নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

পথহারা পথিক আমি

কৈশোর হারানো এক হতভাগ্য যুবক

পথহারা পথিক আমি › বিস্তারিত পোস্টঃ

দূর্বাঘাসের জীবন

০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৭ দুপুর ১২:০২

বদমাশটা কোনটে গ্যাছে? আজ আসুক এলা। দেখিম, অর একদিন কি মোর একদিন। দাঁত কিড়মিড় করে রাগী গলায় বলে উঠলেন রাজ্জাক হোসেন। কপালের ভাঁজগুলো তার নদীর পাঁকের মতো গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে, ঝুলে পড়েছে গালের গোশত শুকিয়ে খোল হয়ে যাওয়া চোয়াল দু’টো।
সেই কখন কাকা করে ডেকে গেছে ভোরের কাক। ঘুম ভাঙা পাখিগুলোও অন্নের সন্ধানে ফাঁকফোকর থেকে বেরিয়ে আটঘাট বেঁধে মিছিলে নেমেছে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে। তাদের সাথে সম্মতি জ্ঞাপন করতেই কিনা বাড়িপোষা গরুগুলোও হাম্বা হাম্বা ডাকে অস্থির করে তুলেছে চারপাশ, কোথাও এতটুকু স্বস্তি নেই।
ভিটেয় থাকা ধানী জমিগুলো দেখে এসে রাজ্জাক হোসেন ঘরের বারান্দায় মাটিতে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তাঁর চাল-চলন তেমন সুবিধার বলে মনে হচ্ছে না, যেকোনো সময় অনর্থক ঘটনা ঘটাতে পারেন। গতদিন সন্ধ্যায় কার বকরী যেন তার খেতের একাংশের ধান খেয়ে উদরপূর্তি করেছে। রাগটা তাই মনের ভেতর ক্রমেই বাষ্পীভূত হচ্ছে তাঁর, যেকোনো সময় বায়ুভরা চাকার মতো বিকট শব্দে ফেটে যেতে পারেন। রাগত চোখজোড়ায় সামান্য দয়া-মায়া পর্যন্ত অবশিষ্ট নাই, শক্তপোক্ত কামারের পেটানো লোহার মতো সেগুলো লাল অগ্নি ছাড়ছে। ভূমিকম্পে আক্রান্ত শক্ত ভিতের পুরনো ভাঙা বাড়ির ঘুণে খাওয়া দরজা জানালার মতোই শরীরটাও ঠকঠক করে কাঁপছে, এই বুঝি ভেঙে পড়বে পড়বে ভাব।
কি হচে তুমার? আজ আবার কি হল, এমন করতেছেন ক্যান?
রান্নাঘর হতে পাতিলের শব্দ শোনা যাচ্ছে, কুন্ডলিত কালো ধোঁয়ায় ভরে গেছে চারপাশ। তার মধ্যেই খুক করে কেশে খানিক পর মরিচ ধরানো কণ্ঠে সফিয়া বেগম আবারো বললেন-
রোজ রোজ ছ্যোল টের সাথে আগ না করলে হয় না? তার কোমা খ্যাউত খ্যাউত করা অব্যেস হয়ে গেছে।
পাক ঘরে রান্নার কাজ করছিলেন তিনি, ভাত-তরকারি শেষে চুলোর উত্তপ্ত আঙরা দিয়ে মরিচ পোড়াচ্ছিলেন, লাল-কালো ছোপছোপ পোড়া মরিচ ছাড়া একবেলাও খেতে পারে না রাজ্জাক হোসেন। তার এ অভ্যেস অনেক ছোট থেকেই হয়েছে।
সকাল নেই, বিকেল নেই সারাক্ষণ বাড়িতে শুধু ক্যাচাল লেগেই থাকে। সবসময় এ জিনিস কার ভাল লাগে? সখেদে কথাগুলো বলছেন আর খুক খুক করে কাশছেন।
রাজ্জাক হোসেন স্বৈরাচারী মানুষ, নিজের মতের বিরুদ্ধে কিছু শুনতে পারেন না। মহাকালের মতো তিনি যা বলবেন তাই যেন ঠিক। সবাইকে সেটাই করতে হবে। স্ত্রীর কথা শুনে রাগটা আরো বেড়ে গেল তার, প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা গরম আবহাওয়াটা জেঁকে ধরলে বললেন-
