নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সত্যের অন্বেষণে আছি, কিন্তু পথ খুঁজে পাচ্ছি না! আমি সেই অজ্ঞ মানব!

রাফিন জয়

সত্যের অন্বেষণে আছি, কিন্তু পথ খুঁজে পাচ্ছি না! আমি সেই অজ্ঞ মানব!

রাফিন জয় › বিস্তারিত পোস্টঃ

রহস্য

০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:০৬


ভোর থেকেই ঝিপ ঝিপ বৃষ্টি হচ্ছিল, কিছুক্ষণ আগেই তা ঝুপ ঝুপ করতে শুরু করলো। ভাগ্যটাই খারাপ বলে ভাগ্যের ঘাড়ে সব চাপিয়ে দিলাম। তবে আজ পাঁচ বছর পরে কলেজের ছুটিতে দাদু বাড়ি যাচ্ছি বলে কোন ভাবেই আর সহ্য হচ্ছে না। আরেহ, দাদু তো তার ঘোড়ার গাড়িটা একটু দ্রুত পাঠাতে পারতো! দাড়িয়ে আছি রাস্তার পাশের এক রসগোল্লার দোকানে। দাদুকে মনে মনে বিড়বিড় করে বকা দিচ্ছি। তবে যদি দাদু ঘোড়ার গাড়িটা পাঠাতে সময় না লাগাতো, তবে হয়তো এমন দৃশ্য দেখাই যেত না। নদীর জলে ধুম বৃষ্টির পতনে জলের একটা রিদম তুলেছে, রসগোল্লার দোকানের টিনের চালায় বৃষ্টির আওয়াজে কান যেন ফেটে যাচ্ছে রিমঝিম রিমঝিম শব্দের! পাখিগুলো সব গুটিসুটি দিয়ে গাছে বানানো তাদের কুঁড়েঘরে বসে আছে।

এইসব দেখতে দেখতে হঠাৎ আবার বিরক্তি চলে আসলো! আরেহ, পুরো তো পঞ্চাশ মিনিটের বেশি হয়েছে, পথ তো মাত্র কুড়ি মিনিটের। এখনো দাদু গাড়িটা পাঠাতে পারলনা! মনে মনে বলতে শুরু করলাম, “হরিহর চট্টোপাধ্যায়, তুমি যতই জমিদার পুত্র হওনা কেন, তোমায় পেলে এখন আস্ত গিলে খাবো বুড়ো!” ঠিক তখনি যেন আমার ভ্রূকুটিকে ভয় করে চলে আসলো জমিদার বাড়ির একটা ঘোড়ার গাড়ি। দ্রুত বের হয়ে ঘোড়ার গাড়িতে উঠেই বললাম, “ঐ বুড়োর এতক্ষণে সময় হল তোমায় পাঠানোর? বুড়ো কি আমায় ভুলে গেছে? চল এইবার, বুড়োকে আস্ত কাঁচা গিলে খাবো!”
“আজ্ঞে না বাবু, কত্তা বাবু আপনাকে আনতে অনেককন আগেই পেটিয়ে দেয়েচে। ঐ রাস্তায় বাদলার জন্যি কাদায় গাড়ি নিয়ে আসতি অনেক দের হইগেছে বাবু।” অনেক বিনয়ের সাথে বলল রামু কাকা।
আমি বললাম, “ওহ আচ্ছা, তো বুড়ো, জেঠু, বড়মা আর বিন্দুমা কেমন আছে গো কাকা? তুমিই বা কেমন আছো?”
“আমি ভাল আচি বাবু। চলুন এগোই এই বেলা।”
“হুম তাই যাওয়া যাক, চল যাই। বৃষ্টি হয়তো আরও বাড়বে।”

ঠিক তখনি হন্তদন্ত করে বের হয়ে পড়লাম দুজনে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে। পরে সত্যিই মনে হল যে দাদুর প্রতি অগত্যাই রেগে যাওয়াটা একেবারেই অবান্তর ছিল। প্রধান সড়ক থেকে গ্রামের পথ ধরতেই দেখলাম রাস্তার অবস্থা নাজেহাল! উফ এর মধ্য দিয়ে আবার যাচ্ছে ঘোড়ার গাড়ির চাকা আটকে! ধুম বৃষ্টির মধ্য দিয়ে অনেক কষ্টে পৌঁছলাম।

