| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ভীড়বিহীন একটা দোকানে বাদাম চিবোতে চিবোতে সুন্দর নকশা করা একটা বইয়ের প্রচ্ছদ দেখছিলাম, হঠাৎই পেছন থেকে মেয়েলি কন্ঠের ধমক। “এত সুন্দর সুন্দর লেখা লেখেন, অথচ এতো ভাব নিয়ে থাকেন কেন?”
আমি বইসহ একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে গেলাম। ছিপছিপে মাঝারি আকৃতির সাদা-কালো শাড়ি পরিহিতা মেয়েটা তার কপালের ওপর থেকে চুল সরিয়ে বলল, “জ্বি, আপনাকেই বলছি।” দুহাতে ধরা ‘গুচ্ছ গুচ্ছ ভালবাসা’ বইটা নাড়িয়ে সে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে।
“দিন, অটোগ্রাফ দিন।”
“অটোগ্রাফ?” আমি বড় করে একটা ঢোক গিলি।
“হুমম অটোগ্রাফ। যা খুশি তাই লিখুন, নামটা লিখলেই হলো।” তার জ্বলজ্বল করতে থাকা চোখের দিকে তাকিয়ে আমি ভড়কে যাই। তাড়াতাড়ি ইতি-উতি কিছু একটা লেখে দিতেই সে বইটা নিয়ে বিদেয় হয়ে যায়। আর আমি জমাট বরফের মতো ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে দাড়িয়ে থাকি।
*
ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনের মোড়ের চায়ের দোকানের সামনে আমাদের আড্ডাটা জমে উঠেছিলো। সামনের শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ ক্রিকেট সিরিজ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। এক হাতে চায়ের কাপ ধরে আরেক হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে বিস্তর বক্তৃতা দিচ্ছিলাম। বারেক মামা ভয়ে ভয়ে আমার হাতের দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন, উত্তেজনায় তার সাধের কাপটা ভেঙে না ফেলি! এমন সময় কে যেন পিঠের ওপর আলতো করে চাপড় দিলো। আমি বক্তৃতা মাঝপথে থামিয়ে ঘুরে দাড়াই।
সেদিনের বইমেলার মেয়েটা। চোখে বিরক্তির ঝাপসা দৃষ্টি। আমি ঢোক গিললাম।
“আপনার নাম কি জুবায়ের হোসেন?” তার কন্ঠস্বর কড়া। যেন বিষ মেশানো।
“না।”
“তাহলে আপনি অটোগ্রাফ দিয়েছেন কেন?”
“আপনিই তো দিতে বললেন সেদিন।”
“আমি দিতে বললেই আপনি দেবেন নাকি? বইতে কেউ আলতু-ফালতু মানুষের অটোগ্রাফ নেয় নাকি? লেখকের অটোগ্রাফ নেয়।” সে আবারো তার কপালের ওপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দেয়। “আপনি জীবনে কিছু লেখেছেন যে বইতে অটোগ্রাফ দিলেন?” একটা শ্বাস ফেলে সে গটগট করে হেটে চলে যায়। এই পর্যন্ত ঠিক ছিলো। কিন্তু সে চলে যাবার পরপরই যে হাসির বলক উঠলো, সেটা হজম করা যেন-তেন ব্যাপার ছিল না মোটেই।
