নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

চোখ কান খুলে রেখে চলি আর আফসোস করি । \nএই পরিবেশ কি শুধু আমি একাই চলছি? \nসবাই চলে , সবার অনুভুতি কি সমান ?

রওশন রাহাদ

চোখ কান খোলা রেখে শুধুই আফসোস করি

রওশন রাহাদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

দ্বিখণ্ডিত আত্মহত্যা

১৯ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১০:৪০

বিকেল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে । সন্ধ্যায় একটু কমেছিলো , তারপর আবার জোরে শুরু হয়েছে । কারেন্ট নাই সন্ধ্যার একটু পর থেকে । আজকে আসবে কিনা কিছুই বলা যাচ্ছে না । মোমবাতির আলোতে রান্না ঘরে, লবণের জন্য অপেক্ষা করছে একটি মেয়ে । টিনের চালের বৃষ্টির শব্দ থেকে বৃষ্টির ঘনত্ব মাপার চেষ্টা করছে মেয়েটা । বৃষ্টির ঘনত্ব মাপার একটা বিশেষ কারণ ও আছে , লবণ আনার জন্য যাকে পাঠিয়েছেন , তিনি মেয়েটার স্বামী । ইনি বিশেষ ধরনের পাগল টাইপের একজন লোক । সব কিছুই ভুলে যায় । তিন দিন থেকে লবন আনার কথা বলেও কোন লাভ হয়নি মেয়েটার । বৃষ্টি যদি আরো বাড়তে থাকে , তাহলে এই লোকের আসার কোন নাম ঘন্ধই পাওয়া যাবে না । এদিকে রান্না প্রায় শেষ হতে চলল। আসুক আজকে, না খাইয়েই রাখবো সারা রাত । মনে মনে ভাবতে থাকে মেয়েটা । মোমের আলোতে মেয়েটার চোখ তাকালেই, যে কেউ বুঝতে পারবে কেমন রেগে আছে মেয়েটা ।

ঠক ঠক !!
ঠক ঠক ঠক... এবার একটু জোরেই দরজায় শব্দ হলো।
-খোল না ... আর হবে না প্লিজ , ঠক ঠক...
ধপ করে খুলে গেলো দরজা টা । কোন শব্দ নাই চার পাঁচ সেকেন্ড । একটা ছেলে দরজায় দাড়ানো । চুল থেকে শুরু করে মুখ বেয়ে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পরছে । নীরবতা ভাঙ্গালো কাক ভেজা হওয়া পাতলা ছিপ ছিপে ছেলেটা,
- বিশ্বাস করো সব দোকান বন্ধ । আমি খুঁজতে খুঁজতে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম । এই বৃষ্টির মধ্যে কে দোকান খুলে কে বসে থাকবে আমার জন্য , বলো ? আচ্ছা বাবা সরি , মুখ ফ্যাকাশে করে বলল ছেলেটা । মুখ ঘুরিয়ে নিলো মেয়েটা ।
-বললাম তো ভুল হয়েছে (মিনতির সুরে)!
-কি ভুল হইছে সেটা আগে বলো ? তার পর সরি বলো ।খুব মৃদু কন্ঠে উত্তর দিলো মেয়েটা।
মুখে কোন কথা বলল না ছেলেটা । পিঠের পিছন থেকে এক গুচ্ছ গোলাপ বাড়িয়ে দিলো মেয়েটার সামনে । ছেলেটার চোখে মুখে তখন প্রবল শক্তি , সে যেন জয় করে ফেলেছে মেয়েটার সব রাগ ।

দুজনে দুজনার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো দুই তিন সেকেন্ড । মৃদু অন্ধকারে এর বেশী কিছু দেখাও যাচ্ছে না অবশ্য । মুখে কোন কথা না বলে আলতো করে ছেলেটার হাত থেকে ফুলের গুচ্ছটা নিজের হাতে নিলো মেয়েটা । ছেলেটার চোখ মুখ তখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রাপ্তির ছাপে । মেয়েটা এখনো কোন কথা বলছে না । ফুলটা হাতে নিয়েই রান্না ঘরের দিকে যেতে থাকলো মেয়েটা । কোন উপায় না পেয়ে মেয়েটার পিছু নিলো ছেলেটা । রান্না ঘরে ঢুকে একবার পিছনের দিকে ঘুড়ে তাকালো মেয়েটা। ছেলেটা হাসার চেষ্টা করলো । মেয়েটা সামান্য একটু হাসি উপহার দিলো ছেলেটাকে । ছেলেটার চোখের দৃষ্টি আকর্ষন করে নিয়ে তাকালো চুলোর উপরে থাকা পাতিলের দিকে । চুলোয় তখনও আগুন জ্বলছে । টগবগ করছে পাতিলের মধ্যে থাকা পানি গুলো । মেয়েটা তার হাতে থাকা গোলাপের গুচ্ছটা ফুটন্ত পাতিলের মধ্যে দিতে গিয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকলো । ছেলেটার মুখ এতক্ষনে শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে । তাকিয়ে আছে মেয়েটার হাতের দিকে ।

মেয়েটা ছেলেটার দিকে তাকিয়েই ফুলের সামনের অংশ ডুবিয়ে দিলো ফুটন্ত পানির মধ্যে । ফুল সাধারনত ঠান্ডা থাকে। পানির টগবগটা একটু কমলো । পানির ফোটার শব্দটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে, কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেলো ঘরটা । শুধু বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে । ছেলেটা তাকিয়ে আছে মেয়েটার হতের দিকে । মেয়েটা তাকিয়ে আছে ছেলেটার চোখের দিকে । ফুলের পুরো অংশটা পানির মধ্যে ।

