| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শ্রাবণধারা
" আমাদের মতো প্রতিভাহীন লোক ঘরে বসিয়া নানারূপ কল্পনা করে, অবশেষে কার্যক্ষেত্রে নামিয়া ঘাড়ে লাঙল বহিয়া পশ্চাৎ হইতে ল্যাজমলা খাইয়া নতশিরে সহিষ্ণুভাবে প্রাত্যহিক মাটি-ভাঙার কাজ করিয়া সন্ধ্যাবেলায় এক-পেট জাবনা খাইতে পাইলেই সন্তুষ্ট থাকে......."

কিছুদিন ধরেই বিএনপি নেতা ও বর্তমানে স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রী মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ফেসবুক পাতায় একটা খবর চোখে পড়ছিল। সেটা হলো, তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ে বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা করতে চান।
মীর্জা ফখরুলের খবরগুলো আমি আগ্রহ নিয়ে দেখি। এত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি খাত রেখে উত্তরবঙ্গের মানুষের উন্নয়নের জন্য কেন তিনি বিমানবন্দর নির্মানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, সেটা বুঝতে পারছিলাম না।
দুর্বৃত্তদের কেউ হলে ধরে নেওয়া যেত যে, বড় প্রকল্পের আড়ালে লুটপাটের পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু যেহেতু বিষয়টি মীর্জা ফখরুলকে ঘিরে, তাই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছিলাম না। অবাক লাগছিল এই কারণে যে, ঠাকুরগাঁওয়ের খুব কাছেই সৈয়দপুরে একটি বিমানবন্দর রয়েছে। উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের জন্য আরেকটি বিমানবন্দরের কোন যৌক্তিকতা আছে বলে মনে হয়নি। তাহলে তিনি কেন বিমানবন্দর নিয়ে এতটা আগ্রহী?
পরে বুঝলাম, এর উদ্দেশ্য হল তাঁর দলের লোকদের জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি করা। বিশেষ করে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং নিয়োগের মাধ্যমে। এখানে অপচয়, দুর্নীতি বা লুটপাটের মাত্রা কেমন হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। তবে এটি দলীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আর্থিক প্রণোদনা তৈরির একটি উপায়। সব ক্ষেত্রেই হয়তো সম্পূর্ণ দলীয় নিয়োগ নাও হতে পারে, যেমনটা জামাতের মতো দলের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
এখন বিষয়টা হলো, মীর্জা ফখরুল নিজে যেহেতু ব্যবসায়ী নন, তাই তাঁর লোকদের কাছে রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে হলে তাঁকে সরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভর করতে হয়, যেগুলোর মাধ্যমে দলের লোকজনকে খুশি রাখা সম্ভব হবে। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মডেল।
আরেক ধরনের আর্থিক মডেল আছে, যারা পারিবারিকভাবে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বা নিজ উদ্যোগে একটি স্থিতিশীল ব্যবসা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সফল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুধু সাংগঠনিক ক্ষমতা যথেষ্ট নয়। অর্থ, ক্ষমতা, ব্যবসায়িক প্রভাব এবং পেশিশক্তির একটি সমন্বয় এখানে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এভাবে দেখলে এটিকে একটি রাজনৈতিক - অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়।
রাজনীতি করতে হলে আপনার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ থাকতে হবে। অর্থের উৎস হতে পারে বড় কোনো ব্যবসা, যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়। আপনি আপনার এলাকায় তিন-চারশ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছেন - এমনটা হলে ভালো। তখন আপনার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরাই ভোটের সময়ে আপনার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
আপনার পেশিশক্তি নিয়োগের ক্ষমতাও থাকতে হয়। এরা গাড়িবহরের সামনে মোটরসাইকেলে করে শোভাযাত্রা দেবে। মাঝেমধ্যে আপনাকে ঘিরে থাকা কিছু দরিদ্র মানুষকে বেশ জোরে, তবে যাতে হাড়-ভাঙার মতো কিছু না হয়, ঠেলা দিয়ে আপনার জন্য রাস্তা তৈরি করবে। কখনো কখনো কারণে অকারণে গলায় ফুলের মালা পরাবে। প্রয়োজন হলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয়ভীতি দেখাবে, মারধর করবে, এমনকি চরম ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডও ঘটতে পারে। সেরকম কিছু ঘটলে তখন আবার প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে তাদের জামিন বা সুরক্ষার ব্যবস্থা আপনাকেই করতে হবে।
এটা গেল মাঠপর্যায়ের চিত্র। এর পাশাপাশি আপনার এক বা একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও থাকতে হবে। যেমন একটা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, দুই বা তিনটা গার্মেন্টস, একটি বা দুটি কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট ইত্যাদি। ধরুন, কোন কারনে গার্মেন্টস ব্যবসায় আপনার ভরাডুবি হল। তখন যাতে সরকারি প্রভাব ব্যবহার করে পাওয়া ঠিকাদারি কাজের মুনাফা দিয়ে গার্মেন্টস কর্মীদের বেতন চালিয়ে যেতে পারেন।
রাজনীতি, ব্যবসা, প্রশাসনিক প্রভাব এবং পেশিশক্তি - সবকিছু মিলেমিশে এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীল ক্ষমতার কাঠামো আপনাকে তৈরি করতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে এই মডেলের সফল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি সাম্প্রতিক প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তাঁর সমালোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়; উদ্দেশ্য তাঁর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মডেলটি বোঝার চেষ্টা করা।
