| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শ্রাবণধারা
" আমাদের মতো প্রতিভাহীন লোক ঘরে বসিয়া নানারূপ কল্পনা করে, অবশেষে কার্যক্ষেত্রে নামিয়া ঘাড়ে লাঙল বহিয়া পশ্চাৎ হইতে ল্যাজমলা খাইয়া নতশিরে সহিষ্ণুভাবে প্রাত্যহিক মাটি-ভাঙার কাজ করিয়া সন্ধ্যাবেলায় এক-পেট জাবনা খাইতে পাইলেই সন্তুষ্ট থাকে......."

ইতিহাসবিদ ইলান পাপে বলেছেন, "ইসরায়েল মূলত অবৈধ বসতি স্থাপনকারী, ঔপনিবেশিক শক্তির একটি প্রজেক্ট। এটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা স্বাভাবিক রাষ্ট্র নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা"। এ কারণে শুরু থেকেই এর শক্তিশালী সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনী গড়ে উঠেছে। সামরিক শক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জনমত নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের রাষ্ট্রনীতির অংশ। এ প্রসঙ্গে "হাসবারা" ধারণাটি বিবেচ্য। "হাসবারা" শব্দের অর্থ "ব্যাখ্যা করা"। এটি রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রপাগাণ্ডা, যার লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে তথ্যের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইসরায়েল সম্পর্কে ধারণাকে প্রভাবিত করা।
গাজায় গণহত্যা সরাসরি সম্প্রচার শুরু হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিশ্বের গণমাধ্যমে যখন প্রাথমিকভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু হয়, তখন "হাসবারা" নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পশ্চিমা দেশগুলোতে জনমত দমন ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের ওপর তাদের মনোযোগ বাড়ে। তখন থেকে ইসরায়েল একটি বিস্তৃত তথ্যসন্ত্রাস ও অপপ্রচার অভিযান শুরু করে।
এই উদ্দেশ্যে সামনে রেখে, একদিকে যেমন পিআর ফার্ম ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়; অন্যদিকে, টিকটক বা সিবিএসের মতো গণমাধ্যম কেনার জন্য বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়। একদিকে, গণহত্যাবিরোধী আন্দোলন দমাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি ফান্ডিং বন্ধ করা হয়; অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পাঠক্রম পরিবর্তনের জন্য হুমকি দেওয়া হয়। একদিকে, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষণায় প্রভাব ফেলতে থিঙ্ক ট্যাংক ব্যবহার করা হয়; অন্যদিকে, ইসরায়েলপন্থী তাত্ত্বিক কাঠামোকে একাডেমিক পরিসরে প্রচার করা হয়।
তাদের নিয়ন্ত্রণের পরিধি এত বিস্তৃত যে এটি অক্টোপাসের মতো সব দিকে প্রসারিত। সব রাস্তায় তাদের প্রহরী রয়েছে। ফলে দেখা যায়, গাজার গণহত্যার পরেও পশ্চিমা সমাজে সমালোচিত হওয়ার পরিবর্তে তারা প্রশংসিত হয়। শিশুদের স্কুলে বোমা হামলার মতো ঘটনাও তারা মুসলিমদের প্রতি ঘৃণায় রূপান্তরিত করতে পারে।
জনমত দমনের কৌশল হিসেবে ইসরায়েল "অ্যান্টিসেমিটিজম" বা "ইহুদি-বিদ্বেষ" ধারণাকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে। জাতিগত নিধন, উপনিবেশবাদ ও গণহত্যা নিয়ে যে কোনো সমালোচনাকে "ইহুদি-বিদ্বেষ" হিসেবে প্রচার করা হয়। উদাহরণ হিসেবে, কদিন আগে অ্যান্টি‑ডিফামেশন লিগের প্রধান জনাথান গ্রিনব্লাট বলেছেন, "ইহুদি রাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে দায়ী করা ভুল। কাউকে অপরাধী করে তোলা ভুল। আপনি ষড়যন্ত্রমূলক ঘৃণা ছড়াচ্ছেন।" তিনি এখানে সকল ইহুদিকে ইসরায়েলের সাথে মিলিয়ে দেখাচ্ছেন। ফলে ইসরায়েলের প্রতি সমালোচনা মানেই "ইহুদি-বিদ্বেষ"। ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুললে, ইহুদি-বিদ্বেষের ধুয়া তুলে, প্রশ্নকারীকে রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে নিগৃহীত করা পাশ্চাত্য সমাজে একটি সাধারণ ঘটনা।
