নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানবতার জয় হোক

শান্তির জন্য সংগ্রামী

রুমি আলম

মানবতার জয় হোক

রুমি আলম › বিস্তারিত পোস্টঃ

জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

২৩ শে জুন, ২০১২ রাত ১:২৪

আজ ঐতিহাসিক ২৩ জুন। ১৭৫৭ সালের এইদিনে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালি তাদের যে অধিকার হারিয়েছিল ১৯৪৯ সালের এই দিনে ধরমের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া আওয়ামী মুসলিম লীগ ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠেছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক ও বাহক। বারবার অধিকার হারানো বাঙালি এই দলের নেত্রিত্বের মাধ্যমেই পেয়েছে তাদের হাজার বছরের আরধনার স্বাধীনতা। আজকের এই দিনটিতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করছি সেইসব বীরদের। যারা আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে লালন করার এই পাত্রটি তৈরি করেছিলেন।



ইতিহাস যেমন নেতৃত্ব সৃষ্টি করে, নেতৃত্বও তেমনি ইতিহাস সৃষ্টি করে। জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক রাজনীতির প্রথম স্ফুরন ঘটে চতুরদশ শতকে নিকোলাই ম্যাকিয়াভেলির হাত ধরে। অষ্টদশ শতকে ইউরোপে আরো প্রবলভাবে এই চেতনার স্ফুরন ঘটে। মাঝের সময়গুলোতে বিশেষত সপ্তদশ শতাব্দীতে রেনে ডাকারত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের কথা বলেন। এটিকেই টমাস হবস তার Individual & Social Contract গবেষনা গ্রন্থে ব্যক্তিকে সমাজ ও রাস্ট্রের আদি নির্মাতা হিসেবে দেখিয়ে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে রাজনৈতিকভাবে ব্যক্তিস্বাধীনতার উপস্থাপনায় একধরনের পরিবর্তনের তত্ব দিয়ে মানুষকে আন্দোলিত করেন। রেনে ডাকারত ও টমাস হবস এর তত্বের ধারাবাহিকতায় জন লক, বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন, এডাম স্মিথ ও টমাস পেইন প্রমুখ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দার্শনিকেরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা বিশ্লষনের মধ্য দিয়েই ব্যক্তিস্বাধীনতার মাধ্যমে পূর্বেকার শাসন ব্যবস্থাকে নাকচ করে দিয়ে একধরনের 'গণতন্ত্র'র দিকে সমাজ ব্যবস্থাকে ধাবিত করতে সক্ষম হন। এরই ফলশ্রুতিতে দেখা যায়, ১৬৮৮ সালে ইংল্যান্ডের বিপ্লব, ১৭৭৫-৮৩ সময়ে মারকিনিদের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ১৭৮৯ সালের ফরাসী বিপ্লবের মতো দ্রুত পরিবরতনশীল ঘটনা ঘটে। বলা হয়ে থাকে ব্যক্তিবাদ দর্শনের ফলে মানুষের মধ্যে যে মেধার বিকাশ ও জীবনভঙ্গীতে যে পরিবরতন আসতে শুরু করে এর একটি অন্যতম ফল হলো আঠারো শতকের শেষ পাদের শিল্প-বিপ্লব এবং ততজনিত সামাজিক পুনর্গঠন ও সর্বত্র ব্যক্তিবাদের ভিত্তিতে নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ব্যক্তিবাদের ফলেই আবার শুরু হয় নতুন আঙ্গিকে সংকটের। ফলে এক পরিবর্তনের থেকে আরেক পরিবর্তনের সুচনা শুরু হয় এবং সেই পরিবরতন যেন সীমাহীন। কাজেই শুরু হয় নতুন গবেষনা। এবং এইক্ষেত্রে টমাস পেইন, ডেভিড হিউম, কারল মারকস, ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস প্রমুখ দারশনিকেরা একমত হন যে, নিয়ন্ত্রনহীন ব্যক্তিবাদ এবং রাস্ট্র ও পুজিপতিদের মধ্যকার আতাতই শিল্পায়িত দেশসমুহকে যুদ্ধ-বিগ্রহের মতো অনৈতিক স্বিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করছে। মুলত এখান থেকেই সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি। আরো পরে তাত্বিক জ়ে এ হবসন তার Imperialism:A Study নামক গবেষনা গ্রন্থে বিস্তারিত তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছেন ব্যক্তিবাদের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে। অবশ্য আধুনিক পুজিবাদ ভিত্তিক রাস্ট্র বিকাশের শুরুতেই ষোড়শ শতকের প্রারম্ভে মানবতাবাদী স্যার টমাস মুর এই বিষয়ে আশংকা প্রকাশ করেছিলেন। তাই বলা যায়, আজকের আধুনিক বিশ্বে মুলত এইসব প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক গনতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। অবশ্য এক্ষেত্রে প্রনিধানযোগ্য বিষয় হলো, অতীতের সকল তত্ব ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকেই মানুষ তাদের স্বভাবগতভাবেই পরিবর্তন সাধন করে বর্তমানকে তৈরি করে ভাবীকালের উপযোগী করে। জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক রাজনীতিতে একমাত্র গনতন্ত্রই সকল কিছুকেই আমলে নেয় এবং সর্বোচ্চ বাক-স্বাধীনতার সুযোগ পাওয়া যায়। নির্দিষ্ট আয়তনের মধ্যকার জনগোষ্ঠীর দীর্ঘকালের প্রচলিত সাংস্কৃতিকবোধের ভিত্তিতে তৈরি 'জাতীয়তাবাদ' ভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাই এখনো বিশ্বব্যপী অধিক টেকসই পদ্ধতি হিসেবে চালু রয়েছে।