তিনি মুক্তিযোদ্ধা সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জীবনের এক পর্যায়ে তিনি যেমন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তেমনই পরবর্তী সময়ে তিনি একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যবসায়িক-উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
তিনি একটি ব্যবসায়িক পরিবারে বড় হন। তাঁর পিতা ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা সড়ক ও ভবন নির্মাণে নিয়োজিত ছিল। পাশাপাশি তাঁদের পরিবার কক্সবাজারে হোটেল ব্যবসাও গড়ে তোলে। পরবর্তীতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ ব্যবসায় যুক্ত হলে পারিবারিক ব্যবসাগুলোর পাশাপাশি তিনি একটি পাইপলাইন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। নির্মাণ, প্রকৌশল এবং পর্যটনখাতে তাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়।
এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তা হল, তিনি তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে ব্যবসাগুলো সফলভাবে পরিচালনা করতে পেরেছিলেন। একইভাবে, ব্যবসায়িক সাফল্যকেও তিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থেকে দাপটের সাথে তিনি রাজনীতি করে গেছেন।
এখন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের সাথে যদি অব্যবসায়ী, তাঁরই সমসাময়িক আরেকজন নেতার তুলনা করি, তাহলে চিত্রটা ভিন্ন হবে। উদাহরণ হিসেবে, আমাদের উত্তরবঙ্গের একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, তিনি ২০০১-০৬ সালের দিকে এমপি ছিলেন। সংগঠক হিসেবে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের চেয়েও উজ্জ্বল ছিলেন, তবে তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পরবর্তী প্রায় সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
কিন্তু স্বাধীনতাত্তোর সময়ে পেশিশক্তি, অর্থসম্পদ এবং ব্যবসায়িক ক্ষমতা নির্ভর যে রাজনীতি গড়ে ওঠে, সেখানে তিনি প্রান্তিক হয়ে পড়েন। অথচ এই ধরনের সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন নেতাদেরই জনসেবায় বেশি অবদান রাখার সুযোগ ছিল। ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নয়, বরং তাঁদের নিজের নির্বাচনী এলাকা উন্নয়নের প্রধান ক্ষেত্র হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদ বা প্রকল্পনির্ভর নেতাদের প্রভাবের সামনে তিনি টিকেই থাকতে পারেননি।
©somewhere in net ltd.
১|
২৩ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৪:০০
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের নামে পিইডিপি (PEDP) ১, ২, ৩ এবং ৪ প্রকল্পগুলো চালু করা হয়েছিল। বাস্তবতা হলো, এই প্রকল্পগুলো শিক্ষার গুণগত মান যতটা না বাড়িয়েছে, তার চেয়ে বেশি অবদান রেখেছে ইশকুল ভবন বানানোর আড়ালে দলীয় ঠিকাদারদের পকেট ভারী করার ক্ষেত্রে। শিক্ষা ও গবেষণার দোহাই দিয়ে এসব প্রকল্পের জন্য বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সফট লোন আনা হয়েছিল। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় সর্বশেষ হাতে নেওয়া পিইডিপি-৫ প্রকল্পটি নিয়ে। যেহেতু আগের সবগুলো প্রকল্পই ব্যর্থ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল, তাই গণমাধ্যমেও এটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও লেখালেখি হয়।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি সরকার যখন প্রাথমিক শিক্ষা খাতে নতুন কিছু করার উদ্যোগ নেয়, তখন তারা পলিসি বা আইডিয়ার খোঁজে ছিল। এবার সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ববি হাজ্জাজ। নতুন কিছু করার উদ্দেশ্যে ববি হাজ্জাজ এবং ড. মিলন আমলাতন্ত্রের নীতিনির্ধারকদের সাথে বৈঠকে বসেন।
সেখানে এক শ্রেণীর সুযোগ সন্ধানী ও চতুর আমলারা নতুন কোনো আইডিয়া না দিয়ে, পূর্ববর্তী সরকারের সেই বিতর্কিত পিইডিপি-৫ প্রকল্পটিই কিছুটা সংযোজন-বিয়োজন করে তাদের হাতে ধরিয়ে দেয়। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল যে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমলাদের পকেটে আবারও কাট মানি ঢুকতে যাচ্ছে। অথচ, সরকারের এই দুই অনভিজ্ঞ মন্ত্রী হুবহু সেই পুরোনো ব্যবস্থাপনাই প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে প্রাথমিক শিক্ষা খাতে তাঁর সরকারের নতুন অর্জনের ফিরিস্তি দিচ্ছিলেন। লক্ষ্য করে দেখলাম, আগের আমলের সেই বিতর্কিত পিইডিপি-৫ প্রকল্পটিকে সামান্য ঘষামাজা করে সম্পূর্ণ নতুন একটি প্যাকেজ হিসেবে ওনার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং উনি সেটাই সংসদে পাঠ করছেন। বিষয়টি দেখে ভীষণ হতাশ হয়েছি।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এরপর থেকে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো এই জালিয়াতি নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যায়। আসলে আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো অধিকাংশ সময়ই নিরপেক্ষ নয়, বরং নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে রিপোর্ট করে। এই বিশাল দুর্নীতির ভাগ বা সুবিধা যখন তারাও পেয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের কলম বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের দেশে একের পর এক মেগা প্রকল্প নেওয়ার পেছনের আসল 'মোজেজা' মূলত এটাই!