| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাহাদাৎ শাহেদ
বেড়ে ওঠা লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে। গ্রামে। শহুরে হাজারো রংয়ের মধ্যেও চোখের পাতায় গ্রাম লেপ্টে আছে। স্বপ্ন নিয়ে যে তরুণরা ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছে আমি তাদের একজন। ২৪ অক্টোবর ২০১৪ সালে লেখা-লেখির জগতে প্রবেশ। ৩ জানুয়ারি ২০১৫ দৈনিক বাংলাদেশ সময়ে প্রথম ছড়া প্রকাশের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা-লেখিতে মনযোগ। মূলত ছড়া, কিশোর কবিতা, কবিতা, গল্প, ফিচার ও প্রবন্ধ লিখছি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বলতে কিছু নেই, স্বপ্ন তো অনেক রকমই দেখি। অনেকের মতো অচিন পথে হাঁটতে পছন্দ করি। শত কোলাহলের ভেতরও আমি একা। খুব সহজে করো সাথে মিশতে পারি না। ভুলো মন। স্কেপিস্ট, মানে দেয়ালে পিঠ ঠেঁকে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিপদ থেকে পালিয়ে বেড়াই। ভোজন রসিক। ইচ্ছে হলে আমাকে খাওয়ার দাওয়াত দিতে পারেন
বিহারি লালের হাত ধরে বাংলা কবিতার যেই মোড় পরিবর্তন ঘটেছিলো রবীন্দ্রনাথ তাকে বিশিষ্ট করেছেন এবং তারপর নজরুল, জীবনানন্দ দাশ, আল মাহমুদ, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, জয় গোস্বামীহ অনেকেই তাকে উন্নীত করেছেন অন্য এক শিখরে। অপরদিকে আমরা যাকে কবিতার আদিপিতা হিসেবে জানি, ছড়া, লোক মুখে চলে অাসছে দীর্ঘ একটা সময় ধরে- অনেকেই দাবি করছেন এটি ঘুর্ণিপাক খাচ্ছে একটি বৃত্তে। এর অবশ্য অনেকগুলো কারণ রয়েছে- ছড়ায় মাত্রাপ্রবনতা, তাল-লয়ের অনিবার্যতা, আদি ছড়ার রসবোধ অনুসরণে বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি বজায় রাখার ফল। ছড়ার নিজস্ব বৈশিষ্ট বজায় রেখে এর মধ্যে বৈচিত্র সৃষ্টির প্রয়াস সময়ে সময়ে চালিয়েছেন গুণীজন। তাদের কারোটিকে তরুণরা সাধুবাদ জানিয়েছেন আবার অন্যদেরটা গুরুত্ব পায়নি। যাদের পেয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেযোগ্য এক ব্যক্তিত্ব নিয়ে আজ আমাদের আলোচনা।
তাকে আলোচনার অবশ্য অরো অনেক কারণ রয়েছে। বন্ধু বৎসল, স্বপ্রতিভ, খ্যাতিমান এবং বাংলা ছড়া সাহিত্যের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ এক নাম জগলুল হায়দার। তাকে অনেকে ছড়াসম্রাট, কেউ কেউ ছড়ার যাদুকর ইত্যাদি বিশেষণে বিষেশায়িত করেন। শুরু থেকেই তিনি তরুণদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এই আকর্ষণ এবং ছড়া সাহিত্যে তার প্রভাব সৃষ্টির ফলে, খুব স্বাভাবিক, তাকে কারো কারো চক্ষুসূল হতে দেখা যায়। সেসবে নেই তার বিন্দুবিসর্গ ভ্রুক্ষেপ। তিনি কাজ করে চলছেন আপন গতিতে, বিস্তৃত করে চলছেন নিজের সৃষ্টির জগৎ। ফলে আমরা দেখতে পাই, নব্বই দশকের একেবারে শেষ থেকে এখন দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত তার বিভিন্ন ঢংয়ের ৩৩টি বই, ছড়া, কিশোর কবিতা ও কবিতা, পাওয়া গেছে এবং এই বইগুলোর বেশিরভাগই আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। যা জগলুল হায়দারকে আমাদের মতো তরুণদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। তাই আমাদের বর্তমান আলোচনার বিষয়, সময়ের তরুণদের চোখে জগলুল হায়দার বিশেষ হওয়ার কারণ কি? সেটি।