আমি মেয়েটির যাবার পথের দিকে তাকিয়ে থাকি একদৃষ্টিতে। সে আজ নীল জামা পরে এসেছিলো। আগের দিন তেমন একটা চোখে না পড়লেও আজ নীল জামাতে তাকে দারুণ মানিয়েছে। আমি কোনও কারণ খুঁজে পাই না। দাড়িয়ে দাড়িয়ে সবার খোচানি সহ্য করতে থাকি।
*
একবিংশ শতাব্দীর সেই দিনটির পর থেকে এই একটি মেয়ে আমার জীবনকে অতিষ্ট করে তুলল, কিংবা বলা চলে যথেষ্ট পরিমাণ অতিষ্ট করে তোলার চেষ্টা করল। দূর্ভাগ্যক্রমে সে আমাদেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদেরই বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। আর আট-দশটা মেয়ের মতো দম আটকে না থেকে সে ক্যাম্পাসের এ মাথা থেকে ও মাথা বিশেষ দক্ষতায় চষে বেড়ায়। অনেকটাই চোখে পড়ার মতো করে। এতদিন আমার চোখে পড়ল না কেন আমি বুঝতে পারলাম না। ফার্মেসী ডিপার্টমেন্টের যে ছেলেটা ওর বান্ধবীর সাথে বাঁদরামি করে- তাকে সে শাসায়, আবার ক্যান্টিনের যে বেয়ারা পয়সা নিয়ে ঝামেলা করে তাকেও একহাত দেখায়। আমি যথারীতি মেয়েদের পুরোপুরি উপেক্ষা করে চলার চেষ্টা করলেও কোনও একটা কাকতালীয় কারণে প্রতিবারই তার সামনে পড়ে যাই, এবং সে তার অটোগ্রাফের শোধ তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে।
সেদিন যেমন আমার তিনঘন্টার পরিশ্রমের ফসল বীকারে ভরে টেবিলের ওপর রেখে ডাটাশীটে তথ্য লিখছিলাম, তখনই সে পাশ দিয়ে যাবার সময় কাপড়ের বাড়ি লাগিয়ে বীকারটা মাটিতে ফেলে দিলো। মুহূর্তের ঘটনায় আমি কিছু বুঝতে না পারলেও সে ছোট্ট করে দায়সারা ভাবে ‘সরি’ বলে চলে যাবার পর বুঝলাম, আমাকে আবার নতুন করে কাজ শুরু করতে হবে। বহুদিন পর আমার যথেষ্ট পরিমাণ রাগ হলো। চারপাশে আমার বন্ধু-বান্ধবরা বিরক্তির দৃষ্টিতে ললনার গমনপথের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে থাকে। কেউ কেউ আস্তে করে ‘বেয়াদব’ শব্দটাও উচ্চারণ করলো। তবে আমাদের শিক্ষকমশায় এসব কোনও অজুহাতই শুনতে চাইবেন না আমি জানি। তাই আমাকে প্রথম থেকে আরও তিন-তিনটি মসৃণ ঘন্টা ব্যয় করে একই জিনিস তৈরী করতে হলো। গাধার খাটুনি খেটে আমার রাগ-অভিমান করার কোনও শক্তিই আর অবশিষ্ট ছিলো না। হলে ফিরেই বিছানায় কাত। ঘুম থেকে উঠে ভুলেই গেলাম ল্যাবরেটরীর ঘটনা।
আরেকদিন অ্যাসাইনমেন্ট হাটুর ওপর রেখে চত্বরের পাশে বেঞ্চে বসে ছিলাম। কিছুক্ষণ পরই জমা দেয়ার জন্য অপেক্ষা করা। হঠাৎই দেখি ললনা তার মিষ্টি চেহারার বান্ধবীকে সাথে নিয়ে হেটে আসছেন। একবার মনে হলো হয়তো আমার সাথে কথা বলার জন্য দাড়াবে। কিন্তু না। দাড়ানো তো দূরের কথা। উল্টো পাশ দিয়ে যাবার সময় তার হাতের কাপ থেকে কিছুটা কফি ছলকে উঠে ঠাস করে এসে পড়ল আমার অ্যাসাইনমেন্টের ওপর। ধবধবে সাদা পৃষ্ঠাগুলো হয়ে গেল সুন্দর চকোলেট রঙা। আবারও আমি মুহূর্তের আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে গেলাম এবং ললনা ছোট্ট করে দায়সারা ভাবে ‘সরি’ বলে হেটে চলে গেল। পাশে থাকা বান্ধবী অসহায় দৃষ্টিতে একবার তার দিকে, একবার আমার দিকে তাকাতে থাকে।
