| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এইচ এন নার্গিস
আমি একজন লেখক, সমাজ কর্মি , মা এবং মুক্তিযোদ্ধা
"বঙ্গ" আর "বাঙ্গালী" শেকড়ের খোঁজে ( পর্ব ১২ c )
"কেহ নাহি জানে, কার আহাব্বানে কত মানুষের ধারা,
দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে সমুদ্রে হল হারা" রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর
অনেক উপজাতির একটি এই "শবর" যারা এই বরেন্দ্র অঞ্চলে এসেছিল ।
"পুণ্ড্র নগর" একটি প্রাচীন সভ্যতার ভিত্তি । বরেন্দ্র অঞ্চলে বসবাস কারি উপজাতি শবর । তাদেরও দান রয়েছে এই সভ্যতা গঠনের পেছনে ।
"গঅনত গঅনত তইলা বাড়ি হেঞ্ছে কুড়াড়ী
কনৈ নৈরামনি বালি জাগন্তে উপাড়ী
ছাড় ছাড় মাআ সোহা বিষম দুন্দোলী
হেরি সো মেরি তইলা বাড়ি খমসে সমতুলা
সূকড়য় সে রে কাপাসু ফুটিলা
তইলা বাড়ির পাসে রে জোহ্না বাড়ি খমসে সমতুলা
ফিটলি আন্ধারি রে আকাশ ফুলিআ
অনুদিন শবরো কিম্মিন চেবই মহাসুহে ভোলা"
এটি একটি শবর পাদের গীত
এর অর্থ
"পাহারের চুড়াই ,যেন আকাশের গায়ে শবরদের কুঁড়ে ঘরের বাড়ি ।চারদিকে কার্পাস গাছে তুলো ফুটে গেছে , বাড়ির চারদিকে কাউনের ধান পেকেছে এবং শবর শবরী আনন্দিত" ।
এই আদিবাসি দের রচিত কবিতার বর্ণনায় "শবর" দের কথা উঠে এসেছে।
বরেন্দ্র এলাকায় এখনো চীনা কাউন চাল জনপ্রিয় এবং এখনো কার্পাস তুলা লাগানো হয়।
চলে যাই সেই সুদূর অতীতে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে, দেখে আসি এই বঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলে কোন কোন উপজাতি বাস করতো ।
আগের পর্বে বলা হয়েছে কারা ছিল এই সভ্যতা গঠনের পেছনে । এখন জানবো এখানে বসবাস কারি যত উপজাতি এখানে এসেছিল তাদের মধ্যে কারা ছিল ।
বরেন্দ্র এলাকায় বস বাস কারি একটি উপজাতি যারা "শবর" নামে পরিচিত । এই "শবর" জাতি জঙ্গলে জঙ্গলে শিকার করে বেড়াতো ।
"পুণ্ড্র নগর" এর উন্নয়ন দ্রুততার সাথে বৃদ্ধি পেতে থাকলে তার সাথে তারা মিল রাখতে পারে নি কেউ কেউ । তখন তারা চলে যায় ভারতের উত্তরে "ছোট নাগপুর" এবং ওড়িস্যায় "বন পাহাড়ি" গ্রামে । "ছোট নাগপুরে" একটি নদীর নাম "শবরী" যা তাদের নামে।
শবর দের বিচ্ছিন্ন গোত্র গোস্টি পশ্চিম বাংলা ,বিহার সীমান্তে ঝাড়গ্রাম এবং ঘাট শিলায় বাস করে।
এখনো তারা শিকারী জীবন ধারা ছাড়ে নি । এবং পান সুপারি তাদের প্রিয় । তাদের কিছু কিছু অংশ গৃহী হয়েছিল ।
ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী গত শতাব্দীতে খুব গভীর ভাবে তাদের উপর গবেষণা চালায় । স্ব শরীরে তারা এসব স্থানে ঘুরে বেড়ায় তাদের সাথে মিশে যায়, তথ্য খুঁজে, মাসের পর মাস তাদের সাথে থেকে পর্যবেক্ষণ করে। গবেষক গন খুঁজে পান এখনো তারা মধ্য প্রস্তর যুগের জীবন যাপন করে।
