নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

পথহারা পথিক আমি

কৈশোর হারানো এক হতভাগ্য যুবক

পথহারা পথিক আমি › বিস্তারিত পোস্টঃ

কেঁদো না শ্রাবণী

১০ ই জানুয়ারি, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:২৯

এক:
সেদিন ছিল রুপোজল ঝরা শ্রাবণের বিষণ্ণ দিন। ভোর থেকেই নীলাকাশে মেঘেরা গুনগুন করছিল। বেলা গড়িয়ে টিমটিম করে যখন দুপুর হতে শুরু করলো তখন কালো মেঘে সারা দুনিয়া অমাবস্যার অন্ধকারে ঢেকে এসে আদিম মানবের একথলে আবেগের মতো প্রবল বৃষ্টি নামছে। আষাঢ়ে আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে সময় কাটাতে এলাকার বয়স্করা বসে জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছিলেন জলিলের চায়ের দোকানে। প্রবীণ মানুষেরা একজায়গায় হলে যা হয় আরকি, পরে যাওয়া দাঁতের ফাঁক দিয়ে কথার তুবড়ি ছোটান। তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগ কথা-বার্তাই হয় উচ্ছন্নে যাওয়া দেশ আর বাসি হওয়া পঁচা রাজনীতি নিয়ে।
‘আরে, কি যে বলো কায়েম মিয়া ?’
অনেকক্ষণ ধরে উশখুশ করতে থাকা ইউনুস আলী এবার সুযোগ পেয়ে নড়েচড়ে বসলেন। এমনিতেই সে খুব খুঁতখুঁতে মানুষ। সহজে হজম করতে পারল না কায়েম মন্ডলের কথা। তাই বিকট গলায় বললে- ‘কেবল এক পক্ষের দোষ দিলেই চলবে? এর আগের সরকারও ধোয়া তুলসি পাতা ছিল নাকি? সব শুয়োরেরা একই পালের গোদা। দেশের যাই হোক না কেন, নিজেদের চ্যাটটা মোটা হলেই হলো। এই দেখবা, সকালের মিছিলে একে অপরের টুটি চেপে ধরছে, আবার রাতেই সব ভুলে গোয়ায় গোয়ায় পিরিত লাগায়। হারামীদের লাজ লজ্জা বলতে কিচ্ছু নেই। আরে ভাই, পিরিত লাগাবি লাগা। ভালো কথা। তয় দিনের পিরিত আর রাতের পিরিতের মধ্যে তফাৎ করিস কেন।’
কথাটা শেষ হতে না হতেই দোকানের সবাই হো হো করে হেসে উঠে। কথাবার্তার সময় বড্ড বেশি বেসামাল হয়ে পড়েন ইউনুস, শ্লীলতার ধার-টার ধারে না। যখন যা মনে আসে কোন ভাবনা চিন্তা ছাড়াই পট করে বলে ফেলেন। রাজীব দেখল বৃষ্টির গতি আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। সেদিকে কারো খেয়াল নেই। গল্পরস আস্বাদনে ব্যস্ত দোকানের সবাই। শিরশির করে বাতাস বইছে। এমন মেঘলা দিনে বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে ইচ্ছা হয়। দরজা ভিজিয়ে, হৃদয়ের দরজা-জানালা খুলে পুটুর পুটুর গল্পের নাও বায় নব দম্পতিরা। রঙিন হয়ে ওঠে নব জীবনের হাতছানিতে উদ্বেলিত তাদের রোমান্টিক মনের প্রতিটি কোণা। প্রিয়জন হারানো কারো কারো মনে বিষণ্ণতার সুরও মাঝে মাঝে বেজে ওঠে।
কিছু সময় আগে রাজীব জলিলের দোকান থেকে চা নিয়ে বারান্দায় বসেছে। ধোঁয়া ছড়ানো কাপে থেকে থেকে চুমুক দিচ্ছে আর চাচাদের কথা শুনছে। রাজনীতির প্যাঁচ তেমন না বুঝলেও তাঁদের কথাবার্তার নিগূঢ় অর্থ বুঝতে তেমন কোন সমস্যা হয় না তার। নিজে কিছু বলতে না পারলেও শুনতে তার বেশ আরাম লাগে। ছোটবেলা থেকে সে এই অভ্যাসটা বেশ শক্তভাবে রপ্ত করেছে। তার একটা কারণ অবশ্য, ছোটতে প্রতিদিন শামীম মামা তাদের দুই ভাই রাজীব আর আদনানকে খবরের কাগজ পড়ে শোনাতেন। খেলার খবর, বিশ্বের খবর, সম্পাদকীয়। মাঝে মাঝে টুকটাক রাজনীতি নিয়েও গল্প করতেন তিনি। তখন অবশ্য এসবের কিছুই বুঝতো না তারা। মামার কথায় বারবার মাথা নাড়িয়ে শুধু হু হু করতো। ভুল হোক বা ঠিক হোক সব কথাতেই তাদের হু থাকত। তবে মামা তাদের ওপর কখনো রাগ করতেন না। মাঝে মাঝে শুধু দুইজনের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিতেন।
