| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
চন্দ্রমানব
ইতিহাসের গলির মোড় বাঁকা না সোজা সেটি একটি তর্কের বিষয়। যেমন তর্কের আরেকটি বিষয় হচ্ছে মানুষের মনের গলি মোড়। বিদগ্ধ প্রেমিকজনেরা হৃদয়ের অন্দরে লুকিয়ে থাকা মনের অন্দর মহলকে সব সময় গলি মোড় বলেই ভাবেন। বিষয়টিতে পর্যবেক্ষণ করে যে ফল পাওয়া গিয়েছে তাতে দেখা গিয়েছে নারীদের হৃদয়ে মোড়ের সংখ্যা নাকি বেশি। তবে ইতিহাসের গলির মোড় অবশ্য ভিন্ন কায়দার একটি জিনিষ।
ইতিহাস বলে, মানুষ নাকি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। আর এই জন্যই নাকি সে ইতিহাসে নোংগর ফেলে আটকিয়ে থাকতে পারেনা। তবে কেউ কেউ বেশ রমরমাভাবে ইতিহাসের পাতার মধ্যে সস্থন করে নেয়। অর্থাৎ ইতিহাসের যে গলি মোড়ের কথা দিয়ে আমরা আরাম্ভ করেছিলাম, সেই গলির মোড়েই পাকাপোক্তভাবে আটকিয়ে থাকে বেশ কিছু লোক। তা তারা ভাল কাজের জন্যই বিখ্যাত হোক, আর মন্দ কাজের জন্যই বিখ্যাত হোক। নিজেদের কাজের জন্য তাঁরা ইতিহাসের গলি মোড়কে লেপটে-সেপটে থাকে দারুনভাবে ।
তো, মধ্যযুগের ইতিহাসের গলি মোড়ে যেসব জলদস্যু আটকিয়ে আছে তাদের নাম মনে আছেত ? আসুন তবে স্মৃতির খাতাটাকে কম্পিউটারের বর্তমান ভাষায় একটু “আপডেট” করা যাক। মনে পড়ে হাওয়ার্ড, হকিনস্, ড্রেক এবং ফ্রোবিসারদের কথা ? এরা সবাই ছিল নামকরা ইংরেজ জলদস্যু। সমুদ্রে অন্য দেশের জাহাজ লুন্ঠন, বিভিন্ন দেশের সমুদ্র বন্দরে ঢুকে পড়ে লুটপাট আর ধ্বংসলীলা চালানো, আফ্রিকা মহাদেশ থেকে কাল মানুষদের ধরে এনে আমেরিকার স্প্যানিশ অধ্যুষিত এলাকায় দাস ব্যাবসা চালানো, উপকুলের কাছাকাছি এলাকায় স্বর্ণ খনি থেকে স্বর্ণ এবং অন্যান্য মূল্যবান মালপত্র বহনকারী ট্রেনে হামলা চালানো, অন্য দেশের উপনিবেশে অনধিকার প্রবেশ করা ইত্যাদি ছিল তাদের নিত্য দিনের কাজ।
হ্যাঁ, এই সব জলদস্যুদের কথাই বলছি। এক দিন এরাই ইতিহাসের গলির মোড়ে নোংগর ফেলে নিজেদের জায়গা করে নিল। কিন্তু কিভাবে ? ইতিহাস কি জলদস্যুদের কুকর্মের স্বাক্ষী হতে পারে। ব্যাপারটি ভাবলে হয়ত এমনই মনে হতে পারে। কিন্তু সব প্রশ্ন আর উত্তরকে পাশে ঠেলে ইতিহাস বইয়ের পাতায় চোখ বুলালে এসব জলদস্যুদের জীবন কাহিনী তো বটেই, এদের প্রশংসার ছাড়পত্র এবং রাজ-রাজুড়াদের ন্যায় ছবিও দেখা যাবে বহাল তবিয়তে।
তাহলে একটু খুলেই বলা যাক। পনের শতকের দিকে ইউরোপের প্রায় সব দেশ ছিল উপনিবেশবাদের আঁতুড় ঘর। ঐ সময়ের দিকে এসব দেশ থেকে বেশ কিছু নাবিক পৃথিবীর অধিকাংশ সাগরময় সহচরদের নিয়ে ঘুরে বেড়াত আর ঐ যে উল্লেখ করেছি যতসব কুকর্মের কথা, তার সবগুলোই তারা করে বেড়াত। আর বিভিন্ন উইরোপিয়ান দেশ তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করত। দেশগুলোর মধ্যে আবার ইংল্যান্ড, স্পেইন, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক এরাই ছিল মুরুব্বির স্থানে।
