নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

https://www.facebook.com/sahadat.sahed.50এই লিংকটি থেকে বিস্তারিত জানা যাবে।

শাহাদাৎ শাহেদ

বেড়ে ওঠা লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে। গ্রামে। শহুরে হাজারো রংয়ের মধ্যেও চোখের পাতায় গ্রাম লেপ্টে আছে। স্বপ্ন নিয়ে যে তরুণরা ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছে আমি তাদের একজন। ২৪ অক্টোবর ২০১৪ সালে লেখা-লেখির জগতে প্রবেশ। ৩ জানুয়ারি ২০১৫ দৈনিক বাংলাদেশ সময়ে প্রথম ছড়া প্রকাশের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা-লেখিতে মনযোগ। মূলত ছড়া, কিশোর কবিতা, কবিতা, গল্প, ফিচার ও প্রবন্ধ লিখছি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বলতে কিছু নেই, স্বপ্ন তো অনেক রকমই দেখি। অনেকের মতো অচিন পথে হাঁটতে পছন্দ করি। শত কোলাহলের ভেতরও আমি একা। খুব সহজে করো সাথে মিশতে পারি না। ভুলো মন। স্কেপিস্ট, মানে দেয়ালে পিঠ ঠেঁকে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিপদ থেকে পালিয়ে বেড়াই। ভোজন রসিক। ইচ্ছে হলে আমাকে খাওয়ার দাওয়াত দিতে পারেন

শাহাদাৎ শাহেদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

কবিতার শরীর কবিতার ছন্দ : প্রাথমিক আলাপ

৩১ শে মার্চ, ২০১৭ বিকাল ৫:২২

অনেক অনেক আগেকার কথা। তখন, নৃতাত্ত্বিকদের মতানুযায়ী, মানুষ সভ্য হয়ে ওঠেনি। এখানে ওখানে দল দলে বাস করতো তারা। পশু শিকার করে জীবনধারণ করতো। এটাই ছিলো একমাত্র তাদের নেশা, পেশা। সমগ্র অভিজ্ঞতা ছিলো জীবন ধারণ ও টিকে থাকার লাড়াই ঘিরে। প্রকৃতির সাথে ছিলো নিবিড় সম্পর্ক। হিংস্র পশু-প্রাণী তাদের প্রধান শত্রু, এখনকার মতো মানুষে মানুষে ছোটখাটো কোন বিষয়ের জন্য পরস্পরের কোলাহলও নিশ্চই তাদের কল্পনার বিস্তর দূরে; কারণ প্রতিনিয়ত হিংস্র জানোয়ারের সাথে বেঁচে থাকার লড়াই যে তাদের লেগে-ই থাকতো। তারা কথা বলতে পারতো কি? ভাষার উৎপত্তি সংক্রান্ত ইতিহাস তো বলে তারা কথাও বলতে পারতো না প্রথম দিকে। পশু-পাখির অনুকরণে তাদের মতোই চিৎকার, চ্যাঁচামেচি করে পরস্পরের ভাব-বিনিময় করতো। প্রকাশ করার জন্য এখনকার মতো প্রস্ফুটিত ভাষা ছিলো না, তাই বলে কি তাদের মনে প্রেম-ভালোবাসা, অবেগ, অনুরাগসহ ইত্যাকার ব্যাপারগুলো ছিলো না? ছিলো নিশ্চই। প্রকৃতির সান্তান এই মানুষ প্রকৃতি থেকে ক্রমে আয়ত্ত্ব করে নিয়েছে কথা বলার ধরণ। কবে, কখন, কোথাও, কিভাবে ভাষার উৎপত্তি এটা নিয়ে কেউই নির্দিষ্ট মত দিতে পারেননি। ( যদিও ভাষা সংক্রান্ত ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাগুলো বলছে, স্রষ্টা ভাষা ব্যাতীত কোন জাতি সৃষ্টি করেননি।)

সেইসব সমাজে শিল্পী ছিলো বলেই তো আজও আমরা প্রথমদিকের মানুষের যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে পাহাড়ের গুহা, গাছের ছাল বা পাথরে বিভিন্ন পশু-প্রাণী বা নির্দেশনার চিত্র, টোটেম-চিত্র, দেখি। এগুলো যারা করেছেন তারা সেই সমাজের ‘শ্রেষ্ঠশিল্পী’ বলতে দ্বিধা নেই। কবি ছিলেন কি? ভাব, আবেগ, অনুভূতি যখন ছিলো তখন নিশ্চই সেই সমাজে কবি থাকার কথা। কিন্তু এখনকার কবিদের মতো তারা কি কোন ছন্দ-টন্দ জানতো? ছন্দ না থাকলে তো কবিতাই হয় না। আব্দুল মান্নান সৈয়দের ভাষায় বলি, “ছন্দ কবিতার জামাকাপড় নয়- ছন্দ স্বয়ং শরীর বা অবয়ব।... কবিতারই ভিতর থেকে হয়ে-ওঠা অচ্ছেদ্য অবিচ্ছেদ্য সেতু ছন্দ।” শরীর ছাড়া কোন বস্তুর কল্পনা কারা যেতে পারে কি? তারমানে দাঁড়ালো কি?- কবিতাকে ছন্দ থেকে পৃথকই করা অসম্ভব। অন্য কথায়, ছন্দই কবিতার প্রাণ। চৈতন্যহীন শরীর বা শরীরহীন চৈতন্যের মতো ছন্দহীন কবিতা বা কবিতাহীন ছন্দ কল্পনাবিলাস। ছন্দ ছাড়া কবিতার কল্পনা করেও অনেক মত পাওয়া যায়, সেখানে তারা ছন্দ নয় বরং কাব্যরসকেই প্রধান বিবেচনা করেছেন; ছন্দকে দেখেছেন কেবল অলংকার বা অনুসঙ্গ হিসেবে। সৈয়দ শামসুল হক এদেরই একজন। তিনি বলেছেন, “ছন্দটাই যে ঐকান্তিকভাবে কাব্য তা নয়। কাব্যের মূল কথাটা আছে রসে; ছন্দটা এই রসের পরিচয় দেয় অনুসঙ্গ হয়ে।” মত-দ্বিমত যা থাক এটাই সত্য যে, প্রাগৌতিহাসিক সময়ের সেসকল কবিরা ছন্দও কারুকাজেই কবিতা লিখেছেন। আচ্ছা, প্রশ্ন জাগে- কোথায় শিখলেন তারা ছন্দ? আগেই জেনেছি, প্রকৃতির সন্তান কবিরা, প্রকৃতির কোলে লালিত-পালিত হয়ে শিখেছেন প্রকৃতির কাছেই। কিভাবে শিখলেন? বলছি। তার আগে একটা গল্প শুনে নিই- ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ এমন ছোট্ট একটি লাইন দিয়ে এক কবির আবির্ভাব হয়েছিলো বিশ্ব কবিতার আসরে। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যখন তিনি লাইনটি লিখলেন তিনিও জানতেন না কবিতা কাকে বলে বা কোন-রকম ছন্দজ্ঞান তার ছিলো না। কেবল বাহিরে অঝোরধারায় বৃষ্টি নামার টাপুরটুপুর শব্দ শুনে, জল পড়ার এক মোহনীয় দৃশ্য দেখে ছন্দ গেঁথে ফেললেন আধুনিক সময়ের এই প্রকৃতির সান্তন। প্রগৌতিহাসিক সময়ের সেসব কবিরা তো প্রকৃতির আরো কাছাকাছি ছিলেন- প্রকৃতি থেকেই কি তাহলে ছন্দজ্ঞান নিলেন? হ্যাঁ, এই যে পুকুরে টাপুর-টুপুর জল পড়ার শব্দ, পাখি ডাকার মাধ্যে একটি ছন্দ, পশু-পাখি চলাচলের একটি নিজস্ব ছন্দই তো ঐসব চারণ কবির ছন্দজ্ঞানের জন্য যথেষ্ট। মানুষের সমাজিক অবস্থা, জীবন যাপনের গতিময়তার উপর ভিত্তি করে ছন্দের সৃষ্টি। মজা ব্যাপার হলো, নানাবিধ শব্দ তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্যও ব্যবহার করতো। তাহলে, এটাই ঠিক যে, প্রকৃতি থেকে তারা যে ছন্দজ্ঞানাহোরণ করেছেন সেই জ্ঞান বয়ে বেড়াচ্ছে একখনকার কবিতায় (পরিমার্জিত ও সুশৃঙ্খলিত রূপে)।

