নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

chandramanob

I am nutral

চন্দ্রমানব

আমি এখানে কেবল মাত্র গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা লিখতে চাই।

চন্দ্রমানব › বিস্তারিত পোস্টঃ

মা

০৪ ঠা জুলাই, ২০১৪ সকাল ১১:২২

চন্দ্রমানব

জিনিয়া।

সাত সকালেই জিনিয়া আলভির রিডিং রুমে এসে ঢুকলো।

আলভির মা সেটা দেখে ডাইনিং রুমের গ্লাস ষ্ট্যান্ড থেকে তার নিজের গ্লাসটি বেছে নিয়ে আগের মতই এক গ্লাস পানি খেল। আগের মতই সেই পানি তার কাছে খুব বিস্বাদ ঠেকলো। আলভির মায়ের সেই এক দোষ। সে কোন সুমত্ত মেয়েকে আলভির ঘরে ঢুকতে দেখলেই তাকে পিপাসাতে পায় এবং সে তখন এক গ্লাস পানি খায়। আর সেই পানিতে যে কোন স্বাদ থাকবেনা এটা একদম নিশ্চিত। সে তখন এই বিস্বাদ পানির জন্য ওয়াসা সমেত সবার পিন্ডি চিবিয়ে খেতে থাকে।



এইত কয়েক দিন আগে আলভি তার পড়ার ঘরে বসে কয়েকখানা মোটা বই ঘেঁটে একটা ইমপর্ট্যান্ট নোট তৈরী করছিল।

হঠাতই এল সাবরিণা।

সে এসেই আলভির মাকে জিজ্ঞেস করেঃ

- আন্টি, আলিভি কি এখনও বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে আছে?

এটা শুনেই আলভির মায়ের খুব তেষ্টা পায়। সে সাবরিণাকে কিছু বলার আগেই আগের মত এক গ্লাস পানি খেয়ে গ্লাসটিকে সশব্দে ঠক্‌ করে ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে বলেঃ

- পানিত নয় যেন গজব। স্বাদ নেই, গন্ধ নেই, কেমন যে গোবর জল। তারপরও নাকি এটা পানি। খেলেই মুখ ভর্তি বমি আসে।

সাবরিণা তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে।

সে বলেঃ

- আন্টি পানির কী দোষ? আাপনার অসুস্থার জন্যই মনে হয় পানি আপনার কাছে বিস্বাদ ঠেকছে।

-এই মেয়ে, এই মেয়ে তুমি কি ডাক্তার?

আলভির মা সাবরিণার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে।

-সরি আন্টি, না মানে.....

সাবরিনা মিনমিনে সুরে কিছু একটা বলতে যায়।

- তুমি নিশ্চয় তোমার ভুল বুঝতে পেরেছে । তা অমন তাল গাছের মত দাঁড়িয়ে থাকলে কেন। যেখানে যাচ্ছিলে যাও। পানি নিয়ে তোমার এত গবেষণা না করাই ভাল।

আলভির মা সাবরিণাকে রিতিমত অপ্রস্তুত করে ছাড়ে।

সাবরিণা পারলে দৌড়ে গিয়ে আলভির রুমে ঢোকে।

সে মনে মনে বলে, বাব্বা এই আন্টিটা তো শুধু আন্টি নয়, যেন হাই স্কুলের বদরাগি হেড মিসট্রেস।



কিছুক্ষণ পর সাবরিণা আলভির ঘর থেকে বের হয়।

সে সিঁদ কাটা চোরের মত চার দিকটা ভাল করে চেয়ে দেখতে দেখতে এগোয়।

কিন্তু তা রপরেও পিছন থেকে আলভির মা বলে উঠেঃ

- এই মেয়ে, তুমি এমন সিপিস ডগির মত (সযববঢ়রংয ফড়মমু) এদিক ওদিক তাকিয়ে আলভির রুম থেকে বের হচ্ছ কেন?

সাবরিণা ধরা পড়া চোরের মত চমকে উঠে।

কী বলবে সে?

আমি আপনাকে এড়িয়ে যাবার জন্য এমন করছি এভাবে কি বলা যায়?

না, তেমন বলা যায়না।

সে এমন মুখ করে আলভির মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে যার বনর্ণনা দেয়া বেশ মুস্কিল। কোন বিশেষ কষ্টেরর মধ্যে মুখের উপর হাসি ফুটিয়ে তোলা একেবারে জাত আর্টিষ্ট ছাড়া অন্যের পক্ষে করাটা খুবই দুঃসাধ্য। সাবরিণার ক্ষেত্রেও হলো তাই। সে হাসতে গিয়ে সঠিকভাবে হাসতে না পেরে তার মুখটাকে কাচু মাচু করে ফেললো।

তারপরও সে তার মুখের উপর একটু হাসি ছড়াবার চেষ্টা করে বলেঃ

- আন্টি, আমিতো আপনাকেই খুঁজছিলাম।

-কিন্তু খুঁজে না পেলেই ভাল হত, তাইনা?

আলভির মা ব্যাঙ্গ করে বলে।

সাবরিণা এই আন্টি নামক মহীলাটিকে এবার মনে মনে এক হাত নেয়।

কী সাংঘাতিক মহীলারে বাবা ! মহীলা দেখি আমার মনের কথা আয়নার মত পরিস্কার পড়ে ফেলেছে দেখি।

সাবরিণা এবার দৌড়ে আলভির মায়ের কাছে এসে তার হাত দু’ট ধরে বলেঃ

- আন্টি আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন।

- আর তুমিও যে খুব সুন্দরভাবে পরিস্থিকে ট্যাকল্‌ দিতে পার সেটাও আমি বুঝতে পারলাম।

আলভির মা পাল্টা উত্তর করে।

- না আন্টি, পরিস্থিতি টরিস্থিতি আবার কি। আন্টির কাছে কি কোন পরিসি'তি চিন্তা করে কথা বলতে হয়?