‘রাজীব, এই রাজীব। কি হয়েছে তোর?’ পাশের চেয়ারে বসা রবিন হাতে ঈষৎ একটা ঠেলা দিয়ে জিজ্ঞেস করল। উদাসী ভাব ভেঙে চমকে উঠে রাজীব। সত্যিই তো কী ভাবছিল সে? খানিকক্ষণ চুপ থেকে শুকনো হওয়া মুখে বলল- ‘কই কিছু না তো? হঠাৎ কেন জানি আদনানের কথা মনে পড়ল রে। ও থাকলে সেও হয়তো আমাদের সাথে বসে চায়ে চুমুক দিত। মনোযোগ দিয়ে গল্প শুনতো চাচাদের। মাঝে মাঝে খিলখিল করে হাসতো। কিন্তু বিধাতা তা হতে দিলেন না।’
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুক চিরে। টের পেল কি যেন গলে পড়ছে বুকের বাম পাশের জায়গাটা হতে। ইন্দ্রিয়গুলো শূন্য হয়ে গেছে তার। ভালো লাগছে না কিছুই আর। রবিনেরও দীর্ঘশ্বাস পড়ল। সমবেদনার কোন ভাষা নেই, আছে বোবা অনুভূতি। বুকে চেপে থাকা ভারটা নামাতে রাজীব বলেই চলে-‘জানিস, চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে আদনান মারা গিয়েছিল। তখন ও দশম শ্রেণীতে পড়ে। আর আমি পড়তাম নবমে। যমজ হওয়া সত্ত্বেও ওর থেকে এক ক্লাস পিছিয়ে পড়েছিলাম। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সকাল দশটায় স্কুলে গেলাম আমি। হঠাৎ একদিন রাতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল আদনানের। কী ভীষণ জ্বর! সারারাত পাগলের মতো প্রলাপ বকতে থাকলো। কয়েকদিন স্কুলেই যেতে পারলো না বেচারা! ডাক্তার ডাকা হয়েছিল কিন্তু কোন লাভ হয়নি।’
‘খবরটা পেয়েছিলাম কড়া দুপুরে। বাংলা ক্লাসের সময়। শোনার সাথে সাথেই ক্লাশে বই খাতা ফেলে বাড়িমুখে এক দৌড় দিলাম। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি পৌঁছাই। মনে শুধু একটা সত্যই বারবার আঘাত করছিল, আমার ভাই আর নেই। ওরা বলল কাফনে মোড়ানো লাশটা নাকি ভাইয়ের। আমার যমজ ভাইয়ের।’
সে আর কোন কথা বলতে পারল না। গলাটা ধরে এসেছে। মুখটা চেপে ধরে কোনরকমে চুপ হয়ে গেল। রবিন উদাস চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। এ ছাড়া সে আর কিই বা করতে পারে? চলে যাওয়া মানুষের স্মৃতি মানুষকে ভাবায়। মনে জাগিয়ে তোলে ‘যদি’ সম্বলিত অনেক প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর কেউ জানে না। প্রতিটা মানুষই এক একটি জীবন গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। সে মারা গেলে গল্পটিরও মৃত্যু ঘটে। ফাঁকা স্থানে জায়গা করে নেয় নতুন আরেকটি গল্প। স্বাভাবিক হতে রাজীবের বেশি সময় লাগল না। চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে নেয়। এখন বেশ আরাম লাগছে। আড়চোখে ঘড়িটার দিকে নজর পড়তেই দেখে দু’টো বেজে গেছে। বাড়ি যেতে হবে। থমথমে গলায় সে বলে- ‘চল, বাড়ি যাই। আর ভালো লাগছে না। দেরি করে গেলে বাবা অনেক বকবে।’
রবিন মুখে শুধু একটা হু শব্দ করে। খুলে রাখা দু’পায়ের স্যান্ডেল পায়ে গলিয়ে চায়ের দাম মেটাতে উঠে দাঁড়ায় রাজীব। এমন সময় দেখে, শিহাব বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দোকানের দিকে আসছে। গায়ে কালো শার্ট, পরনে ঘিয়ে রঙের নজরকাড়া প্যান্ট। দুটোই পানিতে ভিজে একাকার। কাছে আসতেই রবিন উঠে দাঁড়ায়। আদার চিবানো টুকরোটা মুখ থেকে মাটিতে ফেলে বলে- ‘কিরে কি খবর? বৃষ্টিতে ভিজলি কিভাবে ?’ শিহাব কোনো উত্তর দেয় না। কোন রকমে টিনের পানি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে এনে কাচুমাচু হয়ে বেঞ্চে বসে। মুখটা অনেক ভার।
‘কি রে কি হইছে? কথা বলছিস না কেন?’