এমনই একের পর এক ঘটনা ঘটতে ঘটতে কেমন যেন সয়ে গেল। ছোটবেলা থেকে যেমন বাবার হাতে মার খেয়ে খেয়ে সয়ে গিয়েছিলো। একটা সময় এসে মারের কোনও অনুভূতি হতো না। তেমনি দীর্ঘ সময় চলতে থাকা ললনার এই একমুখী যুদ্ধ যখন অনুভূতিহীন হয়ে এলো, তখন আর কিছুই মনে হতো না। সে আমার জামা-কাপড় পানিতে ভিজিয়ে দেয়, আমি সুন্দরমতো নতুন করে শুকনো জামা পরে আসি। আমার ভাড়া করা রিকশা নিয়ে চলে যায়, আমি হেটে হেটে আসি। আমার অর্ডার করা খাবার নিয়ে চলে যায়, আমি নতুন করে খাবার অর্ডার করি। ল্যাবরেটরীতে আমার দ্রবণ নষ্ট করে দেয়, আমি নতুন করে দ্রবণ তৈরী করি। সবসময়ই যে পারি, তা না। যেমন কোনও কোনও দিন শুকনো জামা পরে আসার সময় থাকে না, সারাদিন ভেজা জামায় থাকতে হয়। কোনও কোনও দিন নতুন করে খাবার অর্ডার করার সময় থাকে না, আমাকে হয়তো না খেয়ে থাকতে হয়। কখনও কখনও নতুন করে দ্রবণ তৈরীর সময় থাকে না, এক্সপেরিমেন্ট জমা দিতে পারি না। মাসদুয়েক এমন চলার পর সম্ভবতঃ সেও কিছুটা বিরক্ত হয়ে এল, এবং অত্যাচারের মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে দেয়। শেষবার ভেজা কাপড়ে থেকে যখন আমি প্রায় তিনদিনের জ্বরে পড়ে গেলাম, তখন সে এসব একেবারেই বন্ধ করে দিলো। আমার বন্ধুরা যারপরনাই আমার ওপর বিরক্ত হয়। শহীদ মাথা নেড়ে বলে, “নিতান্তই গাধামি। এসবের কোনও মানে হয় না।”
সুস্থ হয়ে ফেরার পর একদিন ঘাসের ওপর বসে আছি। কৃত্রিমভাবে তৈরী আসনগুলোতে বসার চাইতে কেন জানি ঘাসের ওপর বসতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হয়। যখন কোনও কাজকর্ম থাকে না, তখন ঘাসের ওপর এলিয়ে পড়ে ওপরের নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। ঢাকা শহরে এর চাইতে বেশি আর কিছু আসলে আশা করা যায় না। যাই হোক, ওপরে তাকিয়ে আছি এমন সময় ললনার আগমন। সেই নীল জামায়। কোনও একটা কারণে শুধু নীল জামাতেই তাকে অসম্ভব সুন্দর দেখায়, কারণটা আমি আজও খুঁচিয়ে বের করতে পারি নি। হয়তো শান্তিমতো তার সাথে কখনো কথা বলা হয়নি দেখেই।
“আমি কি বসতে পারি?” তার ভদ্রতাসূচক কথা শুনে আমি বেশ পুলকিত হই। অন্ততপক্ষে রাগটা তো পড়েছে।
“অবশ্যই, অবশ্যই। হঠাৎ এই দিকে?”
