নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নারী, জগতের সকল অনাসৃষ্টির উৎস...

নবকবি

পৃথিবীর সকল ধ্বংসের মূলে, নারী...

নবকবি › বিস্তারিত পোস্টঃ

‘বিদ্রোহী’ কবিতার ৯০ বছর

২৬ শে ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ১:৫৫

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম যুগস্রষ্টা কবি এবং বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সুবিখ্যাত ও সর্বাধিক জনপ্রিয়, বহুল আলোচিত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ রচনার নব্বই বছর পূর্তি উপলক্ষে পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন মঞ্চে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সেমিনারে সাহিত্য সমালোচক, নজরুল বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি নানা দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতাটির মূল্যায়ন করছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনা ও প্রকাশের নব্বই বছর অবশ্য পূর্তি হয়েছে এ বছরের ডিসেম্বর মাসে। আনন্দের বিষয়—ডিসেম্বর মাস আসার আগেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নব্বই বছর পূর্তি উপলক্ষে ব্যাপকভাবে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। আশা করি, এ ধারা অব্যাহত থাকবে এবং কবিতাটির রচনাকাল, প্রকাশকাল ও গ্রন্থবদ্ধ হওয়া সম্পর্কিত বিষয়ে যথাসম্ভব সঠিক তথ্য তুলে ধরা হবে। কেননা বিদ্রোহী কবিতা প্রথম কোন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল, এ বিষয়েও নানা মত রয়েছে। ‘বিদ্রোহী’ কোন কোন পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল, সে সম্পর্কেও মতভেদ কম নয়। এছাড়া ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার মূলে কবি নজরুলের কোন মানস-প্রবণতা, জীবনবোধ, ভাবানুভূতি, হৃদয়বত্তা ও অন্যান্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কাজ করেছিল অর্থাত্ অনুপ্রেরণার উত্স হয়েছিল, সে বিষয়েও নানা জন নানা মত প্রকাশ করেছেন। এসব দিক নিয়ে যতদূর সম্ভব তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও মূল্যায়ন হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

আমার শারীরিক অবস্থা খুব সুস্থ নয়, দৃষ্টিশক্তিও প্রায় নিষ্প্রভ। এ অবস্থায় আমি নিজে লিখতে না পেরে ডিকটেশন দিয়ে কিছু বক্তব্য প্রকাশের চেষ্টা করেছি। হয়তো আমার মৌখিক আলোচনায়ও কিছু তথ্যগত ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটতে পারে। তবুও সবিনয়ে নিবেদন করছি, কবি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির স্বাতন্ত্র্য, বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য এবং এর গুণগত মান ও উত্কর্ষ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হওয়া ছাড়া কবিতাটির নাম অর্থাত্ ‘বিদ্রোহী’ এই শিরোনাম কিংবা কথাটি কবির নামের সঙ্গে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যরূপে এবং বিশেষণ হিসেবেও সংযুক্ত হয়ে গেছে। নজরুল প্রসঙ্গ এলেই যে কোনো আলোচনায়ই ‘বিদ্রোহী কবি’ ও ‘জাতীয় কবি’ এ দু’টি কথা প্রায় অনিবার্যভাবে এসে যায়। নজরুল অসংখ্য জনপ্রিয় কবিতা, গান ইত্যাদি লিখেছেন। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি তথা কথাটি আর কোনো কবিতায় তার পরিচিতি হিসেবে এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়নি। ‘জাতীয় কবি’ কথাটি যুক্ত হয়েছে জাতীয় নবজাগরণে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ, কোনো বিশেষ কবিতার অনুসরণে নয়। নজরুলের কবিতার পাঠক ও সমালোচকমাত্রই জানেন, নজরুল মূলত রোমান্টিক মানস-প্রবণতার অধিকারী, স্বপ্ন ও সৌন্দর্যবোধের রূপকার। একই সঙ্গে তিনি আবার বিদ্রোহী চেতনারও রূপকার এবং সংগ্রামী চেতনাসম্পন্ন কবি। নজরুল যেমন বিদ্রোহী চেতনাসম্পন্ন এবং সংগ্রামী চেতনার ধারক এবং জাতীয় উদ্দীপনা সঞ্চারী অসংখ্য কবিতা ও গান লিখেছেন, তেমনি তিনি রচনা করেছেন বহু রোমান্টিক কবিতা, গান এবং স্বপ্ন ও সৌন্দর্যের ধারক কবিতা ও গান। নজরুল নিজেই লিখেছেন—‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী/আর হাতে রণ-তূর্য্য’। স্বপ্নচারী এবং রোমান্টিক মানস-প্রবণতার অধিকারী কবির এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যে কত সত্য এবং যথার্থ, তার পরিচয় রয়েছে তাঁর রচিত অজস্র কবিতা-গানে, এমনকি অনেক গদ্য রচনায়ও। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আমরা যেমন ‘বিদ্রোহী’ নজরুলকে পাই, তেমনি পাশাপাশি পাই একজন রোমান্টিক কবিকেও। এই কবিতায় তিনি যেমন নিজেকে ‘বিদ্রোহী’ রূপে উপস্থাপন করেছেন, নিজেকে আখ্যায়িত করেছেন ‘বীর’ হিসেবে, তেমনি কবিতাটির অনেক স্থানে স্বপ্ন ও সৌন্দর্যবোধের এবং রোমান্টিকতার পরিচয় দীপ্ত করেছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা যারা পাঠ করেছেন এবং পাঠ করবেন তারা কবিতাটিতে উল্লিখিত দুই রূপেরই স্বরূপ লক্ষ করেছেন ও করবেন। কবিতাটির আলোচনা, মূল্যায়ন আমার এ লেখার প্রধান উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নয়। কবিতাটির নব্বই বছর পূর্তি উপলক্ষে যথাসম্ভব এ কবিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরাই এ লেখার মূল উদ্দেশ্য।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নজরুলের সর্বাধিক খ্যাত ও পঠিত এবং আলোচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লেখা এবং তা পত্র-পত্রিকা ও গ্রন্থে প্রকাশের আগেই নজরুল তাঁর অনেক কবিতা রচনার মাধ্যমে খ্যাতি লাভ করেন এবং ব্যাপকভাবে আলোচিত ও সমালোচিত হন; সেই সঙ্গে তাঁর মূল্যায়ন, অবমূল্যায়নও হয়। এদিক থেকে দেখলে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নব্বই বছর পূর্তি হওয়ার আগেই নজরুলের বহু কবিতা এবং তাঁর অনেক বিখ্যাত কবিতার নব্বই বছর এরই মধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে তার ‘বিদ্রোহী’ রচনার পূর্বের অন্যান্য বিখ্যাত কবিতা রচনা ও প্রকাশের ইতিহাস নিয়েও বিভিন্নভাবে আলোচনা হওয়া দরকার এবং সেসব কবিতা নতুনভাবে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করা দরকার।