জন্ম তার জামালপুরে। ১৯৬৫ সালের ৮ অক্টোবর। শৈশব কৈশোর কাটিয়েছেন জামালপুর, নরসিংদী, ভৈরব, গাজীপুর ও ঢাকায়। চাকরি সূত্রে বর্তমানে রয়েছেন রাজধানীতে। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে চমৎকার সুখী সংসার। ব্যক্তিগত জীবনে আস্তিক্যবাদী এই মানুষটিকে যে কেউ প্রাক্টিসিং মুসলিম হিসেবে আবিষ্কার করতে পারবে। অন্যান্য ক্ষেত্রেগুলোতেও মুখে বলার বদলে তার জীবনাচারে নন্দনচর্চা সময়ের তরুণদের কাছে তাকে আলাদা করে তুলেছে। সময়ের অনেক লেখক-সাহিত্যিকদের চিত্র এক্ষেত্রে উল্টো।
ছড়ায় ছড়ছড়ানো জগলুল হায়দার:
মানুষটি মূলত ছড়াকার। গত প্রায় পঁচিশ বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে লিখে বাজিমাত করেছেন ছড়ায়। শুরু থেকে তাকে লক্ষ্য রাখা অনেক বোদ্ধাজন দাবি করেছেন, জগলুল হায়দার তার সময়ের অনেককে যেমন ছাড়িয়ে গেছেন তেমনি অনেক সিনিয়রকে অতিক্রম করেছেন আপন গুণে। জগলুল হায়দার এখন নিজকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন নিজে। লিখেছেন বিজ্ঞান ছড়া, সমসাময়িক রাজনীতিও সমাজ সচেতনতা মূলক ছড়া, নিরীক্ষা ধর্মী ছড়া; বিশ্ব রাজনীতিও তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি।
তার বিজ্ঞান ভিত্তিক ছড়ার বই 'আন্তনেট ডডকম' সম্পর্কে বলতে গিয়ে 'জনবিজ্ঞান' সম্পাদক আইয়ুব হোসেন বলেন, ''সরল কথনে কিছুটা হালকা মেজাজে ছড়ার আঙ্গিকে সম্পূর্ণতাই বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে ছড়ার বই বোধ করি বাংলা ভাষায় তিনি প্রথম এবং একমাত্র।''
এই বইয়ের একটি ছড়া উল্লেখ করা যেতে পারে,
''যোগ্য যে
হারবে না সে
হবেই হবে
তার উইন,
বিবর্তনের
তত্ত্ব দিয়ে
বলে গেছেন
ডারউইন।''
সমসাময়িক সমাজ প্রসঙ্গ নিয়ে লিখলেও তার উপস্থাপন শৈলি, অলংকার ইত্যাদি কোন সাধারণ বিষয়েকেও করে তোলে অসাধারণ, আবার কোন জটিল বিষয়কে করে তোলে সাবলিল রসময়। একারণে তার সমসাময়িক ছড়ায় তিনি হয়ে উঠেছেন তরুণদের দিকপাল। একথাটিই সম্ভবত বলতে চেয়েছেন শিশু সাহিত্যিক আশরাফুল আলম পিনটু, ''জগলুলের আর একটা বড় প্রাপ্তি হলো তার ছড়ার বিষয় আর ভাষা বৈশিষ্ট্যকে অনুসরণ করে এখন অনেকেই কাজ করছেন।''
আবার শিশু-কিশোর কবিতায় মোটামোটি সফল একটি নাম জগলুল হায়দার। ছোটদের মনস্তত্ত্ব, চাওয়া-পাওয়া বা স্বপ্নের জগতের কথা চমৎকারভাবে পরিস্ফুটিত হয় তার রচনায়। তার অভিনব ছন্দ, ভাব ও ভাষা যে কোন শিশুদের মন ছুঁয়ে যেতে সক্ষম। অল্প কথায় বিস্তর ভাব প্রকাশের সাথে সাথে সম্পূর্ণ নিজস্ব আঙ্গিক ও শৈলিতে পারঙ্গম জগলুল হায়দার।
