| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মঞ্জুর চৌধুরী
আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি, আমি পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’। আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ, আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ। আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল, আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’ পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’ ফিং দিয়া দিই তিন দোল; আমি চপলা-চপল হিন্দোল। আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা, করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা, আমি উন্মাদ, আমি ঝন্ঝা! আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর; আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ন চির-অধীর! বল বীর - আমি চির উন্নত শির!
নভেম্বরের শেষ বৃষ্টি
মঞ্জুর চৌধুরী
নীরা কথাটা বিশ্বাস করতে পারছে না। তাঁর স্বামী আরমানের আরেক মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল? এই আরমান কিনা সবসময়ে আবৃত্তি করতো "এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?" সে বিবাহিত অবস্থায় আরেক মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়াতে পারলো?
১
নীরার স্বামী মারা যাওয়ার সাত মাস পর, নভেম্বরের এক সন্ধ্যায়, ঢাকা শহরে অসময়ের বৃষ্টি হচ্ছিল। নভেম্বরের বৃষ্টি এমনিতেই কেমন অনাহূত অতিথির মতো - আসার কথা ছিল না, তবু এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে স্বাগত জানাতে অস্বস্তি লাগে, চলে যেতে বলতেও মায়া হয়।
নীরা বারান্দার কাচ বন্ধ করতে গিয়ে দেখল, নিচের রাস্তায় একটা লোক ছাতা ছাড়া হাঁটছে। লোকটার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। বৃষ্টিতে বারবার নিভে যাচ্ছে, সে আবার ধরাচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখেই হঠাৎ তার মনে পড়ল আরমানের কথা। আরমানও এমন করত। বৃষ্টির মধ্যে সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করত। নীরা বিরক্ত হয়ে বলত, "তুমি কি নির্বোধ?"
আরমান বলত, "ভালোবাসা আর সিগারেট, দুটোই বাতাসের বিরুদ্ধে জ্বালিয়ে রাখতে হয়।"
নীরা খুবই বিরক্ত হয়ে বলতো "এইসব ফালতু ডায়লগ কোন সিনেমায় পাও?"
"বিয়ের পর থেকে.... দুঃখী পুরুষেরা আপনাতেই কবি হয়ে যায়।"
নীরা খুব হাসত।
শেষ কয়েক বছরে অবশ্য হাসত না। শেষ কয়েক বছরে আরমানও ডায়লগ বলা বন্ধ করে দিয়েছিল।
তাদের বারো বছরের সংসারে প্রথমে কথা কমেছিল, তারপর স্পর্শ, তারপর ঝগড়া। সবচেয়ে শেষে কমেছিল অভিযোগ।
মানুষ ভাবে সম্পর্কের সবচেয়ে বিপজ্জনক শব্দ হলো ‘ঘৃণা। আসলে সবচেয়ে বিপজ্জনক শব্দ হচ্ছে ‘থাক।’
“কী হয়েছে?”
“কিছু না। থাক।”
“কথা বলবে?”
“থাক।”
“আমার ওপর রাগ করেছো?”
“বললাম তো, থাক।”
দুটি মানুষের মাঝখানে এই ‘থাক’ শব্দটা জমতে জমতে একদিন দেয়াল হয়ে যায়। নীরা আর আরমানের মাঝেও হয়েছিল।
তারপর এক সকালে আরমান সত্যিই আর থাকল না। হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল তার। বয়স হয়েছিল মাত্র তেতাল্লিশ। অফিসের ডেস্কে মাথা রেখে বসেছিল। কলিগরা প্রথমে ভেবেছিল হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। মানুষের মৃত্যু কখনো কখনো এতটাই সাধারণ ভাবে আসে যে জীবনকে তখন বড় সস্তা লাগে।
যেন জীবনটা এতদিন এত আয়োজন করে চলল, হঠাৎ মৃত্যু এসে বলল "অনেক হয়েছে। এবার চলো।"
সেদিনের ঘটনার সাত মাস হয়ে গেছে। আরমানের জামাকাপড় নীরা দিয়ে দিয়েছে। জুতা গুলোও। বইগুলো এখনও আছে। টুথব্রাশটা ফেলে দিতে পারেনি। কেন পারেনি, সে নিজেও জানে না। যে মানুষটাকে শেষ দুই বছর ঠিকমতো ছুঁয়েও দেখেনি, তার ব্যবহৃত টুথব্রাশের জন্য এত মায়া কেন হয়?