“আপনাকে খুজছিলাম। আপনার এক বন্ধুর কাছ থেকে খোজ পেলাম। উনার নামটা ভুলে গেছি।”
আমি হেসে ফেললাম। “ব্যাপার না। এতজনের নাম মনে রাখার দরকার নাই।” এরপর মিনিটখানেক চুপচাপ, কোনও কথা হয় না। আমি কি বলব ঠিক খুঁজে পাই না, অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে আমি খুবই অদক্ষ। কথা সে-ই বলল।
“ভাইয়া আমি খুবই দু:খিত। আপনার সাথে এমন করাটা আমার ঠিক হয় নি।” বলে সে মাথা নিচু করে রাখে। আমি চুপ করে থাকি। কি বলতে গিয়ে কি বলব, শেষে আবার ঝামেলা পাকে কিনা কে জানে।
“আমি ভেবেছিলাম প্রথম দিনই আপনি রেগে গিয়ে আমাকে কিছু বলতে আসবেন। কিন্তু আপনি কিছু বলেননি দেখে আমার আরও জেদ চেপে গিয়েছিলো। আপনি চুপ করে ছিলেন কেন?”
“আমার মানুষের সাথে তর্ক করার কোনও যোগ্যতা নাই আসলে। ঝামেলা মুক্ত থাকতে চাই সবসময়। মনে হলো, কথা বলতে গেলেই কথা বাড়বে, তারচেয়ে চুপ করে থাকাই ভাল।” এদিক ওদিকের গাছে পাখিরা দুপুরের বিশ্রাম নিতে বসে, আর মৃদু স্বরে ডাকতে থাকে। অনেকটা ছোটবেলার গ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। গ্রামের নদীটা মাঝে মাঝে খুব দেখতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে যাওয়া হয়ে ওঠে না।
“শুধু একটা অটোগ্রাফ নিয়ে এতো বেশিদূর যাওয়া উচিত হয়নি। আচ্ছা, আপনি সেদিন অটোগ্রাফ দিলেন কেন বলেন তো?”
আমি মৃদু হাসলাম। “আমার বাবা লেখালেখি জিনিসটা একদম পছন্দ করেন না। আমি আবার লেখালেখির প্রতি বিপুল পরিমাণে আসক্ত। তাই ছদ্মনামে লিখি।”
“ওই বই তারমানে আপনারই লেখা? আপনিই জুবায়ের হোসেন নামে লেখেন?”
আমি মাথা ঝাকালাম। ললনা অবাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে।
“তাহলে আপনি সেদিন একথা বলেননি কেন?”
“আমার বন্ধুরা ছিল সেখানে। তাদের সামনে বলতে চাই নি।” আমার কথা শুনে সে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল, তারপর হুট করে উঠে চলে গেল, কিছু না বলেই।
*
অত্যন্ত মনোযোগের সহিত পলিমারের ওপর রাতারাতি একপ্রকারের গবেষণা চালাচ্ছিলাম, আমার ছোটবোন তুলি এসে আমার সামনে বসল। আর মিটিমিটি হাসতে থাকল। আমার একটু রাগ উঠল।
“এরকম ছাগলের মতো হাসছিস কেন? কাজ-কর্ম নাই? দেখছিস না পড়ছি?”
সে তবুও হাসতেই থাকে। “তোমার এক বন্ধু এসেছে, তোমার সাথে দেখা করতে।”
“আমার বন্ধু? কোন্ বন্ধু?”
“তুমিই গিয়ে দেখো না, ড্রয়িংরুমে বসে আছে।”
“হু যাচ্ছি। কিন্তু এতে হাসির কি আছে?”
“যাও। গেলেই বুঝতে পারবে।”
ড্রয়িংরুমে ঢুকে যে দৃশ্য দেখলাম, তাতে আমার মোটেই হাসি পেল না। সোফার ওপর সেই ললনা, আর তার পায়ের কাছে একগাদা বই। সব বই এর ওপর বড় বড় করে লেখা- ‘গুচ্ছ গুচ্ছ ভালবাসা’। বই সামনে নিয়ে ললনা হাসি হাসি মুখে বসে আছে। আমি কেপে যাই।
“তুমি এটা কি করেছ?”
