| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইমাম আযম আবু হানিফা রহ. ৮০ হি.তে ভূমিষ্ঠ হন এবং ১৫০ হি.তে পরলোক গমন করেন। বর্তমান যুগের আমরা তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলে, এবং তাঁর সঠিক মূল্যায়ণ করতে চাইলে, আমাদের দেখতে হবে সমসাময়িক বিস্বস্ত এবং প্রজ্ঞাবান মুহাদ্দীস ও ফকীহ আলেমগণ তাঁকে কিভাবে মূল্যায়ণ করেছেন। তাঁর ব্যপারে সমযুগীয় ও পরবর্তীদের প্রজ্ঞাপূর্ণ মূল্যায়ণসমূহ ইতিহাসের উৎসগ্রন্হগুলোয় সংকলিত আছে। সেগুলোর সাহায্যেই ইমাম সাহেবের সংক্ষিপ্ত জীবন ও কর্ম এবং তাঁর সঠিক মূল্যায়ণ এখানে তুলে ধরবো ইনশা’আল্লাহ।
পরিচয় :
তিনি ইমাম আযম আবু হানিফা রহ.। তাঁর আসল নাম নু’মান ইবনে ছাবেত আলকুফী। ইরাকের তিনি বিখ্যাত ফকীহ। ইসলামের দ্বিতীয় রাজধানী, সহস্র সাহাবা’র স্থায়ী নিবাস ও অগণিত সাহাবা’র অবতরন-পরশে ধন্য, মহান সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযি. এর শিক্ষাদান কেন্দ্র, ইলম ও আমলের শহর, বিখ্যাত কুফা নগরীতে তিনি ভূমিষ্ঠ ও প্রতিপালিত হন। আনাস বিন মালেক রাযি. যখন কুফায় আগমন করেন, তখন ইমাম সাহেব কয়েকবার তাঁর সাক্ষাত লাভ করেন। তিনি সুবিখ্যাত ফকীহ হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমানের সংস্পর্শে সুদীর্ঘ ১৮ বছর থেকে ফিকাহ শাস্ত্রে গভীরতা অর্জন করেন। এবং ইমাম শা’বী, ইবরাহীম নাখাঈ, হাসান বছরী, আতা ইবনে আবী রাবাহ এবং নাফে’ মাওলা ইবনে উমার রাযি. সহ অসংখ্য মনিষী ও মুহাদ্দীসীন থেকে তিনি হাদীস ও ফিকাহ শিখেছেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ ছালেহী তাঁর উস্তাদসংখ্যা ৪০০০(চার হাজার) উল্লেখ করেছেন।(عقود الجمان ১৮৩পৃ.) আর ইমাম সাহেব থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁর অসংখ্য ছাত্র। এর মধ্যে আছেন ইমাম শাফী’র প্রিয় উস্তাদ ওয়াকী রহ., ইমাম ছাওরী, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক, ইয়াহয়া ইবনে সাইদ আলকাত্তান, ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ইবনে হাসান শায়বানী এবং ‘মুছান্নাফ’ এর সংকলক আব্দুর রাযযাক প্রমুখ বিখ্যাত ইমামগণও।
ইমাম আযম রহ. একজন তাবেয়ী : ইমাম আবু হানিফা রহ. কতক সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন। বিশজন বিখ্যাত মুহাদ্দীস ও হাফিযুল হাদীস তা প্রমাণ করেছেন। (قواعد فى علوم الحديث ৩০৭পৃ.) হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন , এ কারণেই ইমাম আবু হানিফা রহ. তাবেয়ী। তার সমকালীন অন্যান্য ইমামগণের ব্যপারটা এমন না। যেমন শামদেশের ইমাম আওযায়ী, কুফার ইমাম ছাওরী, মদীনার ইমাম মালেক, মক্কার ইমাম মুসলিম ইবনে খালেদ এবং মিশরের ইমাম লাইছ ইবনে সা’দ প্রমুখ।(অর্থাৎ তাঁরা তাবেয়ী না)। تبييض الصحيفة) ৬পৃ.) কিন্তু কোন সাহাবী থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন কিনা, এ ব্যপারে ইমামদের মাঝে মতপার্থক্য আছে। তবে এ ব্যপারে ইমামগণ একমত যে, তাবেয়ী হওয়ার জন্য হাদীস বর্ণনা শর্ত না, সাক্ষাত লাভই যথেষ্ট।
তিনি ইলমের ইমাম ছিলেন, তেমনি ছিলেন আমলেরও ইমাম। কত সুদীর্ঘ রজনী তিনি না ঘুমিয়ে ইবাদতে কাটিয়েছেন। তিনি রাজা-বাদশার দান-দক্ষিণা বা উপঢৌকন গ্রহণ করতেন না। বরং বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নিরবাহ করতেন।(تذكرة الحفاظ ১/১৬৮পৃ.)