রাজীবও কোন জবাব পায় না।
রবিন দেখে রাজীব খানিকটা মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে। ওরা বসে পড়ে। শিহাবের এই স্বভাবটা কেমন জানি খুব গা জ্বালানো! কোন ব্যাপারে বেশি আগ্রহ দেখালে সেটা বলতে ও অনেক সময় নেয়। আরো মিনিট দুয়েক কাটে, কেউ কোন কথা বলছে না। তাদের অনাগ্রহ দেখেই কিনা মাঝে মাঝে শিহাব মুখ দিয়ে খেমছি কাটছে। তবু কোন পাত্তা পাচ্ছে না। উপায় না পেয়ে অবশেষে প্রকাশ্য বিরক্তি সহকারে রাজীবকে উদ্দেশ্য করে বলে-‘তোকে খুঁজতে তোর বাসায় গেছিলাম। কিন্তু পেলাম না। খালাম্মা বলল, তুই বাসায় নাই। ঘুরতে ঘুরতে তাই এদিকে আসলাম।’
বন্ধুদের মাঝে একমাত্র রাজীবই বড়লোকের ছেলে। দু’তলা বাড়ি ওদের। মেঝেগুলো সাদা মার্বেল পাথরে গড়া। সেজন্য ওদের বাড়িকে রবিনরা বাসা বলে ডাক। বাড়ির পিছনে বড় একটা দীঘি। সবসময় ঘাটে একটা নৌকো বাঁধা থাকে। বিশাল সম্পত্তি তাদের। ধানের সময় প্রচুর ধান পায়।
শিহাবের কথা শুনেও না শোনার ভান করে রাজীব। কেবল একবার ওর পানে মুখ তুলে চেয়ে আবার মাথা নামিয়ে নেয়। বোধ হয় মনে খানিকটা চোট পেয়েছে বেচারা। মন খারাপ হলে রাজীব চুপ থাকে। সামান্যতম শব্দও করে না। প্রত্যেক মানুষই আলাদা। তাদের অনুভূতির প্রকাশভঙ্গিও ভিন্ন। আচমকা একটা হাওয়া বইতে শুরু করে। প্রশান্তির ছোঁয়ায় শিউরে ওঠে তাদের শরীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা পরজীবী লোমগুলো। ঝাপটাটা সামলাতে না পেরে গা টা ঝাঁকি দিয়ে উঠলো রাজীবের। বেশ শীত শীত করছে তার। জ্বর আসতে পারে। অবচেতনভাবেই নাক টানে সে।
কায়েম মন্ডল আর ইউনুস আলীদের গল্প এখনো রসের বেগে চলছে। কান পাতলে একটু পর পরই শোনা যায় হাসির শব্দ। দেখলে মনে হয় কত সুখি তারা। কিন্তু কে বলবে, এখানকার মধ্যে সবার জীবনই সমস্যামুক্ত নয়। এই যেমন সিগারেটে টান দেয়া কায়েম মন্ডলের আদরের মেয়ে শিউলীর কিছুদিন আগেই স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। দুই বছর ধরে ইউনুস আলী ডায়বেটিসে ভুগছে। আর কোণার চেয়ারে বসা মাহাবুব আলম এক পায়ে হাঁটে। অন্য পা টা তাকে পঁচন রোগে হারাতে হয়েছে। এত কষ্টের মাঝেও সুখে আছে তারা। হাসি ঠাট্টা করছে। জীবনের শেষ কয়েকটা দিন ভালভাবে যাপন করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে চায়।
নিজেদের মাঝের থমথমে ভাবটা কাটাতে রবিন শূন্য কাপটা ডান হাতে ঘুড়িয়ে বলে- ‘ভালো করেছিস। কোনো দরকারে এসেছিলি?’