প্রাচীন যুগ বা মধ্যযুগকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সুচনাকাল হিসেবে চিহ্নিত করা না গেলেও ব্রিটিশ আমলে যে এই ভুখন্ডটি অবিভক্ত বঙ্গদেশ বলে চিহ্নিত সেটা প্রাচীনকালে নানা জনপদে বিভক্ত ছিল। যুগ যুগ ধরে এসব জনপদের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতিগত ঐক্যসুত্রই মুলত আমাদের হাজার বছরের বাংলা ও বাঙালি’র গৌরব বহন করে চলেছে। এভাবেও একধরনের ঐক্যবোধ লালন করছি আমাদের চৈতন্যের গভীরে। মধ্য যুগে সুলতান ইলিয়াস শাহ প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন সুলতানী আমলের দু’শ বছরের মধ্যকার সময়েই আমাদের বাঙালি জাতিসত্ত্বা গঠিত হয়। ১৫৩৮ সালে সুলতানি আমলের পতনের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতা অবসান হলেও তখন যে রাস্ট্রগত ও শাসনগতভাবে বাঙালিদের মধ্যে যে ঐক্যের বীজ রোপিত হয়েছিল মুলত সেটার বিকাশ ঘটতে থাকে। এই সময়েই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ একটি শাসনতান্ত্রিক একক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। যাকে সুবে বাংলাহ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। মোগল আগ্রাসনে বিরুদ্ধে ইতিহাসখ্যাত বারো ভুইয়ার প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে বাঙালি মানসে যে আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যচেতনার জাগরন ঘটেছিল সময়ের পরিক্রমায় সেটাই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার পতন পর্যন্ত আবেগতাড়িত করে নিয়ে যায়। ভারতবর্ষের সঙ্গে ১৫শতকের শেষে ইউরোপের যোগাযোগের ফলেই ধীরে ধীরে মানবসমাজ, মানুষের আচরন ও মানব চাহিদার সদা পরিবর্তনশীল আচরনগত প্রয়োজনেই সময়োপযোগী রাজনৈতিক পরিবরতনে নিয়ে যায় । তখনই ইংরেজি শিক্ষা, দর্শন ও চিন্তাধারার প্রভাবে আধুনিক জাতীয়তাবাদের স্ফুরন ঘটে। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে, পরিবর্তনই মানব জীবনের বড় সত্য । পরিবর্তন না থাকলে মানব জীবন অর্থহীন । তাইতো যুগে যুগে সব নিয়ম,তত্ব,আইন পরিবর্তিত হয় মানুষ খোঁজে ফিরে ভাল'র চেয়ে ভাল কিছু । তবে উনবিংশ শতকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের সংস্পরশে প্রভাবিত হয়ে যে আধুনিক জাতীয়তাবোধের জাগরন ঘটে সেটা বাঙালি জাতীয়তাবাদের গন্ডি পেরিয়ে ভারতীয় জাতীয় চেতনার রুপ পরিগ্রহ করে সরবভারতীয় ভাবধারায় বিকশিত হয়েছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবোধের যে প্রবল আন্দোলন দানা বেধেছিল সেটাতে বাংলাদেশের মুসলমানদের অনুপস্থিতির কারনে পরিপূর্ণ জাতীয়তাবোধের বিকাশ ঘটেনি বলেই বিদগ্ধজনেরা উল্লেখ করেন। তখনই বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গান ও কবিতার মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবোধের জাগরনে গভীর প্রেরনা যোগায়। অবশ্য একই সময়ে ১৯০৫সালে এশীয় দেশ জাপান প্রবল পরাক্রমশালী ইউরোপীয় দেশ রাশিয়া দখল করার পরেই এশীয় বিভিন্ন দেশগুলোতে নিজস্ব ভাষা ও সাংস্ক্রিতিক জাতীয়তাবোধ নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ন্যায় অনুরুপ ভুমিকা রাখেন জাপানের ওকাকুরা এবং সিংহলের আনন্দ কুমার স্বামী। ইউরোপে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ ভিত্তিক যে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটেছিল সেটার প্রভাব ব্রিটিশ রাজের বদৌলতে ভারত বর্ষেও বিস্তৃত লাভ করেছিল বটে। কিন্তু এই পর্যায়ে প্রত্যেকেই তীব্র অনাস্থা প্রকাশ করলেন ইউরোপের অতি জাতীয়তাবাদিতায়। এই ত্রয়ীর ভাবনা চিন্তার ফসল হিসেবেই প্রকাশ ঘটে যে, এশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলি পরিচালিত হবে একমাত্র এশীয় ভাবধারায়, যা এশিয়ার অধিবাসীদের পরিচালিত করবে সমগ্র মানবতার জন্য সংগ্রাম করতে। এখান থেকেই জন্ম নেয় একটি বিশিষ্ট চিন্তাধারার, যার প্রভাবে বাঙালিদের বিক্ষোভ রুপ নিল একটি গুরুত্বপুরন জাতীয় আন্দোলনে। বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও হিন্দু-মুসলমান ব্যবধানের দরুন আরো প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

মুলত ১৯০০ সালের প্রারম্ভেই ভারতীয় রাজনীতিতে উদারপন্থী ও চরমপন্থী এই দুটি গ্রুপের উত্থান ঘটে। তবে উভয় গ্রুপই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ভুমিকা রাখেন। ১৮৮৬ সালে কংগ্রেস গঠন হলেও তখনো পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে কংগ্রেস স্থায়ীত্ব লাভ করতে পারেনি।

শপথ, প্রতিহিংসা ও সন্ত্রাস তিনটি রঙ্গিন ধারনার উপর ভিত্তি করে ১৯০৩ সালে অতি বিপ্লববাদীদের প্রথম সংগঠন অনুশীলন এবং ১৯০৬ সালে দ্বিতীয় সংগঠন যুগান্তর নামে বিপ্লববাদের আদর্শে দুটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিল। এই দুটি সংগঠন মুখ্যত ছিল হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেনীর আন্দোলন। এদের সঙ্গে জড়তদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। উপরন্তু এসব গোপন অতি বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রারম্ভেই প্রথম দিকে কিছু সংখ্যক মুসলমান ছেলেরা জড়িত হলেও বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত, বিশ্বাস- অবিশ্বাসের কারনে, একসময়ে ভয়াল ভয়ংকরী কালীমূর্তির সামনে গোপনীয়তা রক্ষার জন্য আনুগত্যের শপথ নেওয়ার রেওয়াজ চালু হলে মুসলমানদের আর যোগ দেওয়ার ন্যুনতম সুযোগ থাকেনি।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষনা হলে বাংলার মুসলিম নেতারা খুশি হলেও সরবভারতীয় মুসলিম নেতারা ছিলেন বিপক্ষে। পক্ষান্তরে কলকাতার মুসলিম নেতারাও বিরোধীতা করেন। ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহসহ অনেক মুসলিম নেতারা পক্ষে থাকলেও অন্যান্য অনেক মুসলিম নেতাদের তেমন সাড়া না পেয়ে তিনি কলকাতার মাদ্রাসা-ই-আলিয়া এবং আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক মুসলিম আন্দোলনের নেতাদের একটি মিটিং ডাকেন ১৯০৬ সালে ডিসেম্ভরে ঢাকাস্থ আহসান মঞ্জিলে। যদিও সম্মেলনের উদ্দেশ্য ব্যারথ হয়েছিল, কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি প্রস্তাব পাশ হয় সর্ব ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের। পরবরতীতে এটির নামকরন করা হয়, সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগ। উদ্দেশ্য ও আদর্শের মধ্যে ছিল, * মুসলমান সম্প্রদায়কে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভক্ত ও অনুগত করে তোলা এবং সরকারের কারযকলাপের জন্যে মনে কোন সংশয় উদয় হলে তার নিরসন করা। * ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক এবং অন্যান্য অধিকারকে রক্ষা করা এবং তাদের দাবি দাওয়া সরকারের গোচরীভুত করা।

সেই সময়টা ছিল এমন যে, শুধু ধর্মীয় নয় অন্যান্য বিভিন্ন সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতেই হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক ছিল অবিশ্বাস আর ঘৃণায় ভরপুর। তারপরেও এই পর্যায়ে মুসলমানেরা বিদেশি শাসন থেকে তাদের জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা লাভের জন্য সাম্প্রদায়িক অধিকার ও স্বার্থ বজায় রেখে হিন্দুদের সহিত সম্মানজনক সমঝোতা ও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ও ইচ্ছুক ছিল।



o বাঙালীর জাগরনঃ বিংশ শতকের শুরু থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শ দানা বাধতে থাকে। যার ফলে ব্রিটিশরা বাধ্য হয়ে একধরনের জনগনের প্রতিনিধিত্বমুলক সরকার প্রবর্তন করে। এর মধ্য দিয়েই এতদ অঞ্চলের সমাজের বহুত্ববাদী চারিত্র্ বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক শক্তির ভিতর দিয়ে পরিস্ফুটন হয়ে উঠতে থাকে। একই শতকের ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি একটি সর্ব ভারতীয় অঞ্চলের মধ্যে একটি ধর্মভিত্তিক সংখ্যালঘু তথা মুসলমান জনগনের অস্তিত্ব ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে দর কষাকষির প্রশ্নে একটি প্রধান কারন হয়ে দাঁড়ায়।যার সুচনা হয়েছিল বিংশ শতকের গোড়াতে ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রতিস্টার মাধ্যমে। এবং এই সব মুসলমানের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বপালন বহুলাংশে বর্তেছিল নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নামক রাজনৈতিক সংগঠনের উপর। এরই ধারাবাহিকতায় চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি নাগাদ অধিকাংশ ভারতীয় মুসলমান তাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বার দাবিটি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনা পরিক্রমার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের জন্য আলাদা স্বতন্ত্র রাস্ট্র প্রতিস্টার জন্যই দ্বিজাতি তত্ব নামক রাজনৈতিক কৌশলটি বাস্তবে রুপ লাভ করে। অবশ্য লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম রাস্ট্রসমুহের উল্লেখ থাকলেও ১৯৪৬ সালে সেটার পরিবরতন করে মুসলিম লীগ একটি মুসলিম রাস্ট্রের অস্তিত্বকে স্বীকার করে। যারফলে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে অনিশ্চিত সত্যতায় রুপ নেয়। ব্রিটিশ রাজত্বের অবসানকল্পে ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট জন্ম নেয় সংখ্যাগুরু মুসলমানদের জন্য ভারতের পুরব ও পশ্চিম দুই অঞ্চলের দুটি ভুখন্ড নিয়ে পাকিস্তান নামক রাস্ট্র। এবং ১৫ই আগস্ট জন্ম নেয় সংখ্যাগুরু হিন্দুদের জন্য ভারত নামক রাস্ট্র।

বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আকরাম খা, সাধারন সম্পাদক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ারদী ও সহ-সাদ্গারন সম্পাদক আবুল হাশিম। মাওলানা আকরাম খা-খাজা নাজিমউদ্দিন গ্রুপ স্বভাবত শুরু থেকেই কায়েমী ও প্রতিক্রিয়াশীল স্বার্থ ছিল। অপরদিকে আবুল হাশিম প্রথম থেকেই অনেকটা সমাজতন্ত্রী ভাবধারায় পরিচালিত করেন। মাঝামাঝি পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত সোহরাওয়ারদী এই দুই গ্রুপের সমন্বকারীর ভুমিকা পালন করেন। অধিকন্তু সোহরাওয়ারদী-আবুল হাশিম একই শ্রেনীভুক্ত গ্রুপে উপনীত হন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৩ সালে আবুল হাশিম সাধারন সম্পাদকের পদে আসীন হলে মুসলিম লীগ এক নতুন জীবন লাভ করে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের আগে মুসলিম লীগ সর্ব ভারতীয় নামে থাকলেও বাস্তবে ছিল খুবই অল্প পরিসরে। তিরিশের দশক পরযন্ত বলা যায় বাংলাদেশে শেরে বাংলা ছিলেন যে কোন মুসলিম লীগ নেতা বা দলের চেয়েও জনপ্রিয়। শেরে বাংলার রাজনীতিকে প্রথম হুমকিতে ফেলেন সোহরাওয়ারদী। সেসময়ে শেরে বাংলা ছিলেন মুলত একধরনের সীমিত গনতন্ত্রের প্রতিভু যেটাকে এরিস্টটলের ভাষায় ‘অধিক শিক্ষিত ব্যক্তিরা অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিতদের ভাগ্যের পরিবরতনের জন্য শাসন করবে’ এই তত্বের অনুসারী। অপরদিকে সোহরাওয়ারদী ছিলেন সাবজনীন ভোটাধিকার ভিত্তিক জনগনের সরাসরি ভুমিকায় পরিচালিত গনতন্ত্রের খেদমতদার। আরেকটি বিষয় হলো, বিংশ শতাব্দীতে সারা দুনিয়া জুড়ে শিক্ষিত ছাত্র, তরুন ব্যক্তিদের মধ্যেই সমাজতন্ত্র একটি ফ্যাশনে প রিনত হয়েছিল। আবুল হাশিমের জীবনের পরবরতী রাজনৈতিক অবস্থান দেখে তাই বলা যায় সমাজতন্ত্রের এই মহান অনুসারীও এটিকে ফ্যাশন হিসেবেই গ্রহন করেছিলেন। তবে কাজের কাজ একটি হয়েছিল যে, তার দেওয়া দীক্ষাতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক গুনী নেতৃত্তের বিকাশ ঘটেছিল। বোধকরি এখান থেকেই মুলত মুসলিম লীগের রাজনীতিতে একাধারে সমাজতন্ত্র ও পাশ্চাত্যের আদলে গড়া জাতীয়তাবাদ সমতালে এগিয়ে চলতে শুরু করে। মুসলিম লিগের প্রতিক্রিয়াশীল চক্র অনেকটাই পিছু হটে। এই দুয়ের সমন্বয়ে সংগঠন অনেকটাই আধুনিকরুপে পরিনত হয়। ১৯৪৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত পূর্ববঙ্গে আবুল হাশিম অপরিচিত থাকলেও খুব অল্প দিনের মধ্যেই মুসলিম লিগের প্রতিক্রিয়াশিল চক্রের খপ্পর থেকে সংগঠনকে আধুনিক ভাবধারায় পরিচালিত করতে গ্রহন করেন এক নতুন করমসুচী। যার ফলে পুরব বাংলার তরুন সম্প্রদায় দারুনভাবে মুসলিম লীগে যোগ দিতে শুরু করেন। এই তরুন সম্প্রদায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের সময় মুসলিম লিগের প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃবৃন্দের উপর আস্থা হারিয়েছিলেন। পূর্ববঙ্গের প্রত্যেক জেলা থেকেই কর্মী নিযুক্ত করে পূর্ববঙ্গকে সংগঠিত করতে ঢাকার ১৪৪ মোগলটুলিতে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের শাখা অফিস স্থাপন করা হলো। এতে করে মুসলিম লিগ ইউনিয়ন পরযন্ত কমিটি গঠন করতে সক্ষম হলেন এবং ১৯৪৪ সালের আগস্ট পূর্ববঙ্গে মুসলিম লিগের সদস্য সংখ্যা দাড়ালো দশ লক্ষের উপরে। প্রাদেশিক মুসলিম লিগ কাউন্সিলেও প্রতিক্রিয়াশিল গোষ্ঠী পরাজিত হলেন এবং ধর্ম নিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক তরুন যুবক সম্প্রদায়ের দখলে চলে গেলো মুসলিম লিগের নেতৃত্ব। মুসলিম লিগ বাম ও দক্ষিন এই দুই বলয়ে বিভক্ত হয়ে যায়। সোহরাওয়ারদী মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন। এসময়েই মুসলিম লিগের জনকল্যানে গ্রিহীত করমসুচির কারনেই কংগ্রেস, কমিউনিস্ট, র্যা ডিকেল ডেমোক্রেটিক পারটি, হিন্দু ও মুসলমান সকলের সঙ্গে যৌথভাবেও কাজ করতে শুরু করে। যেকারনে ১৯৪৫ সাল নাগাদ নিখিল বঙ্গ মুসলিম লিগের সদস্য সংখ্যা বিশ লক্ষে উন্নীত হয়। ১৯৪৫ সালে অনুস্টিত কেন্দ্রীয় আইন সভার নিরবাচনে মুসলিম লিগের মনোনিত সকল প্রারথীই নির্বাচিত হলেন। কংগ্রেসের ভারত ছাড় আন্দোলনের কারনে নিষিদ্ধ হয়ে পড়লে মুসলিম লিগ তাদের গৃহীত কর্মসূচীর কারনেই সর্ব ভারতে কংগ্রেসের শুন্যস্থান পুরন করতে সক্ষম হন এবং মুসলিম লিগ একটি গন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হন। যেকারনে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকেই মুসলিম লিগ পাকিস্তানের স্বপক্ষে জোর দাবী পেশ করতে সক্ষম হন। এরই মধ্যে ব্রিটিশ রাজ উপলব্ধি করেন আর বেশিদিন ভারতবর্ষে তাদের ঠাই হবেনা। ১৯৪৬ সালের মার্চে অনুস্টিত নির্বাচনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ প্রানপন যুদ্ধে নামে। কিন্তু প্রাদেশিক মুসলিম লিগের দক্ষিনপন্থী নেতারা অসহযোগিতা তো করেনই উপরন্তু সোহরাওয়ারদী-আবুল হাশিমের বিরুদ্ধে কুতসা রটান। কিন্তু সকল বাধাবিপত্তির পরেও পূর্ব বঙ্গের নির্বাচনে ঘোষিত হলো মুসলিম লিগের সর্বাঙ্গীণ বিজয়। প্রাদেশিক আইন সভার শতকরা ৯৬.৭ ভাগ আসন মুসলিম লিগ প্রার্থীরা দখল করলো।