উল্লেখ্য, বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি এবং অন্যতম যুগস্রষ্টা এই কবি বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হন গত শতাব্দীর বিশের দশকের শুরুতেই। ওই দশকেই তিনি রচনা করেন তাঁর সুবিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাসহ অনেক বিখ্যাত কবিতা। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় এই, নজরুল সাহিত্য ক্ষেত্রে আবির্ভাবের প্রাথমিক পর্বে কবিতা নয়, বরং গদ্য রচনা, বিশেষ করে গল্প লিখেই পাঠক-সমালোচক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’ ১৩২৬ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ‘সওগাত’-এ প্রকাশিত হয়। এ প্রসঙ্গে ‘সওগাত’ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন লিখেছেন—‘সওগাত’ প্রকাশিত হওয়ার প্রায় পর পরই (১৯১৮) নজরুল করাচি থেকে লেখা পাঠাতে শুরু করেন—প্রচুর লেখা। লেখার সঙ্গে থাকত চিঠি। অনেকগুলো লেখা বাতিল হওয়ার পর ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’ হাতে আসে ডাকের মাধ্যমে। গল্পটি ‘সওগাত’-এ প্রকাশিত হওয়ার পর এর প্রতি অনেকেরই দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। মুসলমান সমাজের কোনো লেখক তখন ঐরূপ ভাষায় ঐ ধরনের কিছু লিখতেন না, বা লিখতে পারতেন না। লেখাটি খুব উচ্চমানের না হলেও, আঙ্গিক ও গতিশীলতার দিক দিয়ে অনেকের চোখে খুবই নতুন ঠেকলো।’ [সওগাত ও নজরুল ইসলাম, সওগাত, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৮১]

উল্লেখ্য, উনিশ’শ-বিশের দশকেই নজরুলের বহু সাড়াজাগানো কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ বিষয়ে আমি লিখেছি—‘নজরুল-সাহিত্যের সাধারণ পাঠক, এমনকি অনেক সুধীসমালোচকেরও ধারণা, ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়েই বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব এবং রবীন্দ্রোত্তর বাংলাকাব্যে নতুন যুগের সূচনা। বিদ্রোহী কবি হিসেবে বাংলাকাব্যে নজরুলের বিশেষ-পরিচয় এবং সমগ্র বাংলাসাহিত্যের পটভূমিতে এই কবিতাটির স্বাতন্ত্র্যই এ ধারণার প্রধান কারণ। তাছাড়া দু’য়েকজন বিশিষ্ট সাহিত্য-সমালোচকের মন্তব্যও এমন ধারণার মূলে কার্যকর।’

