নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যা মনে আসে তাই লিখি।

স্বর্ণবন্ধন

একজন শখের লেখক। তাই সাহিত্যগত কোন ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

স্বর্ণবন্ধন › বিস্তারিত পোস্টঃ

তৃতীয় যুদ্ধের দিন

১০ ই জানুয়ারি, ২০২০ সকাল ৯:২২

গতকাল থেকেই দেশসুদ্ধ লোক দেখছি ফেসবুকের পাতায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আচ্ছা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাকি শুরু হবে! কাকগুলো দল বেঁধে ঘুরছে ভাগাড়ের আশে পাশে। শকুনেরা এখন আর আসেনা! আমাদের অজান্তেই গলে যাওয়া ফসিলের মতো ওরা বিলুপ্ত হয়েছে। হয়তো বেঁচে আছে দুই একজন; কিন্তু আমাদের ঠিকানা দিয়ে যায় নাই। পুরানো দিনের গল্পের পাতায় যেখানে হলুদ গন্ধ লেগে থাকে, তাদের দুই একটা ছবি দেখা যায়; অধীর অপেক্ষায় থাকতো কখন অর্ধমৃতরা মরে যাবে! প্রথম যুদ্ধের শতবার্ষিকীতে তৃতীয় যুদ্ধ বাজে নাই, শকুনগুলোর সংখ্যাও ধীরে ধীরে শূন্যের কোঠায় পৌছাচ্ছে! একটা শূন্যতা খালি হয়ে যাওয়া চায়ের কাপের মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহরময়। প্রতিদিন সকালের হাঁটার রাস্তায় আজকে পা পিছলাচ্ছে, অনেকটা ব্যাঙ যেমন টাইলসের অভিজাত উঠোনে পিছলিয়ে হাঁটে। সম্ভবত বৃষ্টি গলিয়ে দিয়েছে জমানো মাটিকে; মাঝে মাঝে রাত বিরাতে কান্নার জলে তুমিও ভাসাতে পাড়; বহুদিন হয়ে গেলো তার। সকাল থেকেই মনটা কষ্টি পাথরের মূর্তির মতো কয়েক টন মাটির গভীরে চাপা পড়ে আছে। আশেপাশের ঘাসকে চেপে রেখেছে ভারী কুয়াশা। কিছুটা সামনেই একটা নাদুস নুদুস বাচ্চা তার বাবার পিছনে পিছনে থপ থপ করে হাঁটছে, হাতে বিস্কুটের ছেঁড়া প্যাকেট, অনেকটা আধাখোলা ওয়ারড্রোব এর ডালার মতো ঝুলছে। তার পিছনে পিছনে অনুগত সেনাবাহিনীর মতো কুচকাওয়াজের তালে লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে গোটা দশেক কাক। বাচ্চাটা আড়চোখে ওদের দেখছে, তার সহজ মন অর্থ বুঝতে চাচ্ছে। বাচ্চাটা কি ভাবছে কাকগুলো তার বন্ধু বনে গিয়েছে! ভাবতেও পারে! আবার নিজেকে রাজাও ভাবতে পারে! রাজা হওয়ার আমরণ লোভ হয়তো গেঁথেও যেতে পারে তার আজন্মলম্বা অবচেতনে! ওর বাবার চোখ মোবাইলে নিবদ্ধ এখনো! সেও কি যুদ্ধের খবর পড়ছে!

গাঁদা ফুলগুলো কুয়াশার গাঁয়ে হেলান দিয়ে নেতিয়ে পড়েছে অনেকটা বিলাসী রমণীর মতো ঘুমের তন্দ্রায়, তার পাতা থেকে গড়িয়ে পড়ছে শিশিরের জল, ফুলেরাও কাঁদে! স্বপ্ন দেখছে হয়তো, লাল নীল কতো রং বেরঙের স্বপ্ন! স্বপ্ন তো সাদা কালো হয় এই তর্কে বহুরাত কথার ছটায় পার করে দিতে তুমি। এমনো অনেকদিন আছে চাঁদটাকে মাঝরাত্রিরে আকাশে আটকিয়ে সময় বাড়িয়ে নিতে! সে অনেক আগের কথা। তখন চাঁদ ও মেঘ, মানবীর কথা শুনতো। দখিণা বাতাস তোমার ফরমায়েশ খাটতো। আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে এক ঝটকায় জাগিয়ে দিয়ে যেতো! এখন এসব রুপকথা। একটা আচ্ছন্ন কুয়াশার দিন বেশ কয়েকবছর হলো টিকে আছে। আর ছারপোকার মতো সংগ্রামের মাহাত্ম্য নিয়ে মাটিতে পিষে গিয়ে এখনো বেঁচে আছি। মধ্যবয়স আসন্ন! প্রতিটি মধ্যবয়সী জীবনই কি মধ্যযুগের মতো দমবন্ধ করা! তুমি যখন মধ্যবয়সী হবে তোমার কাছেই জেনে নিব। অবশ্য যদি সু্যোগ মেলে। মৃত বকুল ফুল পায়ে পিষে হেঁটে যেতে যেতে খুব বেশিই মন খারাপ হচ্ছে জানো! একটা কেমন যেন গাঁ গুলানো বাসি গন্ধ! মদিরার মতো মনের আগল খুলে দিচ্ছে। কাঠের নকশাকাটা সিন্দুকটায় দুঃখগুলো জমা রেখেছিলাম; তার ডালা কি এতো দুর্বল, যে বকুল ফুলের কান্নায় ভেঙ্গে যাবে! আসলে ভাঙ্গা গড়ার আমরা তো কেউ নই। মহাজগতের নাট্যমঞ্চে স্রেফ কাঠের পুতুল। তবু পুতুলের তো আর মন থাকেনা, ওরা বেঁচেই গিয়েছে। সব বিসদৃশ ব্যাপার স্যাপার মানুষের জন্য। দিলো পুতুলের জীবন সাথে জীবন্ত মন!