সাবরিণা ইতোমধ্যে তার ঘেমে ওঠা নাকটি চুলকাতে চুলকাতে বলে।

- হ্যাঁ বলতে হয়।

আলভির মা খুব দৃঢ়তার সাথে উত্তর দেয়।

- তবে তুমি খুব একটি সুন্দর মেয়ে। এবার এস।

শেষ মেষ আলভির মা সাবরিণাকে যাবার অনুমতি দেয়।

সাবরিণা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

‘বাই আন্টি’ বলেই সে ততক্ষণাৎ সেখান থেকে ভেগে আসে।



কয়েক দিন পরে এক সকালে জিনিয়া নামের আরেকটি মেয়ে আলভির সাথে দেখা করতে আসে।

আলভির মা আগের অভ্যেস মতই এক গ্লাস পানি ঢেলে নেয়। তারপর নিজে নিজেই বলতে থাকে এই যে এই ওয়াসার পানি, এগুলো ফুটিয়ে খেলেই বা কি, আর না ফুটিয়ে খেলেই বা কি। এগুলো ফিল্টার করে গলাতে ঢাললেই বা কি, আর ফিল্টার না করে গলার ছিদ্রের মধ্যে ছেড়ে দিলেই বা কি। কোন পানিতে যদি একটু স্বাদ.......



জিনিয়া আলভির রুম থেকে সোজা চলে আসে আলভির মায়ের কাছে।

- মাই সুইট আন্টি, এই যে আমার হাতে ‘ফ্রেশ’ ওয়াটারের একটি বোতল আছে। ওয়াসার ওসব পানি খেয়ে আপনি মুখেও স্বাদ পাবেন না আর পেটেও অসুখ বাড়াবেন না। নিন, এই ওয়াটার বোটলটি নিন। হয়ত ওয়াসার পানির একঘেয়েমি খারাপ স্বাদ থেকে কিছুটা রিলিফ পাবেন। মাই সুইট আন্টি, নিন ধরুন। একবার ট্রাই করেই দেখুন না। দেখবেন আপনার বেশ ভাল লাগছে।



আলভির মায়ের চোখের সাইজ ইতোমধ্যেই ক্রিকেটের বলের আকার ছাড়িয়ে গেছে।

- এই মেয়ে, তুমি এই সাত সকালে আমাকে এই সব জ্ঞান দেবার জন্যে......

আলভির মাম অনেকটা কর্কশ স্বরেই জিনিয়াকে বলে।

-এইত, এইত আমার সুইট আন্টিটা ঠিক বলেছে। আমি কি আর এমনিই সাত সকালে এখানে এসেছি। আমি জানি আমি এসে দেখতে পাব আমার মায়ের মত আন্টিটার খুব তেষ্টা পেয়েছে। ফলে আমি, এই আমি জিনিয়া কি আমার আন্টির জন্য ফ্রেশ ওয়াটারের একটা বোটল না এনে পারি?

জিনিয়া আলভির মায়ের কর্কশ কথাগুলোকে পাত্তা না দিয়েই বলে।



আলভির মা জিনিয়ার দিকে পিট পিট করে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকে।

এই মেয়েটিকে কি সে আগে কখনও দেখেছে?

ও হ্যাঁ, তাইত। মাত্র চার পাঁচ দিন আগেইত এই মেয়েটি এসেছিল। তখনও মেয়েটির সামনে তার তেষ্টা পেয়েছিল। তখনও সে পানি খেয়ে পানির গ্লাসটি টেবিলের উপর ঠক্‌ করে জোরে রেখে দিয়েছিল।

আলভির মা সেদিনের সব কথা এখন পরিস্কার মনে করতে পারে।

কিন্তু এই মেয়েটি কি সেদিন আমার মনের সব কথা পড়ে ফেলেছিল?

সে মনে মনে ভাবতে থাকে।

কী সাংঘাতিক ডেপো এই মেয়েটি !

আমার সেদিনের সেই ব্যবহার দেখে এই মেয়েটি আমাকে ষ্টান্ট দেবার জন্যই আজকে তার সাথে করে একটি ফ্রেশ ওয়াটারের বোতল এনেছে।

আলভির মা মেয়েটির দূরভিসন্ধি আঁচ করতে পারে।



- এই মেয়ে এত ডেপোমি শিখলে কোত্থেকে?

আলভির মা জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখ করে বলে।

-মাই গাড! একে আপনি ডেপোমি বলছেন কেন আন্টি?

জিনিয়া চমকে উঠার ভান করে।

তারপর সে বলেঃ

- আসলে আন্টি, আমরা ছোটরাই হলেম গিয়ে আপনাদের জন্য একটি বড় সমস্যা। ভাল কিছু করতে গেলে আপনারা সেটাকে বলেন ডেপোমি । খারাপ কিছু করতে গেলে বলেন ডেষ্ট্রাকটিভ। আর কোন কিছু না করলে বলেন অকম্মার ধাড়ি। তাহলে বলুন না আন্টি আমরা করবটা কি?



আলভির মা মেয়েটিকে নিয়ে বিপাকেই পড়ে।

সে বলেঃ

- তুমি বরং সরিষা ক্ষেতে গিয়ে সরষে গাছের ফুল তুলতে থাক। দেখবে তুমি ভাল ভাল কাজ করতে শিখে গেছ।

আলভির মা ব্যাঙ্গ করে জিনিয়ার কথার মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করে।

- এইত, এইত। এইত আমার সুইট আন্টিটা লাখো কথার এক খানা কথা বলেছে। কাজটা কিন্তু খারাপ না।

জিনিয়া কথাগুলো বলতে বলতে আলভির মায়ের হাতে ফ্রেশ ওয়াটারের বোতলটি প্রায় জোর করে গুঁজে দিয়ে গট গট করে আলভিদের বাসা থেকে বেরিয়ে আসে।

তারপর পার্স থেকে টিস্যু পেপার বের করে মুখ মুছতে মুছতে নিজেকে বলেঃ

- এই মহীলাটি সিম্পলি ড্যাঞ্জারাস।

তবে আমিও জানি কি করে এই সব ড্যাঞ্জারাস গিরগিটিদের লেজ খসিয়ে ফেলতে হয়।



জিনিয়া চলে যাবার পর আলভির মা ভাবতে বসে যায়।

এই যে টেবিলের উপর শব্দ করে গ্লাস রাখা, পুরোন এই ট্যাকটিস খাটিয়ে আর কত দিন চালানো যাবে। তার মনে হয় এই পদ্ধতিটি কেমন যেন পুরোন হয়ে যাচেছ। সে ভাবে এবার তবে নতুন কিছু একটা উদ্ভাবন করতে হবে।



এর মধ্যে আবারো বেশ কয়েক দিন পার হয়ে গেছে। আলভির মা বিকেলের দিকে কোথাও যেন যাবে। দরজা পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ অন্য একটি মেয়ের সাথে দেখা।

- এই মেয়ে তুমি কে?

