| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত)
আমি ভালবাসি কবিতা, গান, আবৃত্তি------- আর ঘুরে বেড়ানো।জীবনের স্বপ্নগুলো স্বপ্নেই ভেসে বেড়ায়...বাস্তবে ধরা দেয় না!, তবুও স্বপ্ন দেখি...ঘুম থেকে জেগে উঠি আশায় বুক বাঁধি ...ভুল-ত্রুটি শুধরে নতুনে পথ চলার।
শেষ ঠিকানা সাড়ে তিন হাত মাটির খরচ সাড়ে ৪ কোটি!
কবরের জমিতে বিলাসিতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক বৈষম্যের এক নির্মম চিত্র
মানুষের জীবনের শেষ ঠিকানা মাত্র সাড়ে তিন হাত মাটি। জীবদ্দশায় কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র; কেউ প্রাসাদে বাস করেন, কেউ ছোট ঘরে। কিন্তু মৃত্যুর পর সবাইকে ফিরে যেতে হয় সেই মাটির কাছেই। ধর্মীয় দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা কবরের জৌলুস নয়; বরং আমল, তাকওয়া ও সৎকর্ম।
কিন্তু ইট-পাথরের ক্রমবর্ধমান নগরসভ্যতায় মৃত্যুর পরের ঠিকানাটিও যখন কোটি কোটি টাকার সম্পদে পরিণত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটি কি নিছক জমির মূল্য, নাকি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধেরও মূল্যপতন?
সাড়ে তিন হাত মাটির জন্য সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয় করার প্রবণতা তাই কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি আমাদের ধর্মীয় চেতনা, সামাজিক ন্যায়বোধ এবং মৃত্যুকে দেখার মানসিকতা নিয়েও গভীর প্রশ্ন সৃষ্টি করে।
১. ইসলামে কবরের মর্যাদা আছে, কিন্তু বিলাসিতার অনুমোদন নেই
ইসলাম মৃত ব্যক্তির মর্যাদা ও কবরের সম্মান রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। মৃতের দাফন, কবরের সংরক্ষণ এবং মরদেহের প্রতি সম্মান—এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কিন্তু কবরকে অহংকার, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম বানানোর কোনো নৈতিক ভিত্তি ইসলামে নেই। কুরআনে আল্লাহ বলেন—
“তোমরা জেনে রাখো, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা।” —সূরা আল-আনফাল, ৮:২৮
অর্থাৎ সম্পদ মানুষের চূড়ান্ত সাফল্যের পরিচয় নয়; বরং সেটি কীভাবে অর্জিত ও ব্যয় করা হয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ মানুষের মধ্যে অহংকার, অপচয় ও দুনিয়াবি প্রতিযোগিতার মানসিকতা থেকে সতর্ক করেছেন। তাই কবরের জায়গাকেও যদি সম্পদ প্রদর্শনের ক্ষেত্র বানানো হয়, তাহলে তা ইসলামের সরলতা ও সাম্যের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।
২. মৃত্যুর পর মানুষের পরিচয় এক—এটাই ইসলামের গভীর শিক্ষা
একজন মানুষ জীবনে যত বড় ধনীই হোন, মৃত্যুর পর তাঁর দেহকে কয়েক গজ কাপড়েই কাফন দেওয়া হয়। রাজপ্রাসাদের মালিক এবং দিনমজুর—উভয়ের দাফনের মূল প্রক্রিয়া একই। কবর যেন নীরবে বলে—“দুনিয়ায় তুমি যা ছিলে, এখানে তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তুমি কী করেছিলে?”
কবরের মাটির নিচে ব্যাংক-ব্যালেন্স, গাড়ি, বাড়ি, পদবি কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কোনো মূল্য নেই। সেখানে মানুষের সঙ্গে যায় তার কর্মফল।
পবিত্র কুরআনের ভাষায়—“প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” —সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারলে কবরের জায়গা নিয়ে অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা মানুষের কাছে অনেকটাই অর্থহীন হয়ে উঠত।
৩. সাড়ে ৪ কোটি টাকার কবর—সামাজিক বৈষম্যের প্রতীক কেন?
একটি শহরে যখন একজন মানুষ কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে মৃত্যুর পরের ঠিকানা নিশ্চিত করতে পারেন, অন্যদিকে অসংখ্য মানুষ জীবিত অবস্থায় বাসস্থান, চিকিৎসা ও খাদ্যের নিশ্চয়তা পান না—তখন বিষয়টি নিছক ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্ন হতে পারে—
একজন মানুষের মৃত্যুর পর কয়েক গজ জায়গার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচের প্রয়োজন কতটা বাস্তব? সেই অর্থ দিয়ে কতজন দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা হতে পারত? কতজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ পেতে পারত? কতজন অসহায় পরিবারের ঘরে খাদ্য পৌঁছাতে পারত? কতটি এতিম শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে উঠতে পারত? অর্থাৎ সমস্যা শুধু ‘কত টাকা খরচ হলো’—তা নয়। প্রশ্ন হলো, সম্পদের এই ব্যবহার সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে কতটা যুক্তিসঙ্গত?
৪. এটি কি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, নাকি সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন?
