| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এইচ এন নার্গিস
আমি একজন লেখক, সমাজ কর্মি , মা এবং মুক্তিযোদ্ধা
12 E(তাম্রলিপ্ত) বঙ্গ আর বাঙ্গালি, শেকড়ের খোঁজে
তাম্র লিপ্ত
প্রাচীন বাংলার প্রাচীন সমুদ্র বন্দর "তাম্রলিপ্ত" । এটি সুমা এবং ভঙ্গ রাজ্যের রাজধানী ছিল ।
কালের অতল গহব্বরে ডুবে গেছে কত সভ্যতা কত নগরী।
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে আজ তা কিংবদন্তীর মত শুনাই । কিন্তু এক সময় তারাই ছিল বিশ্বের বাতি ঘর। আজ আমরা আলোচনা করবো এক বিস্মৃত অধ্যায় যার নাম তাম্রলিপ্ত ।
এ শুধু এক বন্দরের নাম নয় এ এক সভ্যতার স্পন্দন । যেখানে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের ঢেউ এসে মিশেছিল ।
যেখানে ইতিহাস আর কিংবদন্তী মিলে মিশে
এক হয়েছিল । এর প্রতিটি ধুলা- কনায় এবং ভাজে লুকিয়ে আছে ২০০০ বছরের পুরানো প্রাচীন বাংলার গৌরব ।
চলে যায় ইতিহাসের সেই অতল গভীরে । বাংলার হারিয়ে যাওয়া বিশ্বজয়ী সমুদ্র সভ্যতার খোঁজে ।
অবস্থান
বর্তমান পুর্ব মেদিনীপুরে রূপনারায়ণ নদীর তীরে এর অবস্থান। কাছাকাছি ঘাটশিলা নামক স্থানে ছোটো নাগপুরের অন্তর্গত । কপারের খনি থাকায় এই নাম করন ।তাম্রলিপ্তের দক্ষিণে সমুদ্র এবং পূর্বে রূপনারায়ণ নদী থাকার জন্য বন্দরের জন্য একেবারে উপযোগি
স্থান ।
তাছাড়া অসংখ্য ছোটো বড়ো নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল রূপণারায়ন । নদী প্রবাহ এখন কার মত ছিল না । রূপনারায়ণ তখন ছিল অনেক প্রশস্ত এবং গভীর এবং যা সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সাথে যুক্ত ছিল।
রূপ নারায়ণের সাথে যোগ ছিল ছোটো ছোটো অনেক নদীর,যেমন ঘাগরা, গঙ্গা এবং য়ামুনা । ভাগেরথি নদীর প্রণালী সম্ভবত যোগ ছিল এবং সেই সব নদী পথ দিয়ে চলে যেতো মালামাল।
শুধু নদী দিয়েই না স্থলপথ দিয়েও যোগাযোগ ছিল প্রাচীন ভারতের রাজগ্রিহ, শ্রাবস্তি, পাটালিপুত্র,ভানারসী, চম্পা, কুসুম্বি এবং তক্ষ শিলার সাথে।
আর সমুদ্র দিয়ে জাভা, সিলন , সাউথ ইস্ট এশিয়া, চীন, মিশর, রোম এবং গ্রিসে আসা যাওয়া করতো সমুদ্র গামী পণ্য বাহী জাহাজ ।
তাম্র লিপ্তির উল্লেখ
প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য, সিংহলি গ্রন্থ , গ্রিক ভৌগলিক টলেমী, এবং চীনা পর্যটক দের বিবরনে পাওয়া যায় তাম্রলিপ্তির নাম।
ইতিহাস
গুপ্ত আমলে তাম্রলিপ্ত ছিল একটি গুরুত্ব পুর্ন বন্দর। তবে আরকেওলজিসস্ট দের গবেষণায় উঠে এসেছে এই বন্দরের ইতিহাস খ্রিস্টপূর্ব তিন শতাব্দী আগের। খ্রিঃপুর্ব তিন শত অব্দ থেকে পরে ৭০০ বছর পর্যন্ত তাম্রলিপ্ত ছিল বিশ্বের অন্যতম সমুদ্র বন্দর। এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল পুর্বে চীন এবং পশ্চিমে রোম পর্যন্ত। সিল্ক রুটের সাথে এর যোগ ছিল । মুদ্রা, মদ আর কাঁচের জিনিস নিয়ে আসতো রোমের জাহাজ । নিয়ে যেতো বাংলার সূক্ষ্ম মসলিন ,সিল্ক, রেশম বস্ত্র,তেজপাতা,লবঙ্গ দারচিনি আর হাতীর দাঁত এবং কাছিমের খোল ।
"The periplus of the Erythraean Sea" গ্রন্থে লেখা আছে তাম্রলিপ্তি থেকে রেশম রপ্তানির কথা।
পঞ্চম শতাব্দীতে চীনা পর্যটক ফাহিয়েন এখান থেকে সিংহল হয়ে চীনে ফিরে জান । তিনি এখানে দুই বছর ছিলেন । তিনি লিখেছেন এই স্থানটি নিচু এবং আদ্র ।
এর দুই শত বছর পরে হিউএন সাং এর সভ্যতা দেখে বিস্মিত হন । দুষ্প্রাপ্য সব রত্ন ভাণ্ডার এখানে স্তুপ হয়ে আছে। তাই এখান কার মানুষ সম্পদ শালি ।
