নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জ্ঞান মনের জানালা খুলে দায় এবং সেই খোলা জানালা দিয়ে না জানা বিষয় গুলো দেখি যা বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে সারা পৃথিবী দেখতে সাহায্য করে ।

এইচ এন নার্গিস

আমি একজন লেখক, সমাজ কর্মি , মা এবং মুক্তিযোদ্ধা

এইচ এন নার্গিস › বিস্তারিত পোস্টঃ

"বঙ্গ" আর "বাঙ্গালী " শেকড়ের খোঁজে , "পুণ্ড্র নগরের" সভ্যতা বিকাশের পেছনে যারা কাজ করেছে তাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়

০৩ রা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৯

"পুণ্ড্র নগর" একটি প্রাচীন সভ্যতার ভিত্তি । কি ভাবে এখানে এই সভ্যতার বিকাশ হয়? কারা ছিল এর পেছনে?   এই  অঞ্চলে বসবাস কারি মানুষের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এবং পেশা  (১২ A) 


অনেক নৃতাত্ত্বিকবিদ  এই অঞ্চলের মানুষের নৃতাত্বিক পরিচয় বের করতে অনেক গবেষণা চালিয়েছেন।
 
ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশ শাষক,গবেষক, গভীর ভাবে,
স্ব- শরীরে তাদের সাথে মিশে গিয়ে যত্ন সহকারে তাদের গবেষণা এবং অনুসন্ধান চালিয়েছেন।  

তারা হলেন কর্নেল ডলটন, হ্যাডন,রিজলে, হাটন, গ্রিয়ারসন, হাচিলসন এবং গেইট উল্লেখযোগ্য । 

তাদের গবেষণা মূল্যবান তথ্য ভাণ্ডার বলে বিবেচিত । 

এখন যারা বরেন্দ্র অঞ্চলে বাস করছেন তাদের সংগৃহীত তথ্য সাম্প্রতিক কালের হলেও তাদের পাওয়া গবেষণা থেকে জানা যায় এখানকার অধিবাসী "প্রটো-টাইপ" জাতি গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের  । 

তারা সারজমিনে পর্বেযক্ষন  করে দেখেছেন যে আদিবাসী যারা এখানে বাস করে তারা হল +পোদ , +শবর,  +কৈবর্ত , +কোচ,  +ম্যাচ,  এবং রাজবংশী  

অনেক আদিবাসী অজ্ঞাত এবং বিপুপ্ত প্রায় । তারা মিলে মিশে এক নুতুন সমাজ গড়ে তুলেন ।

প্রাগ ঐতিহাসিক যুগে যারা আগে ছিল যাযাবর, আরণ্যচারী তারা এখানে থিতু হয় এবং কৃষি ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলে। 

পুণ্ড্র জাতিঃ 

জাতির নাম অনুসারে স্থানের নাম হয়। 
যেমন রাঢ়া , বঙ্গা, মগধা, অঙ্গা এই নাম গুলো দিয়ে সেই অঞ্চলের পরিচয় মিলে। অর্থাৎ রাঢ় অঞ্চলের মানুষ কে রাঢ়া, বঙ্গ অঞ্চলের মানুষ কে বঙ্গা বলা ইত্যাদি । 

বরেন্দ্র ভূমির পুর্ব সীমান্ত ব্যাপী,  করতোয়ার তীর বরাবর  অঞ্চল টিকে বলা হয় "পুণ্ড্র নগর" এবং এর অধিবাসী দের বলা হোতো "পুণ্ড্র"  । এই আদিম জাতি "পুণ্ড্র" দের নাম অনুসারে এই অঞ্চলের নাম হয় "পুণ্ড্র নগর"। 

এই "পুণ্ড্র" শব্দ টি সংস্কৃত শব্দ । যা এসেছে পউঁড় থেকে (Huntar  ১৮৭৬ পৃঃ ৪৫ ) 
বরেন্দ্রের মালদহে  "পুন্ডরী"  নামে একটি জন গোষ্ঠীর অনুসন্ধান  পাওয়া যায় । 

নৃবিজ্ঞানী "ওমলে" চলন বিলের নিভৃত অঞ্চলে "পুণ্ড্রী" নামে একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়  পান । (Khan পৃস্টা ৬৫ ১৯৭৮) । এরা পুণ্ড্র জাতির বিস্মৃত অংশ। 

কারন এরা মৎস্য শিকারি  সম্প্রদায়ের । মাছ ধরা যাদের পেশা। যেহেতু সেই আদি  কালে মাছ ধরে বেড়ানো  পেশা ছিল কিছু   আদি মানুষের  আদি জীবিকা । কারর পেশা ছিল বনে জঙ্গলে পশু শিকার,  আবার কারর ছিল  মাছ ধরা। 