লেকের জলটা স্থির হয়ে আছে, অদ্ভুত তো! বাতাস কি থেমে গিয়েছে, হয়তো আমার দৃষ্টিভ্রম। চাঁদের মতো একটা প্রতিবিম্ব লেকের জলে জ্বলছে। কুয়াশার চাঁদ, না তা নয়, একটা ল্যাম্পপোস্টের আলো নিভাতে ভুলে গিয়েছে পৌরসভার লোকেরা। আজকাল সবাই সব ভুলে যাচ্ছে। আমার মতো স্মৃতিভংশ হচ্ছে হয়তো সবার। অনেক ভেবে আজকের মন খারাপের কারণ খুঁজে পেলাম বোধ হয়। প্রথম যখন তোমার শহরে যাই, আবহাওয়াটা ঠিক এরকমই ছিলো। ঘন কুয়াশার চাদরে মোড়া শহর সেটা, যদিও ভীষণ মায়াবী! তোমাদের একটা নদী ছিলো, যদিও তাকে কখনো দেখিনি আমি, শুধু জানতাম আছে। শীতের কাঁপুনিতে জিহবা জড়ো হয়ে আসছিলো আর হাতদুটো অসার। ঠিক এরকমই সকাল ছিলো সেইদিন। তবে তুমি তখন ছিলেনা দৃশ্যপটে। আরো পরে তোমার গল্পের শুরূ। কিন্তু মজার ব্যাপারটা কি জানো? আমি এখন স্মৃতি রোমন্থন করতে গেলেই তালগোল পাকিয়ে ফেলি। একটা বিঘত বড় সাইজের বইয়ের পাতারা যখন বাঁধন ছিঁড়ে একে অন্যের সাথে মিশে যায়, তার মতো দুরূহ ধাঁধাঁ তৈরী হয়েছে স্মৃতির খাতায়। তাই ওই শহরের কথা ভাবলেই দেখি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছো তুমি; হাতে হেলানো সুর্য্যমুখী। আমি নিশ্চিত এরকম কিছু হয় নাই, সময়ের ওই মাত্রায় তুমি ছিলেনা। কিন্ত মস্তিষ্ক প্রতারক, সে চুরি করে স্মৃতি বানায়, নিজের মতো আজব ঘর বানিয়ে বসে থাকে। একটা সময় আসলেই তফাৎ করা যায়না সত্য স্মৃতি আর বানানো স্মৃতির মধ্যে। অদ্ভুত ব্যাপার তাইনা! কি ঘর বানাইলো রে মন শূন্যেরো মাঝার! সকালের অস্বস্তিটা ক্রমেই গাঁড় হচ্ছে। রাস্তায় লোকজন এতোক্ষণে বেড়ে যাওয়ায় কথা, বাড়ছেনা কেন যেন। মাল্টিপ্লাজার সামনের বিরাট চরকিটা মৃত দৈত্যের মতো চুপ করে স্থির হয়ে পড়ে আছে। শহর গতিহীন হলে ভুতুড়ে দেখায়। আবছা আলোয় প্রেতের মতো নিঃস্তব্ধতা গলিপথ গ্রাস করে নেয়। শহরের তাই স্তব্ধতা মানায়না। তবু অনেক শহর শান্তই হয়, যেমন তোমার।