দেখেই দাদু আনন্দে আদরে গদগদ হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,“হা হা হা, হ্যালো ইয়ং ম্যান, হাও আর ইউ?”
“তোমায় ছাড়া কি করে ভাল থাকি বলতো দুষ্ট বুড়ো?!”
“হা হা হা, আসতে কোন ঝামেলা হয়নি তো?”
“মহা ঝামেলা হয়েছে, বাদ দাও ওসব!” এমন করেই বেশ কিছুক্ষণ গল্প চলতে থাকে আমাদের।

আমার পাঁচ বছরের আদর একবারেই এবার হয়তো করার উপক্রম বড়মা মানে আমার জেঠিমার। অনেক অনেক খাবারের সমাহার। দুপুরের আহার শেষে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে উঠে দেখলাম বৃষ্টি হচ্ছে না, তবে আকাশ তখনো কালো মেঘে ঢাকা। সজোরে বাতাস বইছে। একটু জমিদার বাড়ির দোতলার ছাদে গিয়ে ঘুরে দেখা যাক।

এসে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এ যেন আরও সুন্দর হয়েগেছে নানা রকম ফুলের গাছে। হঠাত করেই কেউ তার দুই হাতের তর্জনী, মধ্যমা এবং অনামিকা আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরল আমার চোখ দুটো। এমনিতেই আমাদের জমিদার বাড়িটাকে অনেকে ভূতুরে বাড়ি নামে জানে, অনেক গুজব ও রটেছে এর আগে। বাড়ির বাইরে থেকে দেখলে পুরানো ছোট ছোট ইট গুলো দেখলে মনে হয়, ভীম ভূত যেন ধারালো দাঁত বের করে ভয় দেখাচ্ছে। বাড়ির দেয়াল গুলোতেও শ্যাওলা ধরেছে এবং কিছু কিছু জায়গাতে ছোট বটের চারা হয়েছে। যাই হোক, ভয়ে বুকের মধ্যে হৃদপিণ্ডের রিদম পাল্টে খুব দ্রুততর হয়ে গেল!

অগত্যা এমন করে আর কেউ ধরবে না আমার বিন্দু পিসি ছাড়া। হাত সরিয়েই জড়িয়ে ধরি আমার মায়ের মত পিসিমাকে। আমার জন্মের পরেই আমার মা মৃত্যু বরণ করে। তার পর থেকেই আমার থেকে পনের বছরের বড় বিন্দু পিসিই আমার মা। বাবা আমার ভাল পড়াশোনার জন্য কলকাতার কলেজে পাঠানোর কথা ভেবে আর স্থির থাকতে পারেনি। নিজেও কলকাতা চলে গিয়েছে। জেঠুকে বলেছে, “দাদা, তুমি বাবার জমিদারি দেখো। ও আমায় দিয়ে হবে না। কলকাতার একটা আপিসে আমার উচ্চপদে চাকুরি হয়েছে। আমি কলকাতাতেই যাবো।” সেই থেকে এই পাঁচ বছর পরে লগ্নভ্রষ্টা উপাধিযুক্ত আমার বিন্দুমার সাথে দেখা।
কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে “কিরে এদ্দিনে তোর মনে ধরেছে আমার কথা?”
স্নেহের পরশে দু-ফোঁটা অশ্রু আমার ও বের হয়ে আসলো। ঠিক তখনি আবার বেদম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। দৌড়ে দুজনেই নিচে চলে আসলাম। খুব গল্প হল দুজনে করিডরে ইজি-চেয়ারে বসে। ততক্ষণে সন্ধ্যা নামবে নামবে। বিন্দুমার সাথে বসে উপভোগ করছিলাম ঝড় হাওয়া। গাছের পাতা গুলো যেন উজ্জ্বল সবুজে প্রকৃতির এই দৃশ্যকে আরও সুষমামণ্ডিত করে রেখেছে।

বিন্দুমা চলে যাওয়ার পরেই ঘরের কড়া নেড়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলো রমেন দা। “কিরে, আসবো?”
“অবশ্যই! এসো দাদা।”
দুজনেই বসে খানিকক্ষণ গল্প করলাম।