না, সেরকম কিছু না। কোন দরকার টরকার নয়। এমনি গিয়েছিলাম আরকি! বলেই বাঁ হাত দিয়ে মাথার পিছনটা চুলকাতে থাকে শিহাব।
এবার রাজীবকে উদ্দেশ্য করে বলে-ও আচ্ছা ভাল কথা, তোদের বাসায় কোনো অতিথি এসেছে নাকি?
মুখ তোলে রাজীব। কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে না তার। আবেগগুলো কেমন জানি জড়িয়ে গেছে। তবু অনিচ্ছা নিয়ে ভারী গলায় বলে-‘নাহ্, এই বর্ষার দিনে আবার কে আসবে? কেন, কি হয়েছে রে?’
‘খালাম্মার সাথে একটা মেয়েকে দেখলাম। বেশ সুন্দরী। বিস্কুট খেতে খেতে গল্প করছিল। ভাবলাম যদি একটা সুযোগ নেয়া যায়। তাই জিজ্ঞেস করলাম।’ বলেই শিহাব তার বিচ্ছিরি দাঁতগুলো বের করে অদ্ভুতভাবে হাসতে থাকে।
রাজীব আর রবিন বিহ্বল হয়ে যায়। বলার মতো কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। কয়েকদিন ব্রাশ না করা শিহাবের হলুদ দাঁতের দিকে চেয়ে আছে। আর ভাবছে ছোড়াটা এমন ক্যান ? তার বদ মনে লুকোনো কথাগুলোকে রাজীব আর অহেতুক ডালপালা মেলতে দিল না। জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে হাতে তুড়ি বাজিয়ে বলে - ‘আরে, এই কথা। এরকম বহু মেয়ে আমাদের বাসায় প্রতিদিন যাওয়া-আসা করে। এটা কোন ঘটনা হল নাকি। আসলে ওরা সবাই আম্মুর ছাত্রী।’ শেষের কথাটা বলার সময় স্বরে আলাদা একটা দ্যোতনা সৃষ্টি করল সে।
’মেয়েটাও হয়তো তাঁর ছাত্রীই হবে। বাদ দে এসব কথা । কাজের কথায় আয়।’
বৃষ্টির বেগটা মন্থর হয়ে গেছে। চায়ের দামটা মিটিয়ে দিয়ে বাড়ির পথ ধরে তারা। যাওয়ার পথে শুরুতেই রাস্তার ধারে রাজীবদের বাসা। তারপর কিছুদূর হাঁটলেই গ্রামের রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে মিনিট দশেক দূরের রাধাঁকেষ্টপুর গ্রামে পাশাপাশি বাড়ি শিহাব আর রবিনের। সম্পর্কে ওরা চাচাতো-জেঠাতো ভাই। হাজার বছর ধরে লালন করা বাঙালির একান্নবর্তী পরিবারের সন্তান তারা। কোনরকমে কষ্টে-সৃষ্টে দিন কেটে যায়। শিহাবের বাবা জমিতে কাজ করে। আর রবিনের বাবা ভ্যানচালক। দুবেলা দুমুঠো খেতে পেলেই খুশি থাকে। সাধ-আহ্লাদ বলতে বছরের দুই ঈদে সেমাই-মুড়ি আর মাঠের নামাজের আগে মুরব্বীদের কাছ থেকে পাওয়া দুই চার টাকা সেলামী ছাড়া আর কিছু আছে বলে মনে পড়ে না।
হাঁটতে হাঁটতে যখন তারা রাজীবের বাসার সামনে পৌঁছায় তখন রাজীব চোখ বড় বড় করে বলল-‘চল দেখি, সবাই বাসায় যাই। ব্যাপারটা খুঁটিয়ে দেখা দরকার।’ শিহাবের চোখগুলো চিকচিক করছে। সে আর রবিন কয়েকবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। নানা দিক চিন্তা করে রবিন বলল- না রে। এখন নয়। অন্যদিন যাব ক্ষণ। আজ বাবার সাথে মরিচের ক্ষেতে নিড়ানি দিতে হবে।
‘অন্যদিন কেন, আজই চল, যাই! ওর বাসায় বহুদিন যাওয়া হয় না। আর তাছাড়া খালাম্মাও তোকে একবার দেখতে চেয়েছিল।’ কণ্ঠে খানিকটা অনুযোগের সুর মেশায় শিহাব।