পত্রিকার পাতার আলোড়ন সৃষ্টিকারী মুখ:
নব্বই দশকের একেবারে শেষ দিক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত পত্রিকায় ছড়া ছাপা হওয়ার দিক থেকে রেকর্ড সৃষ্টিকারী একটি নাম জগলুল হায়দার। নিয়মিত ছড়া কলাম, বিশেষ সংখ্যা, সাপ্তাহিক শিশু-কিশোর পাতা থেকে শুরু করে ছড়া কবিতার ছোটকাগজ ইত্যাদিতে জগলুল হায়দার অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী একটি নাম।
তার সমসাময়িক এক ছড়াকার পলাশ মাহবুব বলেছেন এভাবে, ''...জগলুল হায়দার এক্সপ্রেস চলছেই। ক্লান্তিহীনভাবে ছড়া লিখে চলছেন তিনি। পত্রিকায় ছোটদের পাতায় তিনি আছেন, ফান ম্যাগাজিনে তিনি আছেন। বিশেষ সংখ্যাগুলোতেও তার সরব উপস্থিতি। কোথায় নেই জগলুল হায়দার বাবু।''
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিরতিহীন লিখে চলা এবং ইতিহাস সৃষ্টির মতো ছাপা হওয়ার পরও তার লেখার মান নিয়ে বোদ্ধাজন থেকে শুরু করে সাধারণ পাঠক সকেলেই তুষ্ট। এতো লিখেও নিজস্ব লেখার মান সন্তোষজনক রাখা সত্যিই বিরল। এটি তার বিষেশতার কারণও বটে।
জগলুল দর্শন:
পয়েন্টটি দেখে এখন আপনার মনে যে দুইটি বিষয় উঁকি দিচ্ছে আমরা দুটি নিয়েই আলোচনা করবো। প্রথমতো, পত্রপত্রিকায় এতো পরিমাণ লেখা প্রকাশের ফলে সিনিয়র-জুনিয়র লেখক তো বটেই, অনেক সাধারণ ভক্ত-অনুরাগী জগলুল হায়দারকে এক নজর দেখতে, কেউবা একটু কথা বলতে বা সেলফি তুলতে ব্যাকুল হন। জগলুল হায়দারের আন্তরিকতা নিরাশ করে না তাদেরকে।
তেমনি এক তরুণ ভক্ত কবি মাসুদুর রহমান খানের মুখে শুনি, ''জগলুল হায়দার সম্পর্কে বলতে গিয়ে উনার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাতের কথা মনে পড়ে। উনার লেখার সাধারণ একজনভক্ত হিসেবে দেখা করতে গিয়ে উনার আন্তরিকতায় ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলাম। ভীষণ জনপ্রিয় ও গুণী একজন মানুষ যে কতোটা আন্তরিক হতে পারে উনার সাথে দেখা না হলে কেউ বিশ্বাসই করবে না! খুব সহজেই মানুষকে আপন করে নেয়ার অসাধারণ এক গুণ আছে উনার। সেইদিন থেকে জগলুল হায়দার আমার ভাই, আমার প্রিয় দাদা, আমার অভিভাবক। সমসাময়িক বা প্রবীণ ছড়াকারদের তুলনায় আমাদের তরুণদের মাঝে জগলুল হায়দার ভীষণ প্রিয় একজন। ভালোবেসে তাই ছড়া সম্রাট বলে ডাকি। আমার বিশ্বাস সমসাময়িক প্রজন্মের থেকে তিনি ২০/৩০ বছর এগিয়ে আছেন বলেই তরুণদের তিনি খুব ভালো বুঝতে পারেন, মিশে যেতে পারেন খুব সহজে। ভালো একজন লেখককে কালোত্তীর্ণ হতে গেলে ভালো একজন মানুষ হওয়া জরুরি। জগলুল হায়দার নিঃসন্দেহে তেমনি এক বিশুদ্ধ মনের ভালো মানুষ।''
