নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

...............

শ্রাবণধারা

" আমাদের মতো প্রতিভাহীন লোক ঘরে বসিয়া নানারূপ কল্পনা করে, অবশেষে কার্যক্ষেত্রে নামিয়া ঘাড়ে লাঙল বহিয়া পশ্চাৎ হইতে ল্যাজমলা খাইয়া নতশিরে সহিষ্ণুভাবে প্রাত্যহিক মাটি-ভাঙার কাজ করিয়া সন্ধ্যাবেলায় এক-পেট জাবনা খাইতে পাইলেই সন্তুষ্ট থাকে......."

শ্রাবণধারা › বিস্তারিত পোস্টঃ

ইরান যুদ্ধ: স্বাধীনতা নাম দিয়ে শুরু, এখন লক্ষ্য ইরানকে প্রস্তরযুগে নিয়ে যাওয়া

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:২৩


আমার আট বছরের ছেলে ফোনে ফেসবুক পাতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "বাবা, এটা কিসের ছবি"? আমি তার মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর বৃথা চেষ্টা করে অবশেষে বললাম, এটা আমেরিকা- ইসরায়েলের ইরানের একটি শহরের ওপর বোমা হামলার ছবি। যেখানে তারা বোমা ফেলেছে, সেই শহরটার নাম শিরাজ। ইরানের খুব বিখ্যাত দুজন কবি, সাদী এবং হাফিজের জন্মস্থান এই শহর।

আমার ছেলে ভেবেছিল, এটা হয়তো রাতের আকাশে আতশবাজির ছবি হবে। সে যে জগতে বাস করে, সেখানে পৃথিবীটা বড় একটা খেলাঘর বা প্লে-গ্রাউন্ড ছাড়া আর কিছু নয়। এখানে যে কেউ বোমা মেরে শিশুহত্যার মত নৃশংস অপরাধ করতে পারে, এটা তার পক্ষে বোঝা কঠিন। আর, আমার পক্ষে এটা তাকে বোঝানো আরো বেশি কঠিন। বাস্তবতা হলো, মানবাধিকার, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের বুলি আওড়ানো আমেরিকা এখন ঘোষণা দিয়েই শিশুহত্যার মত ভয়াবহ অপরাধ করছে।

আমার মনে পড়ল, রবীন্দ্রনাথের "পারস্যে" গ্রন্থে পঠিত তাঁর তিন-চার সপ্তাহের ভ্রমণ শুরু হয়েছিল শিরাজ শহর থেকে। শিরাজ থেকে তিনি গিয়েছিলেন ইস্ফাহান, তারপর তেহেরান। কবির বর্ণনায় আমার স্মৃতিতে শিরাজের নাম জড়িয়ে ছিল পাহাড়ের পর পাহাড়, কমলালেবুর বাগান, নিবিড় সবুজ ডালিমের বন আর দিগ্বিজয়ী দারিয়ুসের প্রাসাদের প্রত্নস্থাপনার সৌন্দর্যের সাথে। হাফিজের সমাধির পাশে বসে কবির মনে হয়েছিল, "...আমরা দুজনে একই পানশালার বন্ধু, অনেকবার নানা রসের অনেক পেয়ালা ভরতি করেছি। ... কত-শত বৎসর পরে জীবনমৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুসাফির এসেছে যে মানুষ হাফেজের চিরকালের জানা লোক।"

সেই নামগুলোই এখন ফিরে ফিরে আসছে বোমা হামলা, নির্বিচার হত্যা আর সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংসের ছবির সাথে। ইরানকে বোমা মেরে গাজার মতো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেবার ঘোষণা সম্প্রতি ট্রাম্পের কাছ থেকে এসেছে। ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করে জনগণকে মুক্ত করার যে কথা তিনি প্রথমে বলেছিলেন, সেটার ভণিতা এখন নেই।