রবিনের অনাগ্রহ দেখেই কিনা রাজীব আর কোন কথা বাড়ায় না। শার্টের হাতার বোতাম খুলতে খুলতে বলল- ঠিক আছে তাহলে অন্যদিন আছিস তোরা। মা পায়েস রান্না করতে চেয়েছিল। সেদিন মজা করে খাব। এখন যাই রে।’ বলেই সে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
রবিন আর শিহাব বাড়ির পথ ধরে। আরও কিছুটা পথ হাঁটতে হবে তাদের।



দুই
বাসায় ঢোকার পথে সদর দরজা পেরোতেই সোফার ওপর বসা মেয়েটির ওপর চোখ পড়ে রাজীবের। মেয়েটি আসলেই অনেক সুন্দরী, কেমন কাটা কাটা মুখের গড়ন, পটলচেরা চোখ। তখন হয়তো শিহাব এর কথাই বলছিল। মেয়ে দেখলেই রাজীব কেমন জানি অপ্রস্তুত হয়ে যায়, কোন কাজই ভালোভাবে করতে পারে না। আজও সেটার ব্যতিক্রম হল না, সে জড়সড় হয়ে ড্রয়িং রুম পেরিয়ে সরাসরি নিজের রুমে চলে যায়। শরীরের জামা-কাপড় ভিজে গেছে, জামা পাল্টাতে হবে।
মা, আমার তোয়ালেটা কই? বহু খুঁজেও নিজের ঘরে না পেয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে রাজীব।
রান্না ঘর থেকে জেসমিন বেগম বললেন- রুমে আছে তো। ভালো করে খুঁজে দেখ। না পেলে ব্যালকনিতে গিয়ে দেখিস।
রাজীবের মা জেসমিন বেগম প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা। সারাটা দিন স্কুলে কাটিয়ে ক্লান্ত হয়ে বিকেলে বাসায় ফেরেন, আজ সরকারি ছুটি তাই স্কুলে যান নি। মাঝখানে অবশ্য দুপুরবেলা একবার বাড়িতে আসেন। লাঞ্চটা সেরে যান তখন। বছর দুয়েক হল কাজের লোক রেখেছেন, রান্না-বান্নার কাজ সেই করে দেয়। তাঁর বাপের এলাকার লোক। বড্ড শান্তশিষ্ট মেয়ে বিলকিস আক্তার। তার বাবা গ্রামে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালায় । বিশাল সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে। ভ্যান চালিয়ে এত বড় সংসার চালাতে সে বেশ হিমশিম খাচ্ছিল। তাই বিলকিসকে তারা এখানে রেখে গেছে। দুবেলা দুমুঠো খেতে পায় আর সাথে লেখাপড়ার সুযোগও আছে। স্কুলে না গেলেও জেসমিন বেগম বাড়িতেই তাকে পড়ালেখা শেখান। এদিক থেকে জুঁই খুবই ভাগ্যবতী। এমন কপাল সবার হয় না।
ঠিক আছে, দেখছি। ভেজা কণ্ঠে বলে রাজীব তার ঘরের সাথে লাগানো ব্যালকনিতে চলে যায়। তার এককোণে কয়েকটি ফুলের গাছ লাগানো ছিল রঙ করা পোড়া মাটির টবে । বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা মুক্তোর ছিটা পেয়ে সেগুলো দেখতে অপরূপ হয়েছে। আঙুল দিয়ে সে বেনামী একটা লাল গোলাপের মরে যাওয়া কালো পাঁপড়ি ছিঁড়ে নেয়। মুখের সামনে তুলে ধরে বেশ জোরে ফু মারে। ফু এর সাথে বেরিয়ে যায় মনের মধ্যে লুকোনো অতীত জীবনে সঞ্চিত কান্না বেদনার ছায়া। বেশ ভালো লাগছে তার। মানুষের হতাশা গুলোকেও যদি এমন করে নিঃশেষ করা যেত।
