| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
‘‘১৭৭টি আবাসিক কক্ষ,পালবংশের পাল্ বংশের তৈরি,রাজশাহীর নাঁওগা জেলায় অবস্থিত”এটাই ছিলো আমার পাহাড়পুর সম্পর্কে ধারনা।এক যুগের মহীয়ান মানুষদের ঞ্জান বিস্তারের যে প্রয়াস,একজন শিক্ষার্থী হয়ে তা জানা উচিত সব সময় অনুভব করেছি।হয়ত আমাদের আধুনিক শিক্ষার ণাড়ী পোতা এরকম কোন পাহাড়পুরের উদার বুকে।তাই যখন বিভাগ হতে পাহাড়পুরে বনভোজনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।তখন কিছুটা আর্থিক সংটের মধ্যে থেকেও সু্যোগ হারাতে চাইলাম না।চাঁদা ৩৫০ টাকা এবং আনান্যা আনুষাঙ্গিক খরচ ধরি২০০ টাকা মোটে ৫৫০ টাকা। বাবা যতোই বলুক আলুর বাজার মন্দা বনভোজনের টাকাটা চাইতেই হবে, এবার আর কোন কথাই শুনবোনা।
অবশেষে সেই শুভ যাত্রার তারিখ ঠিক হলো ১২ই ফেব্রুয়ারী। আমাদের বাস ছাড়ার কথা ৭.৩০ এ থাকলেও বাস ছাড়ে ৮.৩০ এ। বনভোজনের ঐতিহ্যগত দেড়ী আর কি।এই বনভোজনের আগে যতবার বনভোজনে গিয়েছি,বরাবরই পিছনে বসেছি।কিন্তু এবার আর বোকা বনতে চাইলাম না।তাই আগেভাগেই আমাদের জন্যে নির্ধারিত বাসের আশেপাশে ঘোরাঘোরি করছিলাম।ব্যাস বিতরোন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়ে বাসে উঠলাম।বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা উল্লাসে ফেটে পড়লাম।গৎ বাঁধা জীবন ছেড়ে মুক্তির আনন্দে আমাদেরকে নিয়ে আমাদের বাস চলল পাহাড়পুরের উদ্দেশ্যে।কখনো উচু বিল্ডিং কখনো ঘিঞ্জি বস্তীর মধ্যে দিয়ে রাজশাহী শহর পেরিয়ে নওগাঁর পথে আমাদের বাস ছুটা শুরু করলো।আমার খুব ইচ্ছা ছিলো যে পথ দিয়ে যাছি সেই পথের আশেপাশে যে সব হাট-বাজার পড়বে তাদের নাম মনে রাখব।কিন্তু সেটি আর হয়নি।বাসের ভিতরে বন্ধুরা নাচছিল আর আমি অন্তত হাতে তালি এবং মাঝে মাঝে মাথা ঝোঁকাছিলাম।ফলসরুপ কোন কোন বাজার অতিক্রম করে গেলাম তা ঠাওরে উঠতে পারি নি।এরি মধ্যে আমরা মান্দা চলে এসেছি।সেখান কার গরুর হাটটি বেশ বড়ো।সারি সারি গরু একসঙ্গে বাঁধা,মনে হচ্ছিলো গরুর খামার।পাহাড়পুর যাবার পথে কুসুম্বা মসজিদ।বাংলার আফগান শাসন আমলে নূর বংশের শেষ দিকের শাসক গিয়াসউদ্দিন বাহাদূর শাহের আমলে জনৈক সুলায়েমান মসজিদটি নিমার্ণ করেন।শূর আমলে নির্মিত হলেও নূর বংশের প্রভাব মোটেও নেই,বরং এটি বাংলার স্থাপাত্য রীতিতে নির্মিত।
