| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শ্রাবণধারা
" আমাদের মতো প্রতিভাহীন লোক ঘরে বসিয়া নানারূপ কল্পনা করে, অবশেষে কার্যক্ষেত্রে নামিয়া ঘাড়ে লাঙল বহিয়া পশ্চাৎ হইতে ল্যাজমলা খাইয়া নতশিরে সহিষ্ণুভাবে প্রাত্যহিক মাটি-ভাঙার কাজ করিয়া সন্ধ্যাবেলায় এক-পেট জাবনা খাইতে পাইলেই সন্তুষ্ট থাকে......."

ইরান যুদ্ধে আমেরিকার সামরিক ইন্ড্রাস্ট্রি ছাড়া, বড় মুনাফার সুযোগ নেই - তবু কেন ট্রাম্প যুদ্ধে জড়ালেন? বলা হচ্ছে, আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরায়েল লবির প্রভাব ও এপস্টেইন নথির সংবেদনশীল ভিডিও রেকর্ড প্রকাশের ভয় দেখিয়ে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে যুদ্ধে টেনে এনেছে।
আমেরিকার জনগণের লাভ না থাকলেও, এই যুদ্ধে ট্রাম্প ও তার পরিবার ব্যক্তিগত সুবিধা পাবে। ইরান আক্রমনের মাধ্যমে ট্রাম্প এপস্টেইন ফাইল থেকে মানুষের নজর সরাতে পেরেছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকান দলকে সুসংগঠিত করতে সাহায্য করবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ট্রাম্প নির্বাচনের সময়সীমা পিছিয়ে দিতে পারেন। পাশাপাশি, তৃতীয় মেয়াদের জন্য জায়নবাদী লবির সমর্থনও তিনি ইরানে বোমা হামলা করে অর্জন করে ফেললেন।
আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরায়েল লবির যে ক্ষমতা এখন দৃশ্যমান হচ্ছে, সেটা অভূতপূর্ব। ইসরায়েল গত ত্রিশ বছর ধরে এই যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করছিল। এখন আমেরিকার রাষ্ট্র কাঠামোর প্রতিটি স্তরে তাদের যে অভাবনীয় প্রভাব তৈরি হয়েছে এটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্য দখল থেকে শুরু করে প্যাক্স জুডাইকার ভিত্তির জন্য যা কিছু প্রয়োজন সেটা করার সুবর্ন সুযোগ তাদের এসেছে। কিভাবে এই সীমাহীন প্রভাব তারা অর্জন করলো তা শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় না। এখানে এমন কতগুলো জটিল শক্তির সমাবেশ ঘটেছে, যাকে একক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
গতকাল, একজন মেরিন সেনা যখন প্রশ্ন করলেন, কেন তাকে ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধ করতে হবে, তখন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার বদলে সেখানে উপস্থিত পুলিশ তাকে সরিয়ে নিয়ে গেল। বিস্ময়কর হলো, একজন রিপাবলিকান সিনেটর পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়ে সেই মেরিন সেনাকে জোর করে বের করার সময় তার হাতের কব্জি ভেঙে দিলেন। ইসরায়েল লবির দ্বারা কতখানি সম্মোহিত হলে একজন জনপ্রতিনিধি পুলিশের সঙ্গে মিলে সৈনিককে আক্রমণ করতে পারে! খবরে প্রকাশ, সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে ইসরায়েলে গিয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পরামর্শ দেন, কীভাবে ট্রাম্পকে ইরানে বোমা হামলার জন্য রাজি করানো যায়। এ উদ্দেশ্যে তিনি তাকে গোয়েন্দা তথ্যও সরবরাহ করেন। ইসরায়েলপন্থী শক্তি আমেরিকার রাজনীতিতে যে গভীরভাবে প্রোথিত এই ঘটনাগুলি তার উদাহরণ।
আমেরিকার রাজনীতির প্রায় শতকরা নব্বই ভাগ কার্যক্রম এখন এইপ্যাক ও অন্যান্য জায়নবাদী শক্তির অর্থায়ন ও প্রভাবে পরিচালিত হয়। রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে ইসরায়েল লবির স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। না হলে এপস্টেইন ফাইল ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করা হবে। ইরান আক্রমনের মাত্র কদিন আগে এক ব্যক্তি ট্রাম্পের ফ্লোরিডার বাসভবনের নিরাপত্তা চৌকি ভেঙে তাকে মারার চেষ্টা করলে গুলি করে সেই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। আমেরিকার ইরান আক্রমণের সমীকরণে ট্রাম্পের নিজের নিরাপত্তাও যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ঘটানটি তারই ইঙ্গিত দেয়। প্রথমে চাদাঁ বা ঘুস, তাতে কাজ না হলে ব্লাকমেইল, তাতেও কাজ না হলে জীবননাশের হুমকি - বিষয়টি এভাবে কাজ করে।
নির্বাচনী প্রচারণায় এই লবি ইসরায়েলপন্থী প্রার্থীদের জন্য কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে। আবার যারা ইসরায়েল বিরোধী, তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জন্যও লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করা হয়। মিরিয়াম অ্যাডেলসন নামের একজন খুব ধনী ডোনার ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি চাঁদা দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের তৃতীয় মেয়াদের জন্য তিনি আরও ২৫০ মিলিয়ন ডলার চাঁদা দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন আমেরিকান দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করেন, তার পেছনে এই দাতার একক প্রভাব ছিল।
ট্রাম্প নির্বাচনে জেতার পরে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে তার বক্তৃতায় অ্যাডেলসনের ভূয়সী প্রসংশা করেছিলেন। ভাষাটা ছিল এমন: "ঐ দেখ ওখানে ঋজু হয়ে মিরিয়াম বসে আছে। তার ব্যাংক একাউন্টে ৬০ বিলিয়ন ডলার আছে।" বিচিত্র দেহভঙ্গিমায় বলা ট্রাম্পের সেই ভাষণে সেদিন নিজেকে রাজা হিসেবে দাবি করা লোকটার লোলুপ, কদর্য ও নতজানু চরিত্রটি অঙ্গভঙ্গিতে প্রকাশ পেয়েছিল।