আদালত পাড়ায় কখন পৌছালাম জানিনা! ডিমেন্টেড লোকেদের মতো হাঁটছি হয়তো। ভয়াবহ গাম্ভীর্য নিয়ে আদালত ভবন ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে আছে। এই স্থাপত্যের দিকে চোখ তুলে তাকাতে খুব অস্বস্তি লাগে, তাই আজো তাকালাম না! তবু চোখ পড়ে গেলো একপাশে রাখা নবাবী কামানটার দিকে। কার ছিলো ওটা কে জানে, লিখা নেই কোথাও, সিরাজের ও হতে পারে অথবা মুর্শিদকুলির। একটা ঠান্ডা বাতাস আমাকে ছুঁয়ে দিলো। বহু দিনের পুরাতন ঠাণ্ডা বাতাস লালবাগ, ছোট আর বড় কাটরা হয়ে এসে ঘুরে গেলো এদিকটায়! কামানটা এর আগেও কয়েকবার দেখেছি। ফেসবুক স্ক্রল করলে ওর পাশে দাঁড়ানো আমার ছবিও পাওয়া যেতে পারে। কখনো ভয় হয় নাই। আজ প্রচন্ড ভয় হলো; শিরদাঁড়া বেয়ে রাক্ষুসে কাঁকড়ার মতো নামা ভয়ে কেঁপে উঠলাম খুব! হঠাত মনে হলো পাথরের মতো পুরানো লোহার কামানটা জীবিত হয়ে উঠছে! লোহার উপর জমা মরিচা আর শ্যাওলা উত্তাপে গলে গলে লালচে সবুজ ফলের রসের মতো রাস্তায় ভেসে যাচ্ছে! উত্তপ্ত তরলে ফুটছে কালো অ্যান্টিকের মতো পুরাতন মৃত করোটিরা। ইস্পাতের মতো চকচকে কামানের শরীর থেকে জন্ম নিচ্ছে আরো কয়েকশ কামান; যেভাবে ব্যাকটেরিয়ার কোষ দ্বিবিভাজিত হয়! একসাথে অন্ধ বিবরে ফোটা সাপের সন্তানদের মতো সাথে সাথে ফণা তুলছে কামানেরা আর তাদের মাথা থেকে তীব্র উত্তাপে উৎক্ষিপ্ত গোলা শহরের বুক ঝাঁজরা করে দিচ্ছে। যেমন ঝাঁঝরা হয় মেশিনগানের সামনে নিরস্ত্র মানুষ! সর্বনাশা আগুন চারিদিকে! কিন্তু মানুষ বের হচ্ছেনা; তাদের দেখা যাচ্ছেনা! কোথায় গেলো তারা! থ্যানোসের যাদুর তেলেসমাতিতে কি সব হাওয়া হয়ে গেলো মায়ার জগতে। সম্বিৎ ফিরলো শরীরে একটা আলতো টোকায়। আদালতের গেটের চায়ের দোকানদার, অনেকটা রাসপুটিনের মতো চেহারা তার, লম্বা দাঁড়ি নীচের দিকে বেণি করে বাঁধা, হেসে জানতে চাইলো রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মূর্তির মতো স্তির হয়ে আছি কেন! যদিও সকাল থেকে গাড়ি ঘোড়া নেই, তবু আসতে কতোক্ষণ। এরকম অদ্ভুত দৃশ্য কল্পনা কি কোন সুস্থ মানুষ করতে পারে! কামানটা আগের জায়গায়ই চুপচাপ বসে আছে। কোথাও কিছু হয়নি। তবু এটাতো সত্যি পৃথিবীর চামড়া ঝলসে যাচ্ছে ক্যনবেরা থেকে নিকারাগুয়ায়। সব কিছু সত্যি জ্বলে যায় যদি, এক পাহাড় ছাইয়ের স্তূপে পরিণত হয় সব, তোমার সাথে শেষ দেখাটা কি হবে না! কথা ছিল পাশাপাশি হাঁটবো এই রাজপথে। একটা চা খেয়ে নিলাম সম্ভবত কৃতজ্ঞতাবশত।

