা কিছুটা আছে। "তা মিস্টার অর্ক আপনার চাকরিটা হচ্ছে কিনা তা ফেসবুক এ ই জানিয়ে দেয়া হবে।", নিঝুম ঠোঁটে হাঁসির আভা অক্ষুন্ন রাখলো। কে বলবে কিছুক্ষণ আগেই এই মেয়ে কেঁদেছিল! উঠে আসার সময় অন্যদের গুনগুনানি ও যে কানে এলোনা তা কি হয়? টাকলা বারবার নিঝুম কে বলছিল "ম্যাডাম এগুলো তো নিয়ম না।" নিঝুম উল্টো ঝাড়ি দিল "আমাকে নিয়ম শিখাতে আসবেন না মুজিব সাহেব।"

অফিস থেকে বের হয়েই দড়াম করে আবার ঢুকে পড়লাম অফিসে, "ম্যাডাম ফেসবুক লিঙ্কস টা ভুল হয়েছে? " অপরাধীর মতো বললাম। এক চোখ উপরের দিকে প্রশস্ত করে নিঝুম তাঁকালো,"তাই তো দেখছি অই আইডিতে সে ই একবছর আগে লাষ্ট পোস্ট দেয়া।" আইফোন টা নাড়াতে নাড়াতে বললো।

রাতে ফেসবুক এ লগিন করে দুইটা ম্যাসেজ পেলাম একটা "সামিয়াতুল জান্নাত নিঝুম " আইডি থেকে। ম্যাসেজে ঢুকে দেখলাম, "চাকরি কনফার্ম তোমার।"
কিছুটা খুশি ই হয়েছি যদিও আগেই জানতাম চাকরিটা আমার হচ্ছে ই। তাও নিয়ম মাফিক থ্যাঙ্কস দিলাম।

হোমপেজে পোস্ট চেক করার মাঝে একটা পোস্ট এ চোখ আটকে গেল

"তাঁকে ফিরে পেয়েছি এতবছর পর। এতবছর অপেক্ষা করে আমি তাঁকে ফিরে পেলাম। যেদিন ওর ডায়েরি হাতে পেয়েছিলাম সেদিন একটু একটু করে পুরোটা পড়ে নিলাম। ডায়েরির শেষ কয়েক পাতা শুধু আমাকে নিয়েই লিখা ছিল। নিজেকে নিয়ে পড়েছি আর পুলকিত হয়েছি। কিন্ত তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। ডায়েরির শেষ পাতায় বড় করে লেখা "নিঝুম ভালোবাসি।" কিন্ত ভালোবাসার সেই মানুষটি কোথায় যেন চলে গেছিল। বাবা জোর করে বিয়ে দিয়েছিলেন ঠিক ই কিন্ত অই লোক কে মানতে পারি নি আমি। ছাড়াছাড়ি ও হয়ে গেছে কিছুদিনের মাঝে। আর বিয়ের পিডিতে বসিনি। এতকাল পর তাকে পেলাম কিন্ত সে তো আমায় পাত্তা দিচ্ছে না। আমি জানি সে আমার স্ট্যাটাস টা দেখবে তাই তাকে একটা কথাই বলার আছে 'আই লাভ ইউ অর্ক। ভেরি ভেরি মাচ।' "লেখাটি পড়েই বুকের ভিতরে বয়ে গেল অজানা এক শিহরণ।

লগ আউট করে ছাদে গিয়ে বসে রইলাম ঠিক এমন এক জোছনায় তার সাথে পরিচয় আজ ও সে জোছনায় আলোকিত চারিদিক। মোবাইল স্কিনে ভেসে এলো একটা নাম্বার। নাম্বার টা এতকাল পরেও ঠিকই চিনেছি। তারমানে নিঝুম আর নাম্বার চেঞ্জ করেনি কিন্ত আমি করেছি বেশ কয়েকবার।

অনিচ্ছাকৃত ভাবেই ফোন রিসিভ করলাম

"হ্যালো আসসালামু আলাইকুম।"
অইপাশে কিছু ঘন নিশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো। আমি আবার তাগাদা দিলাম
"কে বলছিলেন?"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর এলো,"আমি নিঝুম।"
জানতাম তাও না জানার ভাব করলাম,"জ্বি মেডাম বলুন?"
"প্লিজ অর্ক স্টপ দিস, আমি আর পারছিনা। আমাকে নিঝুম বলেই ডাকো।", নিঝুমের গলার স্বরে আকুতি।
আমি এখনো শক্ত হয়েই কথা বলছি,"তা কি করে হয়! এতবড় কোম্পানির মালিকের মেয়ে আপনি আপনাকে কি করে নাম ধরে ডাকি?"