আমাদের প্রত্যাহিক জীবনযাত্রার জন্য দরকার হয় একটি ছন্দ। এর ছন্দপতন ঘটলে জীবন হয়ে পড়ে ভারসাম্যহীন, কখনো কখনো ছন্দপতনের ফলে জীবন থেকে হারিয়ে যেতে হয়। প্রাইমারি স্কুলের হেডস্যার বলতেন, ‘ঠিক মতো পড়ো নইলে জীবনের ছন্দ হারাবে।’ মানবসভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে জীবন প্রকরণ যতই বদলাক ছন্দও নিজস্ব একটি গতিপথ তৈরি করে নিয়েছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষে যতই বদল আসুক-না কেন চলার পথে ছন্দ হারায়নি বরং ছন্দের ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। রেঁনেসোর ফলে যন্ত্রময় সভ্যতার বিকাশ হলেও ছন্দ কি হারিয়ে গেছে? যায়নি তো। জীবন যেমন, জীবনের সাথে ছন্দের গতি-প্রকৃতিরও পরিবর্তন হয়েছে তেমনই। আধুনিক যন্ত্রময় জীবনব্যবস্থার একটি উদাহরণ হিসেবে ট্রেনকে দেখি- নিজস্ব ছন্দ উৎপাদন করে বয়ে চলে দূর-দূরান্তে। ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক...।

কবিতায় ছন্দহীনতা কল্পনা করা চলে না। নিত্য-নতুন ছন্দের দোলায় সৃষ্টি হতে থাকে অনর্গল। এখন দেখি গদ্য ছন্দ নামক এক চমৎকার ছন্দে, যারা ডালপালা বিস্তর, তাতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন কবিরা। এটি বাংলা ভাষার আদি ছন্দরূপও বটে। কবিতা লিখতে গিয়ে ছন্দকে অস্বীকার করেননি কেউ। আবু হাসান শাহরিয়ারও অবলীলায় তা স্বীকার করেছেন নিজস্ব আঙ্গিক থেকে, “কবিতার পাঠক কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ, তার শরীর থেকে ছন্দ খসে পড়া। সুরে-সুরে এগিয়েছে বলে গানের কদর বিশ্বের কোথাও কমেনি; বরং বেড়েছে। চিরকালের ছন্দকে নতুন ব্যঞ্জনা দিতে-পারাও কবিতার নতুনত্ব হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে।”