মেয়েটা অনেকক্ষন পর কথা বলা শুরু করল,
-ভয় পাওয়ার কিছু নেই । আমি তো অনেক দিন থেকেই রান্না করি । লবনের মাপ আমি জানি । বেশি হবে না । কম হলেও সমস্যা নাই , তোমাকে আবার পাঠাবো । তুমি তো আমাকে ভালো লবনই এনে দিলে ? তাই না ? লবন আনতে তোমার খুব কষ্ট হইছে তাইনা জান ? তোমাকে আজকে এই লবন দেয়া তরকারি খেতেই হবে । আমি জানি তোমার খুব ভালো লাগবে । আমি জানি । তুমি খাবার টেবিলে যাবে ? নাকি এখানেই দিবো ? থাক ! কষ্ট করে আর খাবার টেবিলে যাওয়ার কোন দরকার নাই । এখানেই দাঁড়াও , তোমার খাবার টা একটু ঠান্ডা হোক এখানেই খেতে দিচ্ছি । হাজার হোক এত কষ্ট করে বৃষ্টিতে ভিজে বাইরে থেকে আসলে । তোমার তো একটু যত্ন আমি নিতেই পারি ।
- একটু থামো না , প্লিজ । কাচুমাচু মুখ করে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল ছেলেটা ।আমার কি দোষ ? ছয় বছরের একটা ফুটফুটে মেয়ে কয়েকটা ফুল বেচার জন্য বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঘুরছে দেখে খুব মায়া হলো । অনেকক্ষন দ্বাড়িয়ে দেখলাম কি করছে মেয়েটা । বৃষ্টির মধ্যে ফুলের তোড়াটা তো দূরের কথা একটা ফুলও কেউ নিচ্ছে না । আমার খুব কষ্ট লাগলো । ভাবলাম কেউ ফুল কিনছে না কেন ? এখানে কি কেউ তার বউকে ভালবাসে না ?
বলতে বলতে আড় চোখে মেয়েটার দিকে তাকালো ছেলেটা । মেয়েটার দিকে তকিয়ে হালকা চমকে গেলো ছেলেটা । মেয়েটা গালে একটা হাত দিয়ে মাথাটা একটু বাঁকা করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলেটার দিকে ।ছেলেটার কথাগুলো মনদিয়ে শুনছেএমন একটা ভঙ্গিমায় । ছেলেটার সাথে যখন চোখচোখি হলো , ধারাবাহিক ভাবে কয়েকবার চোখ মিটমিটিয়ে ভয় পাইয়ে দিলো ছেলেটাকে । তারপর ছেলেটা কিছু বলছে না দেখে মেয়েটা বলছে -
-জি বলেন ! থামলেন কেন? এখানে কেউ তাদের বউকে ভালবাসে না । এখানে কেউ তার বউকে লবন আনতে গিয়ে ফুল এনে দেয় না । শুধু আপনি দেন । শুধু আপনি একাই আপনার বউকে ভালবাসেন । তারপর কি হইছে বলেন , আমি খুবই আগ্রহী ।
ছেলেটা মুখটা গোমড়া করে নিচের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো ,
-আসলে ব্যাপারটা হলো , বাচ্চা মেয়েটার উপরে খুব মায়া লাগছিলো । ওকে তো আর সরাসরি টাকা দেয়া যায় না , তাই ফুলগুলো কিনেই নিয়ে বাসায় আসলাম । বিশ্বাস করো , তোমার লবন কেনার কথা আমি এক্কেবারে ভুলে যাইনি। আসলে আমি বাড়তি কোন টাকা নিয়ে যাইনি । তুমি যে টাকা দিছিলা, পুরোটাই ওকে দিয়ে দিয়েছি । আচ্ছা , তুমিই বলো- একটা বাচ্চা মেয়েকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখতে কার ভালো লাগবে ?
এবার ছেলেটার কন্ঠে একটা জোস বোঝা গেলো। এবার একটু দৃঢ় কন্ঠে বললো,
-তোমার লবন লাগবে তো- এক্ষুনি এনে দিচ্ছি । শুধু যাবো আর আসবো। কথাটা বলতে বলতেই ঘুরে যেতে চাইলো।
-" দাঁড়াও , কোথায় যাও " মেয়েটার কন্ঠে শুনেই থমকে দাঁড়ালো ছেলেটা । যা যা বললা, যা যা বুঝালা ,সব কিছুই শুনলাম ,সব কিছুই বুঝলাম। কোথায় যাচ্ছ যাও, আগে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাও ।
প্রথম প্রশ্ন- তোমার কাছে টাকা নাই কেন ? দ্বিতীয় প্রশ্ন- টাকা ছাড়া বাইরে গেলে কেন? তৃতীয় প্রশ্ন- কত ঘন্টা লাগে ফুল আনতে। কি উত্তর দেবে ? কিছুই খুজে পেলো না ছেলেটা । আমি কি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি ? নাকি, শোন নাই ? মেয়েটার হুংকার টাইপ কথার ধার দেখে মিনমিন করে বলতে শুরু করলো ছেলেটা

