| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
দেশের অর্থনীতি যাদের ঘামে সচল তাদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই!
পাহাড়ে অশান্তি, গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা, দ্রব্যমূল্যের চাপ সব মিলিয়ে দেশ যখন নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই: দেশের অর্থনীতিতে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
একদিকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোয় ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পের একজন শ্রমিকের সর্বনিম্ন মাসিক বেতন মাত্র ১২,৫০০ টাকা।
একবার ভাবুন, এই টাকায় একজন শ্রমিক কীভাবে নিজের খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা এবং পরিবারের অন্যান্য খরচ চালাবেন?
যে শ্রমিকের শ্রমে দেশের পোশাক রপ্তানি হয়, যে শিল্প দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, সেই শ্রমিকের জীবনমান নিয়ে আমরা কতটা ভাবছি?
আজ গার্মেন্টস খাতে আন্দোলন চলছে। সংবাদে প্রায় ৩০০টি কারখানা ছুটি ঘোষণার খবরও দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। শ্রমিকদের অভিযোগ, মালিকপক্ষের অবস্থান, কারখানার বাস্তব পরিস্থিতি এবং ন্যায্য মজুরির দাবি সবকিছু নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করতে হবে।
শ্রমিকের ন্যায্য দাবি শোনা হোক, আবার শিল্পের কর্মপরিবেশ ও কর্মসংস্থানও রক্ষা করা হোক।
আরেকটি বড় অর্থনৈতিক শক্তি হলো প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক। তাঁরা পরিবার ছেড়ে, প্রিয়জনদের দূরে রেখে, বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা।
কিন্তু তাঁদের দুর্ভোগের কথা কে শোনে?
বিমানবন্দরে হয়রানি, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা, দেশে ফিরে নানা দপ্তরে অবহেলা এসব অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোনো প্রবাসী শ্রমিক বিদেশে মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে আনা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও নানা ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে মৃত প্রবাসী শ্রমিকদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা থাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধা যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে; প্রত্যেক যোগ্য পরিবার যেন সহজে ও সময়মতো সহায়তা পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা চাই না সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো বন্ধ হোক। আমরাও চাই তাঁদের জীবনমান উন্নত হোক। কিন্তু একই দেশের শ্রমিক, কৃষক, প্রবাসী ও বেসরকারি খাতের কর্মজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি উপেক্ষিত থাকবে কেন?
একটি রাষ্ট্রে শুধু একটি শ্রেণির উন্নয়ন দিয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
আমাদের দাবিগুলো স্পষ্ট:
1. গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্মানজনক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
2. নতুন মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের প্রকৃত ও স্বাধীন প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
3. শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, বোনাস ও অন্যান্য পাওনা সময়মতো পরিশোধ করতে হবে।
4. শ্রমিকদের ওপর অন্যায়, নির্যাতন, ছাঁটাই ও হয়রানির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে কারখানা ভাঙচুর ও সহিংসতার অভিযোগও আইন অনুযায়ী বিচার করতে হবে।
5. প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দরসহ প্রতিটি সরকারি দপ্তরে সম্মানজনক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
6. বিদেশে কোনো প্রবাসী শ্রমিক মারা গেলে মরদেহ দেশে আনা, দাফন ও পরিবারের আর্থিক সহায়তা সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে।
7. সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি গার্মেন্টস শ্রমিক, কৃষক, দিনমজুর ও প্রবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় বাজেটে কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে।
শেষ কথা
পাহাড়ের মানুষ হোক, গার্মেন্টস শ্রমিক হোক, বিদেশে কর্মরত প্রবাসী হোক কিংবা সরকারি কর্মচারী সবাই এই দেশের নাগরিক। কারও অধিকার কেড়ে নিয়ে অন্য কারও উন্নয়ন আমরা চাই না।
মনে রাখতে হবে, গার্মেন্টস শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের ফসল এবং প্রবাসীর পাঠানো অর্থ সবকিছু মিলিয়েই বাংলাদেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে।
যে শ্রমিক দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন, তাঁর নিজের পরিবার যদি দুবেলা খাবার, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা না পায়, তাহলে সেই উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
সরকারের কাছে প্রশ্ন দেশের অর্থনীতির জন্য যারা জীবনভর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে?
আমরা সংঘাত চাই না, আমরা ন্যায়বিচার চাই। আমরা শিল্প ধ্বংস চাই না, শ্রমিকের অধিকার চাই। আমরা বৈষম্য চাই না, সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন চাই।
দেশটা শুধু ক্ষমতাবানদের নয়, দেশটা শ্রমিকের, কৃষকের, প্রবাসীর, সরকারি কর্মচারীর দেশটা আমাদের সবার।
সালাউদ্দিন রাব্বী
#শ্রমিকের_অধিকার_নিশ্চিত_করুন
#গার্মেন্টস_শ্রমিক
#প্রবাসীর_মর্যাদা
#বৈষম্যের_অবসান
#দেশটা_সবার
©somewhere in net ltd.