নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ

সরোজ মেহেদী

The inspiration you seek is already within you. Be silent and listen. (Mawlana Rumi)

সরোজ মেহেদী › বিস্তারিত পোস্টঃ

গরু নিয়ে হাম্বাগিরীতে সাঁওতাল অনুপ্রবেশ (শেষ পর্ব)

১৩ ই জুন, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:৪৭

প্রিয় অপু ইসলাম/বিশ্বাসের ধর্ম ভাই ও বোনেরা, লেডি গাগার সন্তান জন্মদানে ভূমিকা রাখতে চাওয়া কিউট নেশন, আপনারা কি জানেন আমাদের ‘টিলাসম পাহাড়ে,’ সমতলে বহু পাহাড়ি, উপজাতি, ক্ষুদ্রনৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী বা আমাদের চেয়ে দেখায়-বলায় ভিন্ন মানুষের বসবাস?