-আমি যদি দাগি আসামি হতাম । আমাকে যদি পুলিশ ধরে নিয়ে যেতে বাড়ি ঘেরাও করতে আসতো তাহলেও আমি পালানোর জন্য বাইরে যেতাম না । শুধু তুমি যেতে বলেছো বলেই বাইরে গেছিলাম । তাও আবার লবণ কিনতে ।
মেয়েটা খুব নমনীয় আর ঢং করার ছলে বললো,
-এটা কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর নয়। আমার প্রশ্নের সোজা উত্তর দাও।
ছেলেটা বার বার যেন বোল্ড হয়ে যাচ্ছে । আজকে মেয়েটা এত রেগে আছে কেন কিছুই বুঝতে পারছে না ছেলেটা । আচ্ছা ঠিক আছে , সোজা সাপ্টা উত্তর দিচ্ছি,
-তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর । এক নং প্রশ্নের উত্তর ,নিচে আন্ডার লাইন ( পরিক্ষার খাতায় উত্তর লেখার মত করে বলছে) । আমার কাছে টাকা আছে । দুই নং প্রশ্নের উত্তর , সবুজ কালিতে ডাবল আন্ডার লাইন । আমি শুধু টাকাই না , সব কিছুই ছেরে গিয়েছি , সঙ্গে কিছুই ছিলো না আমার কাছে । খালি পকেটটা ছাড়া । আর তিন নাম্বার টা রচনামূলক প্রশ্ন এটা দিতে অনেক সময় লাগবে । যদি অনুমতি পাই তাহলে আমি শুরু করতে পারি ।
" এত ঢং করার মত আমি কি কিছু জানতে চেয়েছি ? " বললে বলো না বললে থাক।
-আচ্ছা আচ্ছা শোন না -আসলেই অনেক বড় । তোমার জন্য লবন কিনতে নিচে গেলাম । দোকান বন্ধ পেয়ে রাস্তার দিকে যেতে থাকলাম । আমাদের গলির রাস্তা থেকে মেইন রাস্তার দিকে তাকাতেই দেখি একটা কিউট বাচ্চা মেয়ে। দূর থেকে দেখেই খুব ভালো লাগলো মেয়েটাকে । মেয়েটার কাছাকাছি গিয়ে দেখতে থাকলাম । পরে ওর কাছ থেকে ফুল গুলা কিনে নিলাম ।তোমাকে বললাম না ? সেই মেয়েটা ।ফুল গুলো নিয়ে আমি বাসায় ফিরছি । হঠাৎ আমার মনে হল , এই ফুল যদি আমার বউ দেখে সে তো নিশ্চিত ভেবে নিবে আমি তার জন্যই এই ফুল নিয়ে আসছি । আমি জানি , সে আমাকে কিছু বলার সুযোগ তো দিবেই না বরং আমাকে জিজ্ঞেস টাও করবে না এই ফুল তার জন্যই কি না ? এটা মেয়েদের বাজে স্বভাবের একটা অংশ বিশেষ । তখন আমার কেমন যেন মনে হতে থাকলো । আমি আমার বউয়ের সাথে এটা করতে পারবো না । আমি ফুলটা কিনেছিলাম পিচ্চিটাকে ভালোবেসে আমার বউকে ভালবেসে নয় । কিন্তু তাহলে এই ফুল তো বাসায় নিয়ে যেতে পারবো না । আবার ফেলে দিতে গেলেও বাচ্চা মেয়েটার মুখ মনে হচ্ছিল । কি করি , কি করি ? কিছুই খুজে পাচ্ছিলাম না । শেষমেশ একটা চিন্তা মাথায় আসলো।
ততক্ষনে বৃষ্টি শুরু হয়েছে । তখন আবার চিন্তা করছিলাম , বৃষ্টিতে ভিজবো কি না ? তাও আবার বউ ছাড়া । আমি যেটা করতে যাচ্ছি তার জন্য বাইরে ঘুরতে হবে । বউ ছাড়া বৃষ্টিতে ভেজা যতটা না কষ্টের তার চেয়ে বেশি কষ্টের , মিথ্যা ভালোবাসা থেকে বউকে মিছে মিছি ফুল দেয়া । বুঝতেই পারছ , বৃষ্টিতে ভেজার গুরুত্বটাই বেশী মনে হল। বাসে উঠবো কিনা চিন্তা করছি , ততক্ষনে আবার পুরো শরীর ভিজে একাকার । এই অবস্থায় বাসেও উঠতে পারবো না । রিক্সাভাড়াও নাই, আগেই বলছি । হেটে হেটে যেতে অবশ্য খারাপ লাগছিলো না । তুমি তো জানো ,
প্রাকৃতিক দুর্যোগের রাতে আমার একা হাঁটতে খুব ভালো লাগে ।সেই জায়গায় পৌঁছানোর সাথে সাথে বৃষ্টি আরো বেড়ে গেলো । আমার জন্য এটা খুবই উপকার হইছিলো অবশ্য । লজ্জাটা কম লাগছিলো । তারপর আবার হেঁটে হেঁটেই এলাম । আসার পথে মেয়েটা কে খুঁজলাম , পেলাম না । তখন সব গুলো ফুল কেনা ঠিক হয়নি। অর্ধেক ফুল কিনলে হয়তো আসার পথে দেখা হওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকতো, মায়াবী মেয়েটার সাথে ।
- এতো বিস্তারিত না বললেও হবে ,কোথায় গেছিলা ? কেন গেছিলা ?
- সেটা আমি এখন বলতে পারবো না ।
- কেন ?
- আমি যে মোডে (অবস্থা) তোমাকে বলতে চাই , সে মোডে তুমি এখন নাই। তুমি এখন আছো আমার বউ মোডে । বউদের দেখে স্বামীরা যে ভয়টা পায় । আমি এখন সেই ভয়টাই পাচ্ছি । আমি কোথায় এবং কেন গিয়েছিলাম, এটার উত্তর না দেয়ার জন্য যদি বউ এর খ্যাচ খ্যাচ সহ্য করতে হয় ,আমি তাই সহ্য করব । এটা শুধুমাত্র আমার প্রেমিকাকেই বলবো । সুতরাং তুমি যখন আমার প্রেমিকা মোডে আসবা আমি তখন বলবো ।
- আর কতক্ষন ঢং করবা ?
- তুমি যতক্ষন না আমার প্রেমিকা হও ?
মেয়েটা এবার ছেলেটার হাত ধরে পাতিলের দিকে নিয়ে গেলো । ছেলেটাও সুবোধ বালকের মত মেয়েটার পিছন পিছন গেলো। মেয়েটা ছেলেটাকে একটু সামনে ঝুকে পাতিলের মধ্যে দেখতে বলছে । বাধ্য ছেলেটা পাতিলের মধ্যে তাকিয়ে বলল ,