“আপনার সব বই মেলা থেকে কিনে এনেছি। একটাও অবিক্রীত থাকবে না।”
আমার রাগ লাগে। সবকিছু নিয়ে সবসময় বাড়াবাড়ি সম্ভবত: ভালো না।
“তুমি এই মুহূর্তে সব বই ফেরত দিয়ে আসবে। বই থেকে টাকা আয়ের জন্য আমি লিখি না। মানুষের পড়ার জন্য লিখি। তোমার যদি কাউকে দেয়ার প্রয়োজন হয়, সেই কয়টা কপি রেখে বাকি সব ফেরত দিয়ে দেবে। আমি ফোন করে দেব, ওরা টাকা ফেরত দেবে। এক্ষুণি যাবে।”
আমার কথা শুনে ললনার মুখখানা কালো হয়ে যায়। তবে সে কোনও প্রতিবাদ করে না, চুপচাপ উঠে চলে যায়। আজব দুনিয়া! কত কিসিমের মানুষ যে থাকে দুনিয়ায়!
*
এরপর থেকে ললনার সাথে আমার ভাল খাতির হয়ে যায়। ললনার নাম অদিতি। নীল জামা, কিংবা নীল শাড়িতে যাকে অসম্ভব সুন্দর লাগে। কাছ থেকে দেখে আমি এর কারণ বের করি। মেয়েটার চেহারা যেমনই হোক- চোখ দুটো অসম্ভব সুন্দর। আকাশের মতো নীল। ঠিক আকাশের মতোও না, অনেকটা সাগরের মতো। আর সেই চোখে অনন্ত মায়া। খুব কাছে থেকে না তাকালে বোঝা যায় না। তার সাথে খাতির হলেও তাকে বন্ধু চক্রের মাঝে ঢোকানো সম্ভব হলো না। মাঝে তিন বছরের বিশাল ব্যবধান। তার সাথে তাই দেখা কিংবা কথা হতো ছাড়াছাড়া। আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলাম না। তাই নিয়ম করে ঘুরতে যাওয়া কিংবা খেতে যাওয়া, ফোনে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলার মতো কোনও ঘটনা ঘটত না। হয়তো মাঝেসাঝে কোথাও হুট করে দেখা হয়ে গেল, তখন আলাপ চলল দুই-ঘন্টা তিন ঘন্টা সময় নিয়ে। মেয়েদের প্রতি আমার আসক্তি খুবই কম। তাই মেয়েটার প্রতি আমি আসক্ত হয়ে পড়লাম না। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকালে মনে হতো সেখানে অন্যরকম বিশাল একটা নীলের রাজ্য আছে। যাতে সবকিছু নীলে নীলে নীলাভ। অদিতি আমাকে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রায়ই অপ্রস্তুত হয়ে যেতো। আমি তবু আমার কৌতুহূল সংবরণ করতাম না। একদিন সে জিজ্ঞেস করেই ফেলল,
“আপনি আমার চোখের দিকে এভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে কি দেখেন?”