২
রাত সাড়ে দশটার দিকে কারেন্ট চলে গেল। আইপিএস কাজ করছে না। নীরা মোমবাতি খুঁজতে আরমানের ডেস্কের নিচের ড্রয়ারটা খুলল। ড্রয়ারটা সে সাত মাসে খোলেনি। ভেতরে পুরোনো বিল, কলম, একটা ভাঙা ঘড়ি, কয়েকটা বিজনেস কার্ড। নিচে কালো একটা মোবাইল ফোন।
আরমানের ফোন। নীরা ফোনটা হাতে নিল।
মৃত মানুষের ব্যবহৃত জিনিস হাতে নিলে অদ্ভুত লাগে। মনে হয় জিনিসটার মধ্যে এখনও তার হাতের উষ্ণতা আটকে আছে।
চার্জে দিলে ফোনটা চালু হলো।
স্ক্রিনে আরমানের ছবি নেই। ছবিটা নীরার। কক্সবাজারে তোলা। সম্ভবত বিয়ের তৃতীয় বছর। বাতাসে নীরার চুল উড়ছে, চোখ বন্ধ, মুখে হাসি। নিজের সেই মুখ দেখে নীরা নিজেই চমকে উঠল।
এই মেয়েটা কে? এত নিশ্চিন্তভাবে সে হাসতে পারত?
ফোন খুলতে পাসওয়ার্ড লাগল।
নীরা তাদের বিয়ের তারিখ দিল।
ভুল।
মেয়ের জন্মদিন।
ভুল।
আরমানের জন্মদিন।
ভুল।
হঠাৎ কী মনে করে নিজের জন্মদিন দিল।
ফোন খুলে গেল।
নীরার বুকের ভেতর ছোট্ট একটা শব্দ হলো।
ঠিক আনন্দ নয়। আবার ঠিক দুঃখও নয়। বহুদিন বন্ধ থাকা ঘরের জানালা খুললে মুখে বাতাসের প্রথম ঝাপটা লাগলে যেমন লাগে, ঠিক যেন তেমন।
ফোনে তেমন কিছু নেই। পুরোনো ছবি, কিছু মেসেজ, ই-মেইল।
তারপর সে ‘Notes’ খুলল।
সেখানে একটা ফোল্ডারের নাম -
N
ভেতরে সাতাশটা নোট।
প্রথমটার তারিখ আট বছর আগের।
নীরা খুলল।
“আজ নীরা বলল আমি নাকি তাকে আর আগের মতো দেখি না। কীভাবে বোঝাই, আমি এখনও ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি? শুধু ও জেগে থাকলে তাকাতে ভয় লাগে। ওর চোখে আজকাল আমার জন্য অনেক প্রশ্ন। সব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।”
নীরা ফোনটা নামিয়ে রাখল।
বাইরে বৃষ্টি বাড়ছে।
কিছুক্ষণ পর আবার তুলে দ্বিতীয় নোট খুলল।
“আজ আমাদের খুব ঝগড়া হলো। নীরা বলল, আমি নাকি পাথরের মত হয়ে গেছি। উদাসীন, অনুভূতিহীন।”
আরেকটা।
“আজ ওকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিলাম। ও শক্ত হয়ে গেল। ছেড়ে দিলাম। মানুষকে ভালোবাসলেই তাকে জোর করে ধরে রাখার অধিকার পাওয়া যায় না।”
নীরার আঙুল কাঁপতে শুরু করল।
একটার পর একটা পড়তে লাগল। তাদের বারো বছরের সংসারের আরেকটা সংস্করণ যেন ফোনটার মধ্যে লেখা ছিল। একই ঘটনা। কিন্তু অন্য একজনের চোখ দিয়ে দেখা।
যে রাত নীরা ভেবেছিল আরমান উদাসীন, সেই রাতে আরমান লিখেছে - “ও কাঁদছিল। কাছে যেতে পারিনি। ভয় হচ্ছিল, আমার হাত সরিয়ে দেবে।”
যেদিন নীরা বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিল, আরমান লিখেছে, “বাসাটা আজ অস্বাভাবিক শান্ত। এতদিন নিরিবিলিতে একাকী থাকতে চাইতাম। আজ বুঝলাম, একাকিত্ব কখনই সুখের নয়।”
একটা নোটে লেখা “আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা আমরা একে অপরকে হারানোর ভয় পাই, কিন্তু সেটা বলি না। ভয়কে অহংকারের জামা পরিয়ে রাখি।”