আলভির মা মেয়েটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত বার কয়েক পর্যবেক্ষণ করে নেয়।

- আন্টি, আমি আলভির......

মেয়েটিকে কথার মধ্যে থামিয়ে আলভির মা বলে উঠেঃ

- আমি আলভির বন্ধু তাইনা?



মেয়েটির নাম জয়ন্তী। সে হিন্দু ধর্মের। সে পূর্বেই জিনিয়ার কাছ থেকে আলভির মায়ের বিষয়ে জেনেছিল।

সে আলভির মাকে সামনে রেখে মেঝেতে বসে পট পট করে কয়েকটি প্রণাম করে নেয়।

- এই এই, এই মেয়ে কি হচ্ছে এসব?

আলভির মা রিতিমত বিব্রত হয়ে মেয়েটিকে বলে।

- না আন্টি, এটা তেমন কিছু নয়। তবে আপনি দেখতে সাক্ষাৎ মা দুর্গার মত। তাই আপনাকে একটু প্রণাম করে নিলাম।

- এই মেয়ে আমি কি একটি প্রতিমা যে তুমি আমাকে তোমার দুর্গা মায়ের সাথে তুলনা করলে?

আলভির মা উষ্মা প্রকাশ করে।

- আন্টি, আপনি প্রতিমা বা জীবন্ত কোন মা এসব বড় কথা নয়। আসলে মেয়েরা হল মায়েদের জাত। তাই মাকে প্রণাম করতে দোষ কোথায়?

জয়ণ্তী আলভির মাকে খুব দৃঢ়তার সাথে বলে।



হঠাৎ আলভির মায়ের হাত থেকে একটি কাগজের প্যাকেট মেঝেতে পড়ে যায়। সে ইচ্ছাকৃতভাবেই প্যাকেটটি মেঝেতে ছেড়ে দেয়।

তারপর ঝন ঝন ঝনাৎ......

আলভির মা চেঁচিয়ে উঠেঃ

- এই মেয়ে তোমার প্রণামের জন্য আমার হাত থেকে কাঁচের মগ দু’ট মেঝেতে পড়ে ভেঙ্গে গেল।

- সরি আন্টি। আপনার হাতের কোন সমস্যা নেইতো?

জয়ন্তী আলভির মায়ের দিকে এটু বাঁকা চেখে তাকায়।

- তার মা-আ-আ-নে?

আলভির মা প্রায় চেঁচিয়ে উঠে জয়ন্তীকে বলে।

জয়ন্তী খুব শান্ত অথচ ঠান্ডা মাথায় বলেঃ

- আন্টি, প্রণামে যদি কাঁচের মগ ভেঙ্গে যায় তাহলে লোকের শত প্রণামে মা দুর্গার বিগ্রহ ভেঙ্গে খান্‌ খান্‌ হয়ে খসে পড়ত। কিন্তু বাস্তবে সেরকমটি তো কোন সময় হয়না।

- এই মেয়ে তুমি কি ওকালতি পড়?

আলভির মা জয়ন্তীকে প্রশ্ন করে।

- না আন্টি, আমি আলভির সাথে পদার্থ বিজ্ঞান পড়ি।

জয়ন্তী আলভির মায়ের পাশ কাটিয়ে হন্‌ হন্‌ করে আলভিদের বাসায় ঢুকে পড়ে। এরপর সে সোজা গিয়ে ঢোকে আলভির রুমে।



আলভির মা মেয়েটির আলভির ঘরে ঢোকার পথের দিকে নিস্পলক দৃষ্টিতে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকে।

তারপর রাগে নিজেকে বলেঃ

- এই অপদার্থ মেয়েগুলো কিভাবে যে পদার্থ বিদ্যা পড়ে তা আমি বুঝে উঠতে পারিনা।

আলভির মা ফুঁসতে ফুঁসতে বাইরে চলে যায়।



এঘটনারও বেশ কয়েক দিন পরের কথা।

হঠাৎ এক বিকেলে একটি মেয়ে হাতে রজনী গন্ধা ষ্টিকের মোটা একটি তোড়া নিয়ে দরজায় এসে হাজির।

সেটা দেখে আলভির মায়ের বুক ছেৎ করে জ্বলে উঠে। তার ব্রিলিয়ান্ট ছেলেটিকে এই রাক্ষুসি মেয়েগুলো খেয়ে ফেলবে। তার ধৈর্য্য একেবারে সীমা অতিক্রম করে যায়।

সে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে প্রায় চিৎকার করে বলেঃ

- আস আস, ভিতরে আস। হেরেমের দরজা খোলাই আছে।

মেয়েটিকে দেখতে প্রথমে একটু বোকা বোকাই মনে হয় আলভির মায়ের কাছে।

কিন্তু এক সেকেন্ডেরও মনে হয় কম সময়ের মধ্যে মেয়েটির মাথায় এই ‘হেরেম’ শব্দটি হিট করলো এবং এরই মধ্যে সে একটি উত্তর তৈরী করে আলভির মাকে ফেরত দিল।



- আন্টি, হারাম হালালের দরজা বুঝিনা, আজকে আলভির জন্ম দিন। সে আমার ক্লাসের বন্ধু। তাকে কি এক তোড়া ফুল উপহার না দিয়ে পারা যায়?

সে আরো বলতে থাকেঃ

- আচ্ছা বলুন না আন্টি, এই দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বললে অপনার আলভিকে আমি শুভেচ্ছা জানাব কি করে?

আপনি তার রুমটা আমাকে দেখিয়ে দিলেইত তার হারামের দরজাটি আমি চিনে নিতে পারি।

-এই মেয়ে তুমিত দেখছি বেশ চালাক। আমি বলি কি আর তুমি বল কি।

আলভির মা মেয়েটিকে তখন পর্যন্ত দরজায় আটকিয়ে রাখে।

- এই দেখুন আন্টি, আমিত বলতেই ভুলে গেছি। পথে আসবার সময় আপনাদের বাসার মাত্র শ’খানেক গজ দূরে দু’জন বখাটে ছেলে আমার পিছু নিয়েছিল।

তাদের এক জন বললো, এই মেয়ে তুমি কোথায় যাবে?