(নজরুলের ‘বিদ্রোহী’/বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি নজরুল)

উল্লেখ্য, ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের আগেই নজরুল বাংলা কাব্যে ভাব, ভাষা, ছন্দ এবং আঙ্গিক ও রূপরীতিতে নতুনত্ব বয়ে আনেন। ‘বিদ্রোহী’ রচনার ও প্রকাশের আগেই তাঁর হাতে সৃজিত হয় কামালপাশা, শাত-ইল-আরব, খেয়াপারের তরণী, কোরবানী, মোহররম, ফাতেহা-ই-দোয়াজদহমের মতো অনন্যসাধারণ কবিতা। এসব কবিতায় রবীন্দ্র কাব্য-প্রভাব নেই বললেই চলে। ভাষা, ছন্দ ও বিষয়বস্তুর স্বাতন্ত্র্যের দরুণ এবং নজরুলের অনন্যসাধারণ প্রকাশ ক্ষমতার কারণে এসব কবিতা পাঠক ও সমালোচক মহলের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মোসলেম ভারতে ১৩২৭ সালের শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত খেয়াপারের তরণী কবিতা পাঠ করে মোসলেম ভারত পত্রিকার সম্পাদককে লেখা পত্রে বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি ও প্রাজ্ঞ সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার লেখেন—‘যারা আমাকে সর্বাপেক্ষা বিস্মিত ও আশান্বিত করিয়াছে তাহা আপনার পত্রিকার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি লেখক হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম সাহেবের কবিতা। বহুদিন কবিতা পড়িয়া এত আনন্দ পাই নাই। এমন প্রশংসার আবেগ অনুভব করি নাই। বাংলাভাষা যে এই কবির প্রাণের ভাষা হইতে পারিয়াছে, তাঁহার প্রতিভা যে সুন্দরী ও শক্তিশালিনী এক কথায় সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা যে তাঁহার মনোগৃহে জন্মলাভ করিয়াছে তাহার নিঃসংশয় প্রমাণ, তাঁহার ভাব, ভাষা ও ছন্দ। আমি এই অবসরে, তাঁহাকে বাংলার সারস্বত মণ্ডপে স্বাগত সম্ভাষণ জানাইতেছি এবং আমার বিশ্বাস প্রকৃত সাহিত্যামোদী বাঙালী পাঠক ও লেখক-সাধারণের পক্ষ হইতেই আমি এই সুখের কর্তব্য সম্পাদনে অগ্রসর হইয়াছি।... ‘খেয়াপারের তরণী’ শীর্ষক কবিতার ছন্দ সর্বত্র মূলতঃ এক হইলেও মাত্রা বিন্যাস ও নতির বৈচিত্র্য প্রত্যেক শ্লোকে ভাবানুযায়ী সুর সৃষ্টি করিয়াছে। ছন্দকে রক্ষা করিয়া তাহার মধ্যে এই যে একটি অবলীলা, স্বাধীন স্ফুর্তি, অবাধ আবেগ, কবি কোথাও তাহাকে হারাইয়া বসেন নাই। ছন্দ যেন ভাবের দাসত্ব করিতেছে, কোনোখানে আপন অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করে নাই। এই কবিত্ব শক্তিই পাঠককে মুগ্ধ করে। কবিতাটি আবৃত্তি করিলেই বোঝা যায় যে শব্দে ও অর্থগতভাবের সুর কোনোখানে ছন্দের বাঁধনে ব্যাহত হয় নাই। বিস্ময়, ভয়, ভক্তি, সাহস, অটল বিশ্বাস এবং সর্বোপরি প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত একটা ভীষণ গম্ভীর অতিপ্রাকৃত কল্পনার সুর শব্দবিন্যাস ও ছন্দ ঝংকারে মূর্তি ধরিয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে। আমি কেবল একটি মাত্র শ্লোক উদ্ধৃত করিব; ‘আবু বকর উসমান উমর আলী হায়দর/দাঁড়ি যে এ তরণীর নাই ওরে নাই ডর/কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা/দাঁড়ি-মুখে সারিগান লা-শারীক আল্লা।’ এই শ্লোকে মিল, ভাবানুযায়ী শব্দবিন্যাস এবং গম্ভীর ধ্বনি, আকাশে ঘনায়মান মেঘপুঞ্জের প্রলয়-ডম্বরুধ্বনিকে পরাভূত করিয়াছে, বিশেষ করে শেষ ছত্রের শেষ বাক্য ‘লা শারীক আল্লা’ যেমন মিল তেমনি আশ্চর্য প্রয়োগ। ছন্দের অধীন হইয়া এবং চমত্কার মিলের সৃষ্টি করিয়া এই আরবী বাক্য যোজনা বাংলা কবিতায় কি অভিনব ধ্বনি-গাম্ভীর্য লাভ করিয়াছে!’