রমেন দা বয়সে আমার থেকে তিন বছরের বড় হলেও বন্ধুর মত আমরা দুজনে। রমেন দাদা ওকালতি নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেছে গত নভেম্বরে। কিন্তু সাহিত্যের প্রতি তার ঝোঁক ছোট থেকে। কিছু সময় পরেই হৈমন্তী এবং অন্তরা দি এসে বলল, “দাদু তোদের দুজনকে যেতে বলেছে জলসা ঘরে... চল এখনি“
“কিন্তু কেন?” আমি বললাম
অন্তদি বলল, “জানি না ঠিক, তবে চল যাই।“

জলসা ঘরে গিয়ে দাঁড়ালাম আমরা চার জন। সাথে এসে একটু পরে যুক্ত হল জয়ন্ত কাকু। দাদু একটা কাগজ দেখে পাঁচটা ছোট ছোট কাগজে কি যেন মেলাচ্ছে আর লেখছে। এক কথায় আঁকিবুঁকি! অন্তরা দি বলল, “দাদু, দ্রুত বলতো। রবীন্দ্র বাবুর ‘চোখের বালি’ নভেলটা পড়ছিলাম। ডেকে পাঠালে কেন?”
“তোদের সাথে একটা ধাঁধা খেলবো বলে।“ বলল দাদু।
“ধাঁধা? কেমন ধাঁধা? কিসের ধাঁধা?” বললাম আমি।
হৈমন্তী,”দাদু, এক নতুন রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।“
দাদু, “হুম, সবাই একটা করে কাগজ নে। সব কাগজে একই লেখা। এর মাঝে সংকেত দেয়া আছে এক রহস্যের। যে প্রথমে অন্বেষণ করতে পারবি, সেই পাবি খুব মূল্যবান পুরষ্কার।“

যথা নিয়মে সবাই হাতে নিলাম কাগজ গুলো। এমন খেলা দাদুর সাথে আগে প্রায়শই খেলা হত। কাগজে লেখা ছিল,
“অগ্নিতে পশলা ছুট একা একা ঢলিয়ে,
তা দেখে সমকোণে ডানে ছুটে চল এগিয়ে।
‘কৃম্ভ ও মকর রাশি’র পূর্বে যোগ হয় এক কান,
কদম গুনে যাও, ঘুম ভাঙে তার সাথে কোন
এক বলবান!
তার পথ ছাড়িয়ে,
অশ্বত্থ বাবু দাড়িয়ে
থুম ধরা ভূত বনে,
তার পদতলে গুপ্তধন!"

কাগজ নিয়ে যে যার মত চলে এলাম। ঘরে বসে একবার পড়ে মনে হল এটা কোন সংকেত আর ধাঁধা নয়, গোলকধাঁধা! অগ্নি মানে আগুন, তার আবার পশলা ছুটে মানে কি? তা ঢলে চলে কি করে। আগুন তো উপরের দিকে উঠতে থাকে। তাও আবার কি মকর রাশি আগ্রাম বাগ্রাম কতকি! রমেন দাদা হয়তো এতক্ষণে হয়তো তা মিলিয়েও ফেলেছে। আর বিলেত ফেরত লয়ার অন্তরা দি তো বাংলায় মহা গবেষক। কি জানি কি করছে তারা। ইস যদি রমেন দা আর আমি একসাথে অন্বেষণে নামতাম, অন্তরাদিকে পিছে ফেলে চলে যেতাম।
ভাবলাম একবার অন্তরা দির ঘরে যাবো। ওর মত এতো মেধাবী মেয়ে সত্যিই খুঁজে পাওয়া দায়। এই যুগে মেয়েদের বয়সের গণ্ডী ১৩ না পেরোতেই বিয়ে বরণ করে নিতে হয় এই পাশবিক সামাজিকতার কারণে, সেই যুগে ওর বয়স ছাব্বিশ অতিক্রম করে সাতাশ হয়ে গেলো। এখনো বিয়ে করেনি। ও বলে, ওর আত্মসম্মান বোধটা আগে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। অন্যের প্রতি ভরসা করে পা বাড়াবে না। ওর পড়াশোনা আর সাধু চেতনাই সর্বশ্রেষ্ঠ ওর কাছে।

