নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জ্ঞান মনের জানালা খুলে দায় এবং সেই খোলা জানালা দিয়ে না জানা বিষয় গুলো দেখি যা বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে সারা পৃথিবী দেখতে সাহায্য করে ।

এইচ এন নার্গিস

আমি একজন লেখক, সমাজ কর্মি , মা এবং মুক্তিযোদ্ধা

এইচ এন নার্গিস › বিস্তারিত পোস্টঃ

"বঙ্গ" আর "বাঙ্গালী", শেকড়ের খোঁজে ( নুতুন নুতুন ধর্মের আগমন আর শান্তী বিঘ্নিত )

১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:০৪

"বঙ্গ" আর "বাঙ্গালী" শেকড়ের খোঁজে ( নুতুন নুতুন ধর্মের আগমন আর শান্তী  বিঘ্নিত  ) ৮ 

এই বঙ্গে বাঙ্গালী  ছিল অল্পে খুশি ,শান্তি প্রিয় সাধারণ একটা জাতি । যারা মাটির ঘরে আলপনা এঁকে নানা রকমের উৎসব করে ,   নিজেদের নিজস্ব রীতিনীতি নিয়ে জীবন কাটাতে পছন্দ করতো। 
কিন্তু নানা ধর্ম নানান মত এসে তাদের  বাধা গ্রস্ত করে।

কি কি সেই  ধর্ম ?
 
বৈদিক ধর্মঃ 

বৈদিক ধর্ম কবে বঙ্গে আসে তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ ইতিহাসবিদ দের মতে খ্রিস্টপুর্ব  ১০০০ অব্দ থেকে ৫০০ অব্দের মধ্যে  এখানে আসে। 

কারন বৈদিক যুগে বঙ্গ ভারতের অন্যতম একটি অংশ ছিল না।
কারন বঙ্গের অবস্থান ছিল অনেক দূরে ।  তখন  বৈদিক ধর্ম আর্যবর্তের মধ্যেই ছিল । 
পরে গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময় (৩২০-৫৫০) অব্দে বঙ্গে হিন্দু ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি  পায় । 

বঙ্গে বাঙ্গালীর ছিল নিজস্ব সংস্কৃতি ,ভাষা আর বিশ্বাসের রীতিনীতি । যা ছিল খুবই শক্তপোক্ত । 
যা তারা নষ্ট করতে চাইতো না। নিজেদের রীতিনীতি রাখতে বৈদিক দের সাথে বেশ দ্বন্দ্ব হয়। যা দেখা যায় মুর্তির মধ্যে। নিজেদের বীর কে রাক্ষস বানিয়ে বধ করতে দেখা যায় । যাদের গায়ের রং কালো বা নীল কারন তারা অনার্য বাঙ্গালি । 

পরে আস্তে আস্তে বৈদিক ধর্ম পালন করলেও পাশাপাশি নিজেদের প্রথা, রীতিনীতি বজায় রাখে এবং  নিজেদের ঐতিহ্য  ছিল সমান গুরুত্তপুর্ন । 

বৌদ্ধ ধর্মঃ (২৬৯-২৩২ বিসি) 

বঙ্গে একদিন বৌদ্ধ ধর্ম বেশ জমজমাট ভাবে চলছিল । সময়টা ছিল পাল আমল । প্রায় চার শত বছর ধরে পাল আমল ছিল এবং সময়টিকে  বৌদ্ধ ধর্মের সোনালী যুগ বলা হয় । 
সম্রাট অশোকের (২৬৯-২৩২)  সময় তার পৃষ্টপোষকতায় বঙ্গে অনেক বৌদ্ধ মন্দির গোড়ে উঠে এবং বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য ভিক্কু নিয়োগ হয়। বঙ্গ হয়ে উঠে আন্তর্জাতিক জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র বিন্দু।
 
শুধু নালন্দা আর বিক্রমশীলা নয় ,পাহাড়পুর, ময়নামতি, মহাস্থান গড় ছিল বিশ্বের পণ্ডিৎ দের মিলন কেন্দ্র । 
আর এই বাংলা থেকেই অতিস দীপঙ্করের  মতো পণ্ডিত তিব্বত পর্যন্ত জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। 

তারপরে একদিন বৌদ্ধ ধর্মের পতন হতে থাকে । 
কারন কি পতনের ? 