নীরা পড়া বন্ধ করল। চোখ ঝাপসা। মানুষের সঙ্গে মানুষের কত কথা হয়। বাজারের তালিকা। স্কুলের ফি। গ্যাস বিল। কে বাচ্চাকে আনবে। ফ্রিজে মাছ আছে কি না। আজ ফিরতে দেরি হবে।
কিন্তু সবচেয়ে জরুরি কথাগুলো বলা হয় না।
‘আমি ভয় পাচ্ছি।’
‘আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো।’
‘আমি এখনও তোমাকে চাই।’
‘আমাকে ছেড়ে যেও না।’
এই কথাগুলো মানুষের বুকের ভেতরে পড়ে থাকে।
তারপর একদিন মানুষটাই থাকে না। কথাগুলো বুকের গহীনে অব্যক্ত থেকে যায়।
৩
নীরা শেষ নোটটা খুলল।
তারিখ - আরমান মারা যাওয়ার আগের রাত।
মাত্র একটি লাইন।
“আমি আর চেপে রাখতে পারছি না। নীরার প্রতিও অন্যায় করছি। কাল ওকে সব খুলে বলব।”
নীরা অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। সব মানে কী? নিচে আর কিছু নেই। শুধু ওই একটা বাক্য। “কাল নীরাকে সব বলব।“
কিন্তু সেই ‘কাল’আর আসেনি।
নীরার হঠাৎ খুব রাগ হলো। মৃত মানুষের ওপর রাগ করা যায়? যায়।
"কী বলতে চেয়েছিলে?" অন্ধকার ঘরে সে জোরে বলল।
"কী বলতে চেয়েছিলে, আরমান?"
নীরবতা ছাড়া কেউ উত্তর দিল না।
৪
পরদিন নীরা আরমানের অফিসে গেল। সাত মাস পর। আরমানের সবচেয়ে কাছের সহকর্মী ছিল সায়েম। নীরাকে দেখে সে অস্বস্তিতে পড়ল।
দুজনে ক্যান্টিনে গেল। চা এল। দুইজনের কেউই চায়ের কাপে হাত দিল না।
নীরা বলল, "আরমান মারা যাওয়ার আগে কি কোনো সমস্যা চলছিল?"
সায়েম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
"ভাবি, এতদিন পর কেন জানতে চাইছেন?"
"কারণ আমি বুঝতে পারছি যে আমি আমার স্বামীকে পুরোপুরি চিনতাম না।"
সায়েম নিচের দিকে তাকাল। তারপর বলল,
"একজনকে নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল।"
নীরার বুকটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
"একজন? কে সে?"
"একজন মহিলা।"
ঘরের এসি চলছিল। তবু নীরার মনে হলো ওর দম আটকে আসছে। খোলা জানালার বাইরে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারলে স্বস্তিবোধ করতো।
"সম্পর্ক ছিল?"
সায়েম উত্তর দিল না। কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে পরিষ্কার উত্তর।
নীরা উঠে দাঁড়াল।
সায়েম বলল, "ভাবি, পুরো কথাটা শুনুন।"
"দরকার নেই।"
"দরকার আছে।"
নীরা তাকাল। সায়েম বলল, "মহিলার নাম মেহজাবিন। আমাদের অফিসেই কাজ করত। আরমান ভাইয়ের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। সবাই বুঝত।"
"কতদিন ছিল সম্পর্ক?"
"কয়েক মাস।"
নীরা হাসল। অদ্ভুত হাসি।
"চমৎকার।"
তার মাথায় তখন ফোনের নোটগুলো ঘুরছে।
“আমি এখনও ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি।”
“আমি ওকে হারাতে ভয় পাই।”
কী অসাধারণ!
মানুষ একই সময়ে কতগুলো রূপ ধারণ করতে পারে?