গাজা যুদ্ধ শুরু হবার পরে, কানাডায় একটি বড় আকারে মিথ্যা প্রচারণা চালানোর জন্য ইসরায়েল একটি বেসরকারি সংস্থাকে নিয়োগ দিয়েছিল। সংস্থাটির কাজ ছিল জাল ভিডিও তৈরি করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া। এআই দিয়ে বানানো ভিডিওটিতে দেখা যায় একজন দাড়িওয়ালা, টুপি পরিহিত লোক কানাডায় শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার জন্য ডাক দিচ্ছেন। ভুয়া ভিডিওটি তখন দ্রুত শনাক্ত করা হয় এবং অনলাইন থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। কানাডার পররাষ্ট্র দফতর ইসরায়েলি দূতাবাসের কাছে তাদের সেই অপকর্মের ব্যাখ্যা দাবি করলে, ইসরায়েল সরকার এই কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই অপপ্রচারটি তারা আবার নতুন করে শুরু করেছে। মুসলিমরা নাকি আমেরিকায় শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এর জন্য ইসরায়েল সরাসরি আমেরিকার জনপ্রতিনিধিদের ব্যবহার করছে। স্পিকার মাইক জনসন মন্তব্য করেছেন, তিনি আমেরিকায় শরিয়া আইন ছড়িয়ে পড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। সিনেটর র্যান্ডি ফাইন বলেছেন, "আমাদের আরও ইসলামবিদ্বেষী হওয়া দরকার এবং ইসলামভীতি যৌক্তিক।" সিনেটর অ্যান্ডি ওগলস বলেছেন, "মুসলিমদের আমেরিকায় থাকা উচিত নয় এবং বহুত্ববাদ একটি মিথ্যা ধারণা।" সিনেটর টমি টাবারভিল যোগাযোগ মাধ্যমে ৯/১১ হামলার ছবির পাশে জোহরান মামদানির ছবি দিয়ে বলেছেন, "ঘরের ভিতরেই শত্রু।"
জায়নবাদী ধনকুবের ল্যারি এলিসন সম্প্রতি বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সিবিএসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। এলিসন প্রথমে যে কাজটা করেছেন তা হলো বারি ওয়েইস নামে একজন কট্টর ইসরায়েলপন্থীকে প্রধান সম্পাদকদের পদে নিয়োগ দিয়েছেন। ওয়েইস, এলিসনের মতোই জায়নবাদী এজেন্ডার শক্তিশালী মুখপাত্র। সিবিএস নেটওয়ার্কের কাভারেজ, ওয়েইস জায়নবাদী এজেন্ডা অনুযায়ী সাজাচ্ছেন। মামদানি ইরানে ইসরায়েল-আমেরিকার হামলাকে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করায় সিবিএস তার সাক্ষাৎকার বাতিল করে দিয়েছে। মামদানির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জন্য ওয়েইস মামদানির স্ত্রীর পুরনো ইনস্টাগ্রাম লাইক নিয়ে কাভারেজ তৈরি করেছে।
গাজার গণহত্যা বিরোধী আন্দোলনের অনেক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কী পড়ানো হচ্ছে এটা নিয়েও এপস্টেইনের এলিটেরা প্রশ্ন তোলেন এবং এটা বলা হয় যে, সরকারি ফান্ডিং পেতে হলে গাজার গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পাঠ্যক্রমকেও তারা হুমকির মুখে পরিবর্তন করে ফেলতে পেরেছেন।
ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে একটি সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গত বছর টরন্টোতে এসেছিলেন প্রখ্যাত গবেষক ও জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি রিচার্ড ফাল্ক। টরন্টো বিমানবন্দরে তাকে আটকে রাখা হয়। তার ও তাঁর স্ত্রীর পাসপোর্ট জব্দ করে কয়েক ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন জবাবদিহিমূলক প্রশ্ন করা হয়। ফাল্কের মতো অধ্যাপককে এভাবে বিমানবন্দরে হয়রানি করার মধ্য দিয়ে অন্য শিক্ষক, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয় যে, ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা এখানে চলবে না।
গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা যাতে নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা মেনে চলেন, ইসরায়েল সেটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। সাংবাদিকদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি তাদের জন্য উত্তম খাদ্য ও পানীয়, বিনোদন ও ভ্রমণের বন্দোবস্ত করা হয়। প্রভাবশালী লোকদের সাথে সাংবাদিকরা সাক্ষাতের সুযোগ পান। তবে যারা ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা করেন, তাদের পেশাগত জীবন ধ্বংস করে দেওয়া হয়। কানাডার সাংবাদিক ট্রাভিস ধানরাজ ২৫ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করার পরে, ইসরায়েল সম্পর্কিত সমালোচনার কারণে সম্প্রতি সিবিসি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন।