হেইম সাবানের মতো ডোনাররা আবার ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী প্রচারনায় ব্যয় করেন। কোটি কোটি ডলার দিয়ে আইনপ্রণেতাদের পকেটে পুরে ফেলেন। সাবানের মতে, এই ধরনের ব্যবস্থা আমেরিকার রাজনৈতিক কাঠামোয় আগে থেকেই ছিল; তারা এটির সদ্ব্যবহার করেছেন মাত্র।
এ প্রসঙ্গে আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থমাস ফার্গুসনের রাজনৈতিক দলের প্রতিযোগিতায় বিনিয়োগ তত্ত্বের কথা উল্লেখ করা যায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের ভোটের দ্বারা নয়, বরং ধনী বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক অভিজাতদের জোট দ্বারা পরিচালিত হয়, যারা নীতি প্রভাবিত করতে নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থায়ন করে। ফার্গুসনের মতে, ধনী ব্যবসায়ী বা বড় বিনিয়োগকারীরা রাজনীতিতে টাকা দেয় এই কারনে যে, এখান থেকে তারা সুবিধা বা লাভ পাবে। রাষ্ট্রের পলিসি বা নীতি পরিবর্তন সাধারণ ভোটারদের ইচ্ছার কারণে নয়, যারা চাঁদা দেয় সেই শক্তিশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর জন্য করা হয়। যেমন তাদের পক্ষে আইন, নীতি বা সিদ্ধান্ত হবে।
সাবেক কংগ্রেসম্যান পল ফিন্ডলি উল্লেখ করেছিলেন, কংগ্রেসে ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া রাজনৈতিক আত্মহত্যার সামিল। এইপ্যাক এর বার্ষিক সম্মেলনে হাজার হাজার রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও দাতা উপস্থিত হন, যেখানে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টরা ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন।
ধর্মও এই প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমেরিকায় প্রায় ত্রিশ লক্ষ ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান রয়েছেন, যাদের বলা বয় খ্রীষ্টান জায়নিস্ট। ট্রাম্প নিজেও একজন ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান। এরা বিশ্বাস করেন ইসরায়েলের অস্তিত্ব বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীর অংশ। এই ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিয়েছে একটি সংঘটন। এরা হোয়াইট হাউসে বাইবেল পাঠচক্র করে। ২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করেন, এটিকে ইভানজেলিক্যাল ভোটারদের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হয়েছিল।
এরই ধারাবাহিকতায়, কদিন আগে শোনা গেল যে মার্কিন সেনাবাহিনীর কিছু কমান্ডার ইরানে ইসরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধকে আর্মাগেডন এবং যীশু খ্রিস্টের প্রত্যাবর্তনের ধারণার সঙ্গে তুলনা করছেন। তারা তাদের সৈনিকদের বলছেন যে এই যুদ্ধ ঈশ্বরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ এবং ট্রাম্প ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে এই যুদ্ধের সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন।
মার্কিন সরকারের খুব উচ্চপদগুলোতে যারা এখন আসীন রয়েছেন, তাদের অনেকেই ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রকল্পের অংশ। ইসরায়েল দীর্ঘ সময় ধরে এদের পেছনে বিনিয়োগ করে এই উচ্চপেশাজীবীদের তৈরি করেছে। এমন একজন বর্তমানে সিআইএ প্রধান। তিনি ডালাসের একজন সাধারণ আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি ইসরায়েলপন্থী দাতাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে প্রবেশ করেন, যেখানে তাকে পেশাগত ও রাজনৈতিক ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করা হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি কংগ্রেসে নির্বাচিত হন এবং পরে সিআইএ প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন।
প্রশিক্ষণ প্রকল্পের আরেকজন হচ্ছেন ট্রাম্পের নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার। তিনি খুব তরুণ বয়স থেকেই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া নেটওয়ার্কের সহায়তায় ধীরে ধীরে তার অবস্থান শক্ত করা হয়। মিলারের চিন্তাভাবনা, নীতি ও বক্তব্যগুলো এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যা ইসরায়েলপন্থী রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তিনি একবার মন্তব্য করেছিলেন: “আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে শাসন করে শক্তি, যেখানে শাসন করে বলপ্রয়োগ, যেখানে শাসন করে ক্ষমতা। মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই এগুলোই পৃথিবীর লৌহকঠিন আইন।”
এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি এখন আমেরিকার রাষ্ট্রনীতিতে এমন এক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা যুক্তিবোধের সীমা অতিক্রম করে এক ধরনের রাজনৈতিক অন্ধভক্তিতে রূপ নিয়েছে। যেখানে নীতি নয়, শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার প্রদর্শনই সবকিছু। যেখানে ক্ষমতার দাপটই শাসকের একমাত্র অস্ত্র, যার প্রতি সবাইকে অন্ধ আনুগত্য করতে হয়।
(প্যাক্স জুডাইকা: এটি একটি তত্ত্ব বা ধারণা, যেখানে মনে করা হয় ব্রিটিশ ও আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের পরবর্তী সময়ে এমন সময় আসবে যখন বিশ্বব্যবস্থা ইসরায়েলের আধিপত্যে পরিচালিত হবে।)
©somewhere in net ltd.