ফোনের অইপাশে এবার নীরবতার আবেশ। কে যেন কাশি দিল বুঝলাম মোবাইলের অইপাশে নিঝুম নয় অন্য কেউ নিয়ে নিয়েছে। অইপাশ থেকে বয়স্ক কারও কন্ঠ ভেসে এলো,"অর্ক বলছিলে?"
আমি কিছুটা থমথম খেয়ে গেলাম তারপর আবার নিজেকে সামলে নম্রভাবে বললাম,"জ্বি আমি অর্ক।"
বয়স্ক কন্ঠটা আবার ভেসে এলো,"আমি নিঝুমের বাবা বলছিলাম। তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে। সময় হবে? "

আমি পড়লাম বিপদে। ভদ্রভাবে উত্তর দিলাম,"জ্বি স্যার সময় হবে।"
অইপাশ থেকে ভেসে এলো,"একন ই।"
আমি ভুল শুনলাম নাকি তাই ভাবছি। এখন বাজে রাত দশটা, এত রাতে দেখা করার কোন স্কোপ নেই তাই নেতিবাচক উত্তর দিলাম,"এখন হবেনা স্যার রাত অনেক হয়েছে।"
অইপাশ থেকে বয়স্ক কন্ঠটা কনফিডেন্ট নিয়ে জবাব দিল,"এখন বেশি রাত হয় নি মিস্টার অর্ক। তোমার বাসার সামনেই গাড়ি পাঠিয়েছি। বের হলেই দেখতে পাবে।"

কানের ভিতরে কথাগুলো যেন জ্যাম হয়ে ছিল। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সত্যতা যাচাই করলাম আসলেই একটা সাদা প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে। মিনমিন করলে বললাম, "স্যার না মানে,,,,,,
এতটুকু বলার পর উনি উত্তেজিত হয়ে বললেন,"আমি চাচ্ছি তুমি এখনই আসো।"
কথাগুলো গিলে নিলাম আমি।

কিছুই করার নেই তাই উঠে পড়লাম প্রাইভেট কারে। ড্রাইভারের নাম 'মোকলেসুর জামান ' মাথার সামনের চুলগুলো বিসর্জন দেয়া আধা টাকু। একটা পুরোনো দিনের গান প্লে করা হলো
'দুটি মন আর নেই দুজনার........'
গানের তালে তালে জিজ্ঞেস করলাম,"এই গান স্যার শুনেন?"
মোকলেস দাঁত কেলিয়ে হাসলো,"স্যার এই গাড়িতে চড়েনা।আপনিই ফাস্ট কেউ, আপামনি ছাড়া এই গাড়িতে উঠার ফার্মিসন নেই।"

মোকলেসের কথা শুনে আমিই কথা বলার খেই হারিয়ে ফেললাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফিরতি বললাম, "তাহলে আমি কেন এই গাড়িতে?"
এবারো মোকলেস হাঁসলো। এই লোকটার হাঁসি রোগ আছে। হাসতে হাসতে উত্তর দিল,"আপামনি পার্মিশন দিসেন তাই।"
আমি মুখে "ওহ বুঝতে পেরেছি ভাব আনলাম। "

বিশাল এক বাড়ি। বিষ্মিত হওয়ার ই কথা। বাইরে থেকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম চাকরিকে আলোয় আলোকিত। পরক্ষণেই আবার ভাবলাম টাকায়

ড্রয়িং রুমে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর কোট পড়া এক লোক সাথে নিঝুমের প্রবেশ কক্ষে। দুজন পাশাপাশি বসলো। ইনিই ফোনে কথা বলেছেন বুঝতে দ্বিতীয় বার ভাবতে হয় নি আমার। সালাম দিয়ে উনার দিকে হাসি মুখে তাকালাম আমি।

"তা তুমিই অর্ক?", কোট পড়া লোকের প্রথম মুখ নিঃশিত শব্দ
"জ্বি।",নিচু হয়ে উত্তর দিলাম।
"নিঝুম বললো তুমি তাকে ভালোবাসো, এটা কি ঠিক?"
"স্যার অনেক আগে ভালোবেসেছিলাম।",নিঝুমের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম
"নিঝুমের পর আর কাউকে ভালোবেসেছো?", নিঝুমের বাবার প্রশ্ন ভেসে এলো
"না।",শর্টকাট উত্তর আমার