ট্রাম্প ধারণা করেছিলেন, খামেনি ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যা করলে ইরানের মানুষ রাস্তায় নেমে এসে নিজেরাই সরকার উৎখাত করবে। যেভাবে ১৯৫৩ সালে সিআইএ-কে দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে আমেরিকা উৎখাত করেছিল, সেটাই আবার ঘটবে বলে ট্রাম্প মনে করেছিলেন। মোসাদ্দেকের পতনের পিছনের কারণ ছিল, তিনি ইরানের তেল কোম্পানিগুলো জাতীয়করণ করে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোকে ইরান থেকে বিতাড়িত করেছিলেন।

ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও সাফল্য অর্জন করে দেশটির তেলসম্পদ লুট করতে পারবেন - এমনটাই ট্রাম্প আশা করেছিলেন। কিন্তু ইরানে সেটা না হওয়ায় এখন তার পরিকল্পনা হল, ইরানকে ধ্বংস করে দাও, তাদের কে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। এই ঘোষনা স্পষ্টই ইসরায়েলের শিখিয়ে দেওয়া। ইসরায়েলের নির্দেশে ট্রাম্প এখন যা করছেন, সেখানে কোনো লুকোছাপা নেই। বোমা হামলার লক্ষ্য এখন সামরিক স্থাপনায় সীমিত নেই। সামরিক-বেসামরিক সবকিছুই এখন টার্গেট। হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, পানি পরিশোধনের প্ল্যান্ট, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, সবখানেই নির্বিচারে বোমা হামলা চলছে।

ফিলিস্তিনে সবাই হামাস, এই যুক্তি ব্যবহার করে যেভাবে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে বেসামরিক নারী, পুরুষ ও শিশুদের উপর গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, একই কৌশল দক্ষিণ লেবাননেও তারা প্রয়োগ করছে। সেই একই প্রপাগাণ্ডা মডেল ইরানের ক্ষেত্রেও প্রয়োগের চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে আমেরিকার জবাবদিহিতা নেই, কোনো লজ্জাও নেই। শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা ছাড়া অন্যদের তারা মানুষ হিসেবেই গন্য করে না।

এই যুদ্ধে ইসরায়েলের উদ্দেশ্য ইরানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা। যেমনটা ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া আর লেবাননে হয়েছে, দেশটাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে ভেতরের জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাতে সে নিজেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

গত চার দশক ধরে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানোর চেষ্টা করেছে। আগের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট প্রশাসন সেটা প্রত্যাখ্যান করলেও, জায়নবাদীদের চাপের মুখে ট্রাম্প ইসরায়েলের ফাঁদে পা দিয়েছে। এখন আবার সেই আগ্রাসনকে ঢাকতে ইরানের তেল দখলের গল্প তিনি সামনে নিয়ে আসছেন। যেন এটা একটা প্রয়োজন। আসলে এটা সরাসরি ইরানের তেল সম্পদ লুটপাটের পরিকল্পনা।

গতকাল ইস্টারের অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় ট্রাম্প নিজেই সেটা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "আমরা সহজেই ইরানের তেল দখল করে নিতে পারতাম, এবং আমি শুধু তেলটাই নিতে চেয়েছিলাম।" আমেরিকানদের ধৈর্য কম, আর সেকারণেই নাকি সেটা তিনি এখনো দখল করে উঠতে পরেননি। এই একই বক্তৃতায় ভেনেজুয়েলা নিয়ে গর্ব করে তিনি বলেছেন, "৪৫ মিনিটে অভিযান শেষ হয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের ৫৯% তেলের নিয়ন্ত্রণ রাখে"।

এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা শক্তির নৈতিক দাবি ভেঙে পড়েছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে কথা বলার নৈতিক অধিকার তারা হারিয়েছে।
এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, এই শক্তিপুজা, অন্যায় এবং গণহত্যাগুলো ব্যতিক্রমধর্মী বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো একটি অরেকটির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত, এবং পশ্চিমা সভ্যতার অন্তর্গত কাঠামোতেই এই বর্বরতা, অবিচার, লুটতন্ত্র ও গণহত্যার বীজ নিহিত আছে।