কৈতুহলি মন জানতে চায় আমাদের পূর্বপুরুষেরা কিভাবে ছন্দে বৈচিত্র সৃষ্টি করলেন? এমন হতে পারে, পুকুরে জল পড়ার শব্দ এক রকম, বিস্তৃন্য বনে ভাল্লুক চলার গতি এক রকম, হাতি চলার তাল অন্য রকম এভাবে প্রকৃতিতে তারা বিভিন্ন তাল-লয় পেয়েছেন হয়তো। তাই দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন কবির কবিতা পড়লে ছন্দেরও ভিন্ন ভিন্ন দোল পাওয়া যায়। আধুনিক সময়ের লেখকদের মধ্যেও সেটি লক্ষ্য করি। যেমন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা পড়ে মনে হয় এ-যেন খই ফুটছে, আল মাহমুদের কবিতা পড়লে মনে হয় নিঝুম বনে দস্যি হরিণছানা এঁকেবেঁকে ছুটছে বনের এদিক ওদিক, জয় গোস্বামীর কবিতা পড়লে মনে হয় লক্ষ্যহীন ছাগলছানা ছুটছে তিড়িংবিড়িং, ফারুক নওয়াজের কবিতা পড়লে মনে হয় শান্ত ভাল্লুক খাবার খেতে খেতে নীবর বনে ছুটছে অচিন্ত মনে। কবির প্রত্যেক কবিতায় ছন্দের একটা ব্যঞ্জনা থাকা চাই। কিন্তু লেখার সময় কি এতো ছন্দভেবে লিখেন কোন কবি? না তো। একটি ভাব যখন মনে উঁকি দেয় তখন লিখতে বসে যান। তিনি লিখেন নিজের মতো। প্রকৃতির সন্তান কবির নিজের ভেতর থেকে ভাবটা একটা নির্দিষ্ট গতিপথ তৈরি করে বেরিয়ে আসে। তাই কবির সবচে বিশ্বস্থ বন্ধু নিসর্গ। আচ্ছা, কবি প্রকৃতির সন্তান তাই তার লেখা আসার সময় তেমন কোন ছন্দ বয়ে নিয়েই ভূমিষ্ট হবে মানলাম, কিন্তু যে কবিদের কবিতার বিষয় প্রধানত নিসর্গ নয় সংগ্রাম, মানবতার আত্নানদ ইত্যাদি ইত্যাদি, তাদের কি তাহলে ছন্দ আসে না? আসে তো। নজরুল, সুকান্তদের কবিতার দিকে তাকাই- “লাথি মার ভাঙরে তালা...” এই যে কবিতা এর কথাতে কি শুধু তালা ভাঙার কথা বলে নাকি ছন্দর লয়টাও এমন যে লাথি দিলে তালাভাঙার আওয়াজ হচ্ছে ছন্দের ভেতরে ভেতরে? আবার জীবনানন্দ যখন বলেন, “বহুদূর পথ হাটিতেছি আমি, সিংহল সমুদ্র হলে নিশিথের অন্ধকারে মালয় সাগরে...” তখন এখানে ছন্দ এমন যেন পাঠক নিজেই বহুদূর হেঁটে এসেছেন। ছন্দ কিভাবে একটি কবিতার ভেতরে প্রাণচঞ্চল কোরে তুলতে সামর্থ এগুলো তারই উদাহরণ। সেজন্যই আব্দুল মান্নান সৈয়দের মতো নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও অবলীলায় বলে দিলেন ‘ছন্দ কবিতার প্রাণ’ । আল্লাহর নির্দেশে ফেরেস্তারা মাটি থেকে আদমকে তৈরি করে রেখে দিলেন, আল্লাহ একটু ফুঁকে সেই মাটির ভেতর রুহ সঞ্চার করেছেন বলেই তো আদম নড়াছড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। শব্দ দিয়ে কবিতার একটা শরীর বানানোর পর ছন্দ হলো সেটাতে রুহের শামীলও। আগে শব্দ দিয়ে গেঁথে পরে তাতে ছন্দের রুহ দেয়া যায় না, একটি সুসংহত ভাব মনে আসলে তাতে একটা ছন্দ আপনাতেই তৈরি হয়। কবি সেটি প্রকাশ করেন। রবীন্দ্রনাথ বলেন, “শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ছন্দ আছে ভাবের বিন্যাসে, সে কানে শোনবার নয়, মনে অনুভব করবার। ভাবকে এমনভাবে সাজানো যায় যাতে সে কেবলমাত্র অর্থবোধ ঘটায় না, প্রাণ পেয়ে ওঠে আমাদের অন্তরে।” আদিতেও এমনই করতেন চারণ কবিরা। তখন অবশ্য ছন্দ বিষয়ে তাদের এতো মাপজোপ ছিলো না। তারা লিখতেন নিজস্ব ছন্দে। বাংলা কবিতার কথাই ধরি, আদিকালপর্বের একমাত্র নিদর্শন, চর্যপদের (৮ম থেকে ১২শ খ্রি.) বৌদ্ধ দোহার গানগুলো শ্রীহরপ্রসাদ শাস্ত্রী উদ্ধার করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ এগুলোর ছন্দ-তাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, এগুলো প্রধানত মাত্রাবৃত্ত ছন্দের। চর্যার কবিরা ছন্দে কবিতা রচনা করলেও ছন্দের শাস্ত্রীয়জ্ঞান ছিলো না তাদের। শাস্ত্রীয়চর্চা হচ্ছে কেবল গত শ খানেক বছর ধরে। এটাই স্বাভাবিক। ছন্দ রচনা ও ছন্দশাস্ত্র আলাদা জিনিস। বিভিন্ন ছন্দরীতি, প্রবণতা, নকশার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিজ্ঞান সম্মত ব্যাখ্যা হয়েছে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে প্রবোধচন্দ্র সেন হয়ে আব্দুল কাদির, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীসহ ইনাদের মাধ্যমে এই ছন্দশাস্ত্রটি পরিস্ফুটিত হয়েছে। কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, পৃথিবীর সব ভাষার ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেছে যে, দীর্ঘ একটা সময় ধরে কাব্যে চর্চিত ছন্দকে বিচার-বিশ্লেষণ করে নিয়মতান্ত্রিক একটি বৈজ্ঞানিকরূপ দেয়া হয়েছে। প্রাচীন ভাষাগোষ্ঠীর অন্যতম ইংরেজি বা গ্রীকাঞ্চলের সাহিত্যে এই ছন্দ কেমন ছিলো? বুদ্ধদেব বসুকে উদ্ধৃতি করা যাক, “পুরানো অ্যাংলো-স্যাক্সন কবিতায় একটিমাত্র আনুপ্রাসিক ছন্দ পাওয়া যায়, কিন্তু তার চেয়েও প্রাচীন গ্রীক ও সংস্কৃত কাব্যে ছন্দোবৈচিত্র্যের কথা সর্বজনবিদিত।”

একজন নবীন কি আগে ছন্দের পাঠ নেবে নাকি কবিতা লেখা শুরু করবে? এমন প্রশ্ন হরহামেশাই শোনা যায়। আগে তো যেভাবে ভাবটা ভেতর থেকে আসে সেভাবে লিখতে হবে। পাশাপাশি, ছন্দের খুটিনাটি শিখে নিতে হবে। অবজ্ঞা করে গদ্য ছন্দকে একমাত্র পাথেয় করলেও সেটা বোকামি বৈ কিছু নয়। কিংবা যেমন তেমন লিখে তাকে গদ্যছন্দ দাবি করা বালখিল্য বৈ কিছু নয়। কারণ গদ্যছন্দও একটি ছন্দ এবং এর নিয়ম-কানুন জানা থাকাই একজন প্রকৃত শক্তিমান সৃজনশীল কবির পরিচায়ক। এই সময়ে ছন্দজ্ঞান ব্যতীত কবিতা লেখা বোকামির নামান্তর। আল মাহমুদ বলেছেন, “কবিতা যে অঙ্কবাহিত নিয়মে চলে এটা অল্প বয়সে অনেক তরুণ কবি বুঝতে চান না। তারা ভাবেন, তারা স্বেচ্ছাচারী গদ্যে যা কিছু রচনা করেন সেটাই কবিতা। কিন্তু কবিতা চিরকালই ছন্দ ও মিলের মুখোপেক্ষী। ছন্দ উত্তমরূপে না জেনে যারা গদ্যে কবিতা সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়, তারা গদ্য ভাষাকে এলামেলো করে দেয়। তাতে রস সঞ্চার করতে পারে না। কবি হওয়ার প্রথম শর্তই হলো, তাকে উত্তমরূপে বাংলা ভাষার প্রচলিত ছন্দে সিদ্ধহস্ত হতে হবে।”