তাদের ভাষার শব্দাবলী , খ্যদ্যাভাষ শিকারের ধনুক,দৈহিক বৈশিষ্ট্য অস্টিৃক সংস্কৃতির সাথে মিল আছে এবং প্রোটো অষ্ট্রলয়েড চিহ্ন রয়েছে ।
এখনো তারা অল্প কাপড় পরিধান করে এবং কেউ কেউ খুব দুধর্ষ এবং বনে জঙ্গলে থাকতে পছন্দ করে।তাদের পূর্ব পুরুষ বরেন্দ্র অঞ্চলে স্থায়ী ভাবে বাসগৃহ করে এবং বিলীন হয়ে যায় ।
কৈবর্ত উপজাতি
কৈবর্ত উপজাতি অস্ট্রিক গোত্রের নয় । তাদের মাথার আকার চেহারা,মুখের গঠন দ্রাবিড় দের সাথে মিল আছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে এখনো তাদের বাস। এই ভূভাগে আর্য দের আসার আগেই তাদের আগমন পশ্চিম সীমান্ত রাঢ় অঞ্চল থেকে। রাঢ় অঞ্চলে যারা বাস করে তারাও এদের মত ।
রাঢ়ার প্রাচীন নগরী "তাম্র লিপ্ত " নাম টি দ্রাবিড় ভাষার ।
তাই প্রমাণ স্বরূপ বলা যায় কিভাবে এই নামটি হয়েছে।
উদাহরণ "দামিলিও - দামলিপ্ত - তাম্রলিপ্ত "
অর্থাৎ তাম্রলিপ্ত মানে তামিলদের আবাসভূমি ।
বাংলা ভাষার প্রচুর ধাতুমুল , শব্দ ধ্বনি দ্রাবিড় সহজাত ।
তাই অনুমান করা যায় খ্রিস্টপুর্ব এক হাজার সালের দিকে এরা পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে আসে।
ততো দিনে এখানে পুণ্ড্র সমাজের উদ্ভব হয়ে গেছে। অনেক খানি দানাও শক্ত হয়ে গেছে বা ভীত রচনা হয়ে গেছে।
তাই পণ্ডিত গন বলেন অস্টৃক জাতি দ্বারা পুণ্ড্র বর্ধনের ভিত রচনা হয় এবং পরে দ্রাবিড় রা এখানে এসে যোগ দায় ।
আদি বাসি দের ধর্ম চিন্তাঃ
এই আদি বাসি অস্টৃক ভাষা গোত্রের মানুষের ধর্ম নিয়ে যে চিন্তা তা পৃথিবীর সব আদিবাসি দের চিন্তার মতোই এবং তা হল "সব কিছুই সৃষ্টি কর্তা" ।
পৃথিবীর সব আদি বাসি সম্প্রদায় ধর্ম বা সৃষ্টিকর্তা নিয়ে যে চিন্তা করে তা হল "ধর্মীয় আধ্যাত্মিক চেতনা" এবং "সর্ব প্রাণ বাদী বিশ্বাস" বা উপলব্ধি। যাকে বলা হয় "আদিম মানুষ সুলভ" চিন্তা । (Animism)। যে বিষয়ে সমস্ত নৃবিজ্ঞানী এক মত এবং তা স্বীকার করে।
তাই বরেন্দ্র অঞ্চলের শবর, কোচ, মেচ, পুণ্ড্র জাতি গোস্টির অগণিত লোক যা বরেন্দ্র অঞ্চলে বাস করতো তারা এই বিশ্বাস কে নস্যাৎ করতে চায়নি ।
তারা তাদের নিজস্ব ভাবধারা, নিজস্ব বিশ্বাসকেই আঁকড়ে ধরে রাখতে ছেয়ে ছিল ।
তাই বৈদিক ধর্ম তারা অন্তর থেকে নিতে পারে নাই। যে কারনে বৈদিক ধর্ম নিতে চায় নি তার
প্রথম কারনঃ তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া অন্য বিশ্বাস তারা নিতে চায় নি ।
দ্বিতীয় কারনঃ
বৈদিক ধর্মের জটিলতা এবং জটিল ভাবে চর্চা করার প্রথা এবং বিশ্বাস তাদের ভালো লাগেনি। তা তারা পালন করতে চায় নি।
বৈদিক ধর্ম বহিরাগত আর্য দের ধর্ম ।যারা কিনা সেন্ট্রাল এশিয়া থেকে এসে পাঞ্জাবের সমতলে প্রথম বসতি স্থাপন করে। তাদের ধর্ম গ্রন্থের নাম "বেদ" আর ধর্মের নাম "বৈদিক" ।