আলভির মায়ের চোখ কিছুটা কপালে উঠে।

সে মেয়েটিকে বলেঃ

-তারপর?

মেয়েটি বলেঃ

- তারপর আরকি, আমি আপনাদের বাসার কথা না বলে বললাম সামনেই আমার এক আত্মিয়ের বাসায় যাব।

- তারপর, তারপর?

আলভির মায়ের চোখ এবার কপাল ফুঁড়ে উপরে উঠে যাচ্ছে।

- তাদের এক জন বললো, মাইয়া তুমি রিক্সা থাইকা নাইমা আস।

সর্বনাশ! আলভির মা কপালে হাত ঠেকায়।

তারপর সে খুব বিচলিত সুরে বলেঃ

-এর পর তুমি কি করলে?

-আমি আর কি করব আন্টি।

মেয়েটি খুব নিরাসক্তভাবে উত্তর দেয়।

- এরপরে তারা তোমায় এমনি এমনি আসতে দিল?

- দিল তবে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে আসতে হলো।

- সেটা আবার কেমন?

আলভির মায়ের আর ত্বর সইছেনা মেয়েটির উত্তর শোনার জন্য।

মেয়েটি বলেঃ

- রিক্সা থেকে নামতে নামতে আমি তাদের উল্টো দিকে হাত তুলে দেখিয়ে বললাম, ঐতো রবিন ভাই এসে গেছে।

তারা দু’জনেই তখন তাদের চোখ সেদিকে ফেরালো। আর আমিও ভোঁ দৌড়ে এখানে চলে এলাম।

এবার আলভির মা অধৈর্য্য হয়ে মেয়েটিকে বলেঃ

- আর এখানে এসে তুমি আমার সাথে গল্প জুড়ে দিলে, তাইনা?



আলভির মা রেগে হঠাৎ মেয়েটির হাত ধরে তাকে টেনে বাসার ভিতর নিয়ে আসে।

তারপর হুটহাট করে দরজা বন্ধ করে দেয়।

আলভির মায়ের যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে।

সে এবার নিজে থেকেই বলেঃ

- যাও যাও জলদি করে আলভির রুমে যাও। ঐ যে সামনে তার রুম। তাকে গিয়ে সব কথা বল।



মেয়েটি ফুলের তোড়া নিয়ে সোজা আলভির রুমে ঢুকে পড়ে।



সেই মেয়েটি কতক্ষণ পরে চলে গেল। এর মাত্র কয়েক মিনিট পর রুম থেকে বেরিয়ে এল আলভি। সে বেশ ফিটফাট। মুখে হাসি হাসি ভাব। তার গায়ে ক্রোকোডাইলের শার্ট। ছাই কালার জিনসের প্যান্ট। চওড়া বেল্ট। হাতের রিষ্টে সিলভার কালারের চেইন ঝুলঝুল করছে। কিছু দিন আগে থেকেই সে ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি রাখা শুরু করেছে। রুশ কমিউনিষ্ট পার্টির এক কালের মেগা কমরেড লেলিনের দাড়ির আদলটাই নাকি এই ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ির মুল উৎস।



আলভির মা আলভির মাথা থেকে পা পর্যন্ত কয়েকবার পর্যবেক্ষণ শেষে বলেঃ

- কিরে, এমন ধোপ দুরস্ত কাপড় চোপড় লাগিয়ে কোথায় চললি। একটু আগে যে মেয়েটি এসেছিল তাকে সঙ্গ দিতে?

- না মাম, আমিতো যাচ্ছি ‘বাকারু’ রেষ্টুরেন্টে আমার বন্ধুদের দেয়া আমার বার্থ ডে পার্টিতে এ্যাটেন্ড করতে।

আলভি তার মাকে এসব বলতে বলতে বাসার মেইন দরজার দিকে এগিয়ে যায়।

আলভির মা প্রায় চিৎকার দিয়ে বলে উঠেঃ

- মায় গড! আমি তো তোর জন্ম দিনের কথা ভুলেই বসে আছি। একটু আগে যে মেয়েটি তোর কাছে এসেছিল সে তোর বার্থ ডে তে ফুল দিতে আসার কথা বলেছিল বটে। তবে তাকে নিয়ে মহল্লার বখাটেরা যে ঝামেলা করেছিল তার টেনশনে আমি তোর জন্ম দিনের কথা ভুলেই গেছি।



আলভি চলেই যাচ্ছিল।

হঠাৎ করে তার মা পিছন থেকে বলে উঠেঃ

- এই দাঁড়া দাঁড়া, যে মেয়েটি এসেছিল তাকে তুই একা যেতে দিলি কেন?

যদি সেই বখাটেগুলো আবার তার পথ আগলায় কিংবা......



- ওহ্‌ মাম, যাবার সময় তুমি যে কী সব প্যাঁচাল শুরু করলে।

আলভি বেশ বিরক্তি প্রকাশ করে।

- এই দাঁড়ৈশ কোথাকার। এটাকে তুই প্যাঁচাল বলছিস কেন?

আসার সময়েই না মেয়েটির বিপদ গেলো। তাহলে তুই এটাকে প্যাঁচাল বলছিস কি করে?

আলভির মা কিছুটা রাগান্বিত হয়ে বলে।

আলভি এবার জোরে হো হো করে হেসে উঠে।

- মাম, তুমি এত শিক্ষিতা কিন্তু মাঝে মাঝে এমন সব গ্রাম্য ভাষা বল না, যা শুনলে আমি হাসি চেপে রাখতে পারিনা। মেয়েটির কি হবে তার উত্তর আমি তোমাকে পরে দেব। কিন্তু তার আগে তুমি বল, এই ‘দাঁড়ৈশ’ শব্দের মানে কি?