কিন্তু সাগরের জল কি শুধুই এক রঙ্গা পানি ? না, তা মোটেই নয়। কোথাও নিল, কোথাও ঘোলাটে কোথাও বা সফেদ ফেনাযুক্ত। তাহলে সাগরের এসব জলদস্যুরাই বা এক আদম পরিবারের হবে কেন। তারা যে দেশের নাবিক, সে দেশের আদলে ছিল তাদের কায়কারবার। আর নিজ দেশের ঘন্টা নিজেদের মত করে বাজাতে কে বা কারা না চায়। এসব কারণে তাদের মধ্যে নৌযুদ্ধ প্রা-ই লেগে থাকত। আর শেষে পানির এই যুদ্ধ চলে আসত স'লভাগেও। জল দস্যুদের নিজ দেশের সম্রাট-সম্রাজ্ঞীরাও আবার এ সব নিয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়িয়ে পড়ত।
তো, নিজেদের বর্ণ পাল্টাতে এসব জল দস্যু আর কি কি করত ? বলাই বাহুল্য আমাদের দেশের কালো তালিকার কোন কোন লোক যেমন এক সময় বর্ণ পাল্টানোর জন্য কমিশনার, চেয়ারম্যান, মেম্বার ইত্যাদি হবার খায়েসে ভোটের মাধ্যমে সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভ করে, ঐ যে বলা হয়েছিল ঐসব জলদস্যুর কথা, তারাও এক সময় বিভিন্ন নামে বানিজ্যিক কোম্পানি খুলে বসলো এবং কোম্পানির ট্রেড নামগুলো সরকারিভাবে অনুমোদন করিয়ে নিলো। ইংল্যান্ডের এসব কোম্পানির মধ্যে ছিল (১) ল্যাভেন্ট বা টার্কি কোম্পানি (২) বারবারি কোম্পানি (৩) ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইত্যাদি। শেষের কোম্পানিটি রাণী প্রথম এলিজাবেথের রাজত্বের শেষ দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এক সময় মহাভারতের ভাগ্য বিধাতা হয়ে এ দেশকে প্রায় দু’শত বছর শাসন করে। আর এ দেশের হীরা, মনি, মুক্তো সব লুট করে নিয়ে যায়। আজও বৃটিশ রাজ পরিবারের কাছে সব চেয়ে যে বড় হীরক খন্ডটি রয়েছে তা মোঘল বাদশাদের কাছে থাকা লুট করা হীরক খন্ড। সেটা অবশ্য অনেকের জানা।
এখন উপরে যে যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা বলা হয়েছিল তার দু’একটি ঘটনা এবার তুলে ধরা যাক। এসব যুদ্ধের মধ্যে স্পেইন এবং ইংল্যান্ডের মধ্যকার “আরমাদা” যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আর এ যুদ্ধের কারণ একটাই আর তা হচ্ছে নৌ দস্যুপনা। আমেরিকাতে স্পেনীয় অধিবাসিদের উপর ইংল্যান্ডের জল দস্যু ড্রেক কর্তৃক আক্রমন, স্পেনের ধন-সম্পদ বহনকারী জাহাজের উপর চড়াও হয়ে লুন্ঠন, ওয়েষ্ট ইন্ডিয়ান কলোনীগুলোতে ইংরেজ বনিকদের অনধিকার প্রবেশ ইত্যাদি কারণে এ যুদ্ধের উদ্ভব হয়। রাণী এলিজাবেথ এসব জেনেও এসব জলদস্যুপনার পরিনাম হিসেবে স'লের যুদ্ধকে কৌশলে বহু বছর ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু এক সময় তা আর সম্ভব হয়নি। এ যুদ্ধের পূর্বে ইংরেজ জল দস্যুদের বড় ওস্তাদ ড্রেক, স্পেনের ক্যাডিজ নৌবন্দরে আক্রমন করে বসে এবং স্পেনীয়দের অনেকগুলো যুদ্ধ জাহাজ ধ্বংস করে দেয় ও উপকূলের অনেক জাহাজ অধিকার করে নিয়ে আসে। এসব কারণে এই ড্রেক বাহাদুর এতই গর্বিত ছিল যে, সে এটাকে “স্পেনের রাজার দাড়ি পোড়ানো” বলে আখ্যা দেয়।