দাদুও ওর কোন কাজে ওকে বাধা দেয় না। হয়তো কারণটা বিন্দুমা। লগ্নভ্রষ্টা মেয়ের কষ্ট দেখে দাদু নিজেও সমাজ পরিবর্তন চায়। তাই দাদু নিজেই ঈশ্বরচন্দ্র বাবুর আদর্শ গ্রহণ করে দিদিকে কলেজে যেতে খুব উৎসাহ দিয়েছে। আমার আধুনিক চেতনার জেঠু ও তাই করেছে। কিন্তু বিপত্তি ছিল বড় মা’র। তার ভয় ছিল সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে। কি জানি কি হয় তার মেয়ের সাথে!

থাক এসব কথা। তখনি দিদির ঘরে খুব আগ্রহ নিয়ে গেলাম। দেখলাম হৈমন্তী ঘুমিয়ে পড়েছে। আর অন্তরা দিদি বাংলা অভিধানে কিছু খুঁজছে। সর্বনাশ! এতো দেখছি হাতে সেই সংকেতের কাগজটি!
ঠিক তখনি, “কিরে বাঁদর? উঁকি দিয়ে কি দেখছিস দরজার ও পাশ থেকে?”
আমি বললাম- তুই কি করে বুঝলি আমি এখানে?
দিদি বলল- বৈদ্যুতিক লাইটের কারণে তোর ছায়াটা দেখা যাচ্ছিল।
-যাই হোক বলতো সংকেতটা আসলে কি বোঝাচ্ছে?
-খুঁজে বের কর, পরে বলে দিচ্ছি! হাহ হা হা!
-তোর অট্টহাসি সহ্য হচ্ছে না। গেলাম!
-বাঁদরদের এতো রাগ করতে নেই!

কিছু না বলেই বেরিয়ে পড়লাম এবং ঘরে ঢুকে আমিও অভিধান নিলাম হাতে। এবার খুব মনোযোগ দিয়ে আবার পড়লাম সংকেতটা। প্রত্যেকটার অর্থ বার বার অভিধানে দেখলাম। পশলা মানে বর্ষণ বুঝায়, বর্ষণ মানে পতন, এর পরে আর কি যায়! এমন আঁকিবুঁকি করতে করতেই হৈমন্তী বলল,”দাদা, দিদিভাই একটা কাগজে এই গুলো লেখার পরে কাগজটা ছিঁড়ে ফেলে দিল। দেখতো কি আছে? আমি কিছুই বুঝলাম না!”

এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। কাগজে লেখা, “অগ্নি = দক্ষিণ –পূর্ব, পশলা = বর্ষণ বা বৃষ্টি। কিন্তু তা সব সময় থাকে না। সব সময় থাকে কি?!” বিষয়টা একটু আঁচ করতেই হৈমন্তিকে বললাম, “দিদিভাই পাগল হয়ে গেছে। এসব কিছু না। আর যদি সত্যিই কিছু হত তেমন, তো এমন করে ফেলত না যে আমরা পাই। দেখলি না, ও এটা ছিঁড়ে ফেলে দিল।“

ও হয়তো বুঝে গেছে যে আমি কিছু ওর কাছে লুকিয়েছি। কিন্তু সত্যিই তো, অগ্নি মানে শুধু আগুন হবে কেন? তাতো দক্ষিণ-পূর্ব কোণ বা অগ্নি কোণ ও হতে পারে। আর সংকেতের মাঝে তো অবশ্যই প্রথমে দিকনির্দেশনা দিবে। পেয়ে গেলাম অগ্নি কোণ। কিন্তু পশলা ঢলে যাবে কি করে? বৃষ্টি তো সব সময় থাকে না। আর বৃষ্টি ঢলেই বা চলবে কি করে?! এমন কি আছে আমাদের এখানের অগ্নি কোণে, যা ঢলে চলে?
অনেকক্ষণ ভাবার পরে মগজে এলো, ঢলে তো পানিই চলতে পারে এখানে। আর তা হতে পারে কোন নদী। তবে সেখানে পশলা বা বর্ষণ কি করে আসে? আর অগ্নিকোণে তো নদী চলছে না, তা দক্ষিণ থেকে পশ্চিমে চলছে! ওহ, শুধু নদী নয়, ঢলে চলার জন্য আরও একটা বস্তু সেখানে আছে। আর তা হল ঝরনা! হ্যা, দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ২৫ মিনিটের পথ পরেই তো পাহাড় বেয়ে নেমে এসেছে এক ঝরনা! এখনই একবার যাওয়া যাক, উফ সেই ধুম বৃষ্টি! যাই হোক, আমার আগে যাওয়ার ও কারো কোন সুযোগ নেই। বাঁচা গেলো!