- হ্যাঁ। ঠিকই তো আছে । গোলাপ সিদ্ধ হচ্ছে । আমি এটা দিয়ে ভাত খাবো । আমার কোন সমস্যা নাই । আর যদি একদম খেতে না'ই পারি তাহলে একটা ডিম সিদ্ধ করে নিবো ।তুমি তো জানো, আমি ডিম সিদ্ধ করতে পারি ।
কথা গুলো চুপচাপ শুনে ,আগে থেকেই ধরে রাখা ছেলেটার হাত ধরে অন্য দিকে আবার টানা শুরু করলো । টানতে টানতে রান্না ঘরের মুখেই থাকা ছোট্ট একটা ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে থামলো । টেবিলের উপরে থাকা একটা একটা বাটির দিকে ইশারা করে দেখালো ছেলেটাকে । ছেলেটার মুখ এবার চকচক করে উঠলো । ছেলেটার একহাত মেয়েটা ধরেই আছে । অন্য হাত দিয়ে মুখে জমে থাকা পানি গুলো মুছে নিলো ছেলেটা ।
- যাক , রাতে তাহলে আর গোলাপ সিদ্ধ দিয়ে ভাত খেতে হবেনা । আমি তো ভেবেছিলাম -আমাকে দিয়ে নতুন এক খাবারের আবিষ্কার হবে । গোলাপ সিদ্ধ । হা হা হা ।
মুখ টা কিছুটা ফ্যাকাশে রেখেই কিছুটা হাসার চেষ্টা করলো ছেলেটা । মেয়েটা এবার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রাগমুখে হাসির মত ঠোঁট বাঁকা করে মুখে তিনবার হি হি হি করলো ।
-তুমি এই খাবার খাবা।
ছেলেটা বাড়িতে আসার পর থেকে একের পর এক বোল্ড হতেই থাকলো ।
- আচ্ছা , লবন আনি নাই এটাই কি আমার অপরাধ ?
- নাহ , লবন দিয়েই রান্না হইছে । তোমার মত স্বামী থাকলে আমার কি আর লজ্জা ঠিক রাখলে হবে? বাড়িওয়ালী আন্টির কাছ থেকে আমি লবন আনছি ।
ছেলেটার মুখ আবার একটু উজ্জ্বল হতে শুরু করলো ।
-এই খাবার আমি খাবো না তো । জেদের মত করে বলল মেয়েটা। তুমি আমার জন্য লবন আনছো । সেটা রান্না হচ্ছে । আমি সেই তরকারি খাবো । আর বাড়িওয়ালী আন্টির কাছ থেকে আমি তোমার জন্য লবন আনছি । তুমি সেই তরকারিই খাবা । মানে, আমি তোমার জন্য খাবার ব্যাবস্থা করছি , আর তুমি আমার জন্য । আগেই বলে দিচ্ছি, আমাকে জোর করে কোন লাভ হবে না । আমি তোমার খাবার খাবো না , তো খাবো না ।
ছেলের মুখটা অপরাধীর মত হয়ে গেলো ।
-আমার দোষটা কি? একবার বলো না, প্লিজ ?
আকাশে হালকা বিদ্যুৎ চমকালো । ছেলেটা মেয়েটার দিকে তাকালো ।মেয়েটা আবার বর্জ্রপাত খুব ভয় পায় । মেয়েটা মনে হয় না, আর বেশীক্ষন ঝগড়া করতে চায় । হয়তো বর্জ্রপাতের ভয়ে । তাই মনে হয় এবার রাগ ঝাড়া শুরু করলো ,
-এক প্যাকেট লবন আনতে বাইরে গেলা । দুই ঘন্টা পরে ভিজে আসলা তাও লবন ছাড়া । এটা শুধু তোমার পক্ষেই সম্ভব । তোমাকে দিয়ে কি হবে আমার , বলবা ? তিনদিন থেকে বলতে বলতেও তোমার মনে থাকে না , এক প্যাকেট লবন আনতে হবে । তুমি কিভাবে আমার কথা মনে রাখো ,আল্লাই জানে । যে মানুষ একটা লবনের কথা মনে রাখতে পারেনা । সেই মানুষটা আমার স্বামী। তোমার জন্য আমাকে অন্যের কাছে থেকে ধার করতে হয় । আমার তো লজ্জা বোধ না'হয় আমি খেয়ে ফেলতেই শুরু করছি। কিন্তু সবার কাছে তোমার একটা সম্মান তো আমি নিজে বহন করি। সেটা ? আমার সম্মানের সাথে সাথে নিজের টাও যে যাচ্ছে, সেটাও তো বুঝতে হবে । আমার পরিচয়, আমি তোমার বউ । এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলে ফেলল মেয়েটা ।তুমি বাসার ঠিকানাটা সার্টের উপরের পকেটে রেখে দিবা । খবরদার অন্য কিছু রাখবা না । শুধু ঠিকানাটা । এটা ওটা সেটা অনর্গল বকতেই থাকলো... ক্ষ্যাপা মেয়েটা।