কবিতা তো একটা শিল্প, একটা সৈন্দর্য। সৃষ্টির সব সুন্দরই একটা নির্দিষ্ট নিয়ম আছে, নিয়মমাফিক নন্দনে আছে অপার শক্তিময়তা। যা অন্যকে আন্দলিত করে, ক্ষিপ্ত করে, কাঁদায়, হাসায়। কবিতার ছন্দ যে-নিয়মে সৃষ্টি হয়েছে, বিশ্বের সকল সৌন্দর্যই সেই-নিয়মে সৃষ্টি। একটা সুনির্দিষ্ট বন্ধনের মধ্য দিয়ে বেগ প্রবাহিত হয়ে মনে আঘাত সৃষ্টি করে বলেই সৌন্দর্যের এমন অনিবার্য শক্তি। কবি তার কবিতার ধ্বনিগুলোকে যে সুশৃঙ্খল বিন্যাসে বিন্যস্ত করেন তাতে এক বিশেষ ধ্বনিসুষমা তৈরি হয়, যার ফলে কবিতাটি পড়ার সময় পাঠক এক ধরণের ধ্বনিমাধুর্য উপভোগ করেন, ধ্বনির সেই সুশৃঙ্খল বিন্যাসকেই ছন্দ বলা হয়। ছন্দ হলো একটা শব্দের সাথে আরেকটা শব্দের সুবিন্যস্ত বন্ধন। রবীন্দনাথ এই বন্ধনকে “কেবল বাইরের বাঁধন, অন্তরে মুক্তি” হিসেবে দেখেছেন। তিনি বলছেন, “কথাকে তার জড়ধর্ম থেকে মুক্তি দেবার জন্যই ছন্দ। সেতারের তার বাঁধা থাকে বটে কিন্তু তার থেকে সুর পায় ছাড়া। ছন্দ হচ্ছে সেই তার বাঁধা সেতার, কথার অন্তরের সুরকে সে ছাড়া দিতে থাকে।”

আগেই আমরা বলেছি, ছন্দের শাস্ত্রীয় আলোচনার বয়স সবে শ পেরুলেও বাংলা কবিতার প্রায় দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে এর ব্যবহার শুরু থেকেই। এই দীর্ঘ-সময়ের কবিতাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রবোধচন্দ্র সেন বাংলা কবিতার ছন্দকে পাঁচ রকম দেখেছেন- স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত, গদ্যছন্দ ও মিশ্রছন্দ। আব্দুল মান্নান সৈয়দ এই পাঁচ ধরণের ছন্দের প্রথম তিন প্রকারকে ‘মৌল ছন্দ’ বলেছেন। প্রসঙ্গত, ছন্দের উপরিউক্ত নামকরণ প্রবোধচন্দ্রসেনের দেয়া। পরে অবশ্য তিনি এগুলোকে অবৈজ্ঞানিক নাম উল্লেখ করে নতুন নামকরণ করেন- দলবৃত্ত, কলাবৃত্ত ও মিশ্রবৃত্ত। নামকরণের ক্ষেত্রে ছন্দবিশারদদের মতপার্থক্য দেখা যায়। বিতর্ক যা-ই থাক সর্বজন পরিচিতি স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত নাম নিয়েই আমরা আলোচনা করতে চাই। এখানে স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের বিস্তারিত আলোচনার পর অক্ষরবৃত্তের প্রাথমিক আলোচনা করবো; কেননা, অক্ষরবৃত্ত একটি বৈচিত্রপূর্ণ ছন্দ প্রকরণ। এবং এর আলোচনা নতুন দীর্ঘ কোন পরিসরের দাবি রাখে।

স্বরবৃত্ত : রবীন্দ্রনাথ স্বরবৃত্তকে বলেছেন লোকছন্দ, প্রবোধচন্দ্র দলবৃত্ত ছন্দ, বুদ্ধদেব ছড়ার ছন্দ, অমূল্যধন শ্বাসাঘাতপ্রধান ছন্দ, সুধীন্দ্রনাথ স্বরান্তিক ছন্দ। বাংলা ভাষা ও বাঙালির ধ্বনি উচ্চারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছন্দ হচ্ছে স্বরবৃত্ত ছন্দ। চলিত বা প্রাকৃত বাংলার স্বভাব রক্ষা করে এ ছন্দের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে। সুতরাং ছন্দটি সাধু বাংলার বাইরে বাউল গানে, লোককথায় ও ছড়ায় বহুল ব্যবহৃত। উচ্চারণে দ্রুততা ও সবলীলতা স্বরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম। প্রতি পর্বের প্রথমে প্রবল শ্বাসাঘাত যেমন এ ছন্দের দ্রুততার প্রধান কারণ, তেমনি শ্বাসাঘাতের শক্তিই একে করে তুলেছে সবল ও প্রাণবান। আবার স্বরবৃত্ত ছন্দের প্রধান পর্ব যেহেতু চার মাত্রার এবং তার পরেই থাকে একটি ক্ষুদ্র পর্ব, সেজন্যও এ ছন্দ দ্রুত উচ্চারিত হয়। রবীন্দ্রনাথই একে প্রথম সুনির্দিষ্ট চার মাত্রার পর্বে ভাগ করেছেন এবং ছন্দ হিসেবে একটি বৈজ্ঞানিক নকশা দিয়েছেন। চার মাত্রার চাল হলেও মাঝে মাঝে কম বেশি করার রীতি রয়েছে এতে। আব্দুল মান্নান সৈয়দ বলেন, “স্বরবৃত্তের চার মাত্রার পর্বভাগের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ তিন কি পাঁচ মাত্রার পর্ব ব্যবহার করে কবিরা একটি মুক্তির আস্বাধ গ্রহণ করেন।”