কৌতূহলী মনকে কোন ভাবেই শান্ত করতে পারলাম না। তখনি অগ্নিকোণের ঝরনার কাছে যাওয়ার শক্তমত একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু ভয়ের কারণে আবার সাহস করতেও পারছি না। সব চিন্তা বাদ দিয়ে, হাতে একটা বিদেশী টর্চ লাইট ও রেইনকোট নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। ওরে বাবা, কি গহিন বন। প্রাচীন গাছ গুলো যে ঠিক কত প্রাচীন তা শুধু গাছ গুলোই জানে। সব মিলিয়ে এই ধুম বাদলার রাতে পরিবেশটা একেবারে ভূতুরে মনে হচ্ছে।

কিছুক্ষণ পরেই আমার টর্চের লাইটে দেখা গেলো এক অদ্ভুত দৃশ্য! এক সাদা কাপড় পরা নারীমূর্তি আমায় হাত উঁচু দেখিয়ে ওর দিকে যেতে বলছে। মুখটা ঠিক দেখার আগেই আঁচ করে ফেলেছিলাম যে এটা কোন পেত্নী হবে নিশ্চয়! অগত্যা এক চিৎকার করে ১০ মিনিটের বনের পথ ৩ মিনিটে দৌড়ে অতিক্রম করে জমিদার বাড়ির মধ্যে চলে আসলাম। ওরে বাবা, সেটা ছিল কি আসলে? রহস্যের মাঝে আরেক রহস্য! ভয়ে কাবু হয়ে ঘরের মাঝে কাঁথা মুড়ি দিয়ে পেত্নীর ভয় থেকে বাঁচতে চাইলাম। মনে হচ্ছিল আমার ঘরের খাটের নিচেই ও শুয়ে আছে!


রাতটা গুটিসুটি দিয়ে খুব আতঙ্কে কেটেছে। তবে ভোরের আলো ফুটতেই ওসব ভূতের চিন্তা মাথা থেকে ঝেরে ফেলেদিলাম। ছোটবেলা থেকেই দিদিভাই’র মত আমিও একটু বস্তুবাদী ধাঁচের। ভূত-প্রেতে আহামরি বিশ্বাস নেই আমার। তবে কাল রাতে না চাওয়া সত্ত্বেও ঐ অদ্ভুত ভয়ংকর দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বারবার। খুবি দুরূহ রাত অতিক্রম করে সকালের এই সজীব প্রকৃতির মনোহর সৌন্দর্যের দৃশ্য সব ভুলিয়ে দিল।

নাহ, আর এক মুহূর্তও নয়, এক্ষনি আবার মেলাতে হবে সেই সংকেতটা। গতকাল “অগ্নিতে পশলা ছুট একা একা ঢলিয়ে,’’ এইটুকু অন্বেষণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আজকে অমনি মত চলতে শুরু করলাম অগ্নিকোণে ২৫ মিনিটের জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে ঝরনার দিকে হাতে একটা অভিধানের বই নিয়ে। গহিন জঙ্গলের প্রাচীন গাছ গুলো যেন আমার দিকে ঘাড় নিচু করে ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। গা ছমছমে একটা আবহাওয়া বিরাজ করতে শুরু করলো। হঠাৎ আবার মনে হল গত রাতের কথা। কোন কথা না ভেবেই এক দৌড় দিলাম। একদম ঝরনার সামনেই থামলাম। ঝরনার শব্দ আর দখিনা বাতাস একদম সারা শরীর ঠাণ্ডা করে দিল।