এই তরুণ কবির সূত্র ধরেই আমরা দ্বিতীয় বিষয়টিতে অবতীর্ণ হবো। তিনি সাধারণের চেয়ে চিন্তা-দর্শনে এগিয়ে। তিনি জানেন কোন দিকে যেতে হবে, কী করতে হবে। কী করছেন সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তরুণদের প্রিয় মানুষ জগলুল হায়দার। তিনি যা লিখেন, বুঝে লিখেন। জলে গা ভাসানো কচুরি পানা তিনি নন। তাই দেখা যায় তার বাচনভঙ্গি, তার বলার স্টাইল ইত্যাদি তাকে আলাদা করে দেয়। সমসাময়িক অন্য ছড়াকারদের চেয়ে তার জানার জগৎ বিস্তৃত ও পরিষ্কার। আড্ডায় তার জ্ঞানবিজ্ঞান, তত্ত্ব, তথ্য, দর্শন ব্যক্তিগতভাবে আমাকেও আকর্ষণ করে।
আড্ডবাজ জগলুল হায়দার:
আপনি হয়তো ভাবছেন আমি কেন আলাদাভাবে আড্ডা নিয়ে কথা বলছি! কে না আড্ডা দিতে পারে? হ্যাঁ, আড্ডা সবাই দিতে পারে, তবে আড্ডাটি যদি হয় জগলুল হায়দারের সঙ্গে তবে কোথায় যেন একটা স্পেশালিটি তৈরি হয়। এর অনেক কারণের মধ্যে আমরা উল্লেখ করতে চাই জগলুল হায়দারের বয়স কতো? ৫১+। কিন্তু তিনি যখন আড্ডা দিচ্ছেন তখন তিনি হয়ে ওঠেন তার আড্ডাসঙ্গির সমবয়সী। তার সাথে যিনি ছড়া নিয়ে আড্ডা দিতে চান ছাড়া বিষয়ে তার জানাশোনা টের পাবেন নিশ্চিত। যিনি তত্ত্ব নিয়ে আগ্রহী, জগলুল হায়দার সেই বিষয়ের পান্ডিত্যসহ তার কাছে হাজির হন। বিশ্বসাহিত্য নিয়ে কথা বলতে গেলে তাকে বিশ্ব সাহিত্যের একজন বোদ্ধা হিসেবে আবিষ্কার করা যাবে অনায়াসে। আবার সমাজ, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক পট-পরিবর্তন ইত্যাদি তার নখদর্পণে।
মজার বিষয় হলো, কোন ভক্ত ছড়া-কবিতা বুঝেন না, বুঝেন সঙ্গিত/ গান; ঘণ্টার পর ঘণ্টা গান নিয়ে কথা বলা, গান গেয়ে আড্ডার আসর জমিয়ে তোলার চমৎকার ক্ষমতা আছে আমাদের আলোচ্য ব্যক্তিত্বের।
এক তরুণ কবি তার সাথে আড্ডার পর যেই অনুভূতি প্রকাশ করেছে তা থেকে আমরা ব্যাপারটি আঁচ করার চেষ্টা করি, ''না, তার প্রশংসা গীতি গাইবার কোন প্রয়োজন নেই। বাংলা সাহিত্যের রথী-মহারথী থেকে লাঙল কলম দিয়ে মাঠ মাঠ কবিতা লিখেন যে কৃষককুল, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষক থেকে অ আ লিখতে পারা শিশুকুল তাকে চেনেন। প্রাণের নিতল জায়গা থেকে অতল ভালোবাসায় সিক্ত করেন তাকে। তার লেখা পড়ে গড়েন স্বপ্নের, সম্ভাবনার, ভালো লাগার আরাধ্য আলো-জগৎ। হ্যাঁ, তিনি ছড়া সম্রাট। ছড়ার কিংবদন্তি। অমিত শক্তির অবিশ্বাস্য শব্দ জাদুকর। আমাদের প্রাণের ছড়া কারিগর। বলছিলাম জগলুল হায়দারের কথা। আমার, আমাদের জগলু দাদার কথা। অনেক দিন পর আজ তার ঢেউ ঢেউ মায়ায়, বটবৃক্ষ ছায়ায় দীর্ঘ সময় কাটালাম। জগলুল হায়দার নামক মহা-পাঠশালা থেকে অজানা অনেক কিছু শিখলাম। তিনি আমার আমিকে চেনালেন। লিখতে বললেন। সত্যিই দাদা আপনার কাছ থেকে ফেরার পর থেকেই কেমন যেন লাগছে। এ এক অন্য অনুভূতি। শুধু এটুকু বলি আমি লিখব, অবশ্যই লিখব। প্রিয় দাদা! আমার সন্ধ্যাটা আজ স্বর্ণ সময় করে দিলেন।''
এই তরুণ ছড়াকার জাহিদ জাবেরের আড্ডা পরবর্তী অনুভূতি জানিয়ে ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসে আবেগ মেশানো থাকলেও মূল জায়গাটি আমাদের ধরতে অসুবিধা হয় না। তরুণরা জগলুল হায়দারে মুগ্ধ হওয়ার জন্য এটি কি যথেষ্ট নয়?