- এইত এইত, তুই আমার সব কথা ধরে বসে থাকিস।

এ শব্দটির মানে কি তা আমিও কি কখনো ভেবে দেখেছি। তবে আমার মনে হয় দাঁড়া যোগ মহিষ এমন কিছুর সন্ধিবিচ্ছেদ হতে পারে। এমনও হতে পারে লোকে জেনে কিংবা না জেনে সন্ধিবিচ্ছেদ ছাড়াই দঁড়ানো মহীষকে ‘দাঁড়ৈশ’ বানিয়ে নিয়েছে।



আলভি তার মায়ের কথা শেষ না হওয়ার আগেই লাফিয়ে উঠে বলেঃ

- মাওলা তুমি রহম কর। আমাকে তুমি মানুষ করে দুনিয়াতে পাঠালে। আর আমার মাম আমাকে একটা কিম্ভুতকার জন্তু বানিয়ে ফেললো।

কী সাংঘাতিক ব্যাপার! এই আমি এখন শিং দিয়ে মানুষ হাঁকাতে হাঁকাতে বের হয়ে পড়লাম।

আলভি জোরে পা হাঁকিয়ে দরজা পর্যন্ত চলে যায়।

অমনি আলভির মা বলেঃ

- এ্যাই, দাঁড়া দাঁড়া। ট্রিকস্‌ করে কেটে পড়লে চলবেনা। আমার প্রশ্নের জবাব দিয়েই তবে তুই এখান থেকে যেতে পারবি।

আলভির মা আলভির পিছন পিছন প্রায় তেড়ে আসে।



আলভি ততোক্ষণে দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে গেছে। তবে তার হাত তখনও চৌকাঠ ছুঁয়ে আছে।

সে তার মাকে হাত নেড়ে বলেঃ

- মাম, সামনেই তো বিশ্ব মা দিবস। সেদিনই না হয় তোমাকে সব বলি?

আলভি দ্রুত কেটে পড়ে।

কিন্তু আলভির মায়ের মনটা মেয়েটির বিপদের কথা ভেবে বেশ খারাপ হয়ে যায়। যদি আবারো তার কোন অসুবিধা হয়ে পড়ে তাহলে কী হবে?



হঠাতই মোবইল ফোনটা বেজে উঠে।

আলভির মা দৌড়ে পিছনের দিকে এসে তার মোবাইল কল রিসিভ করে।

কিন্তু সে দেখতে পায় মোবাইলে আলভির নাম ভেসে উঠেছে।

ব্যাপার কি?

এইনা সে বেরিয়ে গেল। তাহলে আবার ফোন কিসের জন্য?

আলভির মা কলটি রিসিভ করতেই আলভি ওদিক থেকে বলেঃ

- মাম তুমি এত উদ্বিগ্ন হচ্ছ কেন। তোমার সেই মেয়েটি আমার অন্যান্য বন্ধুদের নিয়ে বাকারুতেই আড্ডা দিচ্ছে।

একথা শুনে আলভির মা হাঁ হয়ে যায়।

- তবেরে বাঁদর, তুই কি আগে থেকেই জানতিস মেয়েটির কোন বিপদ হবেনা?

কিন্তু আলভির দিক থেকে সেধরনের কোন উত্তর নেই।

সে তার গলায় অত্যন্ত আদর ছড়িয়ে বলেঃ

- মাম। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।

-থাক তোকে আর আদিখ্যেতা দেখাতে হবেনা। তুই এখন কি বলতে চাস বল।

আলভির মা তার কন্ঠে কৃত্রিম রাগ মিশিয়ে বলে।

- মাই সুইট মাম, মেয়েটির আসলে কি হয়েছিল তা তোমাকে সে দিনই বলি?

আলভি মোবাইলে ফিস ফিস করে বলে।

- সেটা আবার কোন দিন?

আলভির মা আলভিকে উল্টো জিজ্ঞাসা করে।

- কেন তোমাকে না খানিক আগেই বিশ্ব মা দিবসের কথা বললাম।

আলভি এটা বলতেই তার মা বলেঃ

- ও হ্যাঁ, তাইতো।

কিন্তু ঘটা করে সে দিনই কেন সব কিছু বলতে......



আলভি তার মোবাইল ফোনটি অফ করে দেয়।



কয়েক দিন পার হয়েছে। হঠাৎ এক বিকেলে আলভি এক ঝাঁক বন্ধুকে নিয়ে তার রুমে ঢুকে।

তারপর বন্ধুদেরকে রেখে সে হাতে একটা আইসক্রিমের বক্স নিয়ে তার মায়ের কাছে আসে।

সে সোজা তার মাকে বলেঃ

- মাম এই নাও তোমার জন্য আইসক্রিমের বক্স এনেছি।

- কেন হঠাৎ করে তুই আবার আমার জন্য আইসক্রিম আনতে গেলি কেন?

আলভির মা আলভিকে জিজ্ঞাসা করে।

- কারণ আমার বন্ধুদেরকে দেখলেই তোমার গলা শুকিয়ে উঠে। তাই ভাবলাম তোমার শুকনা গলাকে ঠান্ডা করার জন্য আইসক্রিম নিয়ে গেলে বেশ ভাল হবে। ব্যাস, নিয়ে এলাম।

আলভি এসব বলতে বলতে আইসক্রিমের বক্সটি তার মায়ের হাতে দেয়।

- কিন্তু আমার যে এখন তেষ্টাও নেই, গলাও শুকনা নেই?

আলভির মা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আলভির দিকে তাকায়।

- মাম তাহলে অন্য সময় কেন আমার বন্ধুদের দেখলে তোমার তেষ্টা পায়?

আলভি তার মাকে সোজাসুজি প্রশ্ন করে।

- এই হয়েছে এক জ্বালা, তোর সব প্রশ্নের উত্তরই কি তোকে দিতে হবে নাকি?

এখন তোর রুম ভর্তি বন্ধু। তুই তাদের সাথে এখন কথা বলবি নাকি আমাকে নিয়ে এখানে বক বক করে যাবি। যা ভাগ। এখন রুমে গিয়ে বন্ধুদের সাথে কথা বলগে যা। পরে সব কথা হবে।

আলভির মা এক রকম জোর করে আলভিকে তার রুমের দিকে পাঠিয়ে দেয়।



২০১৪ সালের ১১ ই মে। বিশ্ব মা দিবস।

আজকে সারা দিন আলভি তার মাকে ছেড়ে কোত্থাও বের হয়নি। কেবল সন্ধ্যার সময় অল্প সময়ের জন্য বাইরে গিয়ে তার মায়ের জন্য একটি গিফট্‌ প্যাক কিনে আনে। তার বাবা নেই। ভাই বোনও নেই। এজন্য তার মা-ই তার কাছে সব।



রাতের খাবার টেবিলে বসে আলভির মা-ই প্রথম আলভিকে জিজ্ঞাসা করেঃ

- হ্যাঁরে আলভি, তুই আমাকে বলত তোর কাছে সব সময় মেয়ে বন্ধুরাই বেশি আসে কেন?