একাডেমিক গবেষণা ও ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কোন ঘটনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, কোন তথ্যসূত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, বা কোন ঐতিহাসিক ঘটনাকে সামনে আনতে হবে - এই বিষয়গুলো জায়নবাদীরা নিয়ন্ত্রণ করে। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ধুত অধ্যাপক রাশিদ খালিদির "দ্য হান্ড্রেড ইয়ারস ওয়ার অন প্যালেস্টাইন" বইটি ফিলিস্তিনের শত বছরের সংগ্রামকে ইসরায়েলের জাতিগত নিধন ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরে।
খালিদির প্রপিতামহের সাথে জায়নবাদের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন থিওডর হার্জেলের যে পত্রযোগাযোগ হয়েছিল সেটা খালিদি তথ্য উপাত্তসহ তার বইয়ে উল্লেখ করেছিলেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক "মধ্যপ্রাচ্য প্রতিবেদনের সঠিকতা ও বিশ্লেষণ কমিটি" খালিদির এই গবেষণাকে ভুল বা পক্ষপাতমূলক বলে উল্লেখ করে। ইতিহাস নিয়ে গবেষণাও জায়নবাদীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
একাডেমিক পরিসরেও মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ ও রাজনীতি ব্যাখ্যায় একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়। যেমন বার্নার্ড লুইস বা স্যামুয়েল হান্টিংটনের লেখাগুলো আমেরিকার রাষ্ট্রীয় নীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। তাদের তত্ত্বে ইসলাম ধর্ম এবং মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক সভ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা পশ্চিমা বিশ্ব থেকে ভিন্ন, সংঘাতপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ।
লুইস খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদিধর্মকে জিউডো-ক্রিশ্চিয়ান সভ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং যুক্তি দেন যে, পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসলামের মধ্যে সংঘাত তীব্র হচ্ছে। তিনি "ইসলামি মৌলবাদ" ধারণাটি পশ্চিমে পরিচিত করান এবং "সভ্যতার সংঘর্ষ" শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন, যা পরে পরিমার্জিত হয়ে স্যামুয়েল হান্টিংটনের বিখ্যাত গ্রন্থ "ক্লাস অব সিভিলাইজেশন"-এ স্থান পায় এবং পাশ্চাত্য সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
আমেরিকার ইরাক আক্রমণের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবি ও প্রভাবকারী হিসেবে লুইসকে বিবেচনা করা হয়। ইরাক যুদ্ধকে উসকে দিয়ে তিনি কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেন, যেখানে উল্লেখ করেন, "শাসন পরিবর্তন বিপজ্জনক হতে পারে, তবে কখনও কখনও নীরব থাকার বিপদ তার চেয়ে বড়"।
এপস্টেইন ফাইলের কথা মাথায় রেখে, হিলারি ক্লিনটন মিডিয়ার সামনে এসে ইসরায়েলী এজেন্ডার পক্ষে ও ফিলিস্তিনিদের অমানবিক করে দেখানোর প্রচারণা চালান। ইরান যুদ্ধ সমর্থন করে ট্রাম্পের প্রসংশা করে তিনি বলেছেন, ট্রাম্প ও তার আশেপাশের মানুষদের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ছে এবং তাদের মধ্যে একটা কমন গ্রাউন্ড তৈরি হচ্ছে।
ট্রাম্প ও হিলারির মধ্যে যে কমন গ্রাউন্ড তৈরি হয়েছে, তা ক্ষমতা ও সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রশ্নে। গাজার গণহত্যা সমর্থন করা, ইরান যুদ্ধ উসকে দেওয়া, ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরো দম্পতির অপহরণকে বৈধতা দেওয়া এবং কিউবার ওপর আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধ বজায় রাখা - এই নীতিগুলোর মধ্যে তাদের স্বার্থ এক হয়ে যায়।
এদের সাথে মিলিতভাবে ইসরায়েলপন্থী শক্তি, অতি ধনী কর্পোরেট গোষ্ঠী, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী, উগ্র বর্ণবাদী, নিজেদেরকে ঈশ্বরের বিশেষ পছন্দের সম্প্রদায় মনে করা জায়নবাদী, বাদামী সুবিধাবাদী ও মগজধোলাই হয়ে যাওয়া মানুষের কমন গ্রাউন্ড হলো গণহত্যা, জাতিগত নিধন ও যুদ্ধের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের শক্তিকে টিকিয়ে রাখা।
©somewhere in net ltd.