মোহিতলাল মজুমদারের উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, ভাব, ভাষা, ছন্দ, বিষয়বস্তু ও অন্যান্য দিক থেকে কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’ রচনার আগেই অন্যান্য কবিতার মাধ্যমে রবীন্দ্র পরিমণ্ডলের বাইরে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। এদিক থেকে দেখতে গেলে তিনি উনিশ-বিশের দশকেই রবীন্দ্র কাব্যবৃত্তের বাইরে নিজেকে উপস্থাপন করেন। এটাও উল্লেখযোগ্য যে, নজরুল তাঁর কবিতার ভাষায় এবং বিষয়বস্তুতে হিন্দু-ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতানুসারী শব্দও প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করেছেন।

রবীন্দ্রোত্তর যুগেরও তথা তিরিশের দশকের প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্য সমালোচক বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধে লিখেছেন—‘কৈশোরকালে আমিও জেনেছি রবীন্দ্রনাথের সম্মোহন, যা থেকে বেরুবার ইচ্ছেটাকেও মনে হতো যেন রাজদ্রোহের শামিল, আর সত্যেন্দ্রনাথের তন্দ্রাভরা নেশা, তাঁর বেলোয়ারী আওয়াজের যাদু—তাও আমি জেনেছি। আর এই নিয়েই বছরের পর বছর কেটে গেল বাংলা কবিতার; অন্য কিছু চাইলো না কেউ, অন্য কিছু সম্ভব বলেও ভাবতে পারলো না—যতদিন না ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নিশেন উড়িয়ে হৈ হৈ করে নজরুল ইসলাম এসে পৌঁছলেন। সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ভাঙলো।’

উল্লেখ্য, বুদ্ধদেব বসুর এই বক্তব্য তথ্যগত দিক থেকে সঠিক নয় এই কারণে যে, কাজী নজরুল ইসলাম ‘হৈ হৈ করে বিদ্রোহী কবিতার নিশেন উড়িয়ে’ বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হননি, বরং ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনা ও প্রকাশের আগেই কবিতায় নতুন কণ্ঠস্বর নিয়ে বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব ঘটেছে, যা উপরের আলোচনায় দেখানো হয়েছে। তিনি প্রায় এক দশক অর্থাত্ বিশের দশক সাহিত্য সাধনা করেই নিজের কবি-প্রতিভা সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯২১ সালে তাঁর সাড়া জাগানো সুবিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনা ও প্রকাশের মাধ্যমেই সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেন এবং বিদ্রোহী কবি হিসেবেই তাঁর পরিচিতি প্রাধান্য পায়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রথম মুদ্রিত হয় মাসিক ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায়। পত্রিকাটি বাজারে প্রকাশিত হয় বিলম্বে। ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার সমালোচনা প্রসঙ্গেই সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি পুনর্মুদ্রণ করে। পরবর্তীতে সওগাত, প্রবাসী, বসুমতী, সাধনা, ধূমকেতুসহ অনেক পত্র-পত্রিকায় এটি পুনর্মুদ্রিত হয়। সাপ্তাহিক ‘বিজলী’তে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার সমালোচনা করতে গিয়ে ‘বিদ্রোহী’ পুনর্মুদ্রণ প্রসঙ্গে লেখা হয়—

‘মোসলেম ভারত-কার্তিক ১৩২৮। সম্পাদক : মেজাম্মেল হক। মোসলেম ভারতের একটা বিশিষ্টতা এই যে, এতে বাজে মাল বড় একটা আমদানি হয় না। আমাদের বিশ্বাস—ভাল প্রবন্ধাদি সংগ্রহের জন্যই ‘মোসলেম ভারত’ ঠিক যথাসময়ে প্রকাশিত হয় না। এবারের মোসলেম ভারতে শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের ‘চুরাশি লাখ’ সুন্দর নিবন্ধ। মোহাম্মদ লুত্ফর রহমানের ‘রাজনৈতিক অপরাধী’ সুন্দর তেজঃপূর্ণ প্রবন্ধ। ‘কামাল পাশা’ হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা। কবিতাটি যুদ্ধের মার্চের ছন্দগাঁথা। এরূপ কবিতা বোধ হয় বাংলার কাব্যসাহিত্যে এই প্রথম। ‘বিদ্রোহী’ কাজী সাহেবের আর একটি কবিতা। কবিতাটি এত সুন্দর হয়েছে যে, আমাদের স্থানাভাব হলেও তা বিজলী’র পাঠক-পাঠিকাদের উপহার দিবার লোভ আমরা সংবরণ করতে পারলাম না’ [জনাব জিয়াদ আলীর সৌজন্যে]