- ও হ্যাঁ হ্যাঁ মাম, তুমিতো ভাল কথা মনে করেছ।

আলভি যেন তার মাকে কি সব বলার জন্য আগে থেকেই প্রস'ত হয়ে আছে।

সে তার মায়ের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সোজা সে তার মাকে প্রশ্ন করেঃ

- মাম, তুমিই আগে বলনা, আমার মেয়ে বন্ধুদের দেখলে তোমার এমন তেষ্টা পায় কেন? আর সব পানিই বা তোমার কাছে বিস্বাদ ঠেকে কেন? তাছাড়া তোমার হাত থেকে সময়ে অসময়ে এমন কাঁচের বাসনই বা পড়ে ভাঙ্গে কেন?

আলভি তার মাকে এক সঙ্গে তিনটি প্রশ্ন করে বসে।

আলভির মা এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাবার জন্য বলেঃ

- ছেলের কথা শোন। এসব কোন প্রশ্ন হলো। তোর মামের কি কোন সময় তেষ্টা পেতে পারেনা?

আর পানি বিস্বাদ হলে তাকে কি বিস্বাদ বলা যাবেনা?

এরপর কাঁচের বাসন ভাঙ্গার কথা বলছিস?

সেটাত হাত ফসকিয়ে যে কোন সময় ভাঙ্গতেই পারে।

তাহলে বল, এসব নিয়ে তোর মাথায় এত প্রশ্ন আসছে কেন?

আলভির মা আলভির মতই এত সব কথা এক সঙ্গে বলে তারপর থামে।



আলভি এবার মওকা পেয়ে যায়।

সে বলেঃ

- মাম, আমি খেয়াল করেছি এত দিন তুমি আমার মেয়ে বন্ধুদেরকে দেখলেই তোমার তেষ্টা পায় এবং আরো কি কি সব ঘটতে থাকে। কিন' গত কয়েক দিন আগে তোমার এই তেষ্টা রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য আমি আমার ছেলে বন্ধুদের এখানে নিয়ে আসি। তখন তো কই তোমার তেস্টা পায়নি। এমনকি আইসক্রিম দিয়ে তোমার গলাটাকেও তুমি ঠান্ডা করতে চাওনি।

তাহলে তুমিই বল.....

আলভির মা আলভিকে থামিয়ে দিয়ে বলেঃ

- থাক তোমাকে আর পাকামি করতে হবেনা। লোখা পড়া বাদ দিয়ে তুমি তাহলে এখন মায়ের এসবই খেয়াল করে বেড়াও, তাইনা?

কিন্তু আলভি দমবার পাত্র নয়।

সে বলেঃ

- বলনা মাম তুমি এসব কেন কর?

আলভি তার কথাতেই লেগে থাকে।

আলভির মা কি যেন একটু চিন্তা করে।

তারপর আলভিকে উল্টো জিজ্ঞাসা করেঃ

- তাহলে তুই-ই বল, কেবল মেয়ে বন্ধুরাই কেন তোর কাছে আসে, ছেলেরা আসেনা কেন?

আলভি বলেঃ

- মাম, তুমি তো ইউনিভারসিটিতে সাইকলোজির প্রফেসার। তুমি সবার সাইকলোজি বোঝ।

কিন্তু কিছু কিছু বিষয়ে.....

- এই দ্যাখ, এই দ্যাখ, ছেলে এখন আমাকে পড়াতে শুরু করেছে।

আলভির মা আলভিকে হঠাৎ কাছে টেনে নিয়ে তার গালে এবং কপালে চুমু খায়।

-এটা কি হল মাম?

- এটা হলো গিয়ে তোমাকে মা দিবসের পাল্টা উপহার।

আলভির মা হাসতে হাসতে বলে।

- থ্যাঙ্ক ইউ মাম।

কিন্তু মাম.....

-বলনা কি বলবি?

আলভির মা জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে আলভির দিকে তাকায়।

- মাম, আমার কাছে কেন শুধু মেয়ে বন্ধুরাই আসে তা আমি তোমাকে আমার সাবজেক্টের মাধ্যমে উত্তর দেব বলে ভাবছি।

- সেটা কেমন?

- সেটা হচ্ছে আমার সাবজেক্টের কোন একটা জিনিষের সঙ্গার মাধ্যমেই উত্তরটা আমি তোমাকে দেব ।

- মানে তোর পদার্থ বিজ্ঞানের সঙ্গায়?

আলভির মা যেন ভয় পেয়ে যায়।

- হ্যাঁ মাম, পদার্থ বিজ্ঞানের সঙ্গায়।

আলভির মা তার দু’চোখের ভ্রু কুচকে বলেঃ

- কিন্তু পদার্থ বিজ্ঞান যে শক্ত সাবজেক্ট তা কি আমি বুঝে উঠতে পারব?

-অবশ্যই পারবে মাম। আমি বুঝিয়ে দিলে তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারবে।

আলভি তার মাকে ঝটপট আশ্বস্ত করে।



আলভি এবার শুরু করেঃ

মাম, পরমানু বা এটম হচ্ছে কোন পদার্থের সূক্ষতম অংশ যাকে আর অধিক ছোট করে ভাঙ্গা সম্ভব নয়। কিন' এটি রাসায়নিক ক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। এটির ওজন মুলত এর কেন্দ্রে ঘনিভূত থাকে যাকে বলা হয় নিউক্লিয়াস। এই নিউক্লিয়াসে থাকে পজিটিভ চার্জ। আর এর বাইরে থাকে ইলেকট্রনের নেগেটিভ চার্জ। এই নেগেটিভ এবং পজিটিভ চার্জই একটি এটমের মধ্যে শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখে চলে।



এরপর আলভি তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেঃ

- মাম, তুমি এপর্যন্ত বুঝেছ?