ভালোবাসা দিতেও যোগ্য পাত্র চাই:
তরুণরা কী চায়? যার-তার কাছে তারা যায় না। যাকে-তাকে ভালোবেসে ফেলে, তরুণদের বিষয়ে এই ধারণা করা ভুল। তারা যোগ্য পাত্রে সপে নিজের অমূল্যধন ভালোবাসা; যে আবার তার ভালোবাসার মূল্যায়ন করতে জানবে। খুব সহজে আমরা বলতে পারি, তরুণরা মনে করে ভালোবাসার এই যোগ্য পাত্র জগলুল হায়দার। ভালাবাসার মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও তিনি বিশিষ্ট। এক প্রতিভা-দ্বীপ্ত শিশুসাহিত্যিক শামীম খান যুবরাজ তাকে ভালোবাসার পাত্র উল্লেখ করে লিখেছেন, ''জগলুল হায়দার। এক প্রাণবন্ত তারুণ্যের নাম। তরুণদের প্রেরণার নাম। এক হৃদয়বান মানুষের নাম। এক স্বার্থহীন বন্ধুর নাম। আমার প্রিয় মানুষ। তিনি ছড়ার মানুষ। বিজ্ঞান ছড়ার জনক তিনি। তরুণরা তাকে ছড়াসম্রাট বলেই ডাকেন। নানান কৌশলে নানান বিষয়ে ছড়া রচনায় তিনিই সবার শীর্ষে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসেন। উৎসাহি করেন। বেঁচে থাকার প্রেরণা দেন। এই মানুষটির জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থাকবে আজীবন।
একটি মানুষ ছড়ার মানুষ
''একটি মানুষ ছড়ার মানুষ
ছড়ায় ছড়ায় লড়ার মানুষ
ছড়ায় ছড়ান দায় তার
ছড়া শত কায়দার।
একটি মানুষ মনের মানুষ
অঢেল ভক্তজনের মানুষ
ভালোবাসা ছড়িয়ে বেড়ান
সবাই স্নেহ পায় তার।
একটি মানুষ সুখি মানুষ
সবার দুখে দুখি মানুষ
সে মানুষে ধার ধারে না
যখন তখন ফায়দার,
প্রিয় সে মুখ; প্রিয় অতি
প্রিয় জগলুল হায়দার।''
কৃত্রিমতা বর্জিত জগলুল হায়দার:
তার ছড়ার ভাষা, বক্তব্য উপস্থাপনের ধরণ নিয়ে বলেছি এগুলো স্বতন্ত্র। খুব লক্ষ্যণীয় যে, এগুলো কৃত্রিমতা বর্জিত। ব্যক্তি জীবনেও আমরা তাকে কৃত্রিমতা বর্জিত মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করেছি। তিনি শুধু সৌজন্য রক্ষা করার স্বার্থে কারো ঘনিষ্ট হন, এমন মনে হয়নি। তার ভালোবাসা অন্তরের অন্তস্থল থেকে আসে। তাই তিনি প্রিয় মানুষ। কিন্তু ছড়ার জায়গায় তার ছড়ার শক্তিই কেবল তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে বলাবাহুল্য।
এ জায়গাটিই সম্ভবত ধরতে চেয়েছেন প্রতিভাবান গল্পকার সাফি উল্লাহ্, ''জগলুল হায়দার এ সময়ের একজন জনপ্রিয় ছড়াকার। তিনি শুধু ছড়াই লিখেন না, বরং হাইকু, প্রবন্ধ এবং গানও লিখেন। তার লেখা ভালো লাগার অন্যতম কারণ হলো: তিনি চলিত ভাষার যে কৃত্রিম রূপ, সেটা দিয়ে সাহিত্য চর্চা করেন না। ব্যবহার করেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভাষা, এ সময়ের ভাষা। এটা তার লেখনীতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। 