শ্রাবণেই বইছে সাদা কাশফুল দোলানো ঝলমল স্নিগ্ধ বাতাস। নরম তুলার মতো সেই বাতাসের আলতো ছোঁয়া ব্যালকনিতে দাঁড়ানো রাজীবের গায়ে এসে লাগল। ততক্ষণে বেড়ে বৃষ্টির বেগ কয়েকগুণ হয়ে গেছে। আড়াআড়ি ভাবে দড়িতে টানানো তোয়ালেটা হাতে নিয়ে রাজীব সামনের বাড়িগুলোর দিকে তাকায়। উদাস চোখে বৃষ্টি দেখছে। বৃষ্টি দেখলেই মনটা তার কেমন জানি অমাবস্যার বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মনে অনুভূত হয় ফাগুনের পাতা ঝরার শূন্যতা। ভাবতে ভাবতে সে গভীর কল্পনায় ডুবে গেল। নানান খেলা চলছে তার মনে। এক জনমে পেতে ইচ্ছে করছে বহু জীবনের পেষাণো নির্যাসের মিষ্টি-তেতো স্বাদ। এমন সময় ড্রয়িং রুম থেকে হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসল- ‘কিরে গোসল হলো তোর? অনেক বেলা হয়েছে। এদিকে আয়। চারটা ভাত খেয়ে নে।’
কোন উত্তর দেয় না রাজীব। কেবল ধ্যান ভাঙা সন্ন্যাসীর মতো বিরক্ত মুখে পরনে থাকা নীল টি-শার্টটা বদলে গত ইদে মায়ের দেয়া কালো রঙের চেক শার্টটা পড়ে নেয়, আধা ভেজা প্যান্টটা বদলানোর কোন তাড়া অনুভব করল না। ভাবটা এমন-শার্টেই কাজ চলে যাবে, শক্তিহীন শার্টটার নেতানো কলারটা হাত দিয়ে সোজা করতে করতে রাজীব ড্রয়িং রুমে গেল।
সোফায় বসা মেয়েটি আর নেই, বোধ হয় চলে গেছে। নিশ্চিত হতে সে ইতি উতি নজর ঘুড়ায়। না, মেয়েটি সত্যিই আর এখানে নেই। বিপদ কেটে গেলে নিরীহ হরিণ যেমন গাঢ় করে দম নেয় ঠিক তেমনি করে ও বড় একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে, মনের জড়তাগুলো যেন দূর হয়ে গেল। এবার খোলা মনে সব কাজ করা যাবে। শরীরে মেকি আলসেমির ভাব এসে পড়ায় সে সোফায় বসে পড়ল, হাত দুটিকে রাখলো দু’পাশে। দেয়াল ঘড়িটা টিক্ টিক্ করে ঘুড়েই চলছে সেই নব্বই দশকের মতো। ‘কিরে বসে পড়লি যে? আয়, খাবি।’ ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়ানো জেসমিন বেগম চেয়ার টানতে টানতে বললেন। শুনেও যেন শুনল না রাজীব। উঠতে ইচ্ছে করছে না তার, ভেজা শরীরটাতে বেশ টান পড়েছে। খানিকক্ষণ বসে থাকার পর এবার সে উঠে দাঁড়ায়। মন বিক্ষিপ্ত থাকায় এতক্ষণ ক্ষুধার জ্বালা তেমন ভাবে বুঝতে পারে নি। স্নায়ু শীতল হতেই চোঁ চোঁ করা শুরু করেছে পেট বাবাজী। কিচেন থেকে ভেসে আসা ডিম ভাজির গন্ধে তার ক্ষুধা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল।
‘বিলকিস, এই বিলকিস, নামিয়ে নিয়ে আয় খিচুড়িটা। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে।’ জেসমিন বেগম গলা খাঁকি দিয়ে বললেন। মাথা ধরার দরুণ তিনি আগেই টেবিলে বসে শশা কাটছেন অ্যালুমিনিয়ামের চকচকে ছুরি দিয়ে। খিচুড়ির সাথে সালাদ খাবেন।
‘হ, খালাম্মা। আইতেছি। একটু খাঁড়ান।’ তড়িঘড়ি করে বলল জুঁই। কিচেন থেকে পাওয়া গেল পাতিল নামানোর শব্দ । ‘ইস্, মাগো মা, হাত পুড়ে গেল গো।’ জুঁই ললিপপের মতো ডান হাতের আঙুলটা মুখে চালান করে বলল ।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.