নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

স্টিগমা

রাফিন জয়

স্টিগমা

রাফিন জয় › বিস্তারিত পোস্টঃ

**রহস্য**//শেষ পর্ব

২২ শে জুলাই, ২০১৭ বিকাল ৩:২০


রাতটা গুটিসুটি দিয়ে খুব আতঙ্কে কেটেছে। তবে ভোরের আলো ফুটতেই ওসব ভূতের চিন্তা মাথা থেকে ঝেরে ফেলেদিলাম। ছোটবেলা থেকেই দিদিভাই’র মত আমিও একটু বস্তুবাদী ধাঁচের। ভূত-প্রেতে আহামরি বিশ্বাস নেই আমার। তবে কাল রাতে না চাওয়া সত্ত্বেও ঐ অদ্ভুত ভয়ংকর দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বারবার। খুবি দুরূহ রাত অতিক্রম করে সকালের এই সজীব প্রকৃতির মনোহর সৌন্দর্যের দৃশ্য সব ভুলিয়ে দিল।

নাহ, আর এক মুহূর্তও নয়, এক্ষনি আবার মেলাতে হবে সেই সংকেতটা। গতকাল ‘’অগ্নিতে পশলা ছুট একা একা ঢলিয়ে,’’ এইটুকু অন্বেষণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আজকে অমনি মত চলতে শুরু করলাম অগ্নিকোণে ২৫ মিনিটের জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে ঝরনার দিকে হাতে একটা অভিধানের বই নিয়ে। গহিন জঙ্গলের প্রাচীন গাছ গুলো যেন আমার দিকে ঘাড় নিচু করে ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। গা ছমছমে একটা আবহাওয়া বিরাজ করতে শুরু করলো। হটাত আবার মনে হল গত রাতের কথা। কোন কথা না ভেবেই এক দৌড় দিলাম। একদম ঝরনার সামনেই থামলাম। ঝরনার শব্দ আর দখিনা বাতাস একদম সারা শরীর ঠাণ্ডা করে দিল।

কিন্তু আরেকটা বিষয় এখন আরও ভাবিয়ে তুলছে। ‘’অগ্নিতে পশলা ছুট একা একা ঢলিয়ে, তা দেখে সমকোণে ডানে ছুটে চল এগিয়ে।“ এখন আমি ঝরনার যেই দিকেই দাঁড়াই, সে দিক থেকেই তো ডানে চলতে পারি। তাছাড়া এর পরেই তো আবার বলা আছে, “‘কৃম্ভ ও মকর রাশি’র পূর্বে যোগ হয় এক কান,
কদম গুনে যাও, ঘুম ভাঙে তার সাথে কোন
এক বলবান!
তার পথ ছাড়িয়ে,
অশ্বত্থ বাবু দাড়িয়ে
থুম ধরা ভূত বনে,
তার পদতলে গুপ্তধন!"

এখন তো আবার জ্যোতিষ শাস্ত্র ও খুঁজতে হবে। নিরাশ হয়েই ফিরতে হচ্ছে। আবার মনে মনে দাদুকে বকা দিতে শুরু করলাম। হটাত দমকা দখিনা হাওয়া একটা সজোরে ধাক্কা দিল। সাথে সাথে মস্তিষ্ক কিছুটা খুলে গেলো এবং নিরাশাও কিছুটা কমলো। আরেহ, অভিধান খুলেও তো একটু নিশ্চিত হওয়া যায়। তাই করলাম সাথে সাথে। আরেহ, হে! ডান মানে দক্ষিণ! অগ্নিকোণ কোন থেকে সমকোণ, অর্থাৎ ৯০ ডিগ্রি কোণ করে দক্ষিণে ঘুরলে যে হয় দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ বা নৈঋত কোণ।

যাই হোক, এবার ফিরে গিয়ে জ্যোতিষ শাস্ত্র খুঁজতে হবে। হন্তদন্ত পায়, গতকাল রাতের সেই ভূতের রহস্য নিয়ে একটু ভাবতে ভাবতে চলতে শুরু করলাম। আকাশ আজও মেঘাচ্ছন্ন। তবে গতকালের মত বৃষ্টি নেই। তাই আজকেই পরিবেশটা বেশি ভাল লাগছে। শহুরে কোলাহল আর বাড়ির কংক্রিটের মাঝে গুমোট আবহাওয়া থেকে কিছুটা সময় বিরতিতে ঠিক কতটা যে সতেজতা পাচ্ছি, তা বলা যাবে না। তবে গতকাল রাতের ঐ রহস্যের কিছুই ঠাওর করতে পারছি না।

