নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

চকমাটি দিয়ে স্লেটে লিখেছি, লিখেছি পেনসিল দিয়ে। তারপর বহুকাল কলম দিয়ে লিখেছি কাগজের বুকে। শেষমেশ কিবোর্ড হাতে লেখা শুরু করলাম ভার্চুয়াল জগতে।

ইয়াছিন০

আশায় রুইতন, পবনে রতন......... তাস খেলা শিখছি, পুকুরও কাটছি। একদিন হয়ত ভাগ্য পালটাবে, রত্নের দেখা পাব।

ইয়াছিন০ › বিস্তারিত পোস্টঃ

অরণ্যের দিন ও প্রায় রাত্রি।

২৯ শে জুন, ২০১৩ রাত ১:৩৩

আমার ধারনা ছিল বাংলাদেশে যেহেতু শতকরা ২৫ ভাগের কম বনভূমি আছে সেহেতু গহীন অরণ্য বলে কিছু হয়ত এদেশে পাওয়া যাবেনা। সিলেটের লাউয়াছড়া এসে ধরনাটি মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। শুধু অরণ্য না, একেবারে গহীন গা ছমছমে অরণ্য ঢুকে বসে আছি। আমার সাথে ৮ জন বন্ধু, সবাই ফিসফিস করে কথা বলছি। আমাদের দুই পাশে বিশাল বিশাল গাছ, একেকটা দশ বারো তালা দালানের সমান। চওড়া চওড়া গাছ বেয়ে লতাপাতা পেচিয়ে উঠে গেছে। গাছের গোরা গুলোই এততা উচু যে মনে হচ্ছে আমরা বুঝি মাটির নিচ দিয়ে হাঁটছি। এই ভর দুপুরেও স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার। চারদিক এতটাই নিঃশব্দ যে লাইনের শেষে যে ফিসফিস করছে তার কথাও শুনতে পাচ্ছি। আমরা এসেছি একটা ট্যুরে, কথা ছিল গাইডের সাথে বাসের সবাই যাব, কিন্তু শেষ মুহূর্তে আমরা নয়জন বন্ধু শটকে পরেছি। গাইড আগেই বলে দিয়েছিল জঙ্গলে ভাল্লুক আর একটা বিশাল অজগর আছে, সম্প্রতি অজগরটি নাকি একটা ছাগল খেয়েছে। আমাদের কাররই এদের সামনে পরার ইচ্ছে নেই, দুরুদুরু বুকে তাই খুব সতর্কে হাঁটছি। সবার কাছেই সেলফোন আছে কিন্তু তাতে কোন লাভ নেই, এখানে নেটওয়ার্ক নেই। তাই কাররই হারানো চলবে না। কেও অবশ্য একা হারাতেও চায়না।

আমরা যাচ্ছি সাতছড়া নামের একটা ঝরনার খোজে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এলোমেলো পায়ে চলা পথ, স্থানীয় উপজাতিরা এই পথগুলো কাঠ কাটা বা মধু খোজার জন্য বানিয়েছে। পথের বাকে বাকে চিহ্ন রেখে আসছি যাতে ফেরার সময় সমস্যায় পড়তে না হয়। হঠাৎ হঠাৎ নিঃশব্দ চিরে পাখি ডেকে উঠছে আর আমরা সবাই চমকে উঠছি। সারা জীবন ঢাকায় থেকেছি, এইরকম বন্য পরিবেশের সাথে আমরা কেও পরিচিত নই।

এগিয়ে যেতে যেতে পরিবেশ সামান্য পরিবর্তন হল। বিশাল বিশাল গাছগুলোর পরিবর্তে এখানে দেখতে পেলাম নারিকেল বা পাল্ম টাইপের গাছের জঙ্গল। চারিদিকে হলুদ জংলী লেবু, লেবু পাতার তীব্র ঘ্রানে বাতাস ভারি। সবাই লেবু ছিড়ে পকেটে ভরতে লাগলাম। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে জলি মাইন্ডের ছেলে হচ্ছে জাকির। সে আবিষ্কার করল নারিকেল গাছগুলোর পাতাগুলোতে হনুমান ঝুলে আছে, অনাকাঙ্ক্ষিত আগুন্তক দেখে তারা বিকট ভাবে ভেংচি কাটছে। এতক্ষনের ছমছমে পরিবেশ থেকে বের হয়ে আমরাও একটু ফানি হওয়ার চেষ্টা করলাম। আমরাও ভেংচি কাটলাম। জাকির প্রথমে একটা লেবু ছুড়ে মারল, দেখাদেখি সবাই শুরু করলাম। আমাদের লেবু হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে হনুমান গুলো শটকে পরল। কিন্তু ভাবিনি এই শটকে পরাই বিপদ ডেকে আনবে। আমরা তখন মহানন্দে লেবু ছিঁড়ছি, হঠাৎ টিটু চিৎকার দিয়ে বলল, ' দেখ কি আসে"।

আমরা নিচের দিকে দেখলাম কিছু নেই, কিন্তু উপরে তাকিয়ে দেখি সবগুলো গাছের উপরে হনুমান ভরে গেছে। এতগুলো কোত্থেকে আসল হিসাব মিলানোর চেষ্টা করছি এমন সময় কেও একজন বলল, ' অ্যাটাক করবে নাতো? '