তো, যুদ্ধ শুরুর আর বাকি রইলনা। ১৫৮৮ সালের প্রথম মাসগুলোতে স্পেইন এবং ইংল্যানেডর মধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। স্পেনীয়দের আবার গর্বের ধন ছিল তাদের নৌবাহিনী, যার নাম তারা আদর করে দিয়েছিল “অপরাজেয় আরমাদা” (ইনভিনসিবল্ আরমাদা)। আরমাদার অর্থ হচ্ছে রণপোত বহর। হ্যঁ, সেই যুদ্ধের বারুদ ফোটানোর অগে শুরু হলো হাঁক-ডাক, যাকে বাঙ্গালী কায়দায় বলা যায় ‘সলিম ভাই করিম ভাই, ট্যাঁটা বল্লম নিয়ে আই .......”। এক দিকে স্পেনীয়রা তাদের আরমাদার তেলেশমাতি দেখানোর তরিকায় কোমর বাঁধলো, অন্য দিকে বৃটিশদের মধ্যে শুরু হলো লেফট-রাইট, লেফট-রাইট, হফ-হাইট, হফ-হাইট.......। তবে বৃটিশদের ঘরে জলদস্যুদের মহা ওস্তাদ হাওয়ার্ড, হকিনস্, ড্রেক, ফ্রোবিসার আগে থেকেই সমুদ্রের কালো মানিক হয়ে তেলেশমাতি করছিল। এবার স্পেনের বিরুদ্ধে নৌযুদ্ধে রাণী এলিজাবেথ পক্ষ থেকে তাদের ডাক পড়লো। লন্ডনের টেমস্ নদীর ধারে টিলবুরিতে স্থাপিত হলো নৌ ক্যাম্প। রাণী নিজে উপসি'ত হয়ে সেই দস্যু নৌযোদ্ধাদের উৎসাহ যোগাতে লাগলেন।
ব্যাপারখানা তখন হয়ে উঠলো “একেত নাচন্ন্যা বুড়ি, তার উপর ঢোলের বাড়ি”। ড্রেক এবং হকিনস্ গংরা এমনিতেই সাগরে লুটপাট করে তাদের হাতকে লোহার মত শক্ত বানিয়েছিল। তার উপর আবার রাণীর ডাক! এবার নৌযুদ্ধের ডামাডোলে হুমড়ি খেয়ে পড়লে তারা। ওদিকে পাহাড়ের চুড়াতে চুড়াতে বসানো হলো বার্তা ঘোষকদের দল। নৌদস্যুদের ওঁত পেতে রাখা হলো পোর্টমাউথ থেকে ডোভার পর্যন্ত। আর এসবের দায়িত্বে থাকলো এ্যাডমিরাল লর্ড হাওয়ার্ড।
তো হ্যাঁ, এবার যুদ্ধের কিছু খবর-বার্তা দেয়া যাক। স্পেনীয়রা ১৫০টি আরমাদা নিয়ে আক্রমন শুরু করলো। কিন' ইংলিশ চ্যানেলে তারা ইংল্যান্ডের নৌবাহিনী দ্বারা প্রচন্ডভাবে প্রতিরোধের সন্মুখিন হলো। স্পেনীয়দের ভাগ্য খারপ। এসময় বাতাসও ছিল তাদের প্রতিকুলে। ওদিকে তাদের যুদ্ধ জাহাজগুলো ছিল বড় আকৃতির। অন্য দিকে ইংরেজদেরগুলো ছিল ছোট আকারের। ফলে মূহর্মূহ দিক পরিবর্তনের সুযোগে ইংরেজরা স্পেনীয়দের উত্তর সাগর পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে গেল এবং স্পেনীয়দের দুই তৃতীয়াংশ নৌজাহাজ এবং সম অংশ পরিমান নৌসেনা ধ্বংস করে দিল। পরবর্তীতে ড্রেক এবং নরিসের নেতৃত্বে স্পেনের উপর ইংরেজদের আত্মরক্ষামূলক আক্রমন চালতেই থাকে, যা পরবর্তী প্রায় দশ বছর ধরে চলেছিল।
তো, এই হচ্ছে যুদ্ধের ফলাফল এবং যুদ্ধ পরবর্তী হাল-হকিকত। এবং এর ফলে এটাও জানা গেল যে হাওয়ার্ড, হকিনস্, ড্রেক, ফ্রোবিসার এবং নরিসের মত জলদস্যুরাও এক দিন কিভাবে ইতিহাসের গলির মোড়ে স্থান করে নিয়েছিল।
-শেষ-
©somewhere in net ltd.