বাড়িতে ঢুকতেই দেখি জয়ন্ত কাকা তার কাগজটা ছিঁড়ে ফেলে দিল। সাথে বলল, “আমায় দিয়ে এসব হবে না।“ রমেন দা তার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। দিদিভাই’র কোন খবর নাই। দাদুর লাইব্রেরীতে ঢুকে একটা জ্যোতিষ-শাস্ত্র বের করে নিলাম। ওমনি বড়মা এসে বইটা তুলে দিয়ে বলল, “আগে খাবার খা, তার পরে সব।“

বাধ্য হয়ে তাই করলাম। গিয়ে দেখি দিদিভাই আর হৈমন্তী কিছু কথা বলছে। আড়ালে দাঁড়ালাম। হৈমন্তী বলছে দিদিভাইকে, “আচ্ছা বলতো, কৃম্ভ ও মকর রাশির পূর্বে কোন রাশি?”
“তোরা খুবি অলস। একটু খুঁজে নিলেই তো পারিশ। এই সব বই একটু পড়লেও হয়। অন্তত জানতে পারবি মানুষের মাঝে কত কিসের সব বিশ্বাস আর অন্ধবিশ্বাসের দানা বেঁধে আছে!”
“হুম, তা ঠিক। এইসব বই পড়া হয় না। জ্যোতিষ-শাস্ত্র বিষয়টাই অদ্ভুত। এইবার বলনা!“
“কুম্ভ রাশি।“

এ যেন একেবারে সোনায় সোহাগা! ঘরের দিকে ঘুরবো, এমন সময় বড়মা, “আগে খাবার, পরে সব।“
“আসছি গো, এখনি!”
কোন কথা না শুনেই বড়মা হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো খাবার খেতে। অনেক জ্ঞান গর্বের কথা শুনতেও হল। পরে আমার ঘরের করিডোরে বসে মিলিয়ে নিলাম একবার। সত্যিই তো, কৃম্ভ ও মকর রাশির পূর্বে তো কুম্ভ রাশি। বাকিটুকু মেলাতে গেলে আর একটু দেখতে হচ্ছে, “‘কৃম্ভ ও মকর রাশি’র পূর্বে যোগ হয় এক কান,
কদম গুনে যাও, ঘুম ভাঙে তার সাথে কোন
এক বলবান!
তার পথ ছাড়িয়ে,
অশ্বত্থ বাবু দাড়িয়ে
থুম ধরা ভূত বনে,
তার পদতলে গুপ্তধন!"

কুম্ভ রাশির সাথে যোগ করতে হবে এক কান। আরেহ, কান = কর্ণ হয়। মানে কুম্ভ+কর্ণ= কুম্ভকর্ণ! এখন কদম গুনে যাওয়া বাকি। কারণ এই বলবানের ঘুম ভাঙে প্রতি ছয়মাস পর একবার ছয়মাসের জেগে থাকার জন্য। ইন্দ্র দেবের কারণে তার এই দশা হয়েছিল। তার মানে, হয় ছয় কদম এগোতে হবে, না হয় ছয় মাসের সাথে ত্রিস দিন গুণ করতে হবে। অর্থাৎ হয় তা ছয় কদম বা একশত আশি কদম গুনে যেতে হবে ঝরনা থেকে নৈঋতের দিকে।

অশ্বত্থ বাবু দিয়ে যে একটা অশ্বত্থ গাছ বোঝানো হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু থুম ধরা ভূত বনে, দিয়ে কি বোঝানো হচ্ছে তা ঠিক খুঁজতে খুঁজতে কিছুই পেলাম না গত দুঘণ্টায়!

সবে দুপুর ২টা, একটু পরেই বের হয়ে পড়বো সিদ্ধান্তে উপনিত হলাম এবং যথা সময়ে পৌঁছে গেলাম ঝরনার কাছে। ৯০ ডিগ্রি বা সমকোণ করে নৈঋত কোণের দিকে ছুটতে শুরু করলাম। ছয় কদমে কিছুই হল না। তা ছাড়া বলা আছে থুম ধরা ভূত বনে থাকবে সে। তাই ১৮০ কদম হাটার উপক্রম করলাম।

একটু ভেতরেই শুধু গহিন জঙ্গল ছাড়া আর কিছু নেই। অশ্বত্থ গাছ অনেক। তবে ভূত বন দিয়ে কি বোঝানো হয়েছে? ভাবতে লাগলাম, ভূত কি? কখন হয় ভূত? কেন হয়? ভূত কি আদৌ আছে? এটাতো মনের ভ্রম মানুষের!
“যাহ বাবা, এটা বুঝতে এতো সময়” বলে উঠলাম একটা মরা অশ্বত্থ গাছ দেখে। থুম ধর ভূত, বনকে নয়, অশ্বত্থ গাছকেই বোঝানো হয়েছে। এটা একটা মৃত অশ্বত্থ গাছ। এবার এর পদতলে মানে গাছে নিচে খুঁড়তে হবে। এইকি, কিছুটা মাটি খোঁড়া হয়েছিল বলে মনে হচ্ছে! কেউ নিয়ে গেল নাতো? নাহ, তাও দেখি।

খুঁড়ে অপ্রত্যাশিত ভাবে পেলাম মাত্র একটা চাবি! সেকি, মাত্র একটা চাবি? যাই হোক, তাই নিয়ে যাওয়া যাক!