স্মরণাতীত কালের আদিবাসী দের ধর্ম তারা যুগযুগান্তর ধরে রাখতে চেয়ে ছিল । এমনকি উনিশ শতকের শেষ পর্যায় পর্যন্ত বৈদিক বিশ্বাস তাদের মধ্যে অনুপস্থিত ছিল।
তৃতীয়তঃ
বল্লাল সেন বংশের আমলে বর্ণ প্রথার (কাস্ট সিস্টেম) বা জাতপাতের ভেদাভেদ ,উচ্চ বর্ণের মর্যাদা এবং নিচু বর্ণের মানুষকে নিচু করে দেখার প্রবনতা এই বঙ্গ বাসি বা বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষকে বৈদিকী করনের" সব চেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে পড়ে এবং তা বৈদিকী করনের তলানী তে এসে পড়ে ।
বৈদিক ধর্ম শুধু মাত্র তথাকথিত উপরের শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে। আর যখন জমিদারি প্রথা চালু হয় তখন বৈদিক দের দুর্গা পূজা কে কত ইউনিক ভাবে বানাতে পারবে তার প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ আজও তাদের আদি বিশ্বাস পালন করে চলেছে।
বাঙ্গালী সমাজ সাধারণ মানুষ বর্ণাশ্রমের বাইরে ছিল । তাই যখন মুসলিমদের বিজয় আসে তখন "জাত পাত বিহীন সোজা সরল" ইসলাম ধর্মে স্বতুস্পুর্ত ভাবে যোগ দায় ।
বরেন্দ্র অঞ্চলে বসবাস কারি আরও কিছু উপজাতিঃ
কোচঃ
কোচ দের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এবং কি ভাবে তাদের আগমন।
ব্রিটিশ প্রসাসক,গবেসক এবং চিকিৎসক বিমস ডালটন মনে করেন এরা মঙ্গলয়েড রয়েসয়ের মানুষ। এড়া বন্য উপায়ে উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করা পাহাড়ি নরগোস্টীর শাখা।
ভাষাগত দিক থেকে আসাম তিব্বত অঞ্চলের ভাসাগস্টীর কাছাকাছি।
কারো কারর দেহ গায়ের রং ঘনো কালো চুল কোঁকড়ানো ,ঠোঁট উলটানো নেগ্রিটো ছাপ আছে। তারা মনে করে অনেক আগের নেগ্রিটো জাতই যারা এখানে ছিল যারা অনেক আগেই বিলীন হয়ে গেছে তারি একটি ক্ষীণ ধারা বিছিন্ন ভাবে এদের মধ্যে লেগে রয়েছে।
আসামের পার্বত্য অঞ্চল ,ময়মনসিং এর উত্তর পাহাড়ি অঞ্চলে, দক্ষিণ ভারতের গহিন অরণ্যে এবং আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে নেগ্রিটো সম্প্রদয়ের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় ।
নীহার রঞ্জন রায় মনে করেন আসামের ঊর্ধ্বে "কম্বজ শাসক" এক সময় প্রাচীন বাংলা শাসন করেছিল । ষেই সুবাদে কোচ জাতি এই সব অঞ্চলে বাস স্থান গড়ে তুলে।
'স্রংৎসান' গ্যাম্প' 'ম্যাৎসন্যয়' যুগে বাংলা কিছুকাল নিজেদের অধিকারে আনে এবং তখন তারই ছত্র ছায়ায় এই মানব গোস্টি এখানে বসতি স্থাপন করে।
অনেক অনেক বছর ধরে হাজার হাজার সামাজিক রাজনৈতিক ভাঙ্গা গড়া এখানে হয়েছে। জানা অজানা নানা জনস্রোতের আগমন ও নির্গমন ,উত্থান ও লয়ের মধ্য দিয়ে নানা মানব গোস্টি সমূহের মানব ধারা মিলে মিশে গড়ে উঠেছে চিরায়ত বরেন্দ্র অঞ্চলের মানব সমাজ ও সংস্কৃতি ।
চলবে
©somewhere in net ltd.