ইমাম আবু হানিফা রহ. শেষ জীবনে খলিফা মনছুরের কারাগারে বন্দী হন। কারণ তিনি খলিফার পক্ষ থেকে মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রধাণ বিচারপতির পদগ্রহণের আবেদন প্রত্যাখান করেছিলেন। সেখানে তাঁকে ভীষণ নির্যাতন করা হয়। এবং সেখানেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। (تاريخ بغداد ১৩’ ৩২৮পৃ.)
হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আযমের মূল্যায়ণ :
সমকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দীস মিসআ’র ইবনে কিদাম রহ. বলেন, আবু হানিফার সাথে আমরা হাদীস অন্বেষণে বের হই, তাতে তিনি আমাদের ছাড়িয়ে যান। আমরা বুযুর্গী অবলম্বন করি, তাতেও তিনি আমাদের ছাড়িয়ে যান। এরপর ফিকাহ অর্জনে মগ্ন হই আর এতে তিনি কি অর্জন করেছেন সেতো দেখতেই পাচ্ছো! (عقود الجمان ১৯৬পৃ.) ইমাম ছাওরী রহ. বলেন, ইমাম আবু হানিফা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহী সূত্রে বর্ণিত ছাড়া হাদীস-আছার গ্রহণ করা হালাল মনে করতেন না। হাদীসের ‘নাসিখ-মানসূখ’ বিষয়ে গভীর পারদর্শী ছিলেন। তিনি নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের বর্ণিত হাদীসের সন্ধান করতেন এবং নবিজী স.এর সর্বশেষ কর্মপন্থা কী ছিল খুঁজতেন। সঠিক পন্থা অনুসরণের ক্ষেত্রে কুফা নগরীর আলেমগণের মত গ্রহণ করতেন এবং সেভাবেই কর্মপন্থা নির্ধারণ করতেন। (عقود الجمان ১৯১পৃ.) আবু হানিফা রহ. চল্লিশ হাজার হাদীস থেকে নির্বাচন করে ‘কিতাবুল আছার’ সংকলন করেন। مناقب أبي حنيفة للموفق المكى) ৮৪পৃ.) ইমাম আবু হানিফা রহ. হাফিযুল হাদীস ছিলেন। (تذكرة الحفاظ ১/১৬৮পৃ.)