একজন মানুষ কি স্ত্রীকে ভালোবেসেও অন্য কারও দিকে যেতে পারে? ভালোবাসা কি এত নোংরা? নাকি মানুষই এত জটিল?
সায়েম বলল, "মেহজাবিনকে আমি ডাকতে পারি।"
"কেন?"
"কারণ গল্পটা আপনি যেভাবে ভাবছেন, সেভাবে শেষ হয়নি।"
৫
মেহজাবিন এল প্রায় চল্লিশ মিনিট পর। বয়স পঁয়ত্রিশের মতো। সাধারণ চেহারা। চোখে ক্লান্তি।
নীরা প্রথমে অবাক হলো। তারপর নিজের ওপরই বিরক্ত হলো। সে কী আশা করেছিল? সিনেমার খলনায়িকার মতো অসাধারণ সুন্দর একজন নারী? মানুষের সংসার ভাঙতে সৌন্দর্য লাগে না। লাগে শুধু একটা দুর্বল মুহূর্ত।
মেহজাবিন বসে বলল, "আপনি আমাকে ঘৃণা করেন, জানি।"
নীরা শান্ত গলায় বলল, "আপনাকে ঘৃণা করার মতো যথেষ্ট পরিচয় আমাদের হয়নি।"
মেহজাবিন মাথা নিচু করল।
"আরমান আপনাকে খুব ভালোবাসত।"
নীরা হেসে ফেলল।
"দয়া করে এই লাইনটা বলবেন না।"
"আমি সত্যি বলছি।"
"আমার স্বামী আপনার সঙ্গে সম্পর্কে ছিল, আর আপনি আমাকে বলছেন সে আমাকে ভালোবাসত?"
মেহজাবিন এবার চোখ তুলল।
"আমাদের মাঝে কোন সম্পর্ক ছিল না।"
নীরা চুপ।
মেহজাবিন বলতে থাকে।
"সুন্দর একটা সম্পর্ক হতে পারত। আমরা দুজনেই সেই জায়গা পর্যন্ত গিয়েছিলাম। আমি তখন ডিভোর্সের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। আরমানও খুব একা ছিল। আমরা কথা বলতাম। অনেক কথা। যে কথাগুলো সম্ভবত আমাদের নিজেদের মানুষের সঙ্গে বলা উচিত ছিল।"
সে একটু থামল।
"এক রাতে আমি ওকে কিস করতে গিয়েছিলাম।"
নীরার চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল।
"ও আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল।"
"কেন?"
"বলেছিল, “আমি আমার স্ত্রীকে অনেকদিন ধরে ঠিকভাবে ভালোবাসতে পারছি না। তাই বলে ওর প্রতি বিশ্বাস ঘাতকতা করার অধিকারও আমার নেই।”"
নীরা তাকিয়ে রইল। মেহজাবিন ব্যাগ থেকে একটা সাদা খাম বের করল।
"মারা যাওয়ার আগের সপ্তাহে ও এই চিঠিটা লিখেছিল। আপনাকে লেখা। আমার কাছে জমা রেখেছিল। তারপরে..."
মেহজাবিনের গলা রুদ্ধ হয়ে আসে।
"সাত মাস দিলেন না কেন?"