এরই মধ্যে ব্রিটেনের সাধারন নির্বাচনে শ্রমিক দল জয়লাভ করলে তাদের নেতা এটলি ১৫ মার্চ সংসদে ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে খুলাখুলি কথা বলেন। এবং ক্যাবিনেট মিশন গঠন করে ২০ মার্চেই করাচী আসেন। দিল্লীতে অনুস্টিত মুসলিম লিগের আইনসভার সদস্যদের সভায় করনীয় ঠিক করতেই ৯ এপ্রিল সোহরাওয়ারদী ভারতের মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাস্ট্র প্রতিস্টার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা মুসলিম লিগের বিষয় নিরধারনী কমিটিতে আলোচনার জন্য প্রেরিত হয়। আবুল হাশিম পুরবের লাহোর প্রস্তাবের সংশোধনে করে নতুন করে দিল্লী প্রস্তাব গ্রহনের বিপক্ষে বিতরক করলেও শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তাবই গৃহীত হয়। যদিও পাকিস্তান দাবীকৃত পশ্চিমাঞ্চলে তখন ৩৭% এবং পুরবাঞ্চলে ৪৮% অমুসলিম সংখ্যালঘু বাস করতেন। তখনই মুসলিম লিগের উদারপন্থী এবং কংগ্রেসের কতিপয় বাঙালি নেতারা বিশেষত সোহরাওয়ারদী-আবুল হাশিম গ্রুপ যুক্ত স্বাধীন বাংলা কায়েমের জন্য প্রচেস্টা শুরু করেন। কিন্তু ক্যাবিনেট মিশন, কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের বাংলার দক্ষিনপন্থী এবং পশ্চিম পকিস্তানের নেতাদের বাধা, পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ বিভিন্ন কারনে সেটা বাস্তবরুপ লাভ করতে পারেনি। ভারতের সর্বত্র ধীরে ধীরে গোলযোগ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো এবং শিগ্রই প্রবল আকার ধারন করলো। অনেক যায়গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা গৃহযুদ্ধে উপনীত হলো। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব ১৯৪১ সালের গৃহীত হওয়ার পর থকেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঢাকা শহরে অনেকটাই স্থায়ী আসনে আসীন হয়েছিল। যার ফলে হিন্দু ও মুসলমান এমনকি দুই ধর্মের বামপন্থীরাও সন্দেহ ও প্রতিহিংসার বিশে জরজরিত পরিবেশে পরস্পর থেকে দূরে সরে পড়ে এবং ক্রমেই অকর্মণ্য হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ সালের নিরবাচনের মাধ্যমে সোহরাওয়ারদী যুক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন। আবুল হাশিম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রভাবশালী উদারপন্থী নেতা। পূর্ববঙ্গে সহরাওয়ারদী ও আবুল হাশিমের অনুসারীদের দৃষ্টিভঙ্গী সবসময়েই ছিল সাম্প্রদায়িকতার উরধে । কিন্তু মুসলিম লিগের দক্ষিনপন্থী নেতাদের অনুগামীরা বরাবরই দাঙ্গায় প্ররোচনা দিয়ে এসেছে। এবং স্বাধীনতার হিসেব নিকেষে যখন নেতৃস্থানীয়রা ব্যস্ত তখন মুসলিম লীগের সামন্তবাদীরা ব্যবসা বানিজ্যের রমরমা চটকদারীতায় ব্যস্ত। অপরদিকে সোহরাওয়ারদী-আবুল হাশিম প্রমুখ নেতারা স্বাধীন যুক্ত বাংলা কায়েমের জন্য প্রচেস্টা করাতে স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিম পাকিস্তানীরা এবং তাদের তাবেদার স্বদেশীয় মুসলিম লিগের দক্ষিন পন্থীরা একাট্টা হয়ে জিন্নাহ সাহেবের অদৃশ্য ইঙ্গিতে এবং লিয়াকত আলি খানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সোহরাওয়ারদীকে সংসদীয় কমিটির নেতা থেকে সরিয়ে খাজা নাজিমউদ্দিনকে বসালেন। প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতির পদ থেকে মাওলানা আকরাম খা পদত্যাগ, শেরে বাংলার আবার মুসলিম লীগে আগমন এহেন বিভিন্ন ঘটনায় সোহরাওয়ারদী-আবুল হাশিমের মধ্যেও ভুল বুঝাবুঝির অবতারনা হয়। যার ফলে আবুল হাশিম তার প্রধান কর্মস্থল পূর্ব বাংলা ত্যাগ করে বর্ধমান চলে যান। কর্মীদের অনেকটাই দিশেহারা করে। সোহরাওয়ারদী যুক্তবাংলার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় সংগঠনে সময় দিতে পারেন নি। এমন পরিস্থিতিতে সোহরাওয়ারদী-আবুল হাশিম গ্রুপের ছাত্র ও যুব সম্প্রদায়ের কলকাতার কর্মীরাও ঢাকায় চলে আসলেন। তাদের সমব্যথী ঢাকার কর্মীরা ১৪০ মোগলটুলির অফিসেই অভ্যর্থনা জানান। এতদিন পূর্ববঙ্গের যারা কলকাতায় পড়ালেখা ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারাও সোহরাওয়ারদী-আবুল হাশিম গ্রুপেই অন্তরভুক্ত হয়েছিলেন। অবশ্য ঢাকা ও কলকাতা উভয় স্থানেই মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল গোস্টির অনুগামীরাও সক্রয় ছিল। কিন্তু এর মধ্যেই কলকাতার ৩নং ওয়েলেসলীর প্রথম লেনে মুসলিম লীগের পারটি হাউসেই আবুল হাশিম তাদের উদার ও বামপন্থী ছাত্রদের রাজনৈতিক ক্লাস নিতেন। শেখ মুজিব সহ অন্যরা সেখানেই রাজনীতির তাত্বিক দীক্ষা গ্রহন করেন। ঢাকা এবং কলকাতার উভয় স্থানের কর্মীরাই আবুল হাশিমের রাজনৈতিক ক্লাস থেকে দীক্ষা নিয়েছিলেন রাজনৈতিক সংগ্রামের ব্যকরন এবং সোহরাওয়ারদীর রাজনীতি থেকে দীক্ষা নিয়েছিলেন নিয়মতান্ত্রিক সংসদীয় রাজনীতির। বাংলার এই তরুন ছাত্র ও যুবক কর্মীদের তখনই মুসলিম লিগের প্রতি মোহ ত্যাগ ঘটে। তখনই তাদের অনেকে মুসলিম লিগ ত্যাগ করে ব্যস্ত হলেন নতুন কর্মসূচী নিয়ে। যা মানুষের মতবাদকে অধিকতর যুক্তিসম্পন্ন করবে। সমাজতন্ত্রী ভাবধারায় আস্থাশীল এই কর্মীরা ভাবলেন, তারা নিজেদের উতসরগ করবেন সাধারন মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য, সংগ্রাম করবেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এবং দেশকে ধীরে ধীরে অথচ নিশ্চিতভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাবেন সমাজতন্ত্রের দিকে। উভয় পন্থায় বিশ্বাসীরা নিশ্চিতভাবেই জানতেন, মুসলিম লিগ তথা বাংলার প্রতিক্রিয়াশিল নেতৃত্ব, যাদের শক্তি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তারা এবং তাদের অনুগামীরা নিশ্চিতভাবেই এই উদারপন্থীদের উপর অত্যাচার করবে, নিপীড়ন চালাবে। শুধু জনগনের উপর আস্থা অটুট রেখেই তারা রাজনীতিতে নতুনভাবে লড়াইয়ের স্বপ্ন দেখছিল। শহীদ-হাশিম গ্রুপের ঢাকার কর্মীদের দ্বারাই পাকিস্তান জন্মের আগেই ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান গন আজাদী লীগ। সারা ভারত ব্যপী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বৃদ্ধি পেতে থাকায় কলকাতার মুসলমানদের অনুরোধে এবং গান্ধীর আহবানে সোহরাওয়ারদী থেকে গেলেন কলকাতায়। আবুল হাশিম বর্ধমানে। এখানে বললে অত্যুক্তি হবে না যে, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে মুসলিম লীগের মধ্যেই আলাদাভাবে সচেতন যেসব ছাত্ররা যুক্ত বঙ্গের ঢাকা ও কলকাতা কেন্দ্রিক যারা অগ্রনী ভুমিকা পালন করেছিলেন তাদের মধ্যে ঢাকার ১৪০ মোগলটুলির শামসুল হক এবং ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারন সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান উল্লেখযোগ্য। মুলত এই দুজনের নেত্রিত্বেই দুই স্থানে আন্দোলন করে। যারা বিভাগ-পূর্ব কালে কলকাতায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, মুসলিম লীগের সেইসব অপেক্ষাক্রিত তরুন উদারপন্থী ও প্রগতিশীল অন্তস্রোতের ধারক ও বাহক কর্মীরা তাদের সেই অন্তস্রোতকে বহন করে কলকাতার ৩নং ওয়েলেসলী থেকে ঢাকার ১৫০ মোগলটুলিতে নিয়ে আসেন দেশ বিভাগোত্তর কালে।