মরিস নে তুই? মর। দুনিয়ার এত মানষের মরণ হয়, তোর মরণ হয় না। আযরাইল বাড়ির রাস্তা ভুলে গ্যাছে নাকি?
ছেলের রাগটা এখন মায়ের ওপর পড়ল।
সেদিন মাছ ধরার ছল করে সেই ভোরেই বাড়ি হতে উধাও হয়েছে ছেলেটা। প্রত্যেক দিন কিছু না কিছু কারণ থাকেই তার। তবে এমনও হয়- কোন কোন দিন সে রাতের আজানের সময় উঠে বাড়ি হতে বাহির হয়, কয়েক বাড়ি পরে থাকে মাসুদ, সে সহ আরো কয়েকজন মিলে অন্ধকারে টর্চ জ্বালিয়ে মাছ ধরতে যায় নদীতে, বহু মাছ পাওয়া যায় তখন। মাঝে মাঝে যখন কোন মাছই ওঠে না, কাঁকড়া আর টোপা মাছ ছাড়া কিছু ভাগে পড়ে না কারো, তখনো নিরুৎসাহিত হয় না তারা, মাছে যায়। মনে করে ভাগ্যে এতটুকুই ছিল।
কি হল? আও করিস না ক্যা? আজও মাছত গ্যাছে নাকি? বলেই নাক দিয়ে একটা ঘোৎ করে শব্দ করলেন। সফিয়া চমকে উঠলেন সে শব্দে, তারপর নিতান্তই বিরক্তি সহকারে বললেন-
গ্যালে কি করবেন, মারে ফেলবেন? নিজের ছ্যোলোক্ গলাটিপে মারে ফেলেন, দশ গ্রামের মানষে কিছু কবার নয়, মুই কোম্ এমনি মরে গ্যাছে।
তখন রাজ্জাক হোসেন আর কথা বাড়ালেন না, রাগটা ঝাড়তে বিড়বিড় করে আক্ষেপের সাথে বললেন- কাল কনু একবার জমিগুলো দেখে আয়, কিছু খাবার পারে। না, জমিদারটা গ্যাল নে, ঘাই মেরে থাকিল্। মনটা কয় ঘাড়টা ধরে বাড়ি থেকে বাইর করে দেও। কাজ কাম কিছুত নাই, খালি ঘুরে বেড়ায় আর খায়। একটা অপদার্থের জন্ম দিছো মুই। মোর কপালত এল্লে হবি ক্যা?
তার মুখের দিকে আর তাকানো যাচ্ছিল না, চরম অসহায়ত্বে ভরে গেছিল মুখখানা। আসলে যে সব তিনি সহ্য করতে পারেন না, তার কপালে সে সবই পড়েছে।
গরমের আধিক্য সহ্য করতে না পেরে পরনে থাকা নব্য-পুরনো ময়লা গেঞ্জিটা পাটির একপাশে রেখে স্কুলের জন্য পড়া তৈরি করতে লেগে গেছে বদরু। তার স্কুলের শিক্ষকরা বড় কড়া, পড়া দিতে না পারলে কপালে জোটে কঠিন শাস্তি। মেঝেতে আঁখির বিছিয়ে নিল ডাউন করে দু’হাতে দু কান ধরিয়ে পিছনে সপাৎ সপাৎ দু’চার বেতের বাড়ি দেন, নয়তো সূর্যমুখীর মতো দাঁড়িয়ে রাখেন একপায়ে। মাগো , বাবা গো বলে চিল্লালেও আর শেষ রক্ষা হয় না। যতক্ষণ না তাঁদের মনের খায়েস মেটে ততক্ষণ বেতাতেই থাকেন।
কি রে বদরু, তুই আবার পড়া থামালু ক্যা। পড়া ছাড়া কি করে খাবু? বড়টা তো গোল্লায় গেছে, তুইও যেতে চাস না কি?
পড়া থামিয়ে সে চুপিচুপি বাবার কথা শুনছিল, ক্লাস ফোরে পড়ে, মোটামুটি ভাল ছাত্র। রাজ্জাক হোসেন এতক্ষণ বিষয়টা খেয়াল করেন নি, বোধ হতেই বলে উঠলেন- ভাইয়ের ওপর ভর করে থাকিস এলা, পরে দেখবু ভাই উইড়া গেছে ফুড়–ৎ কইরা, তখন আঙুল চুছিস।
বলেই হাত দিয়ে এমন একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করলেন যে, গাছে বসে থাকা কাকগুলো ডাকাডাকি বন্ধ করে তার দিকে চেয়ে রইল। বদরু ঘরের ভেতর বসে ছিল, তাই তার নজরে পড়ে নি, না হলে সেও হেসে কুটিকুটি হত।