ছেলেটা দুই হাত দিয়ে নিজের মুখটা মুছে ফেলল । হাতের কনুই থেকে কব্জির দিকে হাত দুইটাও মুছে নিলো । এক হাত দিয়ে ঝাপটা দিয়ে দিয়ে চুলের পানি গুলো কমালো । আস্তে আস্তে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল ,
-খুব কথা বলতে শিখছো না'হ । দ্বাড়াও...
মুহুর্তে রাত কে দিন বানিয়ে কোথায় আবার চলে গেলো একটা বিশাল বিজলী। আবার আসবে বলে মনে হচ্ছে । সব কিছু যেন আলোকিত হয়ে গেলো কিছু সময়ের জন্য । ছেলেটা মেয়েটার খুব কাছে গিয়ে মেয়েটার মাথা নিজের দুই হাতের থাবার মধ্যে নিলো । মেয়েটার কথা বলা হঠাৎ থেমে গেলো । ছেলেটার ভেজা শরীর মেয়েটাকে ভেজাতে শুরু করেছে । ছেলেটার সাথে সাথে মেয়েটাও আলতো করে দুই হাতে ছেলেটার মাথা চেপে ধরলো ।দুজনার'ই চোখ অদ্ভুত ভাবে বন্ধ হয়ে গেলো ।চাইলেও দুজনার কেউ'ই এখন কোন কথা বলতে পারবে না ।

এমন অবস্থা যতবার তাদের মধ্যে সৃষ্টি হইছে , ততবার তাদের মধ্যে সমান প্রয়োজন ও তৈরি হইছে । শুরুটা যেই করুক , যে পরিবেশেই করুক না কেন , সমাপ্তিটা দুজন মিলেই করে । এটা যেন তাদের মধ্যে এক অলিখিত একটা চুক্তি ।
কথা কাটাকাটির সমাধান দুজনেই চুপ করে যাওয়া । কিন্তু তারা নিজেদের ইচ্ছেতে কখনোই চুপ করে না । একজন অন্যকে চুপ করিয়ে দেয় । এতে করে , নিজেদের রাগ গুলোর প্রকাশ ঘটে ঠোঁটের উপর তীব্র অত্যাচার করে ।
এবার বিশাল শব্দে বর্জ্রপাতের শব্দ হল। মেয়েটা হঠাৎ করেই ছেলেটার মাথা ছেড়ে ছেলেটাকে জরিয়ে ধরলো দু'হাতে। ভয় পেয়েছে । ছেলেটা মেয়েটার এই আচরনের কোন প্রতিবাদ করলো না। কিন্তু মেয়েটাকে জড়িয়েও ধরলো না । নিজের হাত গুলোও ছাড়িয়ে নিলো মেয়েটার মাথা থেকে। অভিমান কি এখনো আছে ? নাকি অভিমান থেকে রাগের সৃষ্টি হইছে ?
মেয়েটার মাথা থেকে সরিয়ে নেয়া একটা হাত নিজের ভিজে যাওয়া পকেটে দিলো। কিছু একটা বের করলো ।অন্য হাতে মেয়েটাকে একটু দূরে সরাতে সরাতে বলল, চোখ খুলবা না । মেয়েটা মুখে কিছুই বললো না , শুধু চোখটা বন্ধ করে , এক হাত পিছনে গেলো। ছেলেটা মেয়েটার গলার কাছ থেকে হাতটা নিয়ে ,কিছু একটা করলো । মেয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করছে অদ্ভুত স্বামীর অদ্ভুত কর্মকান্ড । এবার চোখ খোল ।
-বকুল ফুলের মালা ? মেয়েটার চোখে যেন হঠাৎ করেই জ্বলে উঠলো। মোমবাতির আলোতেই যেন সেটা স্পষ্ট হয়ে ঊঠলো । সব রাগ ধুয়ে মুছে কোথায় যেন গেলো ।
-তুমি এটা খোপায় বাঁধবে আজকে, আদেশের সুরে বলল ছেলেটা । তোমার কি মনে হয় আমি লবণ কিনতে বাইরে গেছি ? আমি সবকিছু ভুলে গেলেও তোমার কথা ভুলতে পারি? বাচ্চা মেয়েটাকে না দেখলে গোলাপ ফুলটা জীবনেও আনতাম না ।
কথার মধ্যে কথা বলা শুরু করলো মেয়েটা ।খানিকটা চিন্তিত কন্ঠে ,
-আমিও সেটাই চিন্তা করছিলাম । আমাদের দুই বছরের বিবাহিত জীবনের একদিনও তুমি আমার জন্য গোলাপ এনে দাও নাই। আমি চাইলেও বলেছ, আমি আনতে পারবো না । আজকে কেন যে নিয়ে আসলা সেটাই চিন্তা করছিলাম । আচ্ছা , ঐ বাচ্চা মেয়েটা কি খুবই সুন্দর ?
বলতে বলতেই কেমন জানি ফ্যাকাশে হয়ে যায় মেয়েটার মুখ । ছেলেটা মেয়েটার দুই গালে হাত দিয়ে বলল ,
-তোমার মেয়ে আরো সুন্দর হবে । চিন্তা করোনা । পাগলী কোথাকার । তোমাকে একটা কথা বলি- তুমি যে আমাকে বলো , আমার কিছুই মনে থাকেনা ? আমার কিন্তু ঠিকই মনে আছে , আজকে আমার বৌয়ের জন্মদিন । আজকে যদি তুমি মন খারাপ করো , তাহলে আমার ভালো লাগবে ? মেয়েটা এবার কিছুটা হাসলো । আর আজকে আমি ইচ্ছা করেই দেরী করছি শুধু তোমাকে রাগানোর জন্য ।
আবারো কথা কেড়ে নিয়ে মেয়েটা বলছে ,
-আমার খুব ভয় লাগছিলো ,তাই বেশী রাগ হইছিলাম । তুমি জানো না ? আমি অন্ধকারে একা একা থাকতে পারিনা ? বলেই ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরলো । ছেলেটাও মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
- কি চাই ? ( ফিসফিস করে )।
- আরো পাঁচশোটা বকুলের মালা। এক্ষুনি । মেয়েটা সাথে সাথেই উত্তর দিলো। বৃষ্টিতে ভিজতে কে বলছে তোমাকে ?
- কেউ বলে নাই তবে, বকুল গাছটা মনে হয় আমাকে খুঁজতেছিলো । বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে যদি মরেও যেতাম তাহলেও আমি তোমার জন্য আমার এই ফুল নিয়েই আসতাম ।
- আহারে ! আমার প্রেমিক রে । মরার খুব শখ , তাইনা ?
বলেই ডাইনিং টেবিলের উপরে থাকা পানি ভর্তি জগটা ছেলেটার মাথায় ঢালতে থাকলো ।