মাত্রাবৃত্ত : রবীন্দ্রনাথ একে ব্রজবুলি-ভাঙা ছন্দ বলেছেন, প্রবোধচন্দ্র কলাবৃত্ত, অমূল্যধন ধ্বনিপ্রধান, সুধীন্দ্রনাথ বলেছেন মাত্রিক ছন্দ। রবীন্দনাথই এই ছন্দের প্রকৃত প্রবর্তক। তারপূর্বে এই ছন্দের ভাঙাচোরা উদাহরণ থাকলেও রবীন্দ্রনাথই তার মানসী (১৮৮৭-৯০) কাব্যগ্রন্থে এই ছন্দের সফল ব্যবহার করেছেন। মাত্রাবৃত্ত বড়োবেশি মাপা-গাঁথা ছন্দ। পর্বদৈর্ঘ্য অনুযায়ী পূর্ণপর্ব চার, পাঁচ, ছয় বা সাত মাত্রার এ-ছন্দে স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল উচ্চারণভঙ্গি ফুটে ওঠে এবং এতে শক্তি বা সুরের স্বাভাবিক প্রকাশ না হয়ে কেবল মাত্রারই প্রাধান্য প্রতিফলিত হয়; এ কারণে অনেকে একে দুর্বল ছন্দ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জীবনানন্দ তো মাত্রাবৃত্ত ছন্দ নিয়ে রীতিমতো বিরক্তিই প্রকাশ করেছেন, “এ যুগের অবাদ উচ্ছৃঙ্খলতা দমন করবার জন্যে সর্বব্যাপী নীপিড়নের যে পরিচয় পাওয়া যায় সমাজ ও রাষ্ট্রে- সেইটে কাব্যের ছন্দালোকে নিঃসংশয়রূপে প্রতিফলিত হলে মাত্রাবৃত্তমুক্তকের জন্ম হয় কিনা ভেবে দেখা যেতে পারে। যদি হয় এবং কবিতার ছন্দ যদি যুগের নাড়ি-মূলের নির্দেশ দান করে, তাহলে এরকম মুক্তকে প্রচুর কবিতা আশা করা যায়।” প্রসঙ্গত, জীবনানন্দ ব্যবহৃত ‘নাড়ি-মূলের নির্দেশ দান’ শব্দগুচ্ছ ইতোপূর্বে আমাদের আলোচিত ছন্দের উদ্ভব সম্পর্কিত কল্পনা বিলাসের সত্যায়ন করে। জীবনানন্দের কথার সত্যতা মিলে আমাদের বিদ্রোহী কবির দিকে তাকালেও, কেননা কাজী নজরুল ইসলামের প্রিয় ছন্দ ছিলো ছয় মাত্রার মুক্তক মাত্রাবৃত্ত ছন্দ। মাত্রাবৃত্তের মাত্রাশৃঙ্খলের গাঁথুনিতে কবিতা লিখে উপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তির গান ধরেছিলেন এই কবি।

অক্ষরবৃত্ত : রবীন্দ্রনাথ অক্ষরবৃত্তকে বলেছেন সাধু ছন্দ বা পয়ারজাতীয় ছন্দ, সুধীন্দ্রনাথ আক্ষরিক, বুদ্ধদেব পয়ার, প্রবোধচন্দ্র অক্ষরবৃত্ত, যৌগিক, মিশ্রকলাবৃত্ত বা মিশ্রবৃত্ত ছন্দ বলেছেন। এটি বাংলা কবিতার আদিমতম ও প্রধানতম ছন্দ। তাই তো দিলিপকুমার রায় মন্তব্য করেছেন, স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের যতই গুণগান করা হোক- তাদের আরো অনেকখানি বিকাশ না হলে অক্ষরবৃত্তের সঙ্গে তারা পাল্লা দিতে পারবে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এখনো বাংলা ছন্দরাজ্যের ছত্রপতি অক্ষরবৃত্ত ছন্দ। স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের তুলনায় এ ছন্দের উচ্চারণ অধিকতর স্বাভাবিক এবং গদ্য উচ্চারণভঙ্গির অনুসারী বলেই এটি বাংলা কাব্যের প্রধান ছন্দে পরিণত হয়েছে। অক্ষরবৃত্ত শ্বাসাঘাতপ্রধান নয়, তানপ্রধান ছন্দ। তান হচ্ছে স্বরধ্বনি বা সাধারণ উচ্চারণের অতিরিক্ত টান, যা এ ছন্দে পর্বগত দীর্ঘতার জন্য প্রযুক্ত হয়। মধ্যযুগে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে সুর একটি বড়ো বৈশিষ্ট ছিলো। পনেরো শতকে বাংলা সাহিত্যে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রামায়ণ ও মহাভারত অনুবাদের কারণেই এতে সুর সংযোজিত হয়। অবশ্য উনিশ শতকে অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে এ ছন্দের সুরমুক্তি ঘটে। বাংলা সাহিত্যে অক্ষরবৃত্ত ছন্দ একটি স্থিতিস্থাপক ছন্দ, যা মধ্যযুগের বিভিন্ন সময়ে পর্বগত সংকোচন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিভিন্ন কবির হাতে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। পয়ার হচ্ছে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ৮/৬ মাত্রার বৈশিষ্টপূর্ণ একটি শ্রেণীবিভাগ। পয়ারের পর্ব-সম্মতি প্রকাশিত নয়, বরং অন্তর্গত বলে দ্রুততা ও চাপল্য বর্জিত এবং তা গুরুগম্ভীর মহাকাব্য ও বস্তুনিষ্ঠ জগৎ-জীবন রূপায়ণে অধিক উপযোগী। বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত কাব্যসমূহ রূপায়ণের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে এই ছন্দে। পয়ার ছন্দেরই একটি বিবর্ধিত রূপের নাম হচ্ছে মহাপয়ার। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, “মধুসূদন বাংলা কাব্যে বিষয়ভাবনার পাশাপাশি ছন্দের ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনয়ন করেছেন। তার প্রবর্তিত ছন্দের নাম অমিত্রাক্ষর ছন্দ।... এ ছাড়া মধুসূদনের চতুদর্শপদী কবিতাবলির ছন্দও প্রচলিত পয়ার ছন্দেরই এক নতুন রূপ। মধুসূদনের পূর্বে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর এবং পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ও কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা ছন্দের নবতর রূপ নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।”