কিন্তু আরেকটা বিষয় এখন আরও ভাবিয়ে তুলছে। “অগ্নিতে পশলা ছুট একা একা ঢলিয়ে, তা দেখে সমকোণে ডানে ছুটে চল এগিয়ে।“ এখন আমি ঝরনার যেই দিকেই দাঁড়াই, সে দিক থেকেই তো ডানে চলতে পারি। তাছাড়া এর পরেই তো আবার বলা আছে, “‘কৃম্ভ ও মকর রাশি’র পূর্বে যোগ হয় এক কান,
কদম গুনে যাও, ঘুম ভাঙে তার সাথে কোন
এক বলবান!
তার পথ ছাড়িয়ে,
অশ্বত্থ বাবু দাড়িয়ে
থুম ধরা ভূত বনে,
তার পদতলে গুপ্তধন!"

এখন তো আবার জ্যোতিষ শাস্ত্র ও খুঁজতে হবে। নিরাশ হয়েই ফিরতে হচ্ছে। আবার মনে মনে দাদুকে বকা দিতে শুরু করলাম। হঠাৎ দমকা দখিনা হাওয়া একটা সজোরে ধাক্কা দিল। সাথে সাথে মস্তিষ্ক কিছুটা খুলে গেলো এবং নিরাশাও কিছুটা কমলো। আরেহ, অভিধান খুলেও তো একটু নিশ্চিত হওয়া যায়। তাই করলাম সাথে সাথে। আরেহ, হ্যা! ডান মানে দক্ষিণ! অগ্নিকোণ কোন থেকে সমকোণ, অর্থাৎ ৯০ ডিগ্রি কোণ করে দক্ষিণে ঘুরলে যে হয় দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ বা নৈঋত কোণ।

যাই হোক, এবার ফিরে গিয়ে জ্যোতিষ শাস্ত্র খুঁজতে হবে। হন্তদন্ত পায়, গতকাল রাতের সেই ভূতের রহস্য নিয়ে একটু ভাবতে ভাবতে চলতে শুরু করলাম। আকাশ আজও মেঘাচ্ছন্ন। তবে গতকালের মত বৃষ্টি নেই। তাই আজকেই পরিবেশটা বেশি ভাল লাগছে। শহুরে কোলাহল আর বাড়ির কংক্রিটের মাঝে গুমোট আবহাওয়া থেকে কিছুটা সময় বিরতিতে ঠিক কতটা যে সতেজতা পাচ্ছি, তা বলা যাবে না। তবে গতকাল রাতের ঐ রহস্যের কিছুই ঠাওর করতে পারছি না।

বাড়িতে ঢুকতেই দেখি জয়ন্ত কাকা তার কাগজটা ছিঁড়ে ফেলে দিল। সাথে বলল, “আমায় দিয়ে এসব হবে না।“ রমেন দা তার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। দিদিভাই’র কোন খবর নাই। দাদুর লাইব্রেরীতে ঢুকে একটা জ্যোতিষ-শাস্ত্র বের করে নিলাম। ওমনি বড়মা এসে বইটা তুলে দিয়ে বলল, “আগে খাবার খা, তার পরে সব।“

বাধ্য হয়ে তাই করলাম। গিয়ে দেখি দিদিভাই আর হৈমন্তী কিছু কথা বলছে। আড়ালে দাঁড়ালাম। হৈমন্তী বলছে দিদিভাইকে, “আচ্ছা বলতো, কৃম্ভ ও মকর রাশির পূর্বে কোন রাশি?”
“তোরা খুবি অলস। একটু খুঁজে নিলেই তো পারিশ। এই সব বই একটু পড়লেও হয়। অন্তত জানতে পারবি মানুষের মাঝে কত কিসের সব বিশ্বাস আর অন্ধবিশ্বাসের দানা বেঁধে আছে!”
“হুম, তা ঠিক। এইসব বই পড়া হয় না। জ্যোতিষ-শাস্ত্র বিষয়টাই অদ্ভুত। এইবার বলনা!“
“কুম্ভ রাশি।“