কেউ বলতে পারেন—সম্পদ বৈধভাবে অর্জিত হলে তিনি নিজের ইচ্ছামতো ব্যয় করবেন। ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পদের সঙ্গে দায়িত্বও যুক্ত। ইসলামে সম্পদ ভোগ নিষিদ্ধ নয়; বরং হালাল উপার্জন ও বৈধ ভোগ অনুমোদিত। কিন্তু অপচয় ও অহংকার নিন্দিত। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।”—সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৭
তাই প্রয়োজনের তুলনায় অস্বাভাবিক ব্যয়, সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং মর্যাদা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে সম্পদ ব্যয় করার প্রবণতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া স্বাভাবিক।
৫. নগরায়ণ সমস্যাটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ
ঢাকা বা অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ শহরে জমির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ফলে কবরস্থানের জমিও মূল্যবান হয়ে উঠছে। এটি বাস্তব অর্থনৈতিক সমস্যা।
কিন্তু এখানেই রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কবরস্থান কোনো বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেট প্রকল্প হতে পারে না। কবরস্থানকে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নির্দিষ্ট জায়গায় পর্যাপ্ত সরকারি ও সামাজিক কবরস্থান, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং যুক্তিসংগত ফি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
*** লেখক হুমায়ুন আহমেদের একটা নাটকে একবার দেখেছিলাম যে, সে তার বেয়াই কে কবরের জায়গার বিজনেস আইডিয়া দিয়েছিল-নাটকের নামটা মনে নেই***
৬. প্রতিকারের জন্য কী করা উচিত?
ক. সরকারি ও সামাজিক কবরস্থান সম্প্রসারণ
প্রতিটি বড় শহরে পর্যাপ্ত সরকারি কবরস্থান থাকা দরকার। জমির স্বল্পতার কারণে যেন মৃত মানুষের পরিবারকে অস্বাভাবিক অর্থ ব্যয় করতে না হয়, সেটি রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।
খ. কবরের জায়গার মূল্য নির্ধারণে নীতিমালা
কবরস্থানকে সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ব্যবস্থার হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সরকারি বা সিটি করপোরেশন পর্যায়ে সর্বোচ্চ ফি ও স্বচ্ছ মূল্যনীতি থাকা প্রয়োজন।
গ. কবর নিয়ে সামাজিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করা
“কার কবর বেশি দামী”, “কার কবর কোথায়”, “কার জন্য কত বড় জায়গা”—এ ধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতা নিরুৎসাহিত করতে হবে। মৃত ব্যক্তির সম্মান কবরের দামের ওপর নয়, তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর নির্ভর করা উচিত।
ঘ. ধর্মীয় শিক্ষায় সরলতার চর্চা
মসজিদ, মাদরাসা, ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে কবর, মৃত্যু ও আখিরাত সম্পর্কে ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা দিতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে—মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দামী কবর নয়; বরং জীবদ্দশায় এমন কাজ করা, যার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে।
ঙ. ওয়াক্ফ ও জনকল্যাণমূলক কবরস্থান
ধনী ব্যক্তি ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের উচিত ব্যক্তিগত বিলাসী কবরের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে ওয়াক্ফ, জনকল্যাণমূলক কবরস্থান, হাসপাতাল, শিক্ষা ও দরিদ্র সহায়তায় সম্পদ ব্যয় করা। এতে মৃত ব্যক্তির জন্যও দীর্ঘমেয়াদি সওয়াবের আশা করা যায়।
চ. কবরস্থানের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা
কবরের জায়গা বরাদ্দ, ফি, মেয়াদ, পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ—সবকিছুর সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। দুর্নীতি ও দালালচক্রের সুযোগ বন্ধ করতে ডিজিটাল রেকর্ড ও প্রকাশ্য হিসাব ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।
৭. সবচেয়ে বড় প্রতিকার—মানসিকতার পরিবর্তন
আইন করে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। মানুষের চিন্তার পরিবর্তনও প্রয়োজন। আমাদের বুঝতে হবে—
জীবনে প্রাসাদ আর মৃত্যুর পর বিলাসী কবর—কোনোটিই মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। আজ যে মানুষ কোটি টাকা দিয়ে কবরের জায়গা কিনছেন, তিনিও একদিন সেই জায়গায় শুয়ে থাকবেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে যাবে না সেই জমির দলিল, ব্যাংকের টাকা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের অহংকার, যাবে কেবল তাঁর কর্ম।
ইট-পাথরের শহরে সাড়ে তিন হাত মাটির জন্য সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ের ঘটনা তাই আমাদের সামনে একটি আয়নার মতো দাঁড় করায়। এটি শুধু জমির অস্বাভাবিক মূল্য নয়; বরং আমাদের সমাজে অর্থ, মর্যাদা ও মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক নতুন মানসিকতার প্রতিফলন। মৃত্যুর কাছে মানুষ সত্যিই সমান। কিন্তু জীবিত অবস্থায় আমরা সেই সাম্য ভুলে গিয়ে মৃত্যুর পরও বৈষম্যের দেয়াল তুলে দিচ্ছি। তাই প্রয়োজন—কবরের বিলাসিতা নয়, জীবনের মহত্ত্ব; মৃত্যুর পর দামী ঠিকানা নয়, মৃত্যুর আগে উত্তম আমল; সম্পদের প্রদর্শন নয়, সম্পদের কল্যাণকর ব্যবহার।
©somewhere in net ltd.