এহেন পথপরিক্রমার মধ্য দিয়েই বিশাল ভারত বরষ বিভক্ত হয়ে শুধু ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বতন্ত্র রাস্ট্রে পরিনত হলো। উদারপন্থী মুসলিম লিগ নেতারা হয়ে পড়লেন কোনঠাসা এবং তরুন কর্মীরা হয়ে পড়লেন নেতৃত্বহীন। জাতি গঠনের ইতিহাসে পাকিস্তান এক অভিনব পরীক্ষা। হাজার মেইল ব্যবধানের পৃথক দুটি ভুখন্ডের সমন্বয়ে গঠিত পাকিস্তানের পূর্বাংশের ছয় কোটি মানুষ একই ভাষাভাষী এবং পশ্চিমাংশের সাড়ে চার কোটি মানুষ বহুভাষিক। প্রত্যেক অংশের অধিবাসীদের নিজস্ব আচার ব্যবহার, ভাষা, জাতিগত সংস্কার, সচেতনতা, জলবায়ুর পারথক্য ও অন্যান্য সামাজিক কারনেই সম্পুরন স্বতন্ত্র ধরনের। ১৯৪৬-৪৭ সালের রক্তবন্যা থেকে এরকম একটু কিম্ভুতকিমাকার পাকিস্তানের জন্ম হলো।

গন আজাদী লীগের জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই গঠিত হয় গনতান্ত্রিক যুবলীগ। কিন্তু সরকার এটিকে কমিউনিস্ট সমর্থিত প্রতিস্টান ঘোষনা করে নেতাদের গ্রেফতার করতে থাকে। যারফলে বিলুপ্তি ঘটে। ইসলামী ভাব্ধারায় পুস্ট কতিপয় যুবক গঠন করেন তমদ্দুন মজলিস। পাকিস্তান জন্মের অনেক আগে থেকেই পুরব বাংলার সরকারী নাম কী হবে এবং সরকারী ভাষা কী হবে ইত্যাদি বিষয়ে বিদগ্ধ ব্যক্তিগন পত্রপত্রিকায় তাদের মতামত লিখে আসছিলেন। কিন্তু কোনোরুপ সরকারী স্বিদ্ধান্ত গ্রহনের আগেই কেন্দ্রীয় সরকারের করতাব্যক্তিরা এবং তাদের দোসরেরা বাংলা ভাষাকে রাস্ট্রীয় মরযাদা দানের বিপক্ষে মতামত উপস্থাপন শুরু করলে পুরব বাংলার ছাত্র যুবক সকলের টনক নড়ে। যার ফলে দেখা দেয় রাজনোইতিক করমসুচী প্রনয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য সংগঠনের। কিন্তু ইতিমধ্যেই মুসলিম লিগের উদার ও প্রগতিশীল তরুনেরা মুসলিম লীগের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলায় উপরন্তু মুসলিম লিগ ক্রমশ প্রতিক্রীয়াশীলদের মুতসুদ্দিতে পরিনত হওয়ায় আগের মুসলিম লীগের মধ্যে থেকে আর কোন আন্দোলন সম্ভব নয় এটা সোহরাওয়ারদী-আবুল হাশিম গ্রুপের নিন্মস্তরের করমীরাও অনুধাবন করে। এরই প্রেক্ষিতে মুসলিম লীগের সমরথনাক্রী নিখিল বঙ্গীয় মুসলীম ছাত্রলীগ তথা নিখিল পুরব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ত্যাগ করে সোহরাওয়ারদী-আবুল হাশিম গ্রুপের করমীরা বেরিয়ে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী গঠন করে পুরব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগ। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা যায়, ছাত্রলীগের বিদ্রোহী অংশের এই সাহসী পদক্ষেপ গ্রহনের মধ্য দিয়েই ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ নেতাদের বিরোধী অরথাত ক্ষমতার বাইরের মুসলিম লীগ নেতাদের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে অধিক সাহসী করে তুলেছিল। মুলত ছাত্রলীগের এই নবতর সংগঠনের জন্ম লাভের মধ্য দিয়েই নবীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যপকভাবে প্রথম বিরোধীদলীয় করমকান্ডের সুত্রপাত ঘটায়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সোহরাওয়ারদী ও আবুল হাশিমের অনুসারী এইসব উদার ও প্রগতিশীল ছাত্র তরুন মুসলিম লীগ করমীরা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর দ্বি জাতি তত্বকে কখনোই অখন্ড পাকিস্তানের আদরশিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহন করেন নি, বরং ভারতীয় মুসলমানদের ব্রিটিশ বিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের একটি কৌশলগত কাঠামো হিসেবেই গ্রহন করেছিলেন।

পরবর্তীকালে ১৯৪৭ এর আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্তির পরেই কলকাতার মুসলমানদের সেই প্রগতিশীল ছাত্র তরুনদের অংশটি শেখ মুজিবের নেত্রিত্বে ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে চলে আসে। আগেই উল্লেখ করেছি যে, ১৯৪৪ সালের ১ এপ্রিল থেকেই আবুল হাশিমের তত্বাবধানে এখানে শামসুল হক, তাজউদ্দিন আহমদ, কামরুদ্দিন আহমদ প্রমুখ প্রগতিশীল ছাত্র করমীদের সক্রিয় অংশগ্রহনে মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল গ্রুপ মাওলানা আকরাম খা- খাজা নাজিমউদ্দিন তথা আহসান মঞ্জিলের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী ধারা গড়ে উঠেছিল। পাক-ভারত বিভক্তির পরে কলকাতা থেকে শেখ মুজিবের নেত্রিত্বে তার অন্যান্য সঙ্গীরা ঢাকায় এসে এতে যোগদান করাতে সেই প্রতিবাদী ধারা আরও জোরদার হয়। উল্লেখ্য যে, ১৫০ মোগলটুলির অফিসটি খাজা নাজিমউদ্দিনের নাকের ঢগায় থাকলেও এই অফিসকে কেন্দ্র করেই প্রথমে যুবলীগ এবং পরে নবগঠিত ছাত্রলীগের রাজনীতি পরিচালনার মধ্য দিয়েই মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের সমালোচনা ও বিরোধীতা করছিলেন। এভাবেই এই অফিসটি গুরুত্বপুরন হয়ে উঠে এবং এটি ওয়ারকারস ক্যাম্প নামে অভিহিত হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, মুসলিম লীগের এই প্রগতিশীল তরুন ছাত্র করমীরা নতুনভাবে ছাত্রলীগ গঠনের আগেও পুরনো ছাত্রলীগকে অনেকটা দখলের চেস্টাই করেছিলেন, কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। কারন পাক-ভারত বিভক্তির পরপরেই পুরনো ছাত্রলীগ গোপনে সভা করে নাম বদলিয়ে নিখিল পুরব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ রাখলেও এই প্রগতিশীল গ্রুপের কাউকেই জানানো হয়নি এবং নবগঠিত কমিটিতেও রাখা হয়নি।