আলভির মা কেমন যেন ঘোলা চোখে আলভির দিকে তাকিয়ে বলেঃ

-বুঝলাম, তবে হাল্কা হাল্কা।

কিন্তু হ্যাঁরে, এই পজিটিভ নেগেভি দিয়ে তুই আমাকে কি বুঝাতে চাচ্ছিস?

এর উত্তরে আলভি বেশ পন্ডিতের মত ভাব করে বলেঃ

- আহ্‌, তুমি বুঝতে পারছনা কেন মাম, এই পজিটিভ এবং নেগেটিভ চার্জ আছে বলেই এটমটির মধ্যে শক্তির ভারসাম্য বজায় রয়েছে।

আলভির মা আবারো নিরাসক্তভাবে বলেঃ

- তা না হয় আছে, কিন্তু মানুষের জীবনে এর প্রভাবটা কি তা বলবিত?

আলভি কেমন যেন অধৈর্য্য হয়ে বলেঃ

- এইত মাম, আমি তোমাকে যা বোঝাতে চেয়েছি তুমি তা এখনও বুঝলেনা।

এসময় আলভির মাম আবার আলভির কথার রেশ ধরে বলেঃ

- কী বুঝলামনারে বাবা?

আলভি নিজের মুখের উপর আরেক ডিগ্রি পান্ডিত্য ছড়িয়ে বলেঃ

- মাম, এই যে মানুষ তার মধ্যে ছেলেরা হচ্ছে পজেটিভ চার্জের মত এবং মেয়েরা হচ্ছে নেগেটিভ চার্জের মত। এ জিনিষটি তোমাকে অবশ্যই বুঝতে হবে।

আলভির মা আলভির জটিল সব কথা গিলতে গিলতে সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করেঃ

- তো?

আলভি ত্বরিত উত্তর দেয়ঃ

- এই জন্যই মেয়েরা....

আলভির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তার মা বলেঃ

- মেয়েরা ছেলেদের পিছনে ঘুরে এইত?

এবং এখন এই মেয়েগুলোও তোর পিছনে একারনে ঘুর ঘুর করছে, এটাই তা বোঝাতে চাচ্ছিস?

আলভির মা ছিপি খোলা বোতলের মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানির ন্যায় কথাগুলো এক সঙ্গে বলে থামে।

আলভি খুব পুলকিত হয়।

সে বলেঃ

- এইত মাম, এবার তোমার মাথা সত্যিই খুলে গেছে। তোমার এই পরিচ্ছন্ন উপলদ্ধির জন্য তোমাকে এখন একশ’তে একশ’ মার্ক দেয়া যেতে পারে।

একথা শুনে আলভির মা বলেঃ

- তুই আরেকটা কথা শুনে রাখ বাবা, ওরা আসে বলেই আমার কেবল তেষ্টা পায়।



হঠাৎ আলভি তার মায়ের দু’গালে দু’ট চুমু দিয়ে বসে।

তারপর সে বলেঃ

- মাম তাহলে তুমিও শুনে রাখ, তোমার ছেলে পদার্থ বিজ্ঞানে পড়ে। তোমার তেষ্টা পাক এমন কোন অপদার্থ কাজ সে কোন দিন করবেনা।



এবার কথার মধ্যে একটু ছেদ পড়ে।

একটু পরে আলভির মা বলেঃ

- কিন্তু হ্যাঁরে আলভি?

আলভির মা আলভির দিকে প্রশ্নবোধক তাকায় কিন' কিছু বলেনা।

- কি হয়েছে মাম, কিছু জানতে চাও?

আলভি তার মায়ের দিকে চেয়ে বলে।

- না মানে, সেই যে মেয়েটি রজনীগন্ধা ফুলের তোড়া নিয়ে তোর এখানে এল, সে আবার নিরাপদে বাকারু রেষ্টুরেন্টে ফিরে গেল কিভাবে সেটাইত আমি ভাবছি।

আলভি এবার হো হো করে হেসে উঠে বলেঃ

- ও-ও-ও এই কথা।

আমি তো ভাবছি তুমি আবার নতুন কোন সমস্যার কথা হাজির করবে।

আলভি যেন ঐ কতাটাকে পাত্তাই দিতে চায়না।

কিন্তু আলভির মা সেই আগের কথার রেশ ধরে থেকে বলেঃ

- না, আমি নতুন কোন সমস্যার কথা বলছিনা। তবে সেই মেয়েটির নিরাপত্তা নিয়েই আমি ভাবছি।

আলভির মা আলভির কাছে তার উদ্বিগ্নতা আবারো প্রকাশ করে।

- কিন্তু মাম, তোমাকে ওসব নিয়ে আর ভাবতে হবেনা। ওটা তুমি আমার উপরই ছেড়ে দাও না।

আলভি তার মাকে আস্বস্ত করার চেষ্টা করে।

কিন' এর পরেও আলভির মা উদ্বিগ্ন হয়ে বলেঃ

- কিন্তু হ্যাঁরে, অমন পরীর মত সুন্দর মেয়েটি, যাকে বখাটে ছেলেরা ফলো করেছিল, সে অত সহজে আবার তোদের সাথে মিলিত হলো কিভাবে?

আলভির মায়ের উদ্বিগ্নতা যেন কাটেইনা।

- এইত মাম, এই বিশ্ব মা দিবসে তুমি আমাকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিলে।

আলভি হাসতে হাসতে বলে।

- সেটা কিরকম?

আলভির মা আলভির দিকে নিবিড়ভাবে তাকায়।

- তাহলে তার বিপদটা কিরকম সেটা এখন তোমাকে আমার খুলেই বলতে হয়।

আলভি এটুকু বলতেই তার মা বলেঃ

- বেশত, তুই সব কিছু খুলেই বল না আমাকে। সব কিছু খুলে না বললে আমি সবটা বুঝব কিভাবে।



আলভি তার ঘাড়ের পিছন দিকটা চুলকাতে চুলকাতে বলেঃ

- মাম, সেটি ছিল তোমার কাছে ঐ মেয়েটির একটি নাটক।

আলভির মায়ের চোখ কপালে উঠে যায়।

সে বলেঃ

- না-ট-ক? সেটি কিরকম নাটক?