শুধু বৈভব নয় তাম্রলিপ্তের বাতাসে ভাসতো মন্ত্রের সূর আর জ্ঞানের আলো । বাণিজ্যের হাত ধরে এখানে এসেছিল ভাবনার আদান প্রদান।
এই বন্দর ছিল বৌদ্ধ, জৈন আর হিন্দু ধর্মের এক মহা মিলন স্থান। সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন ।
কারন এই বন্দর দিয়ে বধি বৃক্ষের চারা গিয়েছিল
সিংহলে ।
হিউ-এন-সাং এখানে দশ টি বৌদ্ধ মঠ দেখেছিলেন এবং ১০০০ ভিক্ষুর খোঁজ পেয়েছিলেন । চীন এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারক এই বন্দর দিয়ে গমন করেন।
বিষ্ণু এবং অন্য স্ট্যাচু প্রমাণ করে এখানে হিন্দু ধর্মের প্রসার ঘটেছিল।
তাম্র লিপ্ত ছিল এক বহুত্ব বাদি সমাজ ।সব ধর্ম একে ওপরের হাত ধরে বিকেসিত হয় ।
তবে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। যে নদী তাম্র লিপ্ত কে দিয়েছিল প্রাপ্তি সে নদীই ফিরিয়ে নায় তার প্রান ।
অষ্টক শতাব্দীর পর থেকেই গঙ্গা আর তার শাখা নদী গুলো তার গতিপথ পরিবর্তন শুরু করে।
যার ফলে রূপনারায়ণে ব্যাপক পলি আসে ।
এর গভীরতা কমতে থাকে ।সমুদ্র পিছিয়ে যায় অনেক দক্ষিণে ।
ফলে বড় বড় জাহাজ আর বন্দরে ভিড়তে পারছিল না।
প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সাথে যোগ হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা । পাল সাম্রজ্যের দুর্বলতা এবং সেন বংশের উত্থান আর সপ্ত গ্রামের মত নুতুন বন্দরের বিকাশ এই সব কিছু মিলিয়ে এই তাম্র লিপ্তের গৌরব সুর্য ধীরে ধীরে অস্ত চলে যায় ।
এক সময়ের ব্যাস্ততম বন্দর পরিণত হয় সাধারণ জন বসতি তে। এবং তার কর্ম কাণ্ড চাপা পড়ে যায় ইতিহাসের বিস্মৃতির আড়ালে।
আজ তাম্র লিপ্তের মাটিতে কান পাতলে শোনা যায় অতীত ইতিহাসের কোলাহল ।
আর আর্কেও লজিস্ট (আরকেওলজি সার্ভে অব ইন্ডিয়া ) মাটি খননে পায় অতীতের অনেক আর্ট ইফেক্ট ।
+) প্রস্তর যুগের পাথরের কুঠার এবং প্রাথমিক অবস্থায় থাকা সাধারণ মাটির পাত্র ।
+) Pictographic (চিত্র লিপি ), Hieroglyphics (প্রাচীন মিশরীয় চিত্র লিপি ) দিয়ে লেখা সিল পাওয়া গেছে ,যা প্রমাণ করে মেডিটেরিয়ান রুটের প্রমান ।
+) ক্রিট এবং মিশরের টেরাকোটা ফিগার
+) র্যাম্পড ফ্লোর এবং পাত কুয়া
+) 3rd অব্দ (BC) মুদ্রা এবং টেরাকোটা ফিগার, সুঙ্গা আমলের
+) ইটের তৈরি সিঁড়ি ,ট্যাঙ্কে উঠার ,৩য় শতাব্দী AD
+) সত্য ভানা কিং এর বোট সিম্বলের কয়েন
+) রোমান গোল্ড কয়েন
+) মোঘলমারি তে বুদ্ধ বিহার
আন্তর্জাতিক বেনিজ্যের প্রমাণ
যেমন ১) মৌর্য আর কুসান যুগের মুদ্রা, ২) রোমান এম্পরারের ভগ্ন মূর্তি । ৩) রুলেটেড পাত্র ৪) উত্তর ভারতের কালো মসৃণ মৃৎ পাত্র যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রমাণ।
অতীতের এই গৌরবের বন্দর আজ উদাসীন ঘটনার চিহ্ন । তাম্র লিপ্ত কোনো ইট পাথরের গল্প নয় ।এ হলো বাঙ্গালী এবং বিশ্ব জয়ের বিস্মৃত অধ্যায় । কি ভাবে একটি জাতি সমুদ্রকে জয় করে নিজের ভাগ্য রচনা করতে পারে তারই জ্বলন্ত প্রমাণ । এর উত্থান যেমন এক গৌরব গাথা এর পতনও তেমন একটি শোক গাথা ।
তবে একটা কথা বঙের বাঙ্গালী মনে রাখবে এবং রাখা উচিৎ সেই প্রাচীন বাংলায় বাঙ্গালী দুর্বল ছিল না। হীন ছিল না। তারা কে নিচু করার চেষ্টা করা হয়েছে। ম্লেচ্ছ বলে উপেক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু তারা জানে কি ভাবে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হয়।
চলবে
©somewhere in net ltd.