ফিকাহ শাস্ত্রে ইমাম আযমের মূল্যায়ণ :
ইমাম শাফী’র প্রসিদ্ধ উস্তাদ ওয়াকী ইবনুল জাররাহ রহ. বলেন, আমি আবু হানিফার চেয়ে অধিক ফকীহ কাউকে দেখিনি এবং তাঁর চেয়ে সুন্দর নামায আদায়কারীও আর কাউকে দেখিনি। (تاريخ بغداد ১৩’ ৩৪৫পৃ.) ইমাম শাফী’ রহ. বলেন, যে ফিকাহ অর্জন করতে চায় সে যেন আবু হানিফা ও তাঁর শাগরেদগণের সহচার্য গ্রহণ করে। কারণ প্রত্যেক মানুষ ফিকহের ক্ষেত্রে তাঁর উপর নির্ভর। (تاريخ بغداد ১৩’ ৩৪৬পৃ.) তিনি আরো বলেন, যে আবু হানিফার কিতাবগুলো অধ্যায়ন করেনি সে ইলম ও ফিকহে গভীরতা অর্জন করেননি। (عقود الجمان ১৮৭পৃ.) ইমাম জারীর বলেন, ইমাম আ’মাশকে সূক্ষ ব্যখ্যা বিশ্লেষণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি আবু হানিফার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। (مناقب أبي حنيفة للإمام الذهبى ১৮পৃ.) আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারাক রহ. বলেন, কোন হাদীসের বিশ্লেষণ প্রয়োজন হলে, ইমাম মালেক, ইমাম ছাওরী ও আবু হানিফার বিশ্লেষণ (আমার কাছে গ্রহণযোগ্য)। আর আবু হানিফাই তাদের শ্রেষ্ঠ, সর্বাধিক সূক্ষদর্শী এবংফিকহের অধিকারী। তিনি এ তিন জনের শ্রেষ্ঠ ফকীহ। (مناقب أبي حنيفة للإمام الذهبى ১৯পৃ.) ইমাম ছালেহী উল্লেখ করেন, আবু হানিফা সর্বপ্রথম ফিকাহ সংকলন করেন এবং এর অধ্যায়গুলো বিন্যস্ত করেন। তারপর ইমাম মালেক তাঁর মুয়াত্তায় এই বিন্যাস অনুসরণ করেন। আবু হানিফার আগে কেউ এভাবে সংকলন করেনি। (عقود الجمان ১৮৪পৃ.)
ইমাম আযমের তাকওয়া ও বুযুর্গী :
হাদীস শাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম ইয়াহয়া ইবনে সায়ীদ আলকাত্তান রহ. বলেন, আল্লাহর কসম আবু হানিফার মজলিসে আমি বসেছি এবং তাঁর থেকে হাদীস শুনেছি। আল্লাহর কসম যখনি আমি তার চেহারা দেখতাম, বুঝতাম তিনি আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে আছেন। (تاريخ بغداد ১৩’ ৩৫২পৃ.) মাক্কী ইবনে ইবরাহীম বলেন,আমি কুফা’র আলেমগণের সাথে উঠাবসা করেছি,তাদের মাঝে আবু হানিফার চেয়ে বেশি কাউকে আল্লাহভীরু দেখিনি। (تاريخ بغداد ১৩’ ৩৫৮পৃ.) আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.ও এমন কথাই বলেছেন। (تاريخ بغداد ১৩’ ৩৫৯পৃ.)
ইমাম আবু হানিফার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব :
ছিহা’সিত্তা সংকলকদের অন্যতম ইমাম আবু দাঊদ রহ. বলেন, আবু হানিফার প্রতি আল্লাহ রহমত বর্ষণ করুন, তিনি একজন ইমাম ছিলেন। (تذكرة الحفاظ ১/১৬৯পৃ.) আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেন, আবু হানিফার চেয়ে অনুসরণের অধিকযোগ্য আর কেউ নেই। কারণ তিনি এমন ইমাম যিনি মুত্তাকী, পরহেযগার, আল্লাহভীরু ও ফকীহ আলেম। (الكردرى مناقب أبي حنيفة للإمام ৪৬পৃ.) ইমাম বুখারীর বিশিষ্ট উস্তাদ ইয়াহয়া ইবনে মায়ীন বলেন, আমি ইয়াহয়া ইবনে সায়ীদ আলকাত্তানকে বলতে শুনেছি, আমরা আল্লাহকে সামনে রেখে মিথ্যা বলবো