আমরা পরস্পরের মুখের দিকে চাইলাম এবং ঝেরে দৌড় শুরু করলাম। উল্টোপাল্টা দৌড়ে আবার কোন জঙ্গলে ঢুকে পরলাম যানিনা কিন্তু যখন থামলাম তখন বুজলাম পথ হারিয়েছি। নিজের শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের একটা স্রোত নেমে গেল। এই জঙ্গলে পথ হারানো মানে বিশাল বিপদ। বিপদের মধ্যেও শামিম ছেলেটা মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারে। সে বলল,' উত্তর দিক থেকে এসেছি, তারপর পুবে দৌড় দিয়েছি, কাজেই দক্ষিন দিকে কোনাকুনি গেলেই রিসোর্টে ফিরতে পারব'। প্রস্তাবটা সবাই মেনে নিলাম কিন্তু সবাই দিক ভ্রান্ত, ঠিক কোনদিকটা দক্ষিন তা কেও নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছিলাম না। শেষমেশ বিসমিল্লা বলে একদিকে হাটা শুরু করলাম।

জঙ্গল আর শেষ হয় না। হাঁটছি তো হাঁটছিই এমন সময় আবিষ্কার করলাম পথ শেষ, সামনে একটা খাড়া ঢাল সোজা নেমে গেছে। তিনতলা উচু ঢালের নিচে চকচকে বালি। পেছানোর উপায় নেই, কি করা যায় ভাবছি, এই সময় জাকির আচমিক লাফ দিল। আমরা দম বন্ধ করে ফেললাম, এত উচু থেকে লাফ দিয়ে হাত না পা ভাঙ্গে কে জানে। কিন্তু দেখলাম বালির উপর বসে জাকির হাসছে। সুতরাং এবার একে একে সবাইকে এসিড টেস্টটা দিতে হবে। সবাই টপাটপ পড়তে লাগল, সব শেষে লাফ দিলাম আমি। নিচে পরেই সাহস বেরে গেল। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম কত উপর থেকে লাফ দিয়েছি, বালি না হয়ে পাথর হলে এতক্ষন সর্বনাশ হয়ে যেত।

ঘড়ি দেখলাম, বিকেল হয়ে গেছে, কিছুক্ষন পর সন্ধ্যা নামবে। আমরা দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। একসময় দেখি মাটির রাস্তা শেষ হয়ে বালির পথ শুরু হয়েছে। আমরা যাচ্ছি তো যাচ্ছি এমন সময় পেছন থেকে শামিম ডাক দিল। ফিরে গিয়ে দেখি সে গভীর মনোযোগ দিয়ে বালির দিকে তাকিয়ে আছে। সেখানে দেখলাম কুকুরের পায়ের ছাপের মত ছাপ কিন্তু আকারে অনেক বড়। ছাপ গুলো আমরা যেদিকে যাচ্ছি সেদিকে চলে গেছে। কেও একজন বলে উঠল, ' ভাল্লুক নাতো? ' আমরা পরস্পরের মুখের দিকে চাইলাম এবং আবার ঝেরে দৌড় দিলাম। আমাদের সবার আগে দৌড় দিয়েছিল শামিম আর টিটু। আমরা যখন থামলাম তখন দেখলাম ওই দুজন মিসিং। সবার মাথা নষ্ট হয়ে গেল। আর কিছুক্ষন পর অন্ধকার নামবে এমন সময় দুইজন নেই। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যত তারাতারি সম্ভব বাসের কাছে গিয়ে সকলকে ইনফরম করব। আবার হাটা শুরু করলাম, আদৌ বাসের কাছে যেতে পারব কিনা জানিনা কিন্তু ওই দুজনকে পেতেই হবে, ওদের ছাড়া কোনমতেই এখান থেকে যাবনা। প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে এমন সময় দেখি পথে উপর ওই দুই ভদ্রলোক বসে আছে। ওদের দেখে এত শান্তি পেলাম যেন বুক থেকে একটা বিশাল পাথর নেমে গেছে।

ওরা জানাল যে ওরা দৌড়চ্ছিল আমরা থেমে গেছি ওরা জানেনা তাই আর থামেনি। সরু রাস্তা, দুই পাশে জঙ্গল। হঠাৎ কাল রঙের মানুষের মত কিছু একটা হাতে দাও নিয়ে এপাশের জঙ্গল থেকে ওপাশে চলে গেছে। তাই দেখে ভয় পেয়ে ওরা পথে বসে পড়েছে আর আমাদের অপেক্ষা করছে। কাল রঙের সেই কিছু একটা আর কিছু নয় ছিল একজন উপজাতি, জঙ্গলে এসেছিল কাঠ কাটতে। একটু হাঁকডাক করতেই খুজে পেলাম তাকে। আমরা হরবর করে বলে গেলাম যে পথ হারিয়েছি, কোন রিসোর্টে এসেছি সব। বেচারা কি বুঝল জানিনা কিন্তু অর একটি কথাও বুজলাম না, বাংলা ভাষা না চাইনিজ ভাষা বুজতে পারছিলাম না। যাই হোক আকারে ইঙ্গিতে বুঝলাম ওর পিছন পিছন যেতে হবে। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে দুলতে পিছু নিলাম।

সূর্যের শেষ আলো টুকুও নিভে গেছে, হাঁটতে হাঁটতে আমরা ক্লান্ত। আধো অন্ধকারে একসময় দেখলাম মেইন রোড, একপাশে রিসোর্টে সাইড করা আমাদের বাস। এটি ছিল আমার দেখা অন্যতম একটা সুন্দর দৃশ্য।

মন্তব্য ২ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ২৯ শে জুন, ২০১৩ বিকাল ৪:১২

রাকিবুল৯০ বলেছেন: গা ছমছমে কাহিন।। প্রথম ভালো লাগা।

২| ২৯ শে জুন, ২০১৩ রাত ৮:৪৪

ইয়াছিন০ বলেছেন: জঙ্গলের মধ্যে সারাক্ষন একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম। তখন খুব ভয় করছিল। এখন ভাবতে ভালই লাগে। ধন্যবাদ রাকিবুল৯০।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.