পুরব পাকিস্তান ছাত্রলীগ গঠনের পর থেকেই ছাত্রদের দাবি দাওয়া এবং জনগনের পাকিস্তান বাস্তবায়নের জন্য করমসুচী প্রদান করে আসছিলেন। অবশ্য এর অনেক আগে থেকেই পুরব বাংলার বুদ্ধিজীবি মহল থেকে পুরব বাংলার ভাষা বিষয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি চলছিল। তখনো এটি ছিল মুলত খবরের কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু পাকিস্তান জন্মের পর থেকে সামন্তবাদী শাসক শ্রেনীও বাংলা ভাষাকে রাস্ট্রীয়ভাবে তাচ্ছিল্য ও অবমুল্যায়ন করায় ছাত্রদের প্রধান করতব্য হয়ে উঠে ভাষার প্রশ্নে ছাড় না দেওয়া। তমদ্দুন মুসলিম ও ছাত্রলীগ এক্ষেত্রে শুরু থেকেই গুরুত্বপুরন ভুমিকা রাখতে থাকেন। কিন্তু জনগনের একমাত্র রাজনৈতিক দল, যে দলকে জনগন ভোট দিয়েছে অতীতে সেই দল এক্ষেত্রে সম্পুরন উলটো ভুমিকা রাখতে শুরু করে। এসব যৌক্তিক কারন ও প্রয়োজনেই জনগনের কন্ট হিসেবে একটি রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠে।

অপরদিকে সোহরাওয়ারদী-হাশিম গ্রুপের এই ওয়ারকারস ক্যাম্পের করমীরা মুসলিম লীগকে নতুন আঙ্গিকে কামনা করলেও দেখা যায় যে, নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নাম বদলিয়ে এবং পুরনো কমিটি বিলুপ্ত করে দেয়া হলেও এই গ্রুপের কাউকেই জানানো দুরের কথা নতুন এডহক কমিটিতেও রাখা হয়নি। অন্য কোন প্রদেশের কমিটি না ভাঙ্গলেও শুধু বাংলাদেশের কমিটি ভেঙ্গে মাওলানা আকরাম খা কে আহবায়ক নিযুক্ত করা হয়েছিল। কারন ছিল যে, সোহরাওয়ারদী-হাশিম গ্রুপের বলয় থেকে বের করে নেয়া। এরই প্রেক্ষিতে ১১২ জন কাউন্সিল সদস্যের দরখাস্তের ভিত্তিতে একটি রিকুইজিশন সভা আহবান করা হলেও সাংগঠনিক বিধানের বলে সেটিও অগ্রাজ্য করা হয়।শহীদ-হাশিম গ্রুপের পক্ষে এই দরখাস্তটি মাওলানা আকরাম খা’র হাতে অন্য কেউ নিয়ে যেতে রাজি না হওয়ায় শেখ মুজিবই নিয়ে যান। দৈনিক আজাদে দরখাস্ত এবং কেনো মেনে নেওয়া অসম্ভব সেইসব বিষয়ে বিশদ সংবাদও প্রকাশ করেন মাওলানা। এই সংবাদ প্রকাশের পর থেকে ওয়ারকারস ক্যাম্পের কেউই আর মুসলিম লীগের সদস্য না থাকায় নতুন সংগঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়।



১৯৪৯ সালের মার্চ মাস থেকেই শহীদ সোহরাওয়ারদী পশ্চিম পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে ভারত থেকে চলে যান। তিনি পশ্চিম পাকিস্তান গিয়ে দেখলেন লিয়াকত আলি খানের হাতে মুসলিম লীগের মাধ্যমে সরকারী শাসন ব্যবস্থা এবং সংগঠন দুদিকেই ধবংস অত্যাসন্ন। তিনি স্থির করলেন একটি গনতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গঠন করবেন। কিন্তু কিয়াকত আলি খান ঘোষনা করলেন, কোন বিরোধী দল বরদাশত করবেন না। এতে শহীদ সোহরাওয়ারদী আরো ক্ষেপে গেলেন। সোহরাওয়ারদী বাংলাদেশে তার পুরাতন অনুসারীদের একত্রিত হওয়ার খবর দিলেন। এই সময়েই বাংলাদেশে সোহরাওয়ারদী আসলে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্যে ঢাকায় তশরিফ আনলেন পাঞ্জাব মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি মিয়া ইফতিখার উদ্দিন, উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি মানকী শরীফের পীর সাহেব এবং আসাম মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ঠিক হল, নতুন পাকিস্তান মুসলিম লীগের সংগঠক চৌধুরী খালিকুজ্জামানকে তারা মুসলিম লীগকে একটি উদার রাজনৈতিক প্রতিস্টান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অনুরোধ করবেন। কিন্তু তিনি যদি এ প্রস্তাব গ্রহনযোগ্য হিসেবে মেনে না নেন তাহলে তারা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করবেন।

এর পরপরেই সদ্য নিরবাচিত এম এল এ শামসুল হক সাবেক মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিমের নিকট বরধমানে যান। সপ্তাহের অধিক সময় অবস্থানকালীন সময়ের পরে শামসুল হক ফিরে আসেন। আগত সম্মেলনে শামসুল হক 'মুলদাবি' শিরোনামে যে খসড়া প্রস্তাবটি পাঠ করেন সেটি আবুল হাশিমের দ্বারা প্রভাবিত বলে ধরে নেওয়া হয়।



এই সময়ে মাওলানা ভাসানীও আসাম থেকে টাঙ্গাইল এসে থাকতে শুরু করেন। তার সঙ্গে শামসুল হকের জানাশোনা থাকায় হক সাহেবই যোগাযোগ রাখেন। টাঙ্গাইলে আইনসভার দুটি আসন খালি হলে ওয়ারকারস ক্যাম্পের তরুন করমীরা ভাসানীর স্মরনাপন্ন হয়ে দুটি আসনেই প্রারথী দিতে চাইলে তিনি রাজী হননি। পরে একটি আসনে ভাসানী নিজে এবং অপরটিতে খাজা নাজিমউদ্দিন এম এল এ নিরবাচিত হলেও ভাসানি নিরবাচনী হিসাব দাখিল না করায় মাওলানার নিরবাচনই বেআইনী ঘোষিত হয়। এর আগে মাওলানা ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগারদের সঙ্গে সুসম্পরক রাখলেও এই ঘটনার পর থেকে নীতির পরিবরতন করেন। তমদ্দুন মুসলিম ও ছাত্রলীগের নেত্রিত্বে ভাষা আন্দোলনে ভাসানী সমরথন দেওয়ায় ক্রমে তিনিও এই প্রগতিশীল গ্রুপটির ভিতরে ঢুকে পড়েন। যার ফলে তরুন করমীরা পুনরায় নিরবাচনকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইলে সভা করে ঠিক করেন নারায়নগঞ্জে পরবর্তী সভা করে ভবিশ্যত করমপন্থা ঠিক করা হবে। কিন্তু নারায়নগঞ্জের সেই সভার আগে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলে স্থান বদলিয়ে পাইকপাড়া ক্লাবে সভা হয়। ভাসানীর সভাপতিত্বে এই সভার সিদ্ধান্তমতেই আতাউর রহমান খান ও বেগম আনোয়ারা খাতুন করাচী গিয়ে পাকিস্তান মুসলিম লীগের নতুন প্রধান চৌধুরী খালিকুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাত করে মুসলিম লীগকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দিলে তিনি উলটো খাজা নাজিমউদ্দিনকে সহযোগিতা করতে বলেন। যার ফলে নতুন দল গঠনের বিষয়টি বাস্তব রুপ লাভ করে।