আগে থেকেই ভিজে থাকা ছেলেটার মাথার পানি আস্তে আস্তে নাকমুখ বেয়ে পরছে । নাক দিয়ে নিশ্বাস নিচ্ছে না ছেলেটা । পারছে না । নাকের উপর পানি পরলে নিশ্বাস নেয়া যায় না । দম ফুরানোর আগে আগে বড় করে হা করে নিশ্বাস নিতে হয় । সেও তাই করছে । যতক্ষন সম্ভব দম রেখে, বড় করে নিশ্বাস নিচ্ছে ।
পানি এখনো শেষ হচ্ছে না কেন ? একটা ছোট জগের মধ্যে এত পানি থাকতে পারে ? পানির ধারা যেন ক্রমশ বাড়ছে । নিশ্বাস নেয়াই যেন কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে । কি করছে মেয়েটা ? এবার মনে হচ্ছে পানি পরছে না , পানির মধ্যে ডুবে যাচ্ছে ছেলেটা । দম শেষ হয়ে আসছে...... প্রায়... শেষ.........
একলাফে বিছানা ছেরে উঠে পরেছে ছেলেটা । তার পুরো শরীর সত্তিই ভিজে জবজবে । বৃষ্টির পানিতে নয় , ঘামে । স্বপ্ন দেখছিলো ছেলেটা । এতক্ষন ধরেই স্বপ্ন দেখছিলো ছেলেটা ।
নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এমন অবস্থা থেকে ফিরে এসে বাস্তবে নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে ছেলেটার । খুব কষ্ট হচ্ছে । পানি খাওয়া দরকার । পানি খেতে অন্য একটা ঘরে ঢুকতে হবে । সে চায় না এখনি ঐ ঘরে ঢুকতে । গলা থেকে বুক পর্যন্ত শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে । তারপরও ওই ঘর এখন খুলবে না সে । ওই ঘরে তার বউ ঘুমাচ্ছে ।মোবাইল টা খুঁজছে । নেটওয়ার্ক তো থাকেই না । চার্জ আছে কিনা ফোনে, জানেনা । ফোনটা প্রয়োজন শুধু সময়টা জানার জন্য ।কতক্ষন ঘুমিয়ে ছিলো এটা অনুমান করা সম্ভব নয় । ছেলেটা ২০ ঘন্টাও একটানা ঘুমাতে পারে । মোবাইল টা খুজে পেলো তোশকের নিচে থেকে । কিভাবে তোশকের নিচে গেলো বুঝতে পারছে না । ঘরে একটা তোশক, একটা বালিশ আর কিছু কাপড় ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। কাপড়ের মধ্যে দুইটা তার নিজের পোষাক । আর বেশীর ভাগই পুরানো কাপড় ।কোণায় একটা সুতি শাড়ি কুটি কুটি করে রাখা , যেটা দিয়ে সে হাত পরিষ্কার করে । কাপড় গুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মোবাইল টা অফ হয়েই ছিলো। অন করার চেষ্টা করলে ,অন হয়েই বন্ধ হয়ে গেলো ফোনটা । সাটটা চুয়াল্লিশ এ এম । সকাল । ছেলেটা একটু হেলান দিলো বালিশে। কি মনে করে , উঠে বসলো , একটু কাত হয়ে ছেরা কয়েক টুকরা কাপড় নিয়ে আবার শুয়ে পরলো । ছেলেটার বিছানাতে দুইটা জিনিস আছে । একটা সে নিজে আর একটা হাত । হাত বললে ভুল হবে । পাঁচটা আঙ্গুল । কব্জি পর্যন্ত কাটা । নখ গুলোতে কি যেন লেগে আছে । মেহেদি মনে হচ্ছে । কব্জির কাটা অংশটাতে মাছি ভন ভন করছে ।রক্ত শুকিয়ে গেছে অনেক আগেই। পচণ শুরু হইছে। ছেলেটা নিজের হাত দিয়ে সেই কাটা যায়গাটা মুছে পরিষ্কার করলো । হালকা করে নিজের হাত মুছে নিলো শুকনো কাপর দিয়ে । নিজের হাতটা ধরলো নিজের নাকের কাছে । গন্ধ শুকছে । অনেক বড় করে একটা নিশ্বাস নিলো সে ।
-আহ্ ...। কি সুন্দর গন্ধ !
কাটা হাতের কব্জি টা মনে হয় বাম হাতের । ছেলেটার ডান হাত দিয়ে কাটা হাতটা ধরে নিজের বুকের উপর রেখে চোখটা বন্ধ করে ফেললো। এভাবে কিচ্ছুক্ষন থাকার পর চোখ খুলে উঠে দ্বাড়ালো ছেলেটা । কাটা হাতটা তার হাতে আছে এখনো । তার ঘরের দুইটা দরজার একটিতে গিয়ে ঠক ঠক শব্দ করতে করতে বললো,