মৌলিক তিন প্রকার ছন্দ-পরিচয়ের পর বাংলা কবিতায় ছন্দ ব্যবহারের বিজ্ঞান আমাদের আলোচ্যবিষয়। এখানে যথাসম্ভব সহজে আমরা ছন্দব্যবহার সংক্রান্ত নীতি নিয়ে কথা বলার প্রয়াস পাবো। সাহিত্যের ভেতরও কিভাবে গণিত অর্থাৎ বিজ্ঞান ব্যবহার হয় তা জানবো। সাহিত্য হলো শিল্প। শিল্প সর্বদা স্বতস্ফূর্ত ভাব, অভিজ্ঞতা, অনুভূতির প্রকাশ। অন্যদিকে বিজ্ঞান হলো কোন কিছুর পরীক্ষণ- মাপা পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় বিজ্ঞানে। তাহলে সাহিত্য ও বিজ্ঞান কি-করে এক হতে পারে? এক্ষেত্রে আব্দুল মান্নান সৈয়দ এর জবাব অত্যন্ত চমৎকার। তিনি বলেন, বিশ্বসৃষ্টির সমস্ত স্বতস্ফূর্তির মধ্যে যেমন নিয়মের একটা ধারা বইছে, তেমনি কবিতা ও শিল্পকলার ভেতরে ভেতরে চলেছে নিয়মের নিহিত নদী। সেই নিয়মের ধারাকেই তিনি কবিতার বিজ্ঞান তথা ছন্দ ও রূপপ্রকল্প হিসেসে চিহ্নিত করেছেন। এই পর্যায়ে ছন্দের গঠন নিয়ে আলোচনা করবো- আমরা যথাসম্ভব সরল করে প্রথমে ছন্দ সংক্রান্ত কয়েকটি কলাকৌশল শিখে নিতে চাই। যেমন- দল, যতি, মাত্রা, পর্ব- আপাতত এই কয়েকটি জানা-ই যথেষ্ট।

দল : ইংরেজিতে যাকে সিলেবল বলে বাংলায় সেটি দল। একটি শব্দের যতটা অংশ একবারে উচ্চারণ করা যায় তা-ই দল বা শব্দাংশ। যেমন- ‘বই’ দুটি শব্দের উচ্চারণ একত্রেই হচ্ছে, বিধায় এখানে একটি দল। ‘ছন্দ’ ছন্+দ, এখানে দুই দল। ‘ইংরেজি’ ইং+রে+জি, এখানে তিন দল। মনে রাখতে হবে, অক্ষর আর দল এক নয়। একাধিক অক্ষর নিয়েও একটি দল হতে পারে, দল উচ্চারণের সাথে সম্পর্কিত। যতটা উচ্চারণ একবারে কারা যায় ততোটা মিলে একটি দল। দল দুই রকম- ১. মুক্ত দল ২. রুদ্ধ দল। উদাহরণের মধ্যেমে স্পষ্ট হওয়া যাক- নজ্+রুল, এখানে দুটিই রুদ্ধদল। ঢা+কা, এখানে দুটাই মুক্তদল। ছন্+দ, এখানে ছন্ রুদ্ধদল, দ’টা মুক্তদল। যেখানে নিঃস্বাস থেমে যায় সেটা রুদ্ধদল আর যেখানে থামে না সেটি মুক্তদল। ছন্দের ক্ষেত্রে চোখে দেখা বা বর্ণ গোনায় কিছুই নেই, কানই আসল। কানই ছন্দের নির্ধারক।

যতি ও পর্ব : উচ্চারণে বিরতি পড়ার মাধ্যমে যতির সৃষ্টি। যে কোন একটি লাইন উচ্চারণে আমরা লাইনটি শেষে পুরোপুরি থামতে হয়, কখনও কখনও পড়ে যাওয়ার মধ্যেই হালকা একটা শ্বাসের বিরতি ঘটে কখনও-বা তারচেও হালকা বিরতি হয় শব্দের পর। এই তিন ধরণের বিরতির কারণে যতিও তিন ধরণের- ১. পূর্ণযতি ২. অর্ধযতি ৩. লঘুযতি। উচ্চাণের ক্ষেত্রে যখন পুরোপুরি থামতে হয় তখন পূর্ণযতি সৃষ্টি হয়। পূর্ণযতির মধ্যে ক্ষণিক থামতে হলে তাকে বলে অর্ধযতি আর অর্ধযতির মধ্যে লঘু বা ক্ষণিক থামতে গেলে তৈরি হয় লঘুযতি। যেমন-
তখন। সত্যি ॥ মানুষ। ছিলাম ॥ এখন। আছি ॥ অল্প।

এখানে ‘অল্প’ শব্দের পর পুরোপুরি থামতে হয় বিধায় এটি পূর্ণযতি। আর ‘সত্যি’, ‘ছিলাম’, ‘আছি’-ও পর কিছুটা বিরতি দরকার হয় তাই এখানে অর্ধযতির উৎপত্তি এবং ‘তখন’, ‘মানুষ’, ‘এখন’-এ ক্ষণিক থামতে হয় তাই এখানে লঘুযতির সৃষ্টি হয়েছে। ছন্দ সৃষ্টিতে যতিজ্ঞান থাকাটা অবশ্যক। যথাযত স্থানে যতি টের না পেলে ছন্দবিভ্রাট ঘটবে।

এবার পর্ব নিয়ে আলোচনা করা যাক। সোজা কথায়, যেখানে যেখানে লঘুপর্বের সৃষ্টি হয়েছে সেখাই একটি করে পর্ব তৈরি হয়েছে। পর্ব আবার তিন ধরণের- ১. পূর্ণ পর্ব ২. অপূর্ণ পর্ব ও ৩. অতিপর্ব। যেমন-
ঐ খানে তোর। দাদির কবর। ডালিম গাছের। তলে।
এখানে প্রতিটি ( । ) চিহ্নের মধ্যের শব্দ সমষ্টিই এক একটি পর্ব (ঐ খানে তোর, দাদির কবর, ডালিম গাছের)। আর ‘তলে’ অপূর্ণ পর্ব। এবার অতিপর্ব দেখা যাক-
আমি। বিশ্ব ছাড়ায়ে। উঠিয়াছি একা। চির উন্নত। শির!
এখানে ‘আমি’ অতিপর্ব বাকিগুলো আগের মতন পূর্ণপর্ব ও অপূর্ণপর্বের উদাহরণ।

মাত্রা : আমরা জেনেছি দল দুই প্রকার এবং ছন্দ তিন প্রকার। মুক্তদল তিন প্রকার ছন্দে-ই ১ মাত্রা হিসেবে গণনা করা হয় কিন্তু ছন্দভেদে রুদ্ধদল ভিন্ন ভিন্ন রকম। যেমন- স্বরবৃত্ত ছন্দে এক মাত্রা; মাত্রাবৃত্ত ছন্দে দুই মাত্রা এবং অক্ষরবৃত্তে শব্দের প্রথমে ও মধ্যে থাকলে একমাত্রা, শব্দের শেষে থাকলে দুই মাত্রা, একক কোন শব্দ রুদ্ধদল হলে তাকে দুইমাত্রা হিসেবে গণনা করা হয়। সাধারণত অক্ষরবৃত্তে আট ও দশ মাত্রার মাত্রাবৃত্তে চার, পাঁচ, ছয়, সাত ও আট মাত্রা এবং স্বরবৃত্তে চার মাত্রার এক-একটি (পূর্ণ) পর্ব গঠিত হয়। মনে রাখা জরুরী যে, ছন্দ সর্বদা পর্ব সমতা চায় অর্থাৎ প্রতিপর্বে সমান পর্ব গঠন করতে হয়। গদ্যছন্দে এসবের দরকার পড়ে না। উদাহরণে মাত্রা বিষয়ে পরিষ্কার জ্ঞান লাভ করা যাক।