যেহেতু এই নিভৃতে থাকা মানুষের শ্রেণী টি অন্য মানুষের সাথে মেলা মেসা হয় নি তাই সেই পুণ্ড্র নামটি এখনো তারা ব্যাবহার করে। 

সব চেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ কথা হল বরেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানের বসবাস কারি মানুষ পোদ বা পুঁড়া বা পুড়া সম্প্রদায়ের যে অস্তিত্ব আছে তাদের সাথে চলন বিলের এই পুণ্ড্র জাতির মানুষের জীবন জীবিকা, পেশা, ভাষা, বসতি স্থাপনের ধরনের মিল আছে। 

নৃবিজ্ঞানী গন গবেষণা করে পান বঙ্গের আদিম জনগণ "প্রটো অস্ত্রলয়েড বা Proto-Australoid    । 

এরা  মাঝারী থেকে খর্বাকৃতি ,গায়ের রং ঘন কালো , নাসা প্রান্ত প্রশস্ত, মাথার চুল কোঁকড়ানো, মাথার খুলি মাঝারী থেকে লম্বাটে। 
যা কিনা এই পোদ বা পুণ্ড্র দের দৈহিক বৈশিষ্ট্যর সাথে মিল আছে। 

পোদ থেকে পুঁড়া এবং পুঁড়া থেকে সংস্ক্রিতিক ভাষায়  পরিবর্তন হয়ে পুণ্ড্র হয়েছে। এবং পুণ্ড্র থেকে পৌণ্ড্র ,পৌণ্ড্রিক, পুণ্ড্রবর্ধন এই নাম গুলোতে রূপান্তর হয়।  

এই পোদ বা পুণ্ড্র জাতি বরেন্দ্র, চলন বিল এলাকায় যেমন তখন ছিল এবং আজও আছে এবং মাছ ধরার পেশা নিয়ে চলন বিল থেকে আরও দক্ষিণে যশোর ,ফরিদপুর হয়ে দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ে । 

জলাশয় চারী মানুষ গুলো খাদ্য সংগ্রহ করার জন্য যাযাবর হয়ে এক স্থান থেকে আর এক স্থানে ঘুরে বেড়াতো মাছ ধরা পেশাকে কেন্দ্র করে।  খ্রিস্টপুর্ব দশম শতাব্দীতে  তখনো তারা এক স্থানে থিতু হয় নি । মনে করা হয় দুটি স্রোত এখানে এসে ছিল। প্রথম  স্রোতটি  দ্বিতীয় স্রোতের অনেক আগে এসে ছিল। 
 তারপরে তারা কৃষিকে পেশা হিসাবে নায় এবং এক স্থানে থিতু হয়।

এই পোদ বা পুণ্ড্র রা কৃষির প্রসারের জন্য লাঙ্গলের ব্যাবহার আরম্ভ করে। শুধু ধান নয় লাউ,কচু ,কুমড়া,পান, হলুদ, বেগুন, ঝিঙ্গা, সুপারি প্রভিতির  চাষ করা আরম্ভ করে।  
পরে তা ব্যাপক ভাবে চাষ করতে আরম্ভ করে এবং 
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শতাব্দীর  দিকে বুনো ধান, আখ, কার্পাস এবং  রেশমের ব্যাপক আকারে চাষ আরম্ভ হয় । 

পরে এই সব ফসল উৎপাদনে তারা দক্ষ হওয়ে উঠে। আর এই উৎপাদনের মধ্যে দিয়েই তারা কৃষক হিসেবে "স্থায়ী পল্লী সমাজের" গোড়া  পত্তনের ভিত্তি স্থাপনে কৃতকার্জ  অর্জনে সক্ষম হয় ।  

 এই গ্রাম ভিত্তিক সমাজের জীবনধারা তাদেরেই সৃষ্টি  এবং তাদেরেই অবদান। 

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় কৃষি কাজের মূল্য যন্ত্র "লাঙ্গল" শব্দটি  অস্টৃক  (Austrik) ভাষার ,  ঠিক সে রকম আরও শব্দ যেমন পানের বরজ, ধান ভানা, ঢেঁকি, অস্টৃক  (Austrik) ভাষা বা Astro Asiatic ভাষা গোত্রের মধ্যে পড়ে ।  

সাঁওতাল, মুনডা, শবর, কোল, ভূমিজ প্রাচীন  Astro -এশিয়াটিক ভাষা গোত্রের। 

ভাষা বিজ্ঞানী লেভির মতে খোদ পুণ্ড্র শব্দটি যার মূলে পোদ বা পুড় যা অষ্টৃক ভাষা থেকে সৃষ্ট । 

যে সমস্ত উৎপাদিত সামগ্রী এই পুণ্ড্র কে বিকাশ হতে সাহায্য করেঃ

কার্পাস তুলা চাষ এবং বুননে এখানকার অধিবাসী পারদর্শী  ছিল। এই "কার্পাস" শব্দ টি আস্টৃক এবং "কাপাসিয়া" নামক একটি বিখ্যাত বস্ত্র এখানে বুনন  হতো।  যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানে চলেছিল।