“তোমার চোখের অনন্ত মায়া দেখি। নীলের মায়া। সেই নীলে ডুব দিতে ইচ্ছে করে।” ভেতরে ভেতরে আমি বুঝতে পারলাম, ব্যক্তি অদিতি কে খুব স্বাভাবিক চোখে দেখলেও তার ওই চোখের প্রতি আমার আলাদা টান কাজ করে।
মনের ভেতরের অসীম স্তরের শুদ্ধ মাত্রার আবেগ কাজ করতে থাকে এরপর থেকে। কল্পনায় জলের ওপর ভেসে বেড়াই, আবার ডাঙায় ফিরে আসি। সবগুলো অনুভূতি এক করে লিখতে বসি নতুন সাহিত্য। ছয় ইন্দ্রিয়ের সমস্ত চেতনা কেন্দ্রীভূত করে তৈরী হলো- ‘নীলের মায়া’। লেখার পর মনে হলো, এটাই প্রথম- এটাই শেষ। এমন উপন্যাস আর কখনো লেখার সৌভাগ্য হয়তো হবে না।
পরের বছরের বইমেলায় তুমুল সাড়া ফেলে দিলো সেই ‘নীলের মায়া’। আমার চোখের সামনেই আমার বন্ধুদের কিনতে দেখি, প্রশংসা করতে দেখি। ওদের ভালো লাগা দেখে আমার চোখে পানি চলে আসে। নিজের লেখা পড়তে গিয়ে বিশ্বাস হতে চায় না, একটা সময় ভুলেই যাই, লেখাটা আমার ছিলো।
উপন্যাস প্রকাশ পাবার পর আরও একটা পরিবর্তন এলো- আমার জীবন থেকে অদিতি নামটা চিরতরে হারিয়ে গেল। কোথায় গেল, কেন গেল কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না। শুধু জানলাম পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে শহর থেকে চলে গেছে। কোনও যোগাযোগের মাধ্যম রেখে যায়নি। তার খুব কাছের বান্ধবীরাও কিছু বলতে পারল না। আমি যে খুব কষ্ট পেলাম তা না। আমি একটু স্বার্থপর কিসিমের মানুষ। নীলের মায়া লেখার জন্য আমার প্রেরণার প্রয়োজন ছিল। অদিতি আমাকে সেই প্রেরণা যুগিয়েছে। কিন্তু আমার সমস্ত আবেগ যখন আমি আমার লেখার মাঝে ঢেলে দিয়েছি, তখন আসলে আর অদিতির কোনও প্রয়োজন ছিল না। শুধু একটু মন খারাপ হলো এই ভেবে যে, তার ওই সাগরনীল চোখ আর দেখা হবে না। দুদিন পর ডাকবাক্সে একটা সাদা রঙের খামে ভরা চিঠি আবিষ্কার করি। খামের ওপর সুন্দর করে লেখা- ‘অদিতি’। আমার কি মনে হলো কে জানে! আমি খামটা না খুলে আমার ব্যাকপ্যাকে রেখে দেই।
শেষ বর্ষের আনন্দ ভ্রমণের স্থানের তালিকায় সেন্টমার্টিনস দ্বীপও ছিল। প্রথম দিন পুরো দ্বীপ ঘুরে ঘুরে কাটাবার পর ক্লান্ত-শ্রান্ত সবাই যখন ঘুমিয়ে, সেই ভোরে আমি ঘুম থেকে উঠে যাই। সূর্যবিহীন লাল লাল ভোরে সমুদ্রের তীর দিয়ে হাটার অন্যরকম একটা আনন্দ আছে। অনেক ছোটকালে যখন কক্সবাজারে ছিলাম, তখন বাবা এভাবেই সমুদ্রতীরে নিয়ে আসত ভোরবেলাতে। ধীরে ধীরে যখন স্বর্গীয় স্বর্ণালি আলো ছড়াতে শুরু করে, তখন সমুদ্রের পানির রং ছাড়তে শুরু করে। নীল নীলে নীলাভ হতে থাকে, ঠিক যেন অদিতির চোখজোড়ার মতো। যেই নীলের মাঝে আমি অনন্ত মায়া খুঁজে পেয়েছিলাম। হঠাৎ কি মনে হতেই ব্যাকপ্যাক থেকে অদিতির চিঠিটা বের করি।
দীপ্ত ভাইয়া,
কেমন আছেন জানি না। ধরে নিচ্ছি ভালো নেই। কারণটাও অজানা নয়। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।