এ যেন একেবারে সোনায় সোহাগা! ঘরের দিকে ঘুরবো, এমন সময় বড়মা, “আগে খাবার, পরে সব।“
“আসছি গো, এখনি!”
কোন কথা না শুনেই বড়মা হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো খাবার খেতে। অনেক জ্ঞান গর্বের কথা শুনতেও হল। পরে আমার ঘরের করিডোরে বসে মিলিয়ে নিলাম একবার। সত্যিই তো, কৃম্ভ ও মকর রাশির পূর্বে তো কুম্ভ রাশি। বাকিটুকু মেলাতে গেলে আর একটু দেখতে হচ্ছে, “‘কৃম্ভ ও মকর রাশি’র পূর্বে যোগ হয় এক কান,
কদম গুনে যাও, ঘুম ভাঙে তার সাথে কোন
এক বলবান!
তার পথ ছাড়িয়ে,
অশ্বত্থ বাবু দাড়িয়ে
থুম ধরা ভূত বনে,
তার পদতলে গুপ্তধন!"

কুম্ভ রাশির সাথে যোগ করতে হবে এক কান। আরেহ, কান = কর্ণ হয়। মানে কুম্ভ+কর্ণ= কুম্ভকর্ণ! এখন কদম গুনে যাওয়া বাকি। কারণ এই বলবানের ঘুম ভাঙে প্রতি ছয়মাস পর একবার ছয়মাসের জেগে থাকার জন্য। ইন্দ্র দেবের কারণে তার এই দশা হয়েছিল। তার মানে, হয় ছয় কদম এগোতে হবে, না হয় ছয় মাসের সাথে ত্রিস দিন গুণ করতে হবে। অর্থাৎ হয় তা ছয় কদম বা একশত আশি কদম গুনে যেতে হবে ঝরনা থেকে নৈঋতের দিকে।

অশ্বত্থ বাবু দিয়ে যে একটা অশ্বত্থ গাছ বোঝানো হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু থুম ধরা ভূত বনে, দিয়ে কি বোঝানো হচ্ছে তা ঠিক খুঁজতে খুঁজতে কিছুই পেলাম না গত দুঘণ্টায়!

সবে দুপুর ২টা, একটু পরেই বের হয়ে পড়বো সিদ্ধান্তে উপনিত হলাম এবং যথা সময়ে পৌঁছে গেলাম ঝরনার কাছে। ৯০ ডিগ্রি বা সমকোণ করে নৈঋত কোণের দিকে ছুটতে শুরু করলাম। ছয় কদমে কিছুই হল না। তা ছাড়া বলা আছে থুম ধরা ভূত বনে থাকবে সে। তাই ১৮০ কদম হাটার উপক্রম করলাম।

একটু ভেতরেই শুধু গহিন জঙ্গল ছাড়া আর কিছু নেই। অশ্বত্থ গাছ অনেক। তবে ভূত বন দিয়ে কি বোঝানো হয়েছে? ভাবতে লাগলাম, ভূত কি? কখন হয় ভূত? কেন হয়? ভূত কি আদৌ আছে? এটাতো মনের ভ্রম মানুষের!
“যাহ বাবা, এটা বুঝতে এতো সময়” বলে উঠলাম একটা মরা অশ্বত্থ গাছ দেখে। থুম ধর ভূত, বনকে নয়, অশ্বত্থ গাছকেই বোঝানো হয়েছে। এটা একটা মৃত অশ্বত্থ গাছ। এবার এর পদতলে মানে গাছে নিচে খুঁড়তে হবে। এইকি, কিছুটা মাটি খোঁড়া হয়েছিল বলে মনে হচ্ছে! কেউ নিয়ে গেল নাতো? নাহ, তাও দেখি।

খুঁড়ে অপ্রত্যাশিত ভাবে পেলাম মাত্র একটা চাবি! সেকি, মাত্র একটা চাবি? যাই হোক, তাই নিয়ে যাওয়া যাক!

বাড়িতে এসে প্রথমে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। রাতের বেলায় দাদুর কাছে গেলাম জলসা ঘরে। গিয়ে বললাম, “এটাই কি গুপ্তধন?”
“হুম, এটাই সেই গুপ্তধন মাই ইয়ংম্যান! ডাকো সবাইকে!”