'লিরিক্যাল ব্যালাডস'-এর ভূমিকায় উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছিলেন, 'কবিতার ভাষা হবে মানুষের মুখের ভাষা।' অর্থাৎ মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, সেটাই সাহিত্যের ভাষা, কবিতার ভাষা। আর সে কাজটাই করছেন জগলুল হায়দার। মূলত, কালজয়ী সাহিত্যকর্ম অধ্যয়ন করলে একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যায় লিখনী লেখকের সময়কে ধারণ করে। লেখায় তৎকালীন ভাষারীতি ফুটে উঠে, জানা যায় সে সময়ের ভাষার সৌন্দর্য। এদিক দিয়েও জগলুল হায়দার অনেকটা এগিয়ে আছেন।''
বিশিষ্ট জনের চোখে জগলুল হায়দার:
জগলুল হায়দার তার আপন গুনে উদ্ভাসিত। ছড়া সাহিত্য থেকে শুরু করে হাইকু, কবিতা, কিশোর কবিতা কিংবা বিষয় ভিত্তিক দারুণ সব গদ্য, প্রবন্ধ সৃষ্টির মাধ্যমে তার চিন্তার যে জগৎ ইতোমধ্যে উন্মোচিত হয়েছে বোদ্ধাজন ও সাহিত্য সমাজের কাছে এবং তা কদরসহ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আমরা জগলুল হায়দার সম্পর্কে তেমন কয়েকজন গুণীর ব্যক্তব্যে নজর দেব এখন। যেমন, নাগরিক কবি শামসুর রাহমান বুঝতে পেরেছেন, ''এই ছড়াকারের মধ্যে ছড়া লেখার এক স্বাভাবিক অথচ ব্যতিক্রমী ক্ষমতা আছে।''
সোনালী কবিনের কবি আল মাহমুদকে তো রীতিমতো কাঁদিয়ে ছাড়লেন জগলুল হায়দার। কবির মুখেই শুনি সে ঘটনা, ''...কবিতাটা আবৃত্তি শেষ হতে না হতেই আমার চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনি। ছড়াকার জগলুল হায়দারের 'কেমন করে' নামক লেখাটি আমার মতো একজন বৃদ্ধ কবিকে কাঁদিয়ে ছেড়েছে। লেখাটি আমার মন-প্রাণ ছুঁয়ে গেছে...। কী সহজ-সরল প্যাটার্নে অসাধারণ এক কথা জগলুল বলে দিয়েছে।'' কেন সে কবিতা পড়ে এই কবি কাঁদলেন? চলুন পড়ি কবিতাটি
কৌতূহলে
কোলের ছেলে
প্রশ্ন করে মাকে,
কেমন করে
কোলটা ভরে
মা পেয়েছেন তাকে?
মা বলে এই
বুকের খনির মাঝে
তুই ছিলি বাপ
আশার ভাঁজে ভাঁজে।
তারপর?
তারপর!
একদিন এক
গভীর নিশি যামি
স্বপ্ন হাটে
হঠাৎ তোকে
কুড়িয়ে পেলাম আমি।
আপনার বা আপনাদের মন ছুঁয়েছে কিনা জানি না। তবে ছড়া সাহিত্যের আরেক দিকপাল ফয়েজ আহ্মদকে জগলুল হায়দার আপন লিখনিতে কাবু করে দিয়েছেন।
কিংবদন্তীর ছড়াকার ফয়েজ আহ্মদ তো জগলুল হায়দারের ছড়া বিষয়ে বলেই ফেললেন, ''...কোনকোনটা আমার চেয়েও ভালো। জগলুল হায়দারের ছড়া অনেক দূর যাবে এটা আমার বিশ্বাস।'' তিনি আজ বেঁচে নেই আমাদের মধ্যে, থাকলে তার এ বাণীটি হয়তো আমরা বর্ধিত আকারে শুনতে পেতাম। বাদই দিলাম সে প্রসঙ্গ, যখন আমরা দেখি বিখ্যাত গীতিকার ও সুরকার শেখ সাদী খান আভিযোগের সুরে বলেন, ''...জগলুলের এসব কাজ থেকে ছড়ার পাশাপাশি গানেও ওর প্রতিভার দ্বীপ্তি টের পাচ্ছিলাম। আমি জানি না এতো সুন্দর লিরিক লিখেও জগলুল কেন জানি কেবলই ছড়ার হয়ে থাকতে চায়।''