উল্লেখ্য, বিদ্রোহী কবিতাটি শুধু ব্যাপক জনপ্রিয়তাই অর্জন করেনি, অনেক কবিকে ‘বিদ্রোহী’র অনুসরণে কিংবা ‘বিদ্রোহী’র বিরুদ্ধে কবিতা লেখায় অনুপ্রাণিতও করেছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ছন্দও সম্পূর্ণ নতুন। এটি সমিল মুক্তক মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। ছান্দসিকদের মতে, বাংলা ভাষায় নজরুল এ ছন্দের প্রবর্তক। কবিতাটি প্রধানত ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত; কিন্তু যেহেতু এটি সমিল মুক্তক মাত্রাবৃত্তে রচিত, সে কারণে এতে সর্বত্রই প্রতি পর্বে সমানুপাতিকভাবে ছয় মাত্রা সমভাবে স্থান পায়নি। পূর্ণ ও অপূর্ণ পর্বে নানাভাবে, সাঙ্গীতিক উচ্চারণে মাত্রার ইতরবিশেষ কাটিয়ে কবিতাটি বিচিত্ররূপে সংস্থাপিত। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ছন্দ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন বাংলা সাহিত্যের দুই প্রখ্যাত ছন্দ-বিজ্ঞানী প্রবোধচন্দ্র সেন ও কবি আবদুল কাদির। আমার রচিত ‘বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি নজরুল’ গ্রন্থের ‘নজরুল কাব্যের ভাষা ও ছন্দ’ শিরোনামের প্রবন্ধে বিদ্রোহী কবিতার ছন্দ আলোচনা করা হয়েছে। কবিতার ভাষা সম্পর্কেও ‘বিদ্রোহী’ কবিতার স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছি। এ কবিতায় তিনি বিষয়ানুসারে পুরাণ ও ঐতিহ্য ইত্যাদির ভাবানুযায়ী শব্দ ব্যবহার করেছেন। কবিতাটিতে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার খুবই কম। ‘বিদ্রোহী’র মত একটি সুদীর্ঘ কবিতায় নজরুল মুসলিম জীবন ও ঐতিহ্যবোধক মাত্র নয়টি শব্দ ‘আরশ’, ‘বেদুঈন’, ‘ইস্রাফিল’, ‘জিব্রাইল’, ‘অর্ফিয়াস’, ‘হাবিয়া দোজখ’ এবং ‘জাহান্নাম’ ব্যবহার করেছেন; অন্যপক্ষে হিন্দু উপকথা থেকে চয়িত হয়েছে তিরিশটি উপমা। (নজরুল-কাব্যে আরবি-ফারসি শব্দ/সৈয়দ আলী আশরাফ)।

‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি নানা দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচিত, সমালোচিত, প্রশংসিত, নিন্দিত হয়েছে। কিন্তু সব সমালোচনা সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে হয়নি, ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকেও হয়েছে। সাহিত্য সমালোচকের দৃষ্টিতে আলোচনা করতে গিয়ে কবি আবদুল কাদির লিখেছেন—‘মাত্র দু’বছর আগে যিনি লেখক মহলে দেখা দিয়েছেন, সেই বাইশ বছর বয়স্ক তরুণ কবির হাতে ‘বিদ্রোহী’র মতো প্রাণবন্ত কবিতা বের হওয়া এক বিস্ময়কর ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ পাঠকের শ্রবণে আনে বেগবতী স্রোতস্বিনীর উপলাহত কালধ্বনি, কিন্তু নজরুলের ‘বিদ্রোহী’তে রূপায়িত হয়েছে উদ্দাম প্রাণশক্তি, অকুণ্ঠিত উচ্ছ্বাস।’ [নজরুল পরিচিতি। পৃষ্ঠা ১০-১১]