না, আমরা আবু হানিফার চেয়ে সুন্দরতম আর কোন মতামত পাইনি। আমরা তাঁর অধিকাংশ ফতোয়াই গ্রহণ করে নিয়েছি। (تاريخ بغداد ১৩’ ৩৪৫পৃ.) ইয়াহয়া ইবনে মায়ীন আরো বলেন, কুরআন তিলাওয়াত আমার কাছে হামযার কিরাত অনুযায়ী (যা বহুল প্রচলিত ক্বারী হাফসেরই কিরাত), আর ফিকহের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার ফিকাহ। পূর্ববর্তীদেরও এ অনুযায়ীই চলতে দেখেছি। (تاريخ بغداد ১৩,৩৪১)
সমযুগিয় আলেমগণ ইমাম আযমের নিন্দা করেনি :
সমযুগিয়দের মুখে ইমাম আযমের নিন্দা ছিল না। ইমাম সাহেবের ছাত্রের ছাত্র, যিনি ইমাম বুখারীর বিখ্যাত উস্তাদও, সেই ইয়াহয়া ইবনে মায়ীন রহ. বলেন, ‘আমি কাউকে আবু হানিফার নিন্দা করতে শুনিনি’।(فيض البارى ১/১৬৯পৃ.) অনেক মুহাদ্দীস মনে করেন, ইয়াহয়া ইবনে মায়ীন যে রাবীকে (হাদীস বর্ণনাকারী) চিনেন না বা তার ব্যপারে আলোচনা করেন নি, সে মাজহুল অর্থাৎ অজ্ঞাত ব্যক্তির হুকুমে। বাস্তবে এমনটি না হলেও এর থেকে রাবীদের ব্যপারে তাঁর অগাধ জ্ঞানের বিষয়টি বুঝে আসে। আর তার কথা থেকে জানা গেল, হাজার হাজার রাবীকে তিনি চিনলেও, তাঁর যুগ পর্যন্ত কেউ ইমাম সাহেবের নিন্দা করেনি। অন্তত তাঁদের কাউকে তিনি ইমাম আবু হানিফার নিন্দা করেছে বলে জানেন না। বলাবাহুল্য, সমযুগিয়দের মূল্যায়ণই অধিক গ্রহণযোগ্য ও সঠিক।
শেষকথা :
ইমাম আবু হানিফার সমযুগিয় একজন বিজ্ঞ আলেম এই মন্তব্য করেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আবু হানিফার ফিকাহ এবং হামযার ক্বিরাত ইরাকের সিমানা অতিক্রম করবে না। কিন্ত এখন দেখতে পাচ্ছি তা গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে গিয়েছে’। হাফেয ইবনে হাজার মাক্কী রহ. লিখেছেন, ‘অনেক ইমাম বলেছেন এ কথা যে, মুসলমানদের আর কোন প্রসিদ্ধ ইমামের এ পরিমাণ ছাত্র হয়নি, যা ইমাম আবু হানিফার হয়েছে। তেমনি আর কারো দ্বারা সকল আলেম ও সবর্সাধারণ এত উপকৃত হয়নি, যতটুকু ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর ছাত্রদের দ্বারা হয়েছে’। (الخيرات الحسان ২৬পৃ.) আর এটি বাস্তব সত্য, চামচিকার অভিশাপে সূর্যের দীপ্তী মলিন হয় না। ইমাম আবু হানিফার গুণাবলি সূর্যের দীপ্তীতূল্য! যা এতক্ষন আপনার সামনে তুলে ধরা হলো। তবু যারা এই মহান ইমামের নিন্দা গেয়ে নিজের অযোগ্যতা ঢাকতে চায়, তারা সেই চামচিকা সদৃশ!
আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন, আমরা যেন স্বীকৃত ইমামগণের অযথা নিন্দা করে অপরাধের বোঝা ভারি করা থেকে মুক্ত থাকতে পারি। আমিন।
(শেষের কথাগুলো লিখলাম, কারণ ইদানীং সালাফী বা আহলে হাদীস খ্যত একশ্রেণীর ‘পার্টটাইম’ বা ‘অবসর টাইম’- গবেষকদের দ্বারা মুসলমানদের এই মহান ইমামের সম্মান ভূলুন্ঠিত হচ্ছে। এই লোকদের ‘আহলে হাদীস’ বলাটা আবিধানিক ও পারিভাষিক উভয় দৃষ্টিকোন থেকেই ভুল! বরং এরা ‘গাইরে মুকাল্লিদ’ বা ‘লা মাযহাবী’ নামে পরিচিত হওয়াটাই অধিক যথাযথ।)
©somewhere in net ltd.