কথাটা যেন তাকে প্রবল একটা ধাক্কা দিল। সেই দুর্নিবার ধাক্কার জোরে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বদরু গেঞ্জিটা পরে নিল। বাবাকে সে স্কুলের শিক্ষকদের মতো ভয় করে, রেগে থাকলে তার সামনে সে আঙুলের ডগার মতো নরম বাতাসে শব্দগুচ্ছ ছুড়ে দিতে পারে না ঠিকমতো। তবে হাসি খুশি থাকলে ভিন্ন কথা, তখন তার কণ্ঠ দিয়ে মধুর মতো গলগল করে নিঃসৃত হতে থাকে মিঠে মিঠে বুলি।
ধমক খেয়ে বদরু আবার পড়া শুরু করল, আগের মতো আর মনোযোগ পেল না তবু পড়তেই থাকল-
পালকি চলে!
পালকি চলে!
গগন তলে
আগুন জ্বলে।
আধা-পোড়া খড়িটা চুলো হতে বের করে এনে মাটিতে ঘষে ঘষে আগুন নেভানোর পর সফিয়া বেগম সেটা চুলোর দক্ষিণ পাশের পিঠে মৃত মানুষের মতো টান টান করে ফেলে রাখলেন। আস্তে আস্তে বাতাসে থাকা কালো ধোঁয়াগুলো কেটে গিয়ে পরিবেশে একটা পরিচ্ছন্ন ভাব বিরাজ করছে। এবার তিনি আলু ভর্তা করবেন, এতকিছু শোনার সময় নেই তার। ডালাটা ঘেঁটে দেখলেন রসুন-পেঁয়াজ একটাও নেই। কম পরাতে বদরুকে ডেকে বললেন-
বদরু, ওই বদরু, ছাদের ওপর থ্যাকে কয়টা অসুন দিয়ে যা তো বাবা, আনতে মনে আছিল না। না হলে তরকারিত স্বাদ হবান্যায়। সাবধানে মইয়ে চড়িস।
মায়ের কথায় দৌড়ে গিয়ে সে মইয়ে চড়ে, মাটি বিছানো ছাদ হতে দু’চারটা রসুন এনে দেয়।
রাগ কমার পর রাজ্জাক হোসেন বাসি গোবর ফেলতে গোয়ালঘরে যান। প্রায়ই এ কাজটি করতে হয় তাকে, মাঝে মাঝে অবশ্য সফিয়া বেগমের ভাগেও পরে। তিনি নিজে আর কত দিক সামলাবেন? মনে মনে চান এখন থেকেই বড় ছেলে অল্প অল্প করে সংসারের দায়িত্ব ঘাড়ে নেওয়া শিখুক। কিন্তু কে শোনে কার কথা, শফিকুল তার মনের কথা বুঝতেই পারে না, আর বুঝলেও না বোঝার ভান করে পাশ কেটে চলে যায়। ছেলের এহেন দায়িত্বজ্ঞানহীনতা রাজ্জাককে গভীরভাবে ভাবায়।
গাধাগুলো কি করেছে ঘরটার? দুইটা মাত্র গরু তাদের গোবর দেখলে বাঁচা যায় না, দুনিয়াটা খায় আর ইচ্ছা মতো হাগে। হাগা দেখে মনে হয় যেন এক একটা হাতির বাচ্চা।
বিড়বিড় করে গালি দিতে দিতে কোদালে গোবর তুলে ডালিতে রাখেন। ছোটবেলায় এর ওর মুখে শেখা গালিগুলো বৃথা যায়নি তার, কোথাও না কোথাও কাজে লেগেছে। বাড়ির পূর্ব-দক্ষিণ কোণে ছন দিয়ে বানানো গোয়ালঘর, তার সাথেই বাড়ির বাইরের দিকে ছাউনি আর সেখানে বাঁশ দিয়ে বানানো গরুর খাওয়ার চারি। গোবর ফেলানোর পর গোয়ালঘর থেকে বের করে গরুগুলোকে সেখানেই রাখলেন তিনি। তারপর বাড়ির পাশের জমিতে লাগানো গাছ দেখতে গেলেন। সেদিনই যে প্রথম গেলেন তা নয়। প্রতিনিয়তই যান আর চোখ দিয়ে উচ্চতা মাপেন গাছগুলোর। তবে মজার কথা হল- হাজার মেপেও কাজ হয় না, তারা না বাড়ে দৈর্ঘ্যে না বাড়ে প্রস্থে।