- বৌ । ও বৌ । এখনো ঘুমাচ্ছো ? আটটা বাজে । দরজা খোলা রাখছো যে ? তুমি না কাল ঝগড়া করে আমাকে বের করে দিয়ে দরজা আটকে দিলা ?
খট করে খুলে গেলো দরজাটা । ঘরের মধ্যে থেকে অনেক মাছি ,কিন্তু কোন শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না । সাউন্ড সিস্টেমের স্পীকারে কিছু একটা চলছে । একটা ছেলে কন্ঠ আর একটা মেয়ে কন্ঠ।
-মনে পরেছে , এটা তো আমিই রেকর্ড করেছিলাম । মনে আছে ? তুমি আর আমি একদিন রিক্সা নিয়ে সারাদিন ঘুরলাম ?দুপুরে খাইনি পর্যন্ত । আমি কিন্তু সেদিন আমার ফোনের রেকর্ডার চালিয়ে রেখেছিলাম চুপিচুপি । এটা তো সেই রেকর্ড টা । কোথায় পেলে এটা তুমি ? ও...ও , তাই তো বলি আমার ফোনের মেমরি কার্ডটা কোথায় ? তুমি কিন্তু এটা ঠিক করনাই । কাউকে না বলে তার কোন কিছু ধরাটা কিন্তু অন্যায় । আচ্ছা , তোমার ক্ষুধা লাগছে না ? আমি কিন্তু নরাচরা করতে পারছি না ।খাবার আনতে বাইরে যেতে হবে । জানো ? কি জানি মনে করে বাড়ির চাবিটা ফেলে দিয়েছি । আমি নিজে ইচ্ছে করলেও আর বাইরে যেতে পারবো না , বাড়িটা থেকে । এত উচু পাহারের উপর একটা লোকও নাই । আসাও নিষেধ। তুমি ভাবছো, কেয়ারটেকার লোকটা কে ডাকতেছিনা কেন ? প্রথমবার আমি তোমার আনতে যাওয়ার সময় লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম , এখানে কেউ আসে কি না ? লোকটা বোকার মত বলল ,
-নাহ , এখানে লোকজন বলতে শুধু আমি'ই ।
শুনে আমি তো খুশিতে আত্মহারা । মনে মনে ভাবলাম , এই লোকটাও যদি না থাকে তাহলে তো শুধু তুমি আর আমি । আর কেউ থাকছে না । আসার পথে লোকটাকে দেখলেই বিরক্ত লাগবে ভেবে, তাকে অন্য কোথাও পাঠিয়েছি। আর কোনো দিনই আসবেনা ।
এখান থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে কোন বসতি নাই । আমার খুব ভালো লাগছিলো , আসার সময় আবার মেইন গেটের বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে এসেছি । কেউ যেন না আসে এখানে । মালিক'ও আসবে না , সে বিদেশে থাকে । মালিক টা কি বোকা দেখো , এত সুন্দর পাহারের উপর একটা বাড়ি ছেড়ে বিদেশে গিয়ে থাকে । হা হা হা। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি , আমরা এখন থেকে এখানেই থাকবো । সারা জীবন । তোমার তো আর খাওয়া-দাওয়া লাগবে না । বাড়িটাও কিনতে হবে না । এত সুন্দর একটা জায়গায় শুধু তুমি আর আমি। কোন ঝামেলা নাই ।
-তুমি সারারাত এই অডিওটা শুনছো । বলেই বন্ধ করে দিলো সাউন্ড সিস্টেমটা। রুমটা অনেক সাজানো ,গোছানো । সব আসবাব পত্রই অনেক দামি দামি। এই বাসার আগের মালিকটা কিনেছিলো ।
-কিন্তু একটা কষ্ট থেকেই গেলো । তুমি চেয়েছিলে , আমাদের সব আসবাব পত্র তুমি আর আমি ,নিজের হাতে কিনব । কি আর করবে ? আমাদের তো আর কোন আসবাব লাগবে না । দুনিয়ার কোন কিছুই আর আমরা নিবো না ।
-আজকে কিন্তু তুমি একটা অন্যায় করছো । আবার জিজ্ঞেস করো , কি অন্যায় ? তুমি কিন্তু আমাকে সরাসরি বললেই পারতে , আজকে তোমার জন্মদিন । সেটা তুমি স্বপ্নে এসে বললে? আমি কিন্তু মন খারাপ করছি । হুম্ । আচ্ছা , আমার এত ক্ষুধা লাগছে কেন ? আমি এখন তোমাকে একটু খাই ? খাই না ? প্লিজ। তুমিই তো বলেছিলে, তোমার ক্ষুধা লাগলেই তুমি আমাকে খাবা। ভুলে গেছো ? বলেই, মাংসের স্তুপ থেকে একটা মাংস হাতে নিলো । নাহ্ , এইটা একটু বড় । এত বড় আমি খাবোনা । ধারালো ছুরি দিয়ে আরো কয়েক পিস করলো মাংসের টুকরোটা। একেবারে থেতলো মত হয়ে গেছে।