মেহজাবিনের চোখে পানি এল।
"কারণ আমি কাপুরুষ।"
খামটা টেবিলের ওপর রেখে সে চলে গেল।
৬
নীরা খামটা খুলল না। বাসায় নিয়ে এল। রাত হলো। বৃষ্টি আবার শুরু হলো। নভেম্বরের ঢাকা যেন এ বছর কোনো পুরোনো দুঃখ ভুলতে পারছে না।
আরমানের একটি অতি বাজে স্বভাবের একটি ছিল এই যে সে কঠিন বা অস্বস্তিকর কথাগুলো মুখ ফুটে বলতে পারতো না। চিঠি লিখে জানাতো। এটিও তেমন কিছু একটা নিশ্চিত।
নীরা বারান্দায় বসে খাম খুলল।
ভেতরে দুই পাতার চিঠি। আরমানের হাতের লেখা।
“নীরা,
এই চিঠি তোমাকে দেওয়ার সাহস হবে কি না জানি না। আমি একটা ভুলের খুব কাছে গিয়েছিলাম।
মেহজাবিনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব এমন জায়গায় চলে গিয়েছিল, যেখানে তোমার কাছে সেটা লুকানোই প্রমাণ করে যে ব্যাপারটা নির্দোষ ছিল না।
আমি তোমাকে ঠকিয়েছি কি না, তার বিচার তুমি করবে। শরীর দিয়ে হয়তো করিনি। কিন্তু আমার নিঃসঙ্গতার যে জায়গাটা তোমার সঙ্গে ভাগ করার কথা ছিল, সেখানে অন্য একজনকে ঢুকতে দিয়েছি।
এর দায় আমার। তবে একটা কথা তোমাকে বলতে চাই। আমাদের সম্পর্কটা মেহজাবিন নষ্ট করেনি। আমরা করেছি। একটু একটু করে। তুমি যখন অভিমান করেছ, আমি ভেবেছি সময় দিলে ঠিক হবে। আমি যখন চুপ করেছি, তুমি ভেবেছ আমার আর কিছু যায় আসে না। আমরা দুজনেই জায়গা চেয়েছি।
একা থাকতে চেয়েছি। কিন্তু কেউ কাউকে বলিনি - ফিরে এসো।
নীরা, মাঝে মাঝে কিছুটা সময় মানুষের একা থাকা দরকার। কিন্তু এমন একজন মানুষও দরকার, যার কাছে একা থাকা শেষ করে ফিরে যাওয়া যায়।
আমি জানি না তুমি এখনও আমার কাছে ফিরতে চাও কি না। আমি চাই। যদি তুমি আমাকে আর না চাও, আমি তোমাকে আটকাব না। কিন্তু যদি তোমার ভেতরে আমার জন্য সামান্য কিছু থেকেও থাকে, তাহলে এবার আমরা সত্যি কথা বলি।
সব কথা। কষ্টের কথা। ভয়ের কথা। লজ্জার কথা। যে কথাগুলো বলতে এত বছর দেরি করেছি।
কারণ আমার মনে হচ্ছে, আমরা ভালোবাসা হারাইনি।
আমরা শুধু তার কাছে যাওয়ার রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি।
আরমান।”
নীরা চিঠিটা শেষ করল। তারপর আবার পড়ল। তারপর তৃতীয়বার।
বৃষ্টি পড়ছিল। একসময় সে দেখলো চিঠির পৃষ্ঠা ভিজে গেছে। বারান্দায় বৃষ্টি আসছে না। তাহলে পানি কোথা থেকে আসছে, সেটা বুঝতে তার একটু সময় লাগল।
৭
পরদিন নীরা আজিমপুর কবরস্থানে গেল। সকাল। আকাশ মেঘলা।
আরমানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সে বলল, "তুমি একটা অসহ্য মানুষ ছিলে।"
কবর নিশ্চুপ।
"তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা জানো কী ছিল? তুমি সব কথা নিজের বুকে চেপে রাখতে।"
কবর নিশ্চুপ।
"এত বড় চিঠি লিখেছ। সামনে বসে দুইটা কথা বলতে পারলে না?"
হঠাৎ নীরা কাঁদতে শুরু করল। সাত মাসে সে অনেক কেঁদেছে। সেই কান্নাগুলো ছিল মৃত্যুর জন্য।
আজকের কান্না জীবনের জন্য। যে জীবনটা "হতে পারত।" যে কথাগুলো "বলা যেত।" যে সকালগুলো ফিরে "আসতে পারত।"
যে মানুষটা ভুল করেও হয়তো ঠিক করার চেষ্টা করেছিল।
আমাদের সবচেয়ে গভীর শোক বোধহয় যা হারিয়েছি তার জন্য নয়, যা হতে পারত তার জন্য হয়ে থাকে।
নীরা কবরের পাশে বসে বলল, "আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি কি না জানি না। কিন্তু নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না।"
তারপর কান্না থামিয়ে জোর করে মুখে হাসি টেনে বলল, "তবে একটা কথা বলি? আমিও তোমাকে ছাড়তে চাইনি।"
বাতাসে গাছের পাতা নড়ল। মৃত মানুষেরা উত্তর দেয় না।
ভালোবাসার অদ্ভুত স্বভাব হচ্ছে সামনে থেকে উত্তর না পেলেও কথা বলতে ইচ্ছে করে।
৮
দুই বছর পর।
নভেম্বর। আবারও ঢাকায় অসময়ের বৃষ্টি।
নীরা তখন ধানমন্ডির একটা ছোট ক্যাফেতে বসে আছে। সামনে রাশেদ। বিধুর। স্ত্রী মারা গেছে চার বছর আগে।
গত তিন মাস ধরে তাদের পরিচয়।
রাশেদ বলল, "একটা কথা বলব?"