রবীন্দ্রনাথ "পারস্যে" গ্রন্থে একজন জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। প্রত্নতত্ত্ববিদ প্রাচীন এক প্রাসাদের ভগ্নাবশেষের একটি অংশ সংস্কার করে সেখানে একটি লাইব্রেরি ও সংগ্রহশালা গড়ে সেখানেই বসবাস ও গবেষণা করতেন। তিনি কবিকে বলেছিলেন, "আলেকজান্ডার এই প্রাসাদ পুড়িয়ে ফেলেছিলেন।…অসহিষ্ণু ঈর্ষাই তার কারণ। তিনি চেয়েছিলেন মহাসাম্রাজ্য স্থাপন করতে…।"

রবীন্দ্রনাথ আরও লিখেছিলেন, "পারস্য এক। ...আঘাত পেলে সে পীড়িত হয়, কিন্তু বিভক্ত হয় না। রুসে ইংরেজে মিলে তার রাষ্ট্রিক সত্তাকে একদা দুখানা করতে বসেছিল। যদি তার ভিতরে ভিতরে বিভেদ থাকত তা হলে য়ুরোপের আঘাতে টুকরো টুকরো হতে দেরি হত না। কিন্তু যে মুহূর্তে শক্তিমান রাষ্ট্রনেতা সামান্যসংখ্যক সৈন্য নিয়ে এসে ডাক দিলেন, অমনি সমস্ত দেশ তাঁকে স্বীকার করতে দেরি করলে না; অবিলম্বে প্রকাশ পেলে যে, পারস্য এক।"

বর্ণবাদী, লুটেরা ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রশক্তির আড়ালে থাকা দুর্বৃত্তের মরণ আঘাত সত্ত্বেও ইরান নিজের শক্তিতে অটল থাকবে - আমিও এই প্রত্যাশা করি।

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৯:২২

কামাল১৮ বলেছেন: ক্ষয় খতি দুই দিকেই হচ্ছে।কম আর বেশি।

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১১

শ্রাবণধারা বলেছেন: হ্যাঁ, তা হয়তো হচ্ছে। তবে এই ক্ষতি আমেরিকার জন্য যথেষ্ট বলে মনে হয় না। যখন তারা এই ধরনের যুদ্ধ করে সরে আসার নীতি গ্রহন করবে তখন বোঝা যাবে যে এটা তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল।

২| ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৮

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: ইরানের যুদ্ধ থামানোর একটি উপায় ছিল: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যদি ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করত। কিন্তু বাস্তবে তারা চায়, ট্রাম্প যেন ইরানের ওপর আরও হামলা চালায়। পশ্চিম ও পূর্বের অনেক দেশই এই আগ্রাসনের বিরোধিতা করছে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের শাসক ও সাধারণ মানুষ : দু’পক্ষের অনেকেই এ ক্ষেত্রে নৈতিক অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

সাধারণ মানুষ যদি রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করত: “আমরা যুদ্ধ চাই না”, এবং ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চাদাবাজি করছে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিত; তাহলে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ থেকে সরে আসতে বাধ্য হতো।

এখন পুরো বিশ্বের মানুষের উচিত একটি শক্তিশালী “#StopWar” ক্যাম্পেইন চালু করা, কারণ এই যুদ্ধের ক্ষতি থেকে কেউই মুক্ত নয়। সবাই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:২৯

শ্রাবণধারা বলেছেন: হ্যাঁ, আপনার পয়েন্টটা মোটামুটি ঠিক, তবে খুব যে বেশি সঠিক তাও নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ট্রাম্পকে যুদ্ধ বন্ধ করার অনুরোধ করেছে, কিন্তু ট্রাম্পের উপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা তাদের নেই।

বাস্তবতা হলো, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা রাখে আমেরিকার উপরে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ট্রাম্পের ব্যবসায় পার্টনার, কিন্তু ইসরায়েল ট্রাম্পের মাস্টার।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.