আমি খুব খারাপ একটা মেয়ে। সবসময় চাইতাম ছেলেরা যেন আমার পেছনে ঘোরে। সেই স্কুলজীবন থেকেই। অনেক ছেলেকে ঘুরিয়েছিও এভাবে। একটা মেয়ের রূপ-লাবণ্য তার খুব বড় একটা অস্ত্র। যে অস্ত্র দিয়ে বিশ্ব শাসন করা যায়। কিন্তু কখনো ভেবে দেখিনি, ঢাল বিহীন যুদ্ধের ময়দানে নেমে যাওয়াটা নিতান্তই বোকামি। ভার্সিটির প্রথম দিন থেকেই আপনাকে লক্ষ্য করেছি, আপনি আর সবার থেকে আলাদা। বাকি ছেলেরা আমার দিকে সম্মোহিত হয়ে থাকলেও আপনি কখনো খেয়াল করেননি। আমি ধরেই নিয়েছি এটা আপনার অহংকার, দম্ভ। আপনার দম্ভ ভাঙতে আপনার সবকিছু খুড়ে দেখেছি, আপনাকে ফলো করেছি। আপনিই লেখক সেটা বের করতে কষ্ট হয়নি। আমি জেনেশুনেই আপনার অটোগ্রাফ নিতে আপনার পিছু নিয়েছি। তারপর আপনার বন্ধুদের সামনে আপনাকে অপমান করেছি। তাতেও আপনার ব্যক্তিত্ব এতটুকু নড়েনি। কাঠিন্যের চরম রূপ আপনার জীবনে বসিয়ে দিয়েও আপনাকে আমি যখন টলাতে পারিনি, তখন অন্য পথ ধরেছি। সমবেদনা নিয়ে আপনার বন্ধু হতে চেষ্টা করেছি। কাছ থেকে আমার রূপ আপনাকে দেখাতে চেয়েছি। আপনার মাঝে প্রেমের আশা জাগিয়ে ছেড়ে যাবার ইচ্ছে ছিলো। আমি এমনই। সবসময়ই এমন। এই কাজগুলো আমাকে অনেক আনন্দ দেয়।
কিন্তু সব পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিলো আপনার ‘নীলের মায়া’। উপন্যাসে আপনি আমার রূপ-লাবণ্যকে সামনে আনেন নি, আমার বাবার অঢেল সম্পত্তি- যার দিকে ছেলেরা লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায়, সেটাকেও সামনে আনেন নি। আপনি আমার চোখের ভেতরের মায়া নিয়ে লিখেছেন। আমার ভেতরের মানুষটাকে নিয়ে লিখেছেন। আমার ভেতরের মানুষটার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যে এতদিন আমার কাছে অপরিচিত ছিল।
আপনার মতো মানুষের সাথে প্রতারণা করার স্পর্ধা আমার ছিল না। বাবাকে বলে আমি দেশের বাইরে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চেষ্টা করবো সেখানে ভালো কিছু করার। আমি জানি আপনি আমাকে ভালোবাসেন না। তাই চলে যেতে আমার কোনও বাধা নেই। আমি জানি আপনি আমাকে ভুলতে পারবেন না কখনো। আপনার ‘নীলের মায়া’তেই বেঁচে থাকবো আমি। সবাইকে গর্ব করে বলতে পারবেন, একজন খারাপ মানুষকে ভাল মানুষ বানিয়েছিলো আপনার হাতের লেখা। লেখক হিসেবে আপনার জীবন সার্থক।
ইতি-
অদিতি
হলুদ রঙের কাগজটাতে জায়গায় জায়গায় ছোপ ছোপ দেখতে পেলাম। চিঠিটা লেখার সময় নিশ্চয়ই কান্না ঝরে পড়ছিলো অদিতির নীল চোখ জোড়া দিয়ে। নীল চোখের অশ্রুও কি নীল হয়? উত্তর আমার জানা নেই।
একপাশে কেয়াবন, আর একপাশে নীল জলরাশি, সাথে ওপরের নীল আকাশকে সঙ্গী করে আমি নীলের মায়ায় ডুবে যেতে থাকি।
১১ ই জুন, ২০১৪ রাত ২:০৭
রওনাকুল ইসলাম বলেছেন: অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনিই কি ভালবাসার গল্পের "শুকনো পাতা"?
©somewhere in net ltd.
১|
১০ ই জুন, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:২৬
শুকনোপাতা০০৭ বলেছেন: খুব সুন্দর... খুব!