ঘরে অনেক বড় একটা মাংসের স্তূপ । কেজিতে ৮০-৯০ পিস হবে , এমন ছোট ছোট পিস করে কেটে রাখা । স্তুপের উপরে একটা গলা কাটা মাথা । মাথাটা একটা মেয়ের। মেয়েটার চোখে থ্যাবড়া করে কাজল লাগানো। চোখদুটো টেপ দিয়ে খুলে রাখা। চুল গুলো এলোমেলো করে ছেড়ে দেয়া । মাথাটাকে আলতো করে তুলে কপালে একটা চুমু খেলো ছেলেটা। মেয়েটার চুল গুলো নাকের কাছে নিয়ে তীব্র ভাবে নিশ্বাস নিলো। তোমার গন্ধটা সত্যিই মাতাল করে দেয়ার মত ।আমি সত্যি সত্যি মাতাল হয়ে যাচ্ছি।
-তুমি কি চাও আমার কাছে (মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে)? আরে যা খুশি চাও। আজকে তোমার জন্মদিন না ? যা চাও তাই দিবো ।
হা হা হা... শব্দ করে হাসছে ছেলেটা ।
-এটা কোন চাহিদা হলো? আর একবার সুযোগ দিলাম , বড় কিছু চাইতে পারো । বললাম তো যা চাও তাই পাবে । আচ্ছা ! ঠিক আছে । তুমি যখন বলেছো , আমি আসবো তোমার কাছে । অবশ্যই আসবো । শুধু এটাই চাও ? দাঁড়াও আজকেই আসছি।তুমি বলেছ, আর আমি আসবো না ? এটা হয় ? নাহ্‌, আর দেরি সহ্য হচ্ছে না । এক্ষুনি আসছি। এক্ষুনি আসছি।
ঘরের ছাদটা মেঝে থেকে অনেক উপরে । ফ্যানটা ছাদ থেকে একটু নিচু করে সেট করা । ফ্যানের ঠিক নিচে কয়েকটা টেবিল জোড়া দিয়ে অনেক টা উচু করে রাখা । তার পাশে একটা উচু টেবিল কাত হয়ে পরে আছে । ঠিক উচু টেবিল গুলোর পাশে । তার পাশেই গলা ছাড়া একটা দেহ । ফ্যানের পাখার যায়গায় খুব সুক্ষ করে লাগানো কয়েকটা ধারালো ব্লেড। রক্ত লেগে আছে । দেয়ালেও ছোপ ছোপ রক্তের দাগ।দুইটা মাথা ঝুলছে ছাদ থেকে । দুইটা মাথার চোখ এক সাথে লেগে আছে। চারটা চোখই খোলা। একটা মাথার চুলের সাথে দড়ি বেধে ছাদের সাথে লাগানো। আরেকটা মাথার গলাতে দড়ি লাগানো । যে কেউ দেখেই বলে দিতে পারবে মৃত্যুর এই প্রক্রিয়া গলায় ফাস লেগে হয়েছে । কিন্তু গলায় ফাস লাগার পর ফ্যানের সাথে থাকা ব্লেড গুলো গলাতে লাগানো দড়ির ঠিক নিচে কাঁটতে শুরু করেছিলো । হয়তো ফাঁস লাগার আগেও শুরু করতে পারে । তবে এক সময় নিথর দেহটা মাটিতে পরে গিয়েছিলো কারো সাহায্য ছাড়াই। সদ্য কাটা মাথাটা থেকে টপটপ করে পরা রক্ত যেখানে পরেছিলো, সেখানে রক্তের একটা বৃত্ত সৃষ্টি হয়ে আছে ।
দুই বন্ধু আড্ডা দিচ্ছে ।
- কাল রাতে টিভি দেখছিলি ?
- সেই ভয়ংকর প্রেমিকের কথাটা বলবি তো ?
- মানুষ এত অদ্ভুত হয় কিভাবে ?
- জানিনা। একবার চিন্তা করে দেখ ? প্রথমবার মেয়েটার বাড়িতে গিয়ে মেয়েটাকে বিষ খাওয়ায় , নিজে বিষ খায়। মেয়েটা মারাগেলো সেদিনই। ছেলেটার জ্ঞান ফিরলো তিন দিন পর । সন্ধ্যায় । রাতেই হাসপাতাল থেকে পালালো । মেয়েটার কবর খুরে মেয়েটার লাশ নিয়ে আবার উধাও । কয়েকদিন পর দুজনারই গলাকাটা লাশ পাওয়া গেলো । তবে মেয়েটার শরীর পাওয়া গেলো টুকরো টুকরো অবস্থায়। আর ছেলেটার গলা কাটা । একটা পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে । বাড়ির দাড়োয়ানেরও কোন খোঁজ নাই।
- ছেলেটা নিজে আত্মহত্যা করার আগেই নিজের গলা কাটার ব্যাবস্থা করে গেছে , খুবই নিখুঁত ভাবে ।
- শিরোনাম টা মনে আছে তোর ?
- " দ্বিতীয় খুন দ্বিতীয় আত্মহত্যা" ?

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.