প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্য সমালোচক সৈয়দ আলী আহসান নজরুলকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে নজরুল প্রতিভা ও তার অবদান সম্পর্কে স্ববিরোধী (পড়হঃত্ধফরপঃড়ত্ু) বক্তব্য রেখেছেন। তিনি লিখেছেন—‘নজরুল ইসলামের পক্ষে রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত শৃঙ্খলিত কাব্যধারাকে নিশ্চিন্তে ভেঙে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। এর প্রথম প্রমাণ আমরা পেলাম ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থে। এ কাব্যে আমরা কোনো শিল্প-কুশলী কবিকে আবিষ্কার করি না। কিন্তু একজন চঞ্চল, সাহসী এবং নিঃসংশয় ভাষণের অধিকারী কবিকে আবিষ্কার করি। ‘অগ্নিবীণা’ কোনো মহত্ সৃষ্টি নয় এবং এর মধ্যে কাব্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য পঙিক্তর সংখ্যাও খুব কম। কিন্তু ‘অগ্নিবীণা’ বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। তিনি কৃপণের ধনসঞ্চয়ের মত শব্দকে আড়াল করেননি। তিনি বেহিসাবী যুবকের মত যৌবনের উচ্ছ্বাসে শব্দকে আপন ধনভাণ্ডারের মত উজাড় করে দিয়েছেন। ‘অগ্নিবীণা’য় লক্ষ্য করি যে, এখানে শব্দ নির্বাচিত নয়, তত্সম, তদ্ভব এবং দেশজ শব্দের মধ্যে কোনো জাতি বিচার নেই; একটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ধূলিকণা, তৃণগুচ্ছ এবং বৃষ্টির বিন্দু যেভাবে একসঙ্গে চতুর্দিকে ছড়িয়ে যায়, তেমনি ‘অগ্নিবীণা’য় কবির শব্দগুলো নিশ্চিন্তে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কোনোরূপ বিচার-বিবেচনা না মেনে চিত্তের স্বাধীন স্ফূর্তিতে নজরুল ইসলাম অগ্রসর হয়েছিলেন। এভাবেই ‘অগ্নিবীণা’য় বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে আমরা একজন নতুন নায়ককে পেলাম।’ [আধুনিক বাংলা কবিতা : শব্দের অনুষঙ্গে]

এই বক্তব্য থেকে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ‘অগ্নিবীণা’র কবি যদি শিল্প-কুশলী না হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কীভাবে ভেঙে ফেলতে পারেন ‘রবীন্দ্রনাথ-প্রবর্তিত শৃঙ্খলিত কাব্যধারা’; কিংবা ‘অগ্নিবীণা’ যদি কোনো মহত্ সৃষ্টি না হয়ে থাকে, তাহলে কীভাবে বাংলা কবিতায় একজন নতুন নায়ককে পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, ‘বিদ্রোহী’সহ নজরুলের বহু বিখ্যাত কবিতা ‘অগ্নিবীণা’র কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত। নজরুল কাব্যের এ ধরনের স্ববিরোধী মন্তব্য অনেকেই করেছেন এবং করে থাকেন।

নজরুলের বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার উত্স কী এবং কেমন করে তিনি এ সংগ্রামী চেতনার অধিকারী হলেন—সে বিষয়েও অনেক অভিমত রয়েছে। নজরুল নিজেও তাঁর বিদ্রোহী সত্তার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘বিদ্রোহী করেছে মোরে আমার যত গভীর অভিমান।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যেথায় মিথ্যা ভণ্ডামী ভাই/করব সেথাই বিদ্রোহ/ধামাধরা! জামা ধরা/মরণ-ভীতু, চুপ রহো!’

নজরুল তাঁর এক অভিভাষণে বলেছেন, তাঁকে বিদ্রোহী বলে যারা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে তারা হাফেজ কিংবা ওমর খৈয়ামকে পড়েননি। পড়লে তাঁকে বিদ্রোহী বলে লজ্জা দিতো না। নজরুল তাদের নিজের থেকেও বড় ‘বিদ্রোহী’ বলে উল্লেখ করেছেন।

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ চেতনার উত্স সম্পর্কে কবি আবদুল কাদির লিখেছেন—‘নজরুলের পত্রোপন্যাস ‘বাঁধনহার’র মূলে ছিল প্রেমের ব্যর্থতা, সেই ব্যর্থতা শেষে রূপান্তরিত হয়েছিল বিদ্রোহে... এই পত্রোপন্যাসে ‘সাহসিকা’র এক সুদীর্ঘ পত্রে যে বিদ্রোহের বর্ণনা আছে তারই পূর্ণ প্রকাশ পরবর্তীকালে তাঁর সুবিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় দেখা যায়। (কবির জীবন কথা/নজরুল প্রতিভার স্বরূপ)