বদরু, ও বদরু খেয়ে নে বাবা। ম্যালা বেলা হয়ে গ্যাছে যে, স্কুলত্ যাবি নে ? তোর বাবাকেও ডেকে আন তো। মানুষটা সক্কাল থেকে কিচ্ছু খায়নি, খালি মিছেমিছি রাগারাগি করে।
বলেই জগ ভরাতে সফিয়া বেগম টিউবওয়েলের পাড়ে যান, একপাশে অবহেলায় বেড়ে ওঠা জাম্বুরা গাছটা অনেক বড় হয়েছে।
স্কুলের কিছু পড়া বাকি থাকা সত্ত্বেও সে উঠে পড়ে। বেশিক্ষণ পড়তে পড়তে বিরক্তি ধরেছে তার, গুটিগুটি পায়ে বাড়ির বাইরে এগিয়ে যায়, দেখে রাজ্জাক হোসেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গাছ দেখছেন। কিছু সময় অপেক্ষা করার পর পেছন থেকে বাবাকে ডাক দেয় -
বাবা, ও বাবা। মা তোমাকে ভাত খেতে ডাকতেছেন। তাড়াতাড়ি আসো , খুব খিদে পেয়েছে মোর।
সে বেশিরভাগ সময় বাবার সাথেই ভাত খায়, তার সাথে না খেলে নাকি ভাত হজম হয় না তার। রাজ্জাক হোসেনও কম যান না যখনই খেতে বসবেন তখনই বদরুকে ডাকেন। ছেলের ডাক শুনে তিনি পিছন ফিরে চান, বদরুকে দেখে বলে ওঠেন-
বাবা তুই যা, মুই আসতেছোম।
হ, তাড়াতাড়ি আসেন কিন্তু। দাদীও ভাত খায় নাই। বলেই বদরু জোর কদমে বাড়ির ভেতর ঢুকল।
তার দাদী ছুরতুন্নেসা বিছানায় শুয়েই ছিলেন, বয়স হয়ে গিয়েছে তাই হাজার চেষ্টা করেও ভোরবেলা আর উঠতে পারেন না, অসুস্থই থাকেন বেশি। বদরুর দাদাজান অনেক আগেই ইহলোক ত্যাগ করেছেন। সেদিনের কথা মনে হলে আজও কান্না পায় তার। বুড়ীর সে কি বিলাপ! মাটিতে গড়াগড়ি। চোখে না দেখলে বিশ্বাস হত না- একজন মানুষ আরেকজনকে এ রকম ভালোবাসতে পারে। সেই ভালোবাসার ইতি বিধাতা বড্ড বেশি তাড়াতাড়িই টেনে দিলেন।
রাজ্জাক হোসেনের আসতে খানিকটা দেরি হয়ে গেল। তিনি সহজে গাছের মায়া ছাড়তে পারেন না, জরুরি কোন টাকার দরকার না হলে সহজে গাছ কাটবেন বলে মনে হয় না।
গোসল শেষে বাপ-বেটা, দাদী সবাই মিলে বারান্দায় পাটি বিছিয়ে খেতে বসল। আলু ভর্তা, গড়াই মাছের ভর্তা আর বেগুনের তরকারি দিয়ে ভাত খাচ্ছিল তারা। আলু ভর্তা বাদে বাকি গুলো বেশ ভালোই হয়েছিল।
শফিকুলটা যে এ্যাখনো এলো না বদরুর মা। ছেলেটা বখে গ্যাল নাকি? ঢকঢক করে পানি খেতে খেতে বলে উঠলেন রাজ্জাক হোসেন, ছেলেকে নিয়ে তিনি খুব চিন্তিত। আগের থেকে কপালের ভাঁজগুলো আরো গাঢ় হয়েছে তার।
ছি, এ্যাসব কি বলেন আপনে? ছ্যোল হামার বখাটে হতে যাবি ক্যানে? ওই এনা ঘুরতে পছন্দ করে। এখনকার বয়সটাই তো ঘুরাঘুরি করার। দ্যাখেন ছ্যোল এ্যাকদিন অনেক বড় হবি। সফিয়া সান্ত¦নার স্বরে জবাব দিলেন। স্বামীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা স্বতস্ফুর্ত ভারি শ্বাসটা তিনি ধীরে ধীরে ফেললেন, টের পেল না কেউ।
রাজ্জাক আর কোন কথা বললেন না, সন্তানের মন্দ নিয়ে বেশিক্ষণ কথা বলতে নেই। বিধাতা না করুক ফলেও যেতে পারে। এই ভয়ে তিনি চুপ থাকলেন।
(চলবে)

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.