মসজিদ দর্শন শেষে আবার আমরা যাত্রা শুরু করলাম।মধ্যে আমরা ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে তরতাজা হয়ে উঠছি।ফলসরুপ আমাদের নাচের আসর পুরোদমে সুরু হলো।এসময় কবিগুরুর শেষের কবিতার একটি লাইন বেশ মনে পড়ছিলো‘‘পুরাতন…’’বাংলাদেশীরা এভাবে নাচবে পাঁচ বছর আগে কেউ ভাবেনি।যেমন টিস্যু ব্যবহার বা বোতলের পানি পান পান করবে বাংলাদেশীরা কেউ সেটা ভাবেননি।বিনোদনে পরির্তন আসবে এতে বৈচিত্র্য কি!তবে আমাদের সংস্কূতি-জীবনবোধকে ধরে রাখতে তো হবে।এরি ধারাবাহিকতায় ফরিদ স্যার আমাদের জন্যে আয়োজন করলেন কুইজ প্রতিযোগিতার,কেউ উত্তর দিতে পারলে সে তার ইচ্ছা মত বন্ধকে গান,কৌতুক,কবিতা পারফর্ম করে দেখাতে বলবে।বেশ মজার।সেলিম স্যারের কৌতুক বলার মধ্যেই আমরা পাহাড়পুরে পৌঁছে গেলাম।
জানালা দিয়ে উঁকি মারলাম,দূর থেকে ছবির মতো লাগছিল পাহাড়পুর।বাস থেকে নেমে আমরা মনোয়ারের পিঁছু নিলাম পাহাড়পুর সর্ম্পকে তার বেশ ধারনা,আশেপাশেই বাড়ি কিনা।নেমেই একটু কোমল পানীয় পান করলাম,বেশ বড় এলাকা,দর্শন করতে করতে ক্লান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভবনা আছে।আমরা যখন মন্দিরের কাছাকাছি চলে আসলাম তখন সামনে পড়ল একটা দেওয়াল।মনোয়ার বলল,ওটা আসলে মন্দিরের চারদিকের একটা ছাত্রাবাসের অংশবিশেষ।বর্গাকূতি এই ছাত্রাবাসে মোটে ১৭৭টি কক্ষ আছে।বর্গাকূতি আবাসিক এই অংসঙ্গতি কারন উত্তরে ৪৫টি কক্ষ,অন্যদের চাইতে একটি বেশি।মনে হচ্ছিল চারদিকের ভবনটি ভবনের পাশাপাশি দেওয়াল হিসেবেও ব্যবহার হয়েছিলো কোন এক সময়।যা হয়ত মাঝখানে অবস্থিত কেন্দ্রীয় মন্দিরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তৈরি করা হয়েছিলো কোন একসময়।যাই হোক বর্তমানে দেওয়াল যেহেতু বেশী উঁচু নয়,কোন কারনেই হোক প্রমাণ সাইজে এসেছে,এর সদ্য ব্যবহার আমরা করলাম অথ্যাৎ মূল ফটকের তোয়াক্কা না করে দেওয়াল টপকিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।
আশেপাশে পুরার্কীতি ছড়িয়ে থাকলেও বিশাল উচুঁ কেন্দ্রীয় মন্দির আমাদের যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিলো ।তাই দলবল নিয়ে সগৌরবে দাঁড়ানো কেন্দ্রীয় মন্দিরের কাছে চলে গেলাম।তিনটি ধাপে মন্দিরটি উপরে উঠে গেছে।মন্দিরের গাঁয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মহাভারত ও রামায়নের বিভিন্ন ঘটনাবলি, ভগবান কূষ্ণের মূর্তি ও জনজ়ীবনের নানা ঘটনাবলি।জটিল এক প্রত্নত্তবের নিদর্শন পাহাড়পুর।বলা হয়ে থাকে,ভারতীয় প্রত্নতত্তে এ মন্দির বিরল।তাদের মতে এটি সর্বতোভদ্র শ্রেনীর অন্তর্গত।মন্দিরটি আসলে ব্যবহার করা হত একাডেমিক ভবন হিসাবে।ধর্মগুরু শিষ্যদের ধর্মের ব্যাখ্যা দিতেন।শিক্ষা দিতেন নিষ্কাম কর্মে।কোন এক সময় মহামতি গৌতম বুদ্ধের পদাচারণেও ধন্য হয়েছে এই বৌদ্ধ বিহার।