‘সাহসিকার পত্র’তে আছে—‘নুরুকে স্রষ্টার বিদ্রোহী বলে তোর ভয় হয়েছে, বা দুঃখ হয়েছে দেখে আমি তো আর হেসে বাঁচিনে লো। নুরুটাও স্রষ্টার বিদ্রোহী হল, আর অমনি স্রষ্টার সৃষ্টিটাও তার হাতে এসে পড়লো আর কি... এটা ভুলিসনে যেন রেবা যে, এ ছেলে বাংলাতে জন্ম নিলেও বেদুইনদের দুরন্ত মুক্তি-পাগলামি, আরবীদের মস্ত গোদা, তুর্কীদের রক্ত-তৃষা ভীম স্রোতাবেগের মত ছুটছে এর ধমনিতে ধমনিতে।’

আমরা জানি, নুরু কবির ডাক নাম। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার এক জায়গায় নজরুল লিখেছেন—‘আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস/আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।’ বস্তুত উপরিউক্ত পত্রোপন্যাসেই এমন বিদ্রোহী চেতনার জন্ম। ‘বাঁধন হারা’র অন্তর্গত সাহসিকার পত্র নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার মূলে এক বড় প্রেরণার উত্স হয়েছে।

নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার বিকাশে কুমিল্লায় অবস্থানের, সেখানে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তির এবং নার্গিস ও প্রমীলার সঙ্গে প্রেম-পরিণয়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

উল্লেখ্য, নজরুল তাঁর বাঙালি পল্টনে সৈনিক জীবনে (হাবিলদার) করাচিতে থাকাকালে ১৯১৭-১৯ সময়কালে পাঞ্জাবি মৌলভির কাছে ফারসি শেখেন এবং হাফেজ ও ওমর খৈয়ামসহ ফারসি ভাষার অন্যান্য মহাকবির কাব্য গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। সৈনিক হলেও সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন। করাচিতে অবস্থানকালেই তিনি ‘বাঁধনহারা’ উপন্যাস রচনা শুরু করেন এবং তা ধারাবাহিকভাবে ‘মোসলেম ‘ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু গ্রন্থটির সবটুকু করাচিতে বসে রচনা করা সম্ভব হয়নি। সৈনিক জীবন শেষে ১৯২১ সালে কুমিল্লার দৌলতপুরে এবং কলকাতায় অবস্থানকালে উপন্যাসটির শেষাংশ রচনা করেন। আমরা জানি, নজরুল কুমিল্লা শহরে এবং দৌলতপুরে অবস্থানকালে নার্গিস ও প্রমীলার সঙ্গে প্রেম ও পরিণয়ের সূত্রপাত। উল্লেখ্য, দৌলতপুরে নজরুল ও নার্গিসের প্রেম ও প্রণয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের বিবাহ হওয়া সত্ত্বেও তা টেকেনি। আলী আকবর খানের ভাগ্নী নার্গিসের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রায় পনেরো বছর পরে কলকাতা থেকে নার্গিসকে লেখা পত্রে নজরুল লেখেন—‘আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি অসীম বেদনা। কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি, তা দিয়ে তোমায় কোনোদিন দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এই আগুনের পরশমানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না, আমি ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না।’

[নজরুল-নার্গিস বিষয়ক পত্রাবলী]

উল্লেখ্য, উনিশ শ’ বাইশ সালেই নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় এবং একই বছর প্রকাশিত হয় নজরুল সম্পাদিত অর্ধ সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’। কুমিল্লায় অবস্থানকালে নজরুল রচনা করেন ‘বিজয়িনী’ শিরোনামের একটি গান। এ গানের একটি স্তবকে ‘বিদ্রোহী’ শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়—

আজ বিদ্রোহীর এই রক্ত রথের চূড়ে/

বিজয়িনী! নীলাম্বরীর আঁচল তোমার উড়ে,

গানটি অগ্রহায়ণ ১৩২৮ সালে কুমিল্লায় রচিত এবং পৌষ ১৩২৮ সালে ‘মোসলেম ভারতে’ প্রকাশিত হয়। গানটি ‘ছায়ানট’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম রচনা হিসেবে সংকলিত হয়। (দ্রষ্টব্য : নজরুল রচনাবলী ২য় খণ্ড)

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি নিজেকে ‘বিদ্রোহী’ রূপে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা ‘বিদ্রোহী’র প্রথম পঙিক্ত হচ্ছে—‘বল বীর—বল উন্নত মম শির!

শির নেহারি আমারি, নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!’