১.স্বরবৃত্ত :
। - । - - ।।
খোকন খোকন । ডাক পাড়ি।
। - । - - ।।
খোকন মোদের । কার বাড়ি।

উপরের (। ) চিহ্নটি মুক্তদল ও (-) চিহ্নটি রুদ্ধদল বোঝাতে ব্যবহার করেছি। আগেই জেনেছি মুক্তদল সব ছন্দে একমাত্র হবে। আর স্বরবৃত্তে রুদ্ধদলও একমাত্রা গণনা করা হয়। স্বরবৃত্তে পূর্ণপর্বের গঠন নির্দিষ্টভাবে চার মাত্রারই হয়ে থাকে। অপূর্ণ পর্বের গঠন ১ থেকে ৩ পর্যন্ত যে কোন রকম থাকতে পারে, না-ও থাকতে পারে। এবার উপরের গঠনটি মিলিয়ে নিই, ‘খোকন’-এ মুক্তদল+রুদ্ধদল=২, ‘খোকন’-এ মুক্তদল+রুদ্ধদল=২, ‘ ডাক’-এ একটি রুদ্ধদল=১, ‘পাড়ি’-তে মুক্তদল+ মুক্তদল=২ মাত্রা। পরের লাইনও এমনই। তাহলে পর্বভিত্তিক মাত্রার হিসেবটা দাঁড়ায় ৪+৩,৪+৩। ঠিক এভাবে আমরা নিচের কয়েকটি উদাহরণ মিলিয়ে নেবো।


ক. আকাশ ভরা তারার মেলায় পূর্ণিমা চাঁদ হাসে
নিঝুম রাতে পরির মেয়ে নাচতে ভালোবাসে।
৪++৪+৪+২(শাহাদাৎ শাহেদ)

খ. আব্বু বলেন পড় রে সোনা আম্মু বলেন মন দে
পাঠে আমার মন বসে না কাঁঠালচাপার গন্ধে।
৪+৪+৪+২(আল মাহমুদ)

স্বরবৃত্ত সাধারণত চার মাত্রার পূর্ণপর্ব গঠনের পক্ষপাতী হলেও এর ব্যাত্যয় ঘটেছে ‘লোকছড়ার ছন্দ’ নামক এই ছন্দে। রবীন্দ্রনাথসহ পরবর্তী সকল গুরুত্বপূর্ণ কবির কবিতায় দেখা যায়, চার মাত্রা কোথাও কোথাও তিন বা পাঁচ হয়ে গেছে। যদিও প্রবোধচন্দ্র ও আবদুল কাদির মনে করেন এই রকম কম বেশির ফলে ছন্দ পতন ঘটে তথাপি বুদ্ধদেব বসু, আব্দুল মান্নান সৈয়দ ছাড়া অনেক সাহিত্য সমালোচক এতে দোষের কিছু দেখেন না। আব্দুল মান্নান সৈয়দ তো বলেই দিয়েছেন, মাত্রাবৃত্তে ও অক্ষরবৃত্তে যেমন কবিরা মাঝে মাঝে নিয়মের হেরফের করে ‘মুক্তির স্বাধ’ গ্রহণ করেন তেমনি স্বরবৃত্তে-ও তিন বা পাঁচ মাত্রার ব্যবহার করে কবিরা শৃঙ্খল ভাঙার স্বাধ গ্রহণ করেন। স্বরবৃত্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, পর পর তিনটি রুদ্ধদল হলে হলে তাকে চার মাত্রা গণনা করা হয় কিন্তু পর পর না হয়ে (যেমন, রুদ্ধ+রুদ্ধ+মুক্ত+রুদ্ধ) এমন হলে তাতে দোষ নেই। সব কথার শেষ কথা, ছন্দের যথাযততা বা ছন্দ পতন কানের উপর নির্ভর করে। এই নিয়মতান্ত্রিক স্বরৃত্ত ছন্দের বাহিরের আরও দুই প্রকার স্বরবৃত্ত রয়েছে, ১. স্বরমাত্রিক ২. অক্ষরমাত্রিক। প্রবোধচন্দ্রের দাবি অনুযায়ী, সত্যেন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলাল এই ছন্দে ‘দৃঢ়তা ও বলিষ্ঠতার’ পরিচয় দেখিয়েছেন।

২. মাত্রাবৃত্ত :
- । । - । - । - । - । - । ।
এইখানে তোর ॥ দাদীর কবর ॥ ডালিম গাছের ॥ তলে ।
। - । - । । । । । । - ।। - । ।
তিরিশ বছর ॥ ভজায়ে রেখেছি ॥ দুই নয়নের ॥ জলে।

স্বরবৃত্তের ক্ষেত্রে যেমনটি জেনেছি, (-) চিহ্নটি রুদ্ধদল এবং (। ) চিহ্নটি মুক্তদলের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে এখানেও। আর মুক্তদল মাত্রাবৃত্ত ছন্দেও একমাত্রা গণনা করা হবে এবং রুদ্ধদলকে মাত্রাবৃত্তে দুই মাত্রা গণনা করা হয়। এবং এখানে পূর্ণপর্ব গঠন চার, পাঁচ, ছয় ও সাত পর্যন্ত হতে পারে। অপূর্ণ পর্বের গঠন ১ থেকে ৩ পর্যন্ত যে কোন রকম থাকতে পারে, না-ও থাকতে পারে। এবার উপরের উদাহরনটির দিকে তাকাই- ‘ওইখানে তোর,-এ রুদ্ধদল+মুক্তদল+মুক্তদল+রুদ্ধদল (২+১+১+২=৬); ‘দাদীর কবর,-এ মুক্তদল+রুদ্ধদল+মুক্তদল+রুদ্ধদল (১+২+১+২=৬) ‘ডালিম গাছের,-এ মুক্তদল+রুদ্ধদল+মুক্তদল+রুদ্ধদল (১+২+১+২=৬) ‘তলে’ মুক্তদল+মুক্তদল (১+১=২)। এবার পুরো বাক্যের মাত্রাবিন্যাস দেখি- ৬+৬+৬+২, এখানে পূর্ণ পর্ব ৬ মাত্রা ও অপূর্ণ পর্ব ২ মাত্রা। আমরা জেনেছি, মাত্রাবৃত্তের পূর্ণমাত্রার গঠন ছয় ছাড়াও চার, পাঁচ, সাত মাত্রার হতে পারে। নিচের উদাহরণগুলো ক্রমান্বয়ে তা দেখবো-