"তাহলে ওকে মেনে নিচ্ছ না কেন?", উনার মুখে শঙ্কা
কিছুটা কেঁপে উঠলাম আমি। নিজের আসল পরিচয় আজীবন লুকিয়ে এসেছি সবার কাছে। নিজের আসল পরিচয়ের ভয়েই সেদিন দূরে সরেছিলাম আমি। আমার চোখের কোনে হয়তো পানিও চলে এসেছে এতক্ষণে । দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিলাম,"স্যার আমার আসল পরিচয় আপনি, নিঝুম কেউ ই মেনে নিতে পারবেন না। " তীব্র ক্ষোভ নিয়ে বললাম

নিঝুমের বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে পুনরায় কথা বললেন, " বলো আমরা শুনি।"

মনের সমস্ত শক্তি একত্র করলাম, "আমার জন্মপরিচয় আমি নিজেও জানি না। দেখিনি মা কিংবা বাবা কে? বড় হয়েছি এতিম খানায়। একটু বড় হয়ে ভেগে চলে এলাম। বস্তিতে কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা করতাম আমি। স্কুলে ঠিকভাবে যেতাম না। মেধা ছিল তাই রেজাল্ট ভালো ই আসতো। আমাদের স্কুলে এক এন জিও এসে আমায় নিয়ে আসে আরেক স্কুলে পড়াশোনায় ভালো ছিলাম বলেই নিয়ে এসেছে। বস্তিতে থাকলে নাকি বেপথে যাবো তাদের ধারণা ছিল। "

কিছুটা থামলাম আমি তারপর আবার বলতে শুরু করি
"এন জি ও এর এক স্যার নিজের বাড়িতে উঠালেও তার ওয়াইফ সহ্য করেন নি তাই ঘ্যানঘ্যান করতো। ওখান থেকে আবার চলে আসি আমি। একটা গ্যারেজে ঢুকি মাঝেমধ্যে স্কুল ও করতাম। গ্যারেজের মাসের কিছু টাকা কেটে রাখতো মালিক। তবুও এভাবে করেই গেলো সব। হাইস্কুল এ উঠার পর গ্যারেজ ছেড়ে হোস্টেলে জায়গা পাই। হেড মাস্টার সব শুনে বিনা খরচেই রাখেন হোস্টেলে। বিপদ আসে নাইনের বছর হেডস্যার বদলি হন আর আমায় হোস্টেল থেকে বের করে দেয়া হয়,,,,,,,,,

থামালেন নিঝুমের বাবা,"সত্যিই তোমার জন্ম পরিচয় নেই?"
আমি চুপ করে রইলাম কারণ চুপ থাকা সম্মতির লক্ষণ । নিঝুম উঠে আমার পাশে বসলো। তার হাতটা উষ্ণতা খুঁজে ঢুকে গেল আমার হাতের খাজে। নিঝুম যে কাঁদছে তা তার নিঃশ্বাস এর টানেই বুঝা যাচ্ছে। মুখ খুললো সে কান্না নিয়েই,"আমি কখনো তোমার অতীত নিয়ে ভাবি নি অর্ক। 'আই জাস্ট লাভ ইউ অর্ক 'আমি আর কিচ্ছু জানতে চাই না।" নিঝুমের কথাগুলো বুকে আলাদা উষ্ণতা দিচ্ছিল আর আলাদা ভয়।

জানতাম নিঝুমের বাবা এই মুহূর্তে ভিলেনের চরিত্রে চলে যাবেন কিন্ত তার কিছুই হলোনা। গম্ভীর লোকটি হেঁসে উঠলো,"মিয়া বিবি রাজি তো কেয়া করেগা কাজি?"

নিঝুম ও কান্নার মাঝে হেসে দিল। আর আমি অনুভব করার চেষ্টা করলাম এটা কি স্বপ্ন নাকি বাস্তব? বাইরে বেরুলাম হাতের খাজে এখনো এঁটে আছে নিঝুমের হাত হাতখানা । কি সুন্দর জোছনার আলোয় চারিদিক আলোকিত ঠিক সেদিনের সেই জোছনার মতো। আলতো করে নিঝুমের কানে কাছে গেলাম আর বললাম,"ভালোবাসি।"

**** সমাপ্ত ****

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.