  এই জনপদে দুই রকমের কার্পাস বস্ত্র উৎপাদন হতো । যা পাওয়া যায় পঞ্চদশ শতকে চীনা পরিব্রাজক "মাহুয়ান" নামক একজন পরিব্রাজকের বিবরণ থেকে।

 শুধু মাত্র কার্পাস নয় "রেশম" চাষ এবং রেশম বুননে তারা দক্ষ ছিল। রেশম বস্ত্র উৎপাদন এই সব এলাকাতে এখনো হয় ।
যেমন মুর্সিদাবাদ ,রাজশাহী ,শিবগঞ্জ এখনো বিখ্যাত রেশম বস্ত্র উৎপাদনে। 

"কল্পসুত্র জৈন ধর্ম গ্রন্থে" রেশম উৎপাদনের উল্লেখ আছে।

পুণ্ড্রীক দের রেশম বস্ত্র বয়নের কথা  উল্লেখ আছে "কৌটিল্যের" অর্থ শাস্ত্রে। 
লেখা আছে পুণ্ডরীক দের  রেশম বস্ত্র দূর দেশ আরব এবং  চীন  দেশেও ছড়িয়ে পড়ে ছিল। এই অর্থ শাস্ত্রে উল্লেখ আছে "পুন্ডৃক" নামক রেশম উৎপাদক এবং বয়ন কারিদের কথা । 

পুন্ডৃীক কৃষক কুলে অষ্টৃক সংযোগের এটাই  প্রমাণ।  আর শুধু কার্পাস নয় এখানে প্রচুর শিমুল গাছ ছিল এবং শিমুল তুলা দিয়েও বস্ত্র তৈরি হতো । 

চাঁপাই নবাবগঞ্জ এর বিভিন্ন স্থানে মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ এখনো রেশম চাষ এবং তা দিয়ে বস্ত্র উৎপাদনের জন্য এখনো বিখ্যাত। 

এই সেই সুদূর পুণ্ড্রক জনগণের সেই পুরানো স্কিল এখনো বহমান। 

গ্রামীণ সমাজ এবং কৃষ্টি সংস্কৃতির ধারক আর বাহক এই অস্টৃক ভাষা গোস্টী 

আখ চাষ তারেই আর একটি অংশ । শুধু ধান,  সবজি নয় কার্পাস, রেশম নয় ,  আর একটি বিশিষ্ট ফসল সেটা হল আখ, এই অস্টৃক ভাষা গোস্টি আখ চাষে পারদর্শী ছিল আর তার সাথে আখের রস বানানো ,রস থেকে গুড় । এই সব কাজে যেমন তারা ছিল স্কিল এখনো সেটা বহমান।  

অস্টৃক ভাষা গোষ্ঠী পুণ্ড্র বা পোদ এই বরেন্দ্র অঞ্চলে যে গ্রামীণ সমাজ এবং কৃষ্টি সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক । তাদের হাত ধরেই আর এক অর্থকরী ফসল আখ  চাষে সৃষ্টি । 

হিউ-এন-সাং এর  বর্ণনায় দেখা যায় এখানে ক্ষেতের পর ক্ষেত আখ চাষের দৃশ্যের কথা । 
বরেন্দ্র কবি "সন্ধ্যাকর নন্দী" তাঁর "রামচরিতে" আখ চাষের কথা বর্ণনা করেছেন ।

দশম শতাব্দীতে  আখ থেকে  গুড় উৎপাদন জনিত কারনে এখানে প্রচুর কর্ম কান্ডের সৃষ্টি হয় । কেউ আখ চাষ করে কেউ রস উৎপাদন ,কেউ গুড় তৈরি  এবং কেউ সেই গুড় দেশ বিদেশে রপ্তানি করে।
এইসব পেশা দ্বারা এক বিরাট জনগোস্টি এই বিরাট কর্মকান্ডে   জড়িত ছিল ।

এই সব উৎপাদিত বাড়তি ফসল এবং বস্ত্র এক স্থান থেকে আর এক স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য সে সময় নদী পথ ছিল সবচেয়ে সহজ পথ। তাই নদীকে কেন্দ্র করে এই পুণ্ড্র নগরের ভিত্তি স্থাপন হয়।  তাই পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদী ভিত্তিক একটি বন্দর গুরুত্ব পূর্ণ বন্দরে পরিণত হয়। 

এর পেছনে অবদান  প্রটো অস্ট্রোলয়েড মানুষদেরই । পুণ্ড্র কৃষক যে "প্রটো অষ্ট্রোলয়েড" নরগোস্টি অস্টৃক সংস্কৃতির বাহক তা এখান থেকেই প্রমাণ পায়  । 

চলবে  

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.