বাড়িতে এসে প্রথমে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। রাতের বেলায় দাদুর কাছে গেলাম জলসা ঘরে। গিয়ে বললাম, “এটাই কি গুপ্তধন?”
“হুম, এটাই সেই গুপ্তধন মাই ইয়ংম্যান! ডাকো সবাইকে!”

সবাই চলে আসলো এবং সবার আসার পরে দাদু বলল, “তোরা কি জানিশ এটা কিসের চাবি?”
হৈমন্তী, “কিসের?”
“এটা হচ্ছে কলকাতায় আসা একেবারে নতুন মডেলের একটা গাড়ির চাবি। এটাই ছিল সেই গুপ্তধন!“

সবাই খুব অবাক হয়ে রইলো! এতো দামি উপহার! কিন্তু আমার মন খারাপ হয়ে গেলো আরেকটা রহস্য অন্বেষণ করতে পেরে। নাহ, ভূতের রহস্য আমি অন্বেষণ করতে পারিনি। অন্য আরও একটা রহস্য! এটা ভাবতে ভাবতে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

সকালে উঠেই প্রথমে একবার ছাদে গেলাম সাথে চাবিটা নিয়ে। নিচে গাড়িটা সকালে দাদু নিয়ে এসেছে। ছাদে দিদিভাই মুক্ত বাসাতে শ্বাস নিচ্ছে। ওর সামনে গিয়ে চাবিটা ওর সামনে ধরে বললাম, “এইনে, এটা তোরই প্রাপ্য ছিল!”
“মানে? কি বলছিস এই সব?” কিছু না জানার ভাব করে বলল দিদিভাই।
“তোর মিনি বাঁদর এখন এতটাও ছোট নেই যে এইটুকু বুঝবেনা দিদিভাই!”
“কি সব বলছিসরে বাঁদর? আমি কিছু বুঝতে পারছি না!”
“বুঝতে তো আমি পারছি না, কেন তুই এমন করলি? সংকেতের কাগজ তুই এমনিতেই ফেলে দেয়ার মত মেয়ে নয়। আর তুই কুম্ভ রাশির বিষয় জানিশ আর কুম্ভকর্ণ নয়? আর আমার আগেই তুই গিয়েছিলি গুপ্তধন অন্বেষণে এবং তুই মাটিও খুঁড়েছিলি আমার আগে গিয়েই। তানা না হলে, রাতের বৃষ্টির পরেও মাটি খোঁড়ার চিহ্ন কি করে থেকে যায়? কিন্তু তুই কেন তা ফেলে আসলি বলতো?”
“তা না হয় রহস্যই থাক!” মৃদু কণ্ঠে বলল দিদিভাই।
“আচ্ছা ভূতের কি কোন ব্যাখ্যা আছে তোর কাছে?”
“সব ভূতের কথা জানি না আমি, তবে তোর ভূতের ব্যাখ্যা আমি দিতে পারি। রাতে আমিই ছিলাম ঐদিন!”
“তো সাদা শাড়ির রহস্য কি?”
“ওরে বোকা বাঁদররে, সেটা হলদে শাড়ি ছিল। তোর উচ্চ শক্তির টর্চের আলোয় তা সাদা দেখাচ্ছিল! হি! হি! হি!”
“তো হাত উঁচু করে কেন ডেকেছিলি?”
“চোখে টর্চের আলো পড়াতে আমি হাত চোখের সামনে রেখে চোখ দুটো রক্ষা করছিলাম!”
“তো সব রহস্য শেষ হয়ে গেলো, এবার শুধু তোরটা বলেদে প্লিজ!“
“তোর অন্বেষণ শক্তি টাকে পরীক্ষা করে দেখলাম। তুই পেরেছিস!”

কোন কথা না বলে, সঙ্গে সঙ্গে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। ওর আদর্শটাই এবার পুরোপুরি গ্রহণ করেছি। আমার সর্বকালের সর্ব মহৎ জ্ঞানী আমার দিদিভাই!
পর্ব-১
পর্ব-২

মন্তব্য ০ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.