চারদিকে ঘুরে ঘুরে উঠে দেখতে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেলো।একদম শীর্ষধাপে উঠার পর মন্দিরের ৩-৫ মিটার উঁচু চূড়া।আমাদের ক্লাসমেট গোবিন্দ এই চূড়ায় উঠে পড়ল।এজন্য তাকে পড়ে অবশ্য যবাব দিহি করতে হয় দুটি চৌকিদাঁড়ের কাছে।এরপর আমরা ছুটলাম স্থানীয় বাজারে ক্ষুদ-পিপাসা মেটানোর জন্য।ভেবেছিলাম খাবার দাম কম হবে তাই এক প্লেট ভাত খাওয়ার পর খান দুয়েক পুরি খেয়েছিলাম।কিন্তু দাম দেওয়ার বেলায় দেখলাম রাজ়শাহীকে ছাড়িয়ে গেছে।
ফিরে এসে আমরা প্রথমে গেলাম উত্তর-পশ্চিম অংশে।এখানকার সবচেয়ে আকর্ষনীয় স্থাপনাটি হলো একটি বর্গাকার ইটের কাঠামো,যার নিচে পানি নিষ্কাশনের জন্য তিনটি খাত আছে।দক্ষিন দেওয়ালে একটি উন্মুক্ত মঞ্চ অবস্থিত।দেওয়ালে একটি ধুনাকূতি খিলান আছে।সম্ভবত বিহারের বর্হিভাগে যাওয়ার জন্য এ পথ ব্যবহার হতো।এটি প্রাচীনতম খিলানের একটি দুর্ল্ভ নিদর্শন।এ থেকে প্রমাণ হয় যে বাংলায় অনেক আগেই খিলান নির্মাণের কৌশল জানা ছিলো।এমনকি মুসলমানদের আসার আগেই।আর মঞ্চটি সম্ভবত শৌচাগার ও স্নানাগার উভয়রুপে ব্যবহূত হতো।এখানে বালির এক পুরু স্থর দেখা যায়।বালির স্তর অতীতে কোন নদীর অবস্থান নির্দেশ করে।স্থানীয় প্রবাদ আছে,রাজা মহিদলের কন্যা সন্ধ্যাবতী প্রতিদিন এই ঘাটে স্নান করতেন।তিনি ঐশ্বরিক উপায়ে বিখ্যাত সত্যপীরকে গর্ভে ধারণ করেন।
তীর্থ দর্শ্ন মোটামুটি শেষ করে আমরা তাঁবুতে ফিরলাম।রান্নার কাজ তখনো চলছিলো।আমদের শিক্ষকেরা রাঁধুনীদের সাহায্য করছিল।আমরা অবশ্য স্বার্থপর মতো যাদুঘর দেখতে গেলাম।যাদুঘরে সেই যুগের পিঁড়ি,থালা,প্রদীপ,দাবার ছক,সিলমোহরের আধিক্য।পৌরাণিক যুগের বিভিন্ন দেব-দেবী –যক্ষ,শক্তি,বেণু গোপাল অন্যান্য দেবতাদের মূর্তিও দেখেতে পেলাম।পাথরের একটি মূর্তি আমাকে খুব টানছিলো,হাত দিয়ে একটু ছুঁইয়ে দেখতে চাইলাম।এমনি দেখি একপজন মহিলা যাদুঘ্র সংরক্ষনকারী গর্জে উঠলো।মহিলাটি সোজাসোজি আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।আমি ভাবছিলাম ‘sorry’ বলবো কি না,সে সুযোগ আর পেলাম না।“Under the section 19th of the antiquities act XIV of 1988 any person who destroy,breaks,damage,alters,defaces or scribble in scription or sign on this antiquity is punishable with imprisonment for a term which may extend to one year or with fine or both” এক নিঃশাষে বললেন তিনি।আমি ভাবি,সেরেছে তিন বছর ক্যাম্পাস জীবন শেষ করলাম ইংরেজী বলতে গেলে মুখ দিয়ে শুধু অ্যা…আ বের হয়।আর ইনি কি না যাদুঘ্র সংরক্ষণ কারী হয়ে এত চৎমকার ইংরেজী বলছেন।তবে আমার কেন জানি সন্দেহ হলো,বয়সের দোষ।