ক. দূরে থাকা ছোট ঐ ভূগোলের ম্যাপ
মন মাঝে ছিটে দিলো স্বপ্ন প্রলেপ।
৪+৪+৪+২ (শাহাদাৎ শাহেদ)

খ. ঝরুক পাতা পুরনো পাতা হলুদ পাতা ঝরুক
বীজের মুখে সবুজ কুঁড়ি অবুঝ পাতা পড়ুক।
৫+৫+৫+৩(আল মাহমুদ)

গ. যখন ফুলে ওঠে আঁচলে ঢেউ তুলে হাওয়ার অভিমান,
তখন মানি তোরে সুতনু তরণীর সাগর অভিযান।
৭+৭+৭+১(বুদ্ধদেব বসু)

ঘ. শ্রাবণ গগণ ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে
শূণ্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি-
যাহা ছিলো নিয়ে গেল সোনার তরী।
৮+৮+৮+৫(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

মাত্রাবৃত্তের উপরিউক্ত চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট পূর্ণপর্ব ছাড়াও মুক্তক মাত্রাবৃত্তের চর্চা দেখা যায়। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ৬ মাত্রার মুক্তক মাত্রাবৃত্তের অন্যতম উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ছাড়াও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, ফররুখ আহমদ এই রকম ছন্দে গাম্ভীর্য দেখিয়েছেন। এছাড়াও সুধীন্দনাথ ও নজরুল মন্দাক্রান্তা মাত্রাবৃত্তের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।

স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের উপর আমরা মোটামুটি একটি ধারণা দেয়ার প্রয়াস চালিয়েছি এতোক্ষণ। আমাদের আলোচনায় যথাসম্ভব স্বল্পপরিসরে এদের প্রথমিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিলো। বলাই বাহুল্য, বাংলা সাহিত্যের বৈচিত্রপূর্ণ ছন্দ অক্ষরবৃত্ত বা গদ্য ছন্দ বা মিশ্র ছন্দ নিয়ে আলোচনার জন্য নতুন পরিসর দরকার। এবং এসব ছন্দে গভীরজ্ঞান আয়ত্ত করণের মাধ্যেমেই ছন্দদক্ষ হিসেবে আত্ন্উন্নয়ন সম্ভব। তথাপি, আমাদের সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে এখানে প্রাথমিক ছন্দ বিষয়ক আলাপই ফলপ্রসু মনে করেছি। নিজ নিজ রচনায় এগুলোর পুনঃ পুনঃ চর্চা আমাদেরকে পরবর্তী আলোচনা অনুধাবনের জন্য যথাযতভাবে তৈরি করবে। ছন্দবিষয়ে বিস্তারিত আগ্রহীদের জন্য এখানে আমরা উল্লেখযোগ্য কিছু ব ইবা প্রবন্ধের নাম উল্লেখ করছি-

১/ নূতন ছন্দ পরিক্রমা, প্রবোধচন্দ্র সেন, আনন্দ পাবলিশাস
২/ ছন্দ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, অবসর
৩/ বাংলা ছন্দ, বুদ্ধদেব বসু, সাহিত্য সমালোচনা, সম্পাদনা- আহমদ কবির
৪/ মার্জিনে মন্তব্য, সৈয়দ শামছুল হক, অন্য প্রকাশ
৫/ কবিতার ক্লাস, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, নবযুগ প্রকাশনী
৬/ ছন্দ বারান্দা, শঙ্খ ঘোষ, অরুণা প্রকাশনী

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ৩১ শে মার্চ, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:৫০

প্রাইমারি স্কুল বলেছেন: একজন নবীন কি আগে ছন্দের পাঠ নেবে নাকি কবিতা লেখা শুরু করবে? এই প্রশ্ন আমারও নদীর মাঝে আমি? ডিসেম্বরে সেমিষ্টার শেষে এক মাস ছুটি, বিদেশে কি করে সময় কাটাই, মনে হলো বাংলা লেখাপড়া শুরু করি। শুরু করলাম। পরে মনে হলো কবিতা লেখা যায় কি না। জানুয়ারীর ১৭ তারিখ প্রথম ১ টা কবিতা লেখলাম। কিন্তু মনে হলো হয়নি। ছন্দ ছাড়া ভালো লাগে না। বিদেশে কে শিখাবে ছন্দ অনেকের নিকট গেলাম কিন্তু ছন্দ জানে না । একজনে ১০০০ কবিতা দেখালো বাট সে ছন্দ জানে না। কি করি? ফেইজবুক গেটে কিছু পাতা ও গ্রুপ পাইলাম । কিন্তু হচ্ছে না । অনেক কে ম্যাসেজ দিলাম কেউ উত্তর দেয় কেউ দেয় না। একজন কাছে শিক্ষক হলে হয়ত ভালো হতো। এর মধ্যে এক বড় কবি বললেন লেখতে লেখতে শিখবে । শিখে লিখতে পারবে না । এক স্থানে দিলাম একটা কবিতা দিলো গালি এটা গদ্য না পদ্য ? মন টা খরাপ হয়ে গেলো । তাহলে কি আমি পারবো না? দেশে থাকলে কারো নিকট যাওয়া যেতো। কি করি অনলাইন ছাড়া আমার নিকট আমার নিকট আর কিছু নাই? আসলেই আমি কবিতা লেখা শিখতে চাই। কবি হওয়ার জন্য না জানার জন্য বা লেখার জন্য ? হেল্প চাই?
আপনার লেখাটা খুব সুন্দর । ধন্যবাদ আপনাকে।

৩১ শে মার্চ, ২০১৭ রাত ১১:৪৯

শাহাদাৎ শাহেদ বলেছেন: প্রীতি জানুন। আপনার মন্তব্য অনুপ্রাণীত করেছে। আর হ্যাঁ, যেটুকু জানি আমরা তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

২| ৩১ শে মার্চ, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:১৩

নতুন নকিব বলেছেন:



অনেক শ্রমের ঘামের ফসল।

ধন্যবাদ।

সময় নিয়ে পড়ার ইচ্ছে থাকল।

ভাল থাকবেন।

৩১ শে মার্চ, ২০১৭ রাত ১১:৪৭

শাহাদাৎ শাহেদ বলেছেন: ধন্যবাদ জানুন। পড়া হোক এটাই চাই।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.