"বলুন।"
"আপনার সাথে কিছুক্ষন কথা বললে মনে হয় আপনি যেন হঠাৎই খুব দূরে চলে যান।"
নীরা চুপ করে রইলো। কিছু বললো না। জানালার বাইরে তাকাল। কাচ বেয়ে বৃষ্টি নামছে। ওপাশের ভেজা ঢাকার ব্যস্ততা চোখে পড়ছে।
তার মনে হলো জীবন আসলে একই প্রশ্ন বারবার করে। শুধু মানুষের নাম বদলে দেয়।
সে রাশেদের দিকে তাকাল।
"আমি ভয় পাই।"
রাশেদ একটু অবাক হলো।
"কীসের?"
"কাউকে আবার ভালোবাসতে।"
এই কথাটা বলতে নীরার বুক কেঁপে উঠল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে বুকটা হালকাও হলো।
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, "আমিও।"
নীরা হাসল।
"তাহলে তো বিপদ।"
রাশেদও হাসল।
"দুই ভীতু মানুষ মিলে সাহসী হওয়া যায় না?"
নীরা জানত না সে প্রশ্নের উত্তর কি হওয়া উচিত। সব প্রশ্নের উত্তর জানা লাগে না। কিছু উত্তর দুজনে মিলে খুঁজতে হয়।
ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি আরও বেড়েছে।
রাশেদ ছাতা খুলল। নীরা ছাতার নিচে ঢুকল না।
বলল, "হাঁটবেন?"
"এই বৃষ্টিতে?"
"হ্যাঁ।"
"ঠান্ডা লাগবে।"
নীরা আকাশের দিকে তাকাল। তারপর এমন একটা হাসি হাসল, যে হাসিটা বহু বছর আগে কক্সবাজারের সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ের মুখে ছিল।
"সব বৃষ্টি তো আর সারাজীবন থাকে না। সুযোগ হাতছাড়া করলে পস্তাবেন।"
তারা হাঁটতে শুরু করল।
কিছুদূর গিয়ে রাশেদ বলল,
"নীরা?"
"হুম?"
"কখনো যদি আপনার একা থাকতে ইচ্ছে করে, আমাকে বলবেন।"
নীরা তাকাল।
"আপনি রাগ করবেন না?"
"না।"
"যদি অনেকদিন লাগে?"
রাশেদ একটু ভেবে বলল, "তাহলে অপেক্ষা করব। তবে মাঝে মাঝে দরজায় নক করব। শুধু মনে করিয়ে দিতে, ফিরে আসার জায়গাটা আছে।"
নীরা কিছু বলল না।
শুধু প্রথমবার নিজের ইচ্ছায় তার হাতটা ধরল।
৯
সে রাতে বাসায় ফিরে নীরা আরমানের পুরোনো ফোনটা বের করল।
ব্যাটারি প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে চালু হলো। স্ক্রিনে এখনও সেই পুরোনো ছবি। সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে হাসছে বাইশ বছরের নীরা।
সে ‘Notes’ খুলল।
N ফোল্ডার।
সাতাশটা নোট। সবশেষে আরমানের সেই অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি - “কাল নীরাকে সব বলব।”
নীরা অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর নতুন একটা নোট খুলল।
লিখল -
“আরমান,
তোমার "কাল" আজও আসেনি। আমারটা এসেছে। আজ আমি একজন মানুষকে বলেছি যে আমি ভয় পাই। সে চলে যায়নি।
আজ বুঝলাম, সাহস মানে ভয় না থাকা নয়। সাহস মানে ভয়টার নাম ধরে কাউকে ডেকে বলা - দেখো, এটা আমার ভয়।
তুমি আমাকে একটা কথা শেখাতে চেয়েছিলে। শিখতে আমার দুই বছর লেগে গেল।
মানুষের একা থাকার সময় দরকার।
কিন্তু মানুষের একজন মানুষও দরকার।
যার সামনে শক্ত থাকার অভিনয় করতে হয় না।
যার কাছে ফিরে এসে বলা যায়, আমি এসেছি।
আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি। হয়তো পুরোপুরি না। মানুষের ক্ষমাও ভালোবাসার মতো - একদিনে সম্পূর্ণ হয় না। তবে এখন তোমার কথা মনে পড়লে শুধু তোমার মৃত্যুর সকালটা মনে পড়ে না।
কক্সবাজারের সেই বিকেলটাও মনে পড়ে। তুমি বাতাসে সিগারেট ধরাতে পারছিলে না। আমি হাসছিলাম।
তুমি বলেছিলে - কিছু জিনিস বাতাসের বিরুদ্ধে জ্বালিয়ে রাখতে হয়।
তুমি ভুল বলেছিলে। সব আগুন জ্বালিয়ে রাখতে হয় না। কিছু আগুন নিভে যেতে দিতে হয়। তবেই হয়তো পাশে বসে থাকা মানুষটার মুখ অন্ধকারের মধ্যে পরিষ্কার দেখা যায়।
ভালো থেকো।
নীরা।”
লেখা শেষ করে সে ফোনটা বন্ধ করল। তারপর প্রথমবার সেটাকে ড্রয়ারে না রেখে একটা বাক্সে তুলে রাখল। বাক্সের ভেতরে আরমানের ঘড়ি, কয়েকটা ছবি আর সেই চিঠি। ঢাকনা বন্ধ করার আগে নীরা একটু থামল। তারপর চিঠিটার ওপর হাত রাখল।
খুব আস্তে বলল, "বিদায়।"
এবার শব্দটা বলতে তার বুক ভাঙল না।
সামান্য একটু ব্যথা হলো।
কিছু ব্যথা চলে যায় না। চলে যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। কিছু ব্যথা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, এখানে একসময় ভালোবাসার আবাস ছিল।
১০
রাতে আবার বৃষ্টি নামল। নীরা জানালা খুলে দিল। ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকল। টেবিলের ওপর তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
রাশেদ লিখেছে, “ঘুমিয়েছেন?”
নীরা লিখল, “না।”
ওপাশ থেকে “একা থাকতে চান?”
নীরা কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল “আজ না। আজ কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।”
ফোন বেজে উঠল।
নীরা ধরল।
ওপাশে রাশেদের কণ্ঠ "হ্যালো।"
মাত্র একটা শব্দ। অথচ কোন কোন রাতে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এমন একটা শব্দই যথেষ্ট।
নীরা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। রাস্তার আলো বৃষ্টির পানিতে ভেঙে হাজার টুকরো হয়ে আছে।
একসময় সে ভাবত যেকোন কিছু ভাঙা মানেই শেষ। এখন জানে, কাচ ভাঙলে ফেলে দিতে হয়, মানুষ ভাঙলে সবসময় নয়।
কখনো কখনো ভাঙা জায়গাগুলো দিয়েই আলো ঢোকে। কখনো কখনো সেই ফাটল গলেই ফিরে আসে এককালে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার ক্ষমতা।
নীরা ফোন কানে নিয়ে কথা বলতে লাগল।
বাইরে নভেম্বরের ঠান্ডা বৃষ্টি পড়ে চলেছে।
বৃষ্টি জানে না কার সংসার ভেঙেছে। কার প্রেম শেষ হয়েছে। কে কাকে ক্ষমা করতে পারেনি। কে আজ প্রথমবার নিজের ভয় স্বীকার করেছে।
বৃষ্টি এসবের কিছুই জানে না।
সে শুধু আসে।
কিছু পুরোনো ধুলো ধুয়ে দেয়।
কিছু ক্ষত আবার মনে করিয়ে দেয়।
তারপর একসময় থেমে যায়।
পৃথিবীতে কোনো বৃষ্টিই অনন্ত নয়।
এমনকি নভেম্বরের হিমশীতল বৃষ্টিও না।
©somewhere in net ltd.
১|
২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:২২
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: ভালো লাগলো পড়ে ।