পতনের কারন সামাজিক,রাজনৈতিক এবং অর্থনইতিক । প্রথমত হিন্দু সমাজের পুনর্জাগরন এবং ব্রাহ্মণ্যবাদেড় প্রভাব বৃদ্ধি বৌদ্ধ ধর্মের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় । অনেক বৌদ্ধ মন্দির ভেঙ্গে দেওয়া হয়। বৌদ্ধ ভিক্ষু নির্যাতনের শিকার হন। 

দ্বিতীয়ত বৌদ্ধ ধর্মের আভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং শৃঙ্খলার অভাব। তাদের অনৈতিক আচরণ বৌদ্ধ ধর্মের ভাবমুর্তি নষ্ট করে। মানুষের সমর্থন হারায় । 

তৃতীয়ত  ইসলামিক  আক্রমণ এবং শাসনেও তাদের অনেক ভিক্ষুকে হত্যা করা হয় আর তাদের প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়। 

সর্ব শেষ কারন বৌদ্ধ ধর্মের অনুশীলন এবং শিক্ষার  জটিলতা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন এবং বুঝা কঠিন হয়ে পড়ে ।  

এই সব কারনে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের পতন তরান্বিত হয়। 


 সেন বংশ ও জঘন্য বর্ন প্রথা (১০৯৫ -১২০৪)  

সেন আমলের  জঘন্য  কঠোর বর্ন প্রথা ভিত্তিক ব্রাম্ভন্যবাদী শাষন সমাজ কে বিভক্ত করে। মানব সৃষ্ট এই নিয়ম  মানুষে মানুষে  বিভক্তি , সমাজকে বিষাক্ত এবং জীবনকে দুঃসহ  যন্ত্রণাময় করে তুলে। 

পাল আমলে বৌদ্ধ ধর্ম ছিল উদার এবং সবায়কে নিয়ে সমান ভাবে চলার দৃষ্টি ভঙ্গি এবং মানসিকতা।
 
এই কিতৃম শ্রেণী ভিত্তিক শাসন মানুষকে তিক্ততা এবং বিষাক্তময় করে তুলে।
 
এই কাস্ট সিস্টেম শুধু মাত্র
 সমাজকেই বিষাক্ত করে তাই নয় বৌদ্ধ ধর্মের মতো একটি উদার ধর্মকে কোন ঠাসা করে। 

ব্রাম্ভন,কায়স্থ, ক্ষত্রিয় ,বৈদ্য এবং ইতর এই ছিল শ্রেণী বিভাগ। যা কিনা পরে বংশানুক্রমে  হয়ে যায়।
 
ফল স্বরূপ সমাজে নানা রকমের বাধা সৃষ্টি হয়। কারন যে তারা নিজ বর্ন ছাড়া বিয়ে করতে পারবেনা। 
ফলে সেই বংশের পুত্র বা কন্যা না পাওয়া গেলে বিয়ের বয়স পার হওয়া,  অসম বিয়ে বা বহু বিবাহর চল বৃদ্ধি পায়।

পরবর্তি কালে এই ব্যাবস্থা এত জটিল হয় যে বাঙ্গালী  সমাজ "কুলীন" আর "ইতর" এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়। 

ব্রাম্ভন দের 'মনোসঙ্ঘিতা'  এবং "পুরাণের বর্নাশ্রম" ধর্মের বিধান  মতো চলতে গিয়ে  বহু শূদ্র এবং অশপৃস্য পঞ্চম জাতি দেবমন্দিরে প্রবেশ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। 

 সেনদের কৌলীন্য প্রথা কোনো  দিক দিয়েই বাঙ্গালীর মঙ্গল জনক হয়নি । 

বহু নমশূদ্র জাতি এই বর্ন প্রথার হাত থেকে মুক্তি পেতে পথ খুঁজছিল । 

বৌদ্ধ আর শূদ্র নেতাদের আহাব্বানে বখতিয়ার খলজী ১২০৪ সালে বাংলার শাসক লক্ষণ সেন কে আক্রমণ করলে লক্ষণ সেন পালিয়ে গিয়ে পুর্ব বাংলায় পালিয়ে যায়। 

মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টিকারী জঘন্য কাস্ট সিস্টেম দ্বারা মানুষ এতই ভুক্তভুগি হয়েছিলো যে তারা দলে  দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। 

অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্বোচার হওয়া বাঙ্গালি কঠিন জবাব দায় এবং শান্তির পথে প্রবেশ করে দলে দলে । এটা একটি নুতুন সামাজিক আর আধ্যাত্মিক বিকল্প হিসেবে মানুষের সামনে আসে।
 
ঐতিহাসিক রামেশ চন্দ্রের একটি কথা সে  সময়ের পরিস্থিতি কে খুব ভালো করে তুলে ধরে। আর তা হল "এটা একটি মর্মান্তিক বাস্তবতা"  । 

এ থেকে বুঝা যায় মানুষ মুক্তির জন্য কত আকুল ছিল। ইসলাম সেই মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিল ।
 
ইসলামের মূল কথা ছিল "সাম্য আর ন্যায় বিচার" 