জগলুল হায়দার ঠিক কোন জায়গায় বিশিষ্ট তা আলোচনা করার জন্য হয়তো ভিন্ন পরিসর দরকার হবে। তবে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি আসাদ চৌধুরীর মুখে তার বিশিষ্টতার একটি জায়গা সম্পর্কে শুনি, ''সাহিত্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তারাই করেন যারা প্রথা বা গতানুগতিকতার বেড়াজাল ভাঙতে চান, জগলুল হায়দার এ কাজটি করে চলছেন শক্ত কবজি ধরা লেখনীর মাধ্যমে।''
জগলুল হায়দার না থাকলে কী হতো:
জগলুল হায়দার না থাকলে অনেক কিছুই হতে পারতো, আমাদের মতো তরুণরা অনেক কিছু মিস করতো। বাংলা সাহিত্যে হয়তো পুরন হতো না একজন প্রতিভাবান ছড়াকারের ঘাটতি।
১. তরুণরা পেত না একজন বিশ্বস্ত বন্ধু, অবিভাবক, আস্থাবান দিক নির্দেশক। একজন চমৎকার মানুষকে।
২. হতো না চমকপ্রদ অগণিত অন্তমিলের সৃষ্টি। দেখতে পেতো না হয়তো শব্দ দিয়ে যাদুর খেলা। যে জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে ছড়া যাদুকর বলি।
৩. ছড়ায় নিজস্ব আঙ্গিক সৃষ্টির মাধ্যমে এই ধারাটিকে হয়তো সমৃদ্ধ পেতাম না এমন।
৪. ইতিহাসের অমর নায়কদেরকে ছড়ার সাবলিল ভাষায় উপস্থাপন করে কেউ হয়তো লেখার চেষ্টা করতো না 'বাংলার মুখ বাংলার মিথ'। স্বাধীনতার ইতিহাসকে শিশু-কিশোরদের উপযোগি করে 'স্বাধীনতার কাব্য ইতিহাস' লেখার হয়তো কেউ প্রয়োজন অনুভব করতো না। জন্ম হতো না অসংখ্যা জনপ্রিয় ছড়ার বা জনপ্রিয় বারোভাজার।
৫. আমরা ভাবনার সুযোগ পেতাম না কলোনিয়াল আমলের আগ থেকে আমাদের ভাষার উপর আগ্রাসণ চালানো বিষয়ে সচেতন মানুষ হিসেবে নিজেদের এ্যক্সেন্টে বলা ও লেখার।
৬. দারুণ কিছু লিরিক হয়তো লেখা হতো না বাংলায়।
৭. লেখা নাও হতে পারতো 'জল টুপটুপ শ্রাবণের' মতো ভিন্ন আঙ্গিকের হাইকুু।
আমরা চাই:
আমরা অনেক কিছুই চাই। আমাদের প্রত্যাশা যে মানুষটির কাছে তিনি তা পুরনে সামর্থ। অনেক প্রত্যাশার পূর্বে মূল জায়গাটি আমরা ধরতে চাই।
সময়ের আরেক তরুণ ছড়াকার রবিউল কমলের ভাষায় বলবো আমাদের সেই কথাটি, ''তরুণ ছড়াকারদের প্রিয় মানুষ জগলুল হায়দার। কারো কারো অসীম অনুপ্রেরণা। ছড়াসাহিত্যের সব ধাপেই তিনি তার যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছেন। আমি যখন জগলুল ভাইয়ার ছড়া পড়ি, তখন তার ছড়ারা আমার কানের মাঝে বাজতে থাকে। অনেকক্ষণ রেশ থেকে যায় মনের মাঝে। তার অন্তমিলগুলো এতো অসাধারণ যে ছড়াগানের মতো সুর করে পড়ি। আমি মহান আল্লাহর কাছে জগলুল ভাইয়ার দীর্ঘায়ু কামনা করি। আমি ভাইয়াকে একটি মেসেজ দিতে চাই 'বস আপনি লিখে যান। বাংলা সাহিত্য আপনার কাছ থেকে আরো অনেক কিছু চাই। আপনি আমাদের ছড়া সাহিত্যের বর্তমান সময়ের ছড়া সম্রাট।''
রবিউল কমলের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও চাই তিনি অবিরাম লিখে চলুন। মজার অন্তমিলগুলো তৈরি হয়ে সমৃদ্ধ করুণ বাংলা ছাড়াঙ্গনকে, শব্দ দিয়ে তিনি যাদু দেখান দীর্ঘ সময় ধরে। তিনি সমৃদ্ধ করুন বিজ্ঞান ছড়ার ধারাকে। ''বাংলার মুখ বাংলার মিথ'' হয়ে উঠুক আরো সমৃদ্ধ।
©somewhere in net ltd.