প্রশ্ন করলাম,What is the antiquities act?তিনি আমার কথা এড়িয়ে ।বললেন“এসব ছোঁয়া নিষেধ,দেওয়ালে লেখা আছে পড়তে পারছেন না।’’মনে মনে বললাম বুঝেছি বটে যা বলছেন তা আমার প্রশ্নের উত্ত্র নয়।আর ইংরেজীতে যা বললেন তা একটু আগে বাইরে সাইনবোর্ডে দেখেছি।মুখুস্ত শক্তি বেশ ভালো তো।মুখে কিছু বললাম না।হাজার হোক বেচারি অনেক কষ্ট করে মুখস্ত করেছ,একটু হাব-ভাব নেবে বৈ বেশী কিছু নয় তো।‘‘আন্টি ক্ষমা করেন”,বলে বাইরে এলাম।এদিক ওদিক একটু ঘুরা-ঘুরি করে তাঁবুতে ফিরলাম।এরপর বিভিন্ন খেলার আসর,গান-বাজনা ইত্যাদির পর খাওয়া-দাওয়া ও লটারি শেষে বাসে ফিরলাম আমরা।
পেছনে পড়ে থাকলো পাহাড়পুর যেখানে আমরা এসেছিলাম নাড়ীর টানে,শেকড়ের সন্ধানে।আমরা বেশ ভাগ্যবান ফরিদস্যার এবং রশিদস্যারকে সঙ্গে পেয়ে।স্যারের বদৌলতে আবার আমাদের কুইজ প্রতিযোগিতা শুরু হলো।বাসে ফরিদস্যারের পাশাপাশি সুকর্ণ ভাই ও আলা-আমিন উপস্থাপনা করে যাচ্ছিল।তবে আল-আমিন একটু গন্ডগেলে ছেলে কি না।সে হঠাৎ বলে উঠলো,‘‘স্যার আতিক আর পলাশ কোন কিছূ পারফর্ম করেনি।এমনকি নাচেও নি।’’মনে মনে বললাম এরকম বাদর নাচ আমিও পাড়ি আল-আমিন।কিন্তু বহু দিনে বহু পথ ভ্রমনের সাক্ষী আমার এ জুতো জোড়া আজ কেন জানি বিদ্রোহ করেছে(বেশ টাইট হয়েছে আরকি)।এই জুতো পড়ে হাঁটাই তো আমার প্রাণপাত হওয়ার জোগাড়।সেখানে নাচানাচি করা অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।আতিক সুবির নন্দীর গানের দু’লাইন গেয়ে পার পেল।সষ্ণয়িতার একটি কবিতা আমার সবসময় মনে থাকে,সেই কবিতাটি আমার বিরহের আশ্রয়,সেটি যে বিপদের আশ্রয় হবে ভাবি নি কখনো।ঠিক ধরেছেন সেই কবিতাটিই আবূত্তি করেই এ যাত্রা রক্ষে পে্যেছিলাম।সেই কবিতাটি‘‘আমরা দু’জন একটি গাঁয়ে থাকি…সেই আমাদের একটি মাত্র গাঁ…।”পড়েছেন নিশ্চই।
সবাই কিছু না কিছু করে দেখালো,স্যারেরা কেন বাকি থাকে।অনেক সাধাসাধির পর রশীদ স্যার গাইলেন,‘‘ও মেয়ের নাম দেব কি ভাবি শুধু তাই…’’।আমাদের অবাক হওয়ার পালা।চমৎকার কন্ঠ।স্যার গাণের চর্চা করলে হয়ত আমরা একজন ভালো শিক্ষকের পাশপাশি একজন ভালো গায়কও পেতাম।যাক এরপর আমরা ফরিদ স্যারকে ধরলাম।কিছু একটা পারফর্ম করে দেখাতে হবে।তিনি আমাদের সঙ্গে নেচেছিলেন।ফরিদস্যার আমাদের কাছে স্পেশাল একজন স্যার।বিশেষ কিছু বরাবরি আমরা পেয়ে থাকি।এবারও পেলাম।বlলাই বাহুল্য।অবশেষে আমরা ফিরলাম আমাদের চিরায়িত ক্যাম্পাসে।মাঝখানে পড়ে রইল কিছু সুখস্মূতি,মূত একটি তীর্থভুমি,যেটি স্মরন করিয়ে দেয় বিদ্যা শিক্ষার গোঁড়ার কথা,শেকরের কথা।
©somewhere in net ltd.