এরই মধ্যে টাঙ্গাইলের উপনিরবাচন চলে আসে এপ্রিল মাসে। ওয়ারকারস ক্যাম্প স্বিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের প্রারথী হিসেবে তরুন নেতা শামসুল হক’কে নিরবাচনে দাড় করায়। প্রবল প্রতিপত্তিশালী ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে দলহীন কিন্তু আদরশবাদীদের এটাই প্রকাশ্য লড়াই। নবগঠিত ছাত্রলীগের করমীরা অত্যান্ত গুরুত্বপুরন ভুমিকা রাখে এই নিরবাচনে। ফলাফলে দেখা গেলো স্বতন্ত্র প্রারথী শামসুল হক নিরবাচিত হয়েছেন। এই বিজয়ের মধ্য দিয়েই মুলত প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল বাংলার ছাত্র তরুনদের বিজয়গাথা রচনার শুরু। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, এই সময়ে ভাষা আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেনীর করমচারীদের বিভিন্ন দাবী দাওয়ার আন্দোলন চলছিল সমতালে। এই সকল আন্দোলনে জনগন দেখলো যে, যারা পাকিস্তান আন্দোলনে ভুমিকা রেখেছে তারাই আবার জনগনের প্রত্যাশার দাবীতে আন্দোলন করছে। যে কারনে জন সমরথন পেতে খুব বেগ পেতে হয়নি।

ভারত ও পাকিস্তান বিভক্তির পুরব থেকেই প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ নেতাদের সঙ্গে প্রগতিশীল নেতাকরমীদের বিরুধীতার চুড়ান্ত প্রকাশ ঘটে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরপরেই। ছাত্রলীগ নতুনভাবে গঠিত হওয়া, টাঙ্গাইল উপনিরবাচনে শামসুল হকের বিজয়, ভাষা আন্দোলনে নবগঠিত ছাত্রলীগের গুরুত্বপুরন ভুমিকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেনীর করমচারীদের আন্দোলনে সমরথনদান, ক্ষমতাসীনদের অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, খাদ্য ঘটতি থেকে উত্তরনের জন্য সরকারের জবরদস্তিমুলক করডন প্রথা চালুর প্রতিবাদ, জিন্নাহ ফান্ডের নামে জোরকরে চাঁদা আদায়ের প্রতিবাদ ইত্যাদি কিন্তু মুসলিম লীগের তরুন ও প্রগতিশীল করমীরাই করছিল। ক্ষেত্রবিশেষে নবগঠিত ছাত্রলীগ শিক্ষা প্রতিস্টান কেন্দ্রীক বিষয়গুলোতে আন্দোলনে নেত্রিত্ব দিচ্ছিল। এরমধ্যে আরেকটি ঘটনা হলো এই তরুনদের আদরশিক নতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ারদীকে বাংলায় প্রবেশে সরকারী বাধা প্রদান।

সেসময়ে সরকারী দল ও নেতারাও মনে করতে থাকে যে, এই সকল বিষয়গুলোই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র। অরথাত বাংলার এই তরুন সংগ্রামী করমীদের বিদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই সকল ঘটনার প্রেক্ষিতেই ১৫০ মোগলটুলির ওয়ারকারস ক্যাম্পের করমীরা ২৩ জুন টিকাটুলির কে এম দাশ লেনে অবস্থিত রোজ গারডেনের হল রুমে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে একটি সম্মেলন হয়। যেখানে মাওলানা ভাসানীছিলেন প্রধান অতিথি। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কিছুক্ষন উপস্থিত থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষন দেন। এই সম্মেলনেই প্রাদেশিক পরিষদের টাঙ্গাইল উপনিরবাচনে নিরবাচিত তরুন এম এল এ শামসুল হক “মুল দাবী” নামক একটি লিখিত পুস্তিকায় পাকিস্তান রাস্ট্রের ভবিষ্যত, জনগনের প্রত্যাশা ইত্যাদি উপস্থাপন করেন। সারা দেশ থেকে প্রায় ৩০০ প্রতিনিধি উক্ত সম্মেলনে যোগদান করেন। এদিনেই মাওলানা ভাসানীকে সরবসম্মতিতে সভাপতি নিরবাচিত হন এবং সকলের সঙ্গে পরামশ করে ৪০ সদস্যের একটি অরগানাইজিং কমিটি ঘোষনা করেন। কমিটি ছিল নিম্নরুপঃ

সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

সহসভাপতি আতাউর রহমান খান

সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন

সহসভাপতি আলী আহম্মেদ খান

সহসভাপতি আলী আমজাদ খান

সহসভাপতি আব্দুস সালাম খান

সাধারন সম্পাদক শামসুল হক

যুগ্ম সাধারন সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান

সহ সাধারন সম্পাদক খন্দকার মোশতাক আহমদ

কোষাধ্যক্ষ ইয়ার মোহাম্মদ খান

এই সব ঘটনার প্রতিবিধান এবং রাজনৈতিক প্রক্রি্আন্দোলন করার নিমিত্তেই মুলত পুরব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সেসময়ের বিরাজমান পরিস্থিতির প্রয়োজনে যখন আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয় তখন এই সংগঠনটিকে একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠনের রুপ দিতে হয়েছিল। কেননা, পাকিস্তানী জনগনের ধরম বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে মুসলিম লীগ ইসলাম ধরমকে তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মুলত রাজনৈতিক স্বারথ হাসিল করছিল যার ধারাবাহিকতা পরবর্তীতেও ছিল। এছাড়া মুসলিম লীগ যে বিভ্রান্তিকর অবস্থার স্রিস্টি করে তা থেকে জনগন তখনো নিজেদের সম্পুরনরুপে মুক্ত করতে পারেনি। এই অবস্থায় নবগঠিত সংগঠনটিকে ধরমনিরপেক্ষতার রুপ দেওয়া ছিল সত্যিই কঠিন কাজ। এইসবের বিবেচনা থেকেই নতুন এই সংগঠনটিও রাজনীতিতে কৌশলী ভুমিকা গ্রহন করেছিল।

এক্ষেত্রে আমার লেখার শুরুতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির গোড়াপত্তনকারী ইউরোপের সঙ্গে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক দলসমুহের সাংগঠনিক দিকের অন্ত্যমিল নিয়ে দুই একটি কথা লিখেই শেষ করবো। একথা অনস্বীকারয যে, আধুনিক রাজনৈতআন্দোলনের জন্ম হয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকায়। ভারতীয় উপমহাদেশে তার প্রভাব পড়েছে মাত্র। সেই মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে প্রথম রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছিল ১৭৯২ সালে ‘রিপাবলিকান পারটি’ নামে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, এই দলটি রক্ষনশীল মনোভাবাপন্ন ছিল। যারফলে আভ্যন্তরীন দ্বন্ধ বিরোধের পরিনতিতে উদারপন্থীদের হাত দিয়ে জন্ম নেয় ‘ডেমোক্রেটিক বিপাবলিকান গোস্টীর’। এই বিরোধীরা ১৮২৮ সালের দিকে নাম পরিবরতন করে রাখেন ‘ডেমোক্রেটিক পারটি’। তারপরে গ্রিহযুদ্ধের পরে আবার ১৮৭৬ সালে রাজনীতি শুরু হলেও পুরবের দলগুলোর ধারাবাহিকতাই বহাল থাকে। অন্যান্য অনেক দলই ক্রিয়াশীল থাকলেও বিভিন্ন পরিবরতন ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে এখনো পরযন্ত প্রধান দল হিসেবে এই দুটি দলই কারযকর।