আলভি আমতা আমতা করে বলেঃ

-মাম, ধরনা সেটি ছিল একটি জল পরীর মিথ্যে জলে নামার নাটক।

আলভির মা এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলেঃ

- বাবা, এই দিনেও কি তুই আমার সাথে হেঁয়ালি করে কথা বলবি?

আলভি দাঁত দিয়ে তার জিভ কাটে। মা দিবসের কথাটা সে ইতোমধ্যে ভুলেই গিয়েছিল।

সে তাড়াতাড়ি বলেঃ

- মাম, সেদিনের সেই মেয়েটির বিপদে পড়ার পুরো ঘটনাটিই ছিল সাজানো। সে সোজাসুজি ফুল নিয়ে বাসায় ঢুকলে তোমার যদি আবার তেষ্টা পায়। তাই এই নাটকের ব্যবস্থা নাহলে তুমি কি আর তাকে অত সহজে তার হাত ধরে দরজার মধ্যে তাড়াতাড়ি ঢুকিয়ে নিতে।



সব কিছু শুনে আলভির মা একেবারে থ’ মেরে যায়। সে কয়েক সেকেন্ড আলভির দিকে নিস্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।

তারপর বলেঃ

- দাঁড়া আমি যদি আবারো সেই মেয়েটিকে পাই তাহলে.......



আলভি তার মায়ের হাত দু’টকে খপ করে ধরে ফেলে বলেঃ

- মাম, আমি তার হয়ে তোমার কাছে ক্ষমা......



হঠাৎ এক সেকেন্ডের মধ্যে সব হিসেব নিকেশ পাল্টিয়ে যায়।



আলভির মা বলে উঠেঃ

- কিন্তু আর যাইহোক, মেয়েটি এক্কেবারে প্রিন্সেস ডায়ানার মত সুন্দর, তাই নারে?

তা, হ্যাঁরে মেয়েটির নাম কী বলত?

আলভির মা এবার তার কথার ভোল পাল্টিয়ে আলভিকে প্রশ্ন করে।

-ওর নাম হচ্ছে ‘জ্যোতির জলধারা’।

আলভি হেঁয়ালি করে তার মামকে বলে।

সেই সঙ্গে সে আরো বলেঃ

- নামটি কেমন যেন ব্যাক ডেটেড, তাইনা মাম?

আলভির মা চোখ বড় করে আলভির দিকে তাকিয়ে বলেঃ

- আবারো তুই আমার সাথে হেঁয়ালি করছিস?

জ্যোতির জলধারা এটি আবার কেমন নাম?

আর সেটি ব্যাক ডেটেড না আপডেটেড সে কথায় আমি পরে আসছি।

আগে তুই বল, এধরনের নাম কিভাবে হতে পারে?

আলভি হাসতে হাসতে বলেঃ

- মাম, জ্যোতি হচ্ছে ‘নূর’। আর জলধারা হচ্ছে ‘নহর’। এদু’টকে তুমি একতত্র করেই দেখনা, দু’ট মিলে কী হয়।

- এইত, এইত হলো গিয়ে তোর এক দোষ। তুই সোজা করে কোন কিছু বলতে পারিসনা।

আলভির মা আলভির উপর কৃত্রিম রাগান্বিত হয়।

কিন্তু তারপর সে নিজে নিজেই বলতে থাকেঃ

- নূর নহর, নূর নহর, নূর প্লাস নহর, নূর প্লাস নহর....... হ্যাঁ পেয়ে গেছি।

নিশ্চয় মেয়েটির নাম নূরুন্নাহার?

আলভির মা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আলভির দিকে তাকায়।

আলভি এবার তার ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলটি তার মায়ের দিকে তুলে ধরে খুশিতে বলে উঠেঃ

-ইয়ে-স-স-স মাম। ইউ আর হান্ড্রেড পারসেন্ট কারেক্ট।

কিন্তু মাম, আমি তোমাকে অবারো বলছি তার নামটি খুব ব্যাকডেটেড, তাইনা?

আলভির মা নূরুন্নাহার নামটি আবিস্কারের আবেগ তখন পর্যন্ত তার নিজের মুখের উপর ধরে রাখতে রাখতে বলেঃ

- কিন্তু তুই কি ভুলে গেছিস বাবা ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’?

এমন পরীর মত মেয়েইত আমার.....



সেকেন্ডের মধ্যে আলভির বুকের রক্ত মাথায় আর মাথার রক্ত বুকে আনন্দের আতিশায্যে ডিগবাজি খেলে যায় ।

সে তার মায়ের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলেঃ

- বেশ পছন্দ, তাইনা মাম?



আলভির মা কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সন্মতি সূচক মাথা নাড়ায়।

হঠাৎ আলভি খুশিতে লাফ দিয়ে তার মামকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ডাইনিং টেবিলের পাশে কয়েক রাউন্ড ঘুরে নেয়। এসময় আলভির মা আলভিকে তার কাছ থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলেঃ

- এ্যাই, হচ্ছেটা কি, বলি হচ্ছেটা কি?

আলভির আবেগ তখনও থামেনি। সে তার মাকে বুকে জড়িয়ে আরেক রাউন্ড ঘুরতে গিয়ে ডাইনিং টেবিলের সাথে দড়াম করে বাড়ি খায়। সাথে সাথে ডাইনিং টেবিলে থাকা কয়েকটি গ্লাস ষ্ট্যান্ডসহ মাটিতে পড়ে ভেঙ্গে যায়।

এবার আলভির মা তার ছেলের দিকে ডান হাতের মুষ্ঠি তুলে ধরে তেড়ে আসতে আসতে বলেঃ

- তবেরে বাঁদর, দাঁড়া তুই একটু দাঁড়া।

সেই মেয়ের কথা শুনে তোর বুঝি.......

ওদিকে তখন আলভি তার রুমের দিকে ছুটে পালাচ্ছে।

দৌড়ানোর মধ্যেই সে বলেঃ

- মাম, তুমি কিন্তু নূরুন্নাহারকে পছন্দ করে ফেলেছ। তুমি আর তাকে না করতে......

আলভির মা কিল তুলে তখন প্রায় আলভির কাছাকাছি এসে পড়েছে।



আলভি দড়াম শব্দে তার রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়।





-শেষ-















মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.