সুদীর্ঘ কবিতার উদ্ধৃত পঙিক্ত ক’টি থেকে স্পষ্ট যে, তিনি নিজেকে উদ্দেশ করে লিখিত এ কবিতার মাধ্যমে অন্য সবাইকে বীরত্ব অর্জনের উদ্দীপনা জুগিয়েছেন। নজরুল ছিলেন বিদ্রোহী চেতনাসম্পন্ন সংগ্রামী কবি। তিনি ব্রিটিশ পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সপক্ষে বীরত্বপূর্ণ অনেক কবিতা, গান লিখেছেন। ব্রিটিশের কারাগারে বসেও তিনি শিকল ভাঙার গান গেয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার উত্স যা-ই হোক না কেন, তার মূল লক্ষ্য হলো পরাধীনতা, অত্যাচার-নিপীড়ন ও শোষণ-বঞ্চনা থেকে জাতিকে মুক্ত করা। তিনি বিদ্রোহী কবিতায় লিখেছেন—

মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত,

যবে উত্পীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,

অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—

বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত!

নজরুলের এই বক্তব্য ও আহ্বান সর্বজনীন এবং সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য। এটি কোনো দেশ বা জাতির উদ্দেশে উচ্চারিত নয়। সর্বমানবের প্রতি এটি কবির আহ্বান। যতদিন পৃথিবীতে অত্যাচার, নিপীড়ন শোষণ-বঞ্চনা থাকবে, ততদিনই এ কবিতা এবং কবির আহ্বানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিঃশেষ হবে না। ব্রিটিশ পরাধীনতার যুগে রচিত এই কবিতা নজরুলের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে উত্সারিত। কেননা তিনি যতদিন সুস্থ ছিলেন, ততদিন অত্যাচার-নীপিড়ন ও শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে বীরের মতো মসিযুদ্ধ চালিয়েছেন। অনেকে বলেন, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সারকথা কয়েকটি পঙিক্তর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পঙিক্তগুলো উপরে উদ্ধৃত হয়েছে। এই সারকথা বলার জন্য ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে সুদীর্ঘ কবিতায় রূপান্তরিত না করলেও চলত। এ ধরনের মনোভাব বা ধারণা যারা পোষণ করেন, তারা অনুধাবন করেন না কবিতাটি সুদীর্ঘ না হলে তাতে শুধু মূল কথা বললে একটি বলিষ্ঠ বক্তব্য পাওয়া যেত বটে, কিন্তু তাতে কবিতার যে রূপ-সৌন্দর্য, আঙ্গিক-বৈচিত্র্য ছন্দ-রূপের স্বাতন্ত্র্য এবং বক্তব্যের বহুমুখিতা, সেসব কোনোভাবেই পাওয়া যেত না। কবিতার পাঠক বিচিত্র ধরনের উপমা-চিত্রকল্প অর্থাত্ কাব্যের শিল্পরূপ থেকে বঞ্চিত হতেন। কবিতার মূল কথা বা বক্তব্য বা দর্শন যা-ই হোক না কেন, তা স্বল্প কয়েক পঙিক্ততে প্রকাশ করা যায়, কিন্তু স্বল্প কথায় কবিতার শিল্পরূপ তুলে ধরা সম্ভব হয় না। রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতার মূল বক্তব্যও এর শেষ স্তবকে সীমাবদ্ধ—



ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী

আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি!

শ্রাবণগগন ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,

শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি

যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী

এই কবিতাটি দীর্ঘ করার তথা আরও পাঁচটি স্তবক বা পঁচিশটি পঙিক্ত রচনা করার কী প্রয়োজন ছিল? একটু ভাবলে সহজভাবে অনুধাবন করা যায়, কবিতাটি অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ হওয়ার কারণেই পাঠক নৈসর্গিক দৃশ্য, রূপ-সৌন্দর্য এবং অনেক আকর্ষণীয় উপমা-চিত্রকল্প এবং বাংলাদেশের নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনুধাবন করতে পারছেন এবং এর মধ্য দিয়েই কবিতার প্রকৃত বক্তব্য আরও বেশি সংহতভাবে অনুধাবন করতে পারছেন। এখানেই কবিতাটির সার্থকতা। অনুরূপভাবে বলা যায়, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বৈশিষ্ট্য, বৈচিত্র্য, স্বাতন্ত্র এবং এর মূল বক্তব্যের বিস্তার কবিতাটির চিরন্তন আবেদন ফুটিয়ে তুলেছে। তা না হলে নব্বই বছর পরও এ কবিতা আমাদের সমানভাবে আলোড়িত করত না। আমরা এ কবিতা নিয়ে আলোচনায় এবং মূল্যায়নে ব্যাপৃত হতাম না। কবিতাটিকে কেন্দ্র করে সেমিনার, সভা, আলোচনা ও এত লেখালেখি হতো না।



# মো হা ম্ম দ মা হ্ ফু জ উ ল্লা হ্

সূত্রঃ দৈনিক আমারদেশ, সাহিত্য-সাময়িকী, ২৩.১২.২০১১ইং।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ২:০৯

এম. মিজানুর রহমান সোহেল বলেছেন: :D

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.