ইংল্যান্ডে ১৮৩৪ সালে ‘কনজারভেটিভ পারটি’ বা ‘রক্ষনশীল দল’ গঠিত হয়। একে টোরী পারটিও বলা হয়। উনবিংশ শতকের শেষদিকে এই দলেরই প্রগতিশীল গ্রুপ সংগঠিত হয়ে গঠন করেন ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পারটি’। ১৯০০ সালে এই দলের মধ্যে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক, গনতান্ত্রিক, ফেবিয়ান সোসাইটি, বামপন্থী গনতান্ত্রিক ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন একত্রিত হয়ে গঠন করে ‘লেবার পারটি’ বা ‘শ্রমিক দল’।

এক্ষেত্রে বলা যায়, মার্কিন ও ইংল্যান্ডের বিশেষ করে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ধারায় আমাদের এই অঞ্চলেও রাজনৈতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে। কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ প্রথমেই কোন রাজনৈতিক দল ছিল না। মুলত ছিল ব্রি্টিশদের সঙ্গে আবেদন ও নিবেদনের সংগঠন। কালক্রমে সেগুলো রাজনৈতিক দলে পরিনত হয়।

পাকিস্তান হওয়ার পরে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন হলে দেখা যায়, সেখানেও বিভিন্ন মতাদরশের ব্যক্তির সংমিশ্রন ঘটেছিল। প্রথমে সাম্প্রদায়িক কৌশল গ্রহন করলেও পরে অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ধারন করে। ধীরে ধীরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং বাংলা ভাষা ও সাংস্ক্রিতিক চেতনায় সংগঠনকে যেন পারক্রিতিক নিয়মেই পরিচালিত করে। যার ফলশ্রুতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক ও বাহক এই সংগঠনটি কালক্রমে বাংলাদেশ নামক দেশ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন থেকে যাত্রা শুরু করেছিল ক্রমান্বয়ে সেই আন্দোলন স্বায়ত্বশাসনের দাবী থেকে সেই আন্দোলনই অবশেষে এনে দিয়েছে বাঙালির আরাধনার স্বাধীনতা। সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের। ছাপ্পান্ন হাজার বরগ মাইল ভুখন্ডের রাষ্ট্রটি আমাদের প্রিয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।



বিদ্রঃ লেখাটির বানান ও অলংকরনজনিত ত্রুটির জন্য দুখিত।

মন্তব্য ১৬ টি রেটিং +৬/-০

মন্তব্য (১৬) মন্তব্য লিখুন

১| ২৩ শে জুন, ২০১২ রাত ২:১৫

তীর্থযাত্রী বলেছেন: তথ্য সমৃদ্ধ ও ইতিহাসধর্মী লেখার জন্য ধন্যবাদ।


শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
!:#P !:#P !:#P !:#P !:#P !:#P

২৩ শে জুন, ২০১২ রাত ১১:৫৬

রুমি আলম বলেছেন: ধন্যবাদ।

শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

:) :) :) :) :)

২| ২৩ শে জুন, ২০১২ রাত ২:৪৫

এস্কিমো বলেছেন: পুরোটা পড়লাম না - পরে পড়বো।

আপনার লেখার টানেই এখন ব্লগে নিয়মিত হতে হবে।

শুভ কামনা রইল।

২৩ শে জুন, ২০১২ রাত ১১:৫৮

রুমি আলম বলেছেন: ভাই লজ্জা পেলাম। আপনি সিনিয়র ব্লগার। তাই আমার লেখায় আলোচনার পাশাপাশি গঠনমুলক সমালোচনা প্রত্যাশা করি। এবং অবশ্যই ভুল ত্রুটি সংশোধনে সহযোগিতা কামনা করি।

ধন্যবাদ।

৩| ২৩ শে জুন, ২০১২ দুপুর ২:০৪

পচা শামুক বলেছেন: অসাধারন....... এমন একটি দীর্ঘ,বিশাল ইতিহাসকে এমন স্বল্প পরিসরে বাধা আসলেই একটি দুঃসাধ্য কাজ..... কাজটি করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ....

২৩ শে জুন, ২০১২ রাত ১১:৫৯

রুমি আলম বলেছেন: খুবই অনুপ্রাণিত বোধ করছি।

অশেষ ধন্যবাদ।

:) :) :)

৪| ২৪ শে জুন, ২০১২ রাত ৩:১৮

sumon3d বলেছেন:

আপনার বেশীরভাগ লেখাতেই সমালোচনা করার মত তেমন কিছু খুজে পায়না। তাই সহমত আর প্লাস জানিয়ে চলে যায়। কারো দ্বিমত থাকলে তারা সমালোচনা করুক। আমরা উপভোগ করি।

এই লেখাটা বরাবরের মত চমৎকার হয়েছে।++++++++

২৪ শে জুন, ২০১২ রাত ১০:৩৮

রুমি আলম বলেছেন: যদি সত্যি সত্যিই সমালোচনা করার মতো কিছুই না থাকে তাহলে আমার লেখার বিষয়ে আরো ভাবতে হবে মনে হচ্ছে।

ধন্যবাদ। /:) /:) /:) /:)

৫| ২৪ শে জুন, ২০১২ রাত ৩:২৬

রিস্টার্ট রিফাত বলেছেন: স্যরি ব্রো নিজের নিক ব্লকড তাই তেমন কমেন্ট করি না।আসলে মজাও পাইনা।ইটস লাইক আই লস্ট মাই আইডেন্টিটি।পোস্টে +++++ কিপ ইট আপ

২৪ শে জুন, ২০১২ রাত ১০:৩৯

রুমি আলম বলেছেন: তারপরেও এত কাঠখড় পুড়িয়ে এসেছেন আমার ব্লগে সেজন্য অশেষ ধন্যবাদ।

/:) /:) /:) /:)

৬| ২৪ শে জুন, ২০১২ রাত ৩:৫৫

রাফা বলেছেন: ভালো লিখেছেন,এস্কিমোর কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে বলতেই হোচ্ছে আপনার লেখা পড়ার জন্য হোলেও লগ ইন করতে হবে।

কিপ ইট আপ ,ধন্যবাদ।

২৪ শে জুন, ২০১২ রাত ১০:৪০

রুমি আলম বলেছেন: উত্তরটাও তাহলে একই হোক- ভাই লজ্জা পেলাম। আপনি সিনিয়র ব্লগার। তাই আমার লেখায় আলোচনার পাশাপাশি গঠনমুলক সমালোচনা প্রত্যাশা করি। এবং অবশ্যই ভুল ত্রুটি সংশোধনে সহযোগিতা কামনা করি।

ধন্যবাদ।

/:) /:) /:)

৭| ২৪ শে জুন, ২০১২ রাত ৩:৫৮

ফারজুল আরেফিন বলেছেন: +

২৪ শে জুন, ২০১২ রাত ১০:৪৫

রুমি আলম বলেছেন: ধন্যবাদ।

:( :( :(

৮| ২৪ শে জুন, ২০১২ রাত ১০:৪৯

মামুন হতভাগা বলেছেন: ভাল লাগল,শো কেসড :)

২৫ শে জুন, ২০১২ রাত ১২:৪৪

রুমি আলম বলেছেন: আমারও খুব খুউব ভালো লাগছে।

:( :( :( :( :( :(

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.