আসলেও ব্যাপারটা বুঝতে পারছিনা জানো! নয়টা বাজতে চললো, এখনো সব সুনসান নীরব। অনেকটা পজ করে রাখা ভিডিও গেমের স্ক্রীনের মতো, সব থেমে আছে। ঘরে ফেরাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। পাশের ডাইনিং রুমে বড় পর্দার টেলিভিশনটা বিরতিহীন ভাবে চলে দিন রাত, নিশ্চয়ই এখনো চলছে অন্যদিনের মতোই। বেনসন সিগারেটে টান দিতে দিতে পৃথিবী ও দেশের খবর পেয়ে যাব ঠিকঠাক! যাদুঘর পার হয়ে সামান্য দূরেই একটা কাঠের বোর্ডের মতো টুকরো দালান। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এই বুঝি কাত হয়ে পরলো। সেখানেই কেটে গিয়েছে জীবনের বহুদিন। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখোন যে যাদুঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি নিজেও জানিনা। দরোজাটা তিমি মাছের মুখের মতো খুলে আছে; এভাবে খুলে থাকেনা কখনো! একটা দাড়োয়ান উদাস ভঙ্গিতে দরোজার এমাথা থেকে ওই মাথা পায়চারি করছে আর কবিদের মতো কি জানি কি বিড়বিড় করছে অনবরত।
“যাওয়া যাবে ভিতরে?” জিজ্ঞাসা করলাম সংকোচ সহ। তার ভাবান্তর হলোনা। আবার গলা খাঁকারি দিয়ে জানতে চাইলাম। নিস্পৃহ ভঙ্গিতে পাশ্চাত্য শিল্পের চিত্রে আঁকানো দার্শনিকদের মতো আংগুল তুলে দেখিয়ে দিলো ভেতরের পথ। বেশ তো দেখে আসি। বহুদিন আসা হয় নাই। আগে নিয়মিত আসতাম। সেই যে একদিন কথা দিলাম তোমাকে দেখাতে নিয়ে যাবো; কিন্তু পরে আর তোমার আসা হলোনা। তারপর থেকেই আর আসা হয়না। খুব বড় কোন ব্যাপার নয়, শুধু এখানে ঢুকতে গেলেই বুকের মধ্যে একটা মোচড় দিত জোরে! জানিনা কি ভেবে তবু ঢুকলাম আজ! ভিতরটা খুব অদ্ভুত দেখাচ্ছে। কেউ নেই চেকিং গেটে অথবা রিসেপশনে। শুধু একা আমি আর একটা মৃতদের পৃথিবী। যাদুঘরতো মৃতদেরই অবশিষ্টাংশ!
পছন্দের গ্যালারী ছিলো তিনতলায়। বিশাল বিশাল রাজকীয় পালংক, হাতির দাঁতের চেয়ার রাজসভার মতো সাজানো। একটা চেয়ারে বসে দেখলে কেমন হয়! দিদার কথা মনে পড়ে এখানে আসলেই, দীর্ঘদেহি গৌড়বর্ণের মহিলা, চোখে মুখে চাপা ঊন্নাসিকতা। তবে গল্প বলতেন বেশ! ভাওয়াল নাকি মুক্তাগাছার রাজপরিবারের কন্যা, আজীবন দুঃখসমুদ্রে ভেসেও অভিজাত শৈশবের গর্ব নিয়েই বেঁচে ছিলেন! আসলে সবাই তো স্মৃতি নিয়েই বাঁচি; আমি যেমন তোমার প্রতিচ্ছায়াকে ধরে রেখেছি এতোটা বছর! দিদার মুখে এইসব কাঠ খোদাইয়ের দরোজার গল্প, কালোকাঠের সিন্দুকের ঝনঝনানির গল্প শুনেই সম্ভবত ওদের প্রতি একটা অজানা ভালোলাগা জন্মে গিয়েছে! বসবো নাকি একবার রাজাদের মতো করে হাতির দাঁতের চেয়ারে! কোথাও তো কেউ নাই, প্রহরীশূন্য আজ এই রাজসভা! থাক, দরকার নাই। পরে সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পরে মান সন্মান খোয়ানো যাবে! যৌবন ওইসব সাহস দেখানোর উপযুক্ত সময়; মধ্যবয়সে এই সব বেমানান! এইসব নানান কথা চিন্তা করতে করতে চলে এসেছি চিত্রকলার গ্যালারীতে! ছবিগুলো সব আলোর নীচে ঝলমল করছে! অরিজিনাল প্রিন্ট গুলো একটু ঘোলা, পাকা চোখ ঠিকই ধরে ফেলে। সামনেই Starry Starry Night; তেলরংয়ে তারাগুলো জ্বলজ্বল করছে একটা আবছা জলের উপর। ডুপ্লিকেট কপি তার জৌলুস কমাতে পারেনি তেমন। হুম, ভিনসেন্ট ভ্যান গগ! সে বলেছিলো- I am not an adventurer by choice but by fate! ভিনসেন্ট ঠিকই বলেছিলো; পুরো একশোভাগ খাঁটি কথা! আমাদের পছন্দে বা অপছন্দে কিছুই নির্ধারিত হয়না।
তোমার আমার গল্পে ভিনসেন্ট অনেক বড় একটা শিরোনাম। মনে আছে তোমার? আমাদেরই সবই নির্ধারিত ছিলো; দুইজনের দুই ছায়াপথ! রামানুজনের গণিত কখনো যুক্তির বাইরে হাটেনা। মহাবিশ্ব নাকি নিয়মের অধীন। তবু কি বিচিত্র ভাবে ধাক্কা খেলো দুই ছায়াপথ বলো! আমি ভিনসেন্টের গল্প জানি শুনে তোমার উচ্ছ্বাস প্রথম বাঁধ ভেঙ্গেছিলো নীল টেবিলটার ওই পাশে! কড়া নিয়মের অনুশাসনে লিখা ছিলো স্পর্শ নিষেধ। তীব্র লাভার মতো যে স্নেহেরা উৎক্ষিপ্ত হয় এই গ্রহের কি সাধ্য বলো তার জ্বালামুখকে আটকায়! তুমি আর আমি মুখোমুখি, মাঝে টেবিলের উপর Sunflower! সব মিলেমিশে একাকার হবে এইতো নিয়তি ছিল। তুমি আমি নিতান্তই পুতুল। তারপর আরো কতো গল্প হলো পল গ্যগা থেকে লিওনার্দো, রাফায়েল, মাইকেল এঞ্জেলো! সবাইকে আসরে আনলাম আমরা দুইজন! তোমার কল্পনা শক্তি আফ্রিকার জাদুকরদের দেয়া হ্যালুসিনারজিক উইডকেও হার মানাতো জানো! রোমান হলিডের রোম তোমার সাথেই ঘুরেছি এক দুপুরে! সেদিন থেকে আর অড্রি হেপবার্নকে মিস করিনা। যাদুর পাটি হয়তো ছিলো না, তাতে কি কথার যাদুতো ছিলো! বেশিদিন ছিলেনা তুমি, তবু সারাজীবনের জন্য বেঁধে নিয়ে গেলে আমার আত্মার অংশকে তোমার সাথে! কোন মিথোলজিতে কি ছিলো এভাবে আত্মাকে বেঁধে নিয়ে যাওয়া যায়! ছিলো হয়তো, মনে পরছে না! বয়স বাড়ছে, গুড়িয়ে পড়ছে স্মৃতির পাহাড়! এমনকি এই পৃথিবীও বুড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের সাথে। আচ্ছা এখন ফোন করলে কি তোমাকে পাওয়া যাবে? হয়তো ঘুমিয়ে আছো, শীতের সকালে আরামের ঘুমের ওমের প্রতি একটা নেশা আছে তোমার। এখন তো অনেক বড় হয়ে গিয়েছ, ব্যস্ত থাকবে হয়তো। সব ঘটনা ঘটার একটা প্রবাবিলিটি থাকে। হয়তো ফোনটা ধরার সম্ভাবনা নিরানব্বই ভাগ, না ধরার একভাগ! তবুও ভয় যদি লটারিতে উঠে ওই একভাগ। পেসিমিজমকে ধারণ করেই তো টিকে আছে মানবপ্রজাতি। লক্ষ বছরের প্রবৃত্তিকে এখনো থামাতে পারিনা আমরা। তবু কষ্ট হয়; চাঁদনি রাতে, চাঁদটা যখন আমার সাথেই হাঁটে খুব কষ্ট লাগে। এন্ডাইমিয়নের গল্প শোনাতে তুমি; সেলেন তাকে ঘুমিয়ে রাখতো রাতে। আমি ভাবতাম এটা কেমন কথা! একজনের ভালোবাসার জন্য আরেকজন ঘুমিয়ে কাটাবে কেন! এ কেমন অবিচার! বহু বছরের জমানো কষ্ট নিয়ে আজ মনে হয়, তার চেয়ে তুমি যদি সেলেন হয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে দিতে, সেটাই হতো আশির্বাদ! অন্তত তিলে তিলে কষ্ট দিতে পারতো না নিয়তি! সত্যি যদি সেলেন হতে পারো কখনো, পূর্ণচন্দ্রের দিনে, আমি অপেক্ষায় থাকবো ভর জোছনায়, তুমি ঘুম পাড়িয়ে দিয়ো অনন্তকালের জন্য!