সবাই চলে আসলো এবং সবার আসার পরে দাদু বলল, “তোরা কি জানিশ এটা কিসের চাবি?”
হৈমন্তী, “কিসের?”
“এটা হচ্ছে কলকাতায় আসা একেবারে নতুন মডেলের একটা গাড়ির চাবি। এটাই ছিল সেই গুপ্তধন!“

সবাই খুব অবাক হয়ে রইলো! এতো দামি উপহার! কিন্তু আমার মন খারাপ হয়ে গেলো আরেকটা রহস্য অন্বেষণ করতে পেরে। নাহ, ভূতের রহস্য আমি অন্বেষণ করতে পারিনি। অন্য আরও একটা রহস্য! এটা ভাবতে ভাবতে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

সকালে উঠেই প্রথমে একবার ছাদে গেলাম সাথে চাবিটা নিয়ে। নিচে গাড়িটা সকালে দাদু নিয়ে এসেছে। ছাদে দিদিভাই মুক্ত বাসাতে শ্বাস নিচ্ছে। ওর সামনে গিয়ে চাবিটা ওর সামনে ধরে বললাম, “এইনে, এটা তোরই প্রাপ্য ছিল!”
“মানে? কি বলছিস এই সব?” কিছু না জানার ভাব করে বলল দিদিভাই।
“তোর মিনি বাঁদর এখন এতটাও ছোট নেই যে এইটুকু বুঝবেনা দিদিভাই!”
“কি সব বলছিসরে বাঁদর? আমি কিছু বুঝতে পারছি না!”
“বুঝতে তো আমি পারছি না, কেন তুই এমন করলি? সংকেতের কাগজ তুই এমনিতেই ফেলে দেয়ার মত মেয়ে নয়। আর তুই কুম্ভ রাশির বিষয় জানিশ আর কুম্ভকর্ণ নয়? আর আমার আগেই তুই গিয়েছিলি গুপ্তধন অন্বেষণে এবং তুই মাটিও খুঁড়েছিলি আমার আগে গিয়েই। তানা না হলে, রাতের বৃষ্টির পরেও মাটি খোঁড়ার চিহ্ন কি করে থেকে যায়? কিন্তু তুই কেন তা ফেলে আসলি বলতো?”
“তা না হয় রহস্যই থাক!” মৃদু কণ্ঠে বলল দিদিভাই।
“আচ্ছা ভূতের কি কোন ব্যাখ্যা আছে তোর কাছে?”
“সব ভূতের কথা জানি না আমি, তবে তোর ভূতের ব্যাখ্যা আমি দিতে পারি। রাতে আমিই ছিলাম ঐদিন!”
“তো সাদা শাড়ির রহস্য কি?”
“ওরে বোকা বাঁদররে, সেটা হলদে শাড়ি ছিল। তোর উচ্চ শক্তির টর্চের আলোয় তা সাদা দেখাচ্ছিল! হি! হি! হি!”
“তো হাত উঁচু করে কেন ডেকেছিলি?”
“চোখে টর্চের আলো পড়াতে আমি হাত চোখের সামনে রেখে চোখ দুটো রক্ষা করছিলাম!”
“তো সব রহস্য শেষ হয়ে গেলো, এবার শুধু তোরটা বলেদে প্লিজ!”
“তোর অন্বেষণ শক্তি টাকে পরীক্ষা করে দেখলাম। তুই পেরেছিস!”

কোন কথা না বলে, সঙ্গে সঙ্গে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। ওর আদর্শটাই এবার পুরোপুরি গ্রহণ করেছি। আমার সর্বকালের সর্ব মহৎ জ্ঞানী আমার দিদিভাই!

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:৫৮

হাসান মাহমুদ১৮ বলেছেন: আমার Email এর জীবন্ত অনুভূতিণ্ডলোকে হয়ত Spam Mail ভেবে Delete নামক করুন click -এ হত্যা করা হয়েছে। এণ্ডলো হয়তো সস্তা কাগজের মোড়কে ফিকিয়ে গেছে

১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সকাল ১১:০০

রাফিন জয় বলেছেন: ঠিক বুঝলাম না!

২| ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ১০:০২

ফয়েজ উল্লাহ রবি বলেছেন: ভাল।

১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সকাল ১১:০০

রাফিন জয় বলেছেন: ধন্যবাদ!

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.