"জন্ম,  জাত আর  বর্ন দিয়ে তৈরি করা মানুষের  কিত্রিম দেয়াল"  ভেঙ্গে ফেলে মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নায় দলে দলে। তার সাথে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারিরাও। কারন ইসলামের সাম্য আর ন্যায় বিচারের সাথে বৌদ্ধ ধর্মের মিল আছে। তাই তারা হিন্দু ধর্মে  না গিয়ে ইসলাম ধর্মে যোগ দায়।  

এর  পেছনে সব  চেয়ে বেশি দান ছিল সুফি সাধকদের। 
ইতিহাসবিদ অতীন্দ্র নাথ বোস বলেন "তারা ছিল উদার, লোক- দর্শনের  মশাল বাহক যা সামাজিক বাধা থেকে আধ্যাত্মিক শক্তিকে মুক্ত করে" ।  

তারা কোন কঠিন নিয়ম কানুনের কথা বলেন নাই।  "ভালবাসা আর সাম্যের"  কথা বলে সাধারণ মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিল ।
 
ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে মুক্ত মানুষ কৌলীন্য দের নিন্দা করতে থাকে । আজও সেটা  চলমান । যা সনাতন ধর্মী মানুষ এখনও বুঝে নায়  । এই দূষণ এখনও কার্জকর। 

দরকার একটা বিরাট  "কালচারাল রেভুলেসান" । যা হয়ে গেছে অনেক দেশে। পাক ভারত উপমহাদেশে  হয়নি ।

যে সমস্ত দেশে কালচারাল রেভুলসান হয়ে গেছে এবং তা অনুসরণ করছে সে সমস্ত দেশে মানুষে মানুষে ভাগা ভাগি নাই ।   সন্মান আর সুযোগ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ধনী দরিদ্র কোন পার্থক্য  নাই। 
তার সাথে দেশ বা সমাজের দুর্বল নারী সমাজ  মানব সৃষ্ট যৌতুক প্রথা, সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চনা, বিবাহ বিচ্ছেদের পর হেয় দৃষ্টিতে নারী কে  দেখা এগুলোর চর্চা থাকে না।  

 বৌদ্ধ ধর্ম  বাংলা থেকে পুরপুরি মুছে যায় নি । এটা বাঙ্গালীর লোক সংস্কৃতি এবং স্থানীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে গিয়ে একটা নুতুন রূপ নিয়েছিল । 
বলা যায় "রুপান্তরী"   । 

বাংলায় একটি লোকোধর্ম চালু হয় যার নাম " ধর্ম ঠাকুরের পূজা"  । যা কিনা বৌদ্ধ ধর্মের "শূন্য ধারনা" তার সাথে হিন্দু আচার অনুষ্ঠান মিশিয়ে একটা নুতুন বিশ্বাস। 
৮ম -১২শ শতকে "বৌদ্ধ সহজিয়া" বৌদ্ধ গুরুদের দ্বারা রচিত রহস্যময় গান যা কিনা প্রাচীন বাংলায় রচিত প্রাচীনতম নিদর্শন । যা থেকে বোঝা যায় তান্ত্রিক বৌদ্ধ দর্শন,   যা  সে সময়ের সাধারণ মানুষের একটা জীবন্ত ছবি  চোখের সামনে ভেসে আসে । 

এই আলোচনা দ্বারা একটা বিষয় আমাদের সামনে আসে আর তা  হল   অতীতের এই বিরাট বিরাট ধর্মীয় এবং সামাজিক পরিবর্তন আজকের বাঙ্গালী কে তাদের সংস্কৃতি আর পরিচয় কে কতটা প্রভাবিত করে চলেছে।  

বাঙ্গালীর পরিচয় আসলে ভুলে যাওয়া ইতিহাসের  মিশ্রণ যা বাঙ্গালী   এখনও পুরপুরি সঠিক ভাবে জানে না বা জানানো  হয় না কিংবা জানানোর ব্যাবস্থাও তেমন নাই।

বাঙ্গালীর সংস্কৃতি কোন একক উৎসে নয়। বহু ধারায় আসা সংস্কৃতির সম্মিলন এবং বৈচিত্রে বহু উৎস থেকে এসে মিলে মিশে এক হওয়া। 

এই জিনগত তথ্য গুলো যখন দেখি তখন ধর্ম,বর্ন এবং অঞ্চল  ভিত্তিক যে "বিভেদ"  তৈরি হয় সে গুলো অর্থ হীন মনে হয়। 

বিজ্ঞান যখন এই অভিন্ন উৎসের দিকে নির্দেশ করে তখন বাঙ্গালীর এই বোধ টি যদি বাড়ে তবে পারস্পরিক যে ঝগড়া বিবাদ তা কমে আসবে । 

সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা এগুলো বাড়বে। আমরা সবায় আসলে বৈচিত্র্য ময় একটি মানব পরিবারের অংশ। 

এগুলো আমরা যতোই বুঝবো ততই এই পৃথিবীর  মানব পরিবারের  পথ চলা সহজ হবে। 


চলবে 


   
 



 






 


মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.