কতো সময় ধরে এসব যে ভাবছি জানিনা। বাইরে সূর্যের আলো এখনো উঠেনি। খুব একা লাগছে আর ভয় ছড়িয়ে আছে বাতাসের মতোন প্রতিটি কোণায়। আমি কি রিয়েলিটি থেকে ক্রমশ আলাদা হয়ে যাচ্ছি! মনে হচ্ছে জয়নুলের মনপুরা থেকে সবগুলো ভেসে যাওয়া মৃত মানুষ আর্তনাদ করে নেমে আসছে গ্যালারির মধ্যখানে। এই ভয়াবহ রক্ত হিম করা আর্তচিতকার বলে বোঝানো সম্ভব নয়! বিশ্বাস করো আজ যদি জয়নুল থাকতেন তিনিও সহ্য করতে পারতেন না! পালাতে হবে এই বিভীষিকা থেকে এক্ষুণি। আমার সামনে বাস্তবতার পর্দা ছিঁড়ে যাচ্ছে সম্ভবত! একবার পরাবাস্তবে গেলে আর ফেরা হবেনা তোমার জগতে! তোমাকে দেখার শখ আজো মেটেনি! কিভাবে যাবো বলো এতো তাড়াতাড়ি বাস্তব ছেড়ে! নীচের দিকে দৌড়াচ্ছি, আর একটু দূরেই নিচতলার সাদা আলো!

নীচতলায় নেমেছি, কিন্তু এখন রাস্তায় বের হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। জলপাই রঙের পোশাক পড়া মানুষের কুচকাওয়াজ বুটের তালে তালে এগিয়ে যাচ্ছে। আজকে নিশ্চয়ই কোন জাতীয় দিবস, আজকাল অনেক কিছুই তো মনে থাকেনা। একটু স্বস্তি লাগছে; অন্তত সারা শহরের সব মানুষ মরে গিয়েছে এই বোধটা হচ্ছেনা। হয়তো বিশেষ দিবস উপলক্ষ্যে এই দিকটায় লোকজনের যাতায়াত সীমিত করা হয়েছে। তা যাই হোক,এখন বের হওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়! যাদুঘরের সামনের জমিতে বিঘত খানেক মানচিত্র। একেক রঙ্গের পাথরে একেক জেলা চিত্রিত। আরে ওইতো তোমার শহর! অজান্তেই দৃষ্টি চলে যায় আজো! একটা ছাপোষা মানুষ এক সাধারণ শহরে তার নগণ্য জীবনের কয়েকদিন পার করেছিলো, এটা কোন বড় ঘটনা নয়। তখন পৃথিবীতে কয়েক লক্ষ মানুষ শরণার্থী হয়ে পঙ্গপালের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে! পিঁপড়ার মতো ডুবে মরছে ভূমধ্যসাগরের জলে! অস্ত্র হাতে মহড়া দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদীরা! তখন পৃথিবীর ধূলার আমাদের জীবনের কথা মনে রাখার অবকাশ নেই। কোন সৈনিক যুদ্ধে আহত হয়ে নিরঞ্জণার জল খেলো, কোন সুজাতা কার জন্য মিষ্টান্ন নিয়ে এলো, পৃথিবী এতো মনে রাখেনা! তবু নিরঞ্জণার তীরে সুজাতার সাক্ষাৎ নিয়তিরই লিখন। কর্মসূত্রে বা জীবনসূত্রে যা অসম্ভব মনে হতে পারে তাও তো সম্ভব। মায়ান পঞ্জিকায় লিখা ছিলোনা, নস্ট্রাডামুস ওরাকলে লিখে যান নাই, তবু ভালোবেসে ফেললাম আমরা! শুধু প্রাগজ্যোতিষপুরের জ্যোতিষরা বলেছিলো-“যাই করো বাঞ্ছারাম, দেখা হয়ে যাবে তার সাথে!” করোটীর কংকাল গুণে অমাবস্যার রাত পার করেছি কতো! তবু তোমার সাথে দেখা হয়ে মনে হলো, সহজ লোকদের মতো বাঁচি কিছুদিন। মনে ছিলো না জানো, কবির কথাটা- “সহজ লোকের মতো কে বাঁচিতে পারে!” কেউ পারেনা! সবাই আলো আর অন্ধকারে ঘুরপাক খায়। এই যেমন আমি আর তুমি একটা দরোজায় দাড়িয়েছিলাম, যার একদিকে সংস্কারের বুড়ো পন্ডিতদের না-সূচক মাথা নাড়ানো, আরেকদিকে স্বাধীন অরণ্যে পায়ের তলায় সূচের মতোন তীক্ষ শ্বাসমূল! আমার মনের গর্তে ঘাপটি মেরে থাকা শেয়ালটা বললো- “বুড়ো হয়ে গিয়েছি বাপু! ওই অরণ্যে দৌড়ে যুত করতে পারবোনা! আরো আগে কেন আসোনি বলতো?” যখন যৌবন গেলো মিছিলে মিছিলে। শক্ত পায়ের বেড়ি চেপে বসে গিয়েছে মাংসপেশির ভিতর এখন। জলের মতো শান্ত মনের মেয়ে তুমি সব জানো; ফিরে গেলে ওই সংস্কারের শহরে। যাবার সময় কয়েক লক্ষবার ফিরে তাকালে, আমি আড়চোখে সবই দেখেছি জানো! পাছে আমার কান্নার জল দেখে ছুটে আসো ফিরে, তাই একটা ছুট দিয়েছিলাম। ঘন পাইন আর ক্যাকটাসের সেই বনে বিষাক্ত কাঁটার আঘাতে আমি সংক্রমিত হলাম বিষণ্ণতার অসুখে। বুড়ো দাদু গান বাঁধতেন- “মন নিয়া কইরো না খেলা/ ভাসবো গাঙ্গে অসুখীর ভেলা/ বদ্যি পাইবা না তুমি এই অতলে!” বিষ্টুসুন্দর দাদু মরে গিয়েছেন সেই কবে, সোভিয়েত ভাঙ্গার বছর পাঁচেক পর। তিনি হয়তো জানতেন এই বনের নাড়ি নক্ষত্রের কথা! ধীরে ধীরে শরীর ও মন গ্রাস করে নিলো এই সর্বগ্রাসী ব্যাধি! এখন কতোখানি অথর্ব আমি, ভাগ্যিস তুমি তা দেখোনি!

রাস্তাটা আবার আগের মতো ফাঁকা। যাদুঘরের গেটে দারোয়ানটাকেও দেখছিনা। কোথায় গেলো যে সবাই! তোমাকে ছেড়ে চলে আসার পরও বেশ কয়েক বছর ফেসবুকের পাতা স্ক্রল করতাম নিয়মিত। বিশ্বাস ছিলো সময় প্রলেপ দিবে মনের ক্ষততে। কিন্তু সব ক্ষতই কি আর শুকায়, ভিক্ষুকের পায়ের মতো কিছু ক্ষত বিষিয়ে উঠে, শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার বিষাক্ত স্পর্শ পাঠিয়ে দেয়; উন্মুক্ত রক্ত মাখানো লাল মাংস বের করা দগদগে ঘা স্থায়ী হয়ে যায়! কখন নিজের অজান্তেই বন্ধ করেছি ফেসবুক দেখা জানিনা। ফেসবুক হাতে থাকলে অবশ্যই জেনে যেতাম এতক্ষণে, কি হয়েছে এই শহরের মানুষগুলোর অথবা সবাই কিসের প্রতীক্ষায় গোলপাতার আড়ালে হরিণের মতো লুকিয়ে আছে। তারা সবাই আছে আমি জানি, কিন্তু লুকিয়ে কেন! ধুত্তোরি, ফোনটা রুমে ছেড়ে না আসলেই হতো। রূমের দিকে তাড়াতাড়ি পা বাড়ালাম।
ওভারব্রিজের নীচে জটলা পেকে বসে আছে কয়েকটা মানুষ, অবশেষে মানুষের দেখা! আরে এরাতো সব এলাকার পরিচিত ভিক্ষুক, এদের দেখেছি নীলক্ষেতে, পরীবাগে, মৌচাকে! সুস্পষ্ট কারো চেহারায় নয়, সামষ্টিক আকারে তাদের আমি চিনি। ওরা পত্রিকা পড়ছে। পত্রিকার স্তুপ ঘিরে গোল হয়ে বসে প্রাগৈতিহাসিক বানরের মতো কেউ কেউ পত্রিকা পড়া শুনছে। ওরাও পড়তে পারে এটাই তো জানা ছিলোনা আমার। কিছুটা কাছে এগিয়ে যেতেই ভূত দেখার মতো কেঁপে উঠলো কয়েকজন। কলম্বাস আমেরিকা ছোঁয়ার পর প্রথম সেখানের আদিবাসীদের সামনে যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো, আমার অবস্থা এই মুহূর্তে তার চেয়ে বেশি ভালো নয়। কারো চোখে ক্ষোভ আর কারো চোখে বিস্ময়। কোথাও স্বাভাবিকতা নেই, তাদের অস্বাভাবিক নীরবতা ঘোষণা করছে আমি তাদের কেউ নই! এখন এতোসব ভাবলে চলবেনা! জানতে চাইলাম- “শোন অমৃতের সন্তানেরা এই শহরের মানুষেরা গেলো কই?” দুই একটা দোয়েলের ডাক, একটু বাতাস আর কিছুটা সময়ের পর, মাঝখানে বসে থাকা লাল সোয়েটার পড়া মানুষটা ভরা গলায় গমগম করে বলে উঠলো-“অমৃতের সন্তানেরা শহর ছেড়ে চলে গিয়েছে আগেই, শুধু ধ্বংসের মুখে অপেক্ষায় আছি আমরা নিতান্তই মাটির মানুষ, কীট পতঙ্গও বলতে পারেন আমাদের কিংবা নরকের কীট!” লোকটার মুখের দিকে তাকালাম বিস্ময়ে। বোঁচা নাক, ডান চোখের কোটরটা কৃষ্ণগহ্বরের মতোই গভীর, অনেকটা সক্রেটিসের মতো লাগছে তাকে! একজনের হাত থেকে পত্রিকা কেড়ে নিলাম জোরে টান দিয়ে, ছিঁড়ে গেলো নিউজপ্রিন্টের এক কোণা। ইংরাজী পত্রিকায় শিরোনামে লিখা- “US declares war on RUSSIA. Third world war started.” নীচেই বড় লাল কালির হরফে ঘোষণা- Dhaka is targeted with ballistic missiles. Authority orders immediate evacuations. আচ্ছা কোথায় ছিলাম আমি এতোদিন! আমি কি বাস্তবে ছিলাম! কিভাবে হয়ে গেলো এতো কিছু। সবাই কি পালিয়েছে আমি ছাড়া! সারা শরীর হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্তের মতো কাঁপছে আর ঘামছে। আমি দৌড়াচ্ছি রূমের দিকে, পিছনে ধ্বংসের মুখে নিস্পৃহ বসে এই নগরের শেষ সক্রেটিস! বাঁচার একটা অদম্য আকুতি আবার জেগে উঠেছে। আচ্ছা এতদিন কি বেঁচে ছিলাম! তোমার সাথে দেখা হয়না, কথা হয়না কতো বছর! তবুও কি বেঁচে ছিলাম? হয়তো মৃতরাও পুনরায় মরে যাওয়ার আগে আরেকবার বাঁচার স্বপ্ন দেখে! আমি শুধু একটা স্বপ্ন দেখি, সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার আগে একবার তোমাকে দেখবো।
রাস্তাটা ধীরে ধীরে আরো ধূসর হচ্ছে! প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সব সেনা সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে মুখোমুখি রাস্তার দুইপাশে। কোথাও কোথাও দেয়াল ফেটে বেড়িয়ে আসছে জার্মান ট্যাংকের ছায়া! অনেকটা চলচ্চিত্রের মতো রিলের পর রিল প্লে হচ্ছে অনবরত। কে করছে এসব! এখন কি মজা করার সময়? বলশেভিক ইউনিফর্ম আর জার্মান সুপ্রিমেসির স্লোগানে খসে পড়ছে গরীব দেশের রাজধানীর পলেস্তারা, বৃষ্টির মতো ঝরঝর করে। কোন যুদ্ধই শেষ হয়নি এখনো, তাই শেষ যুদ্ধের দিনে আবার ছায়াযুদ্ধ খেলা হবে, ঘোষণা দিচ্ছে কমান্ডাররা! তারা সবাই প্রেমিক ছিলো মাতৃভূমির, এই নীল গ্রহের প্রেমে তারা পড়েনি কখনো। মাটির গভীরে হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রগুলো ঝনঝন করে উঠে আসছে উপরে আবার। আহা! কি জৌলুস তাদের! রক্তের ক্ষুধায় তারা পাগলের মতো নাচছে। ভোজবাজির মতোই আবার মিলিয়ে গেলো সব; আবার আমি একাই হাঁটছি! আচ্ছা এসব কি জীবন্ত কল্পনা, প্রচন্ড চাপে মানুষের মানস জগত ছিন্নভিন্ন হলে কি এমন হতে পারে। নিজের মাথায় নিজেই কয়েকবার জোরে টোকা দিলাম। ওরে পাগল মন বাঁচতে চাইলে অন্তত এখন সুস্থ থাক!
একটা জাঁদরেল ট্যাংক পার্কের সূর্যমুখীর বনটাকে পিষে চলে গেলো দক্ষিণ দিকে। খুব তাড়া তার, কি দাম আছে এখন সূর্যমুখীর জীবনের! সকালে পার্কে এসে এই বাগানের সামনে বসে কাটিয়েছি কতো মিনিট ঘণ্টা, হিসাব রাখা হয় নাই। ওরা পিষে আছে ঘাসের সাথে এখন। ঘাসের বুকে শিশিরের জল আর ট্যাঙ্কের চাকায় পেষা হলুদ মিলে এক অপূর্ব নকশা বানিয়ে রেখেছে! বাম পাশে ভেঙ্গে পড়ে আছে বুড়ো পাথরের বেঞ্চটাও। সুর্যমুখী মরণেও তুমি সুন্দর। পারিপার্শ্বিকতা ভুলে আবার চলে যাচ্ছি স্মৃতির অনেক গভীরে। একটা সূর্যমুখীর বন আর তাকে ঘিরে আমাদের কথোপকথন, এখনো চলন্ত গ্রামোফোনের মতো বাজছে দুই কানে। সকালে ওরা সূর্যের প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে হাসে আর রাতের আঁধারে বিরহে কাঁদে, এটা তোমাকে বলতে তোমার বিস্ময়ের সীমা ছিলোনা কোন। সেদিন রাতেই ছুটে গিয়েছিলে নিজে চোখে ব্যাপারটা যাচাই করতে! কি প্রচন্ড বিস্ময় নিয়ে আকাশ তোমাকে দেখেছিলো তুমি নিশ্চয়ই তা খেয়াল করো নাই। কতোবার পৃথিবীর সবগুলো সূর্যমুখী বন একজন আরেকজনের নামে দলিল করে দিয়েছিলাম, মনে আছে তোমার! সে হিসাবে বলতে গেলে এই গ্রহের সবগুলো সুর্যমুখী ফুলই তো তোমার আর আমার তাইনা? তারা তৃতীয় মহাযুদ্ধের প্রথম শহীদ। ঘড়ি ধরে একমিনিট দাড়ালাম হলুদ ফুলের সমাধির পাশে, এইটুকু শ্রদ্ধা তারা পেতেই পারে! অন্তত তোমার আর আমার সেই সময়ের পক্ষ থেকে!
আচ্ছা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পুরো শহরটা জতু গৃহের মতো জ্বলে গেলে আমিও ছাই হয়ে গেলে খবর পাবে তুমি! সম্ভাবনা খুবই কম তাইনা! কেন যেন খুব বেশি দেখতে ইচ্ছা করছে তোমাকে। বেনারসী শাড়ি পড়ে চোখে মুখে প্রলেপ মেখে মঞ্চে বসা তোমার ছবিটা আমি চুপিচুপি দেখে নিয়েছিলাম জানো! এতোটা চোখের জল, কোন সজ্জাই ঢাকতে পারেনি সেদিন! কতোদিন ঘুমাইনি, ওই জলে ভেজা চোখ আমার আকাশে কালো মেঘকে চিরস্থায়ী করে দিয়েছে। পৃথিবীর ঋতু বদলাবে, ঝড়ো বর্ষণ হবে, কিন্তু এই মেঘ কাটবেনা। এই মেঘ বজ্রের দেবতাদেরও ভয় পায়না! সেদিনের চোখের জল এখনো জমাট মেঘের দিন হয়ে আছে! তৃতীয় যুদ্ধের শুরূতে আকাশটা ঠিক তেমনই! কতো মিল আমাদের সাথে আজকের এই অন্তিম সময়ের! যেন জমজ ভাইয়ের মতো মিলের চেহারা।
সাইরেন বাজা শুরু করেছে একটানা। বাতাস বইছে জোরে। আমিও হাঁটছি খুব জোরে, পালাতে হবে এই শহর ছেড়ে এক্ষুণি। ধূমকেতুর মতো কিছু একটা সাঁই করে উত্তরার আকাশের দিকে নেমে এলো; বিস্ফোরণের শব্দে ছিটকে পড়লাম আরেক দিকে। মাথা ঘুরছে; কানের পর্দা ফেটেই গেলো কিনা কে জানে! তারপর আরেকটা, আরো কয়েকটা, গোণার মতো সুযোগ নেই! আতশবাজির মতো মিসাইল ফুটছে! শব্দের পর শব্দ! কোনমতে নিজেকে ধাতস্থ করে আসলাম ঘরের কাছাকাছি, একটু দূরে পাঁচ তারকা হোটেলটার পশ্চিম দিকটা পুরো ধ্বসে পড়েছে। আগুন জ্বলছে চিতার মতো দাউ দাউ করে! আমার বাসার দিকটা অক্ষত আছে এখনো। দৌড়ে পৌছালাম গেটে, কয়েকটা জিনিস হ্যান্ডব্যাগে নিয়ে রওনা দিব শহরের সীমানার বাইরে। তোমার শহরের দিকে হাঁটা দিব, জানি কয়েকশ মাইল দূর, তবু অসাধ্য বলে তো কিছু নাই! পৃথিবী ধ্বংসের আগেই একবার কথা বলবো তোমার সাথে!

দরোজার সামনে চাঁদর জড়িয়ে কে দাঁড়িয়ে আছে! সেই হাসি ঠোঁটে, বহু জনমের চেনা। কখন এলে, কিভাবে এলে তুমি? চুলগুলো সাদাটে হয়ে গিয়েছে কেন?
-“আরে সবুর করো একটু। আগের চেয়ে অধৈর্য্য হয়েছ স্বভাবে! এসেছিলাম তোমার খোঁজেই! মাঝে যুদ্ধটা বেজে গেলো! তবু যদি দেখা হয় একবার... জানো মনে হলো কেউ বলছিল, এবার দেখা হবেই! চলে এলাম তাই! আর তোমার মাথার চুলও কিন্তু সব উড়ে গিয়েছে বয়সের ঝড়ে। এতো কথার সময় নয় এটা, তাড়াতাড়ি শহর ছেড়ে বের হই চলো!”
বলেই হেসে দিলো! আগেও এভাবেই হাসতো ও।
আমি বললাম বিস্ফোরণ হচ্ছে তো!
অরূণা মৃদু হেসে বললো- “ভয় নেই। জীবনে তো একসাথে হাঁটা হলোনা, মরণে না হয় একসাথেই মরবো! তবুও তো একটা কিছু একসাথে করা হবে। শোননি লোকে বলে-life is the illusion, death is the ultimate truth!”
ওর বাড়ানো হাতটা ধরে হাঁটা শুরু করলাম। হয়তো জীবনের দিকে অথবা মৃত্যুর দিকে। একসাথে হাঁটছি এটাই বড়, দিক তা যেদিকেই হোক!
সমাপ্ত






মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১০ ই জানুয়ারি, ২০২০ সকাল ৯:৫৭

রাজীব নুর বলেছেন: অল্প কথায় যা লেখা যেত, আপনি বিশাল করে রেখেছেন।
এক শ্রেনীর মানুষ যুদ্ধ পছন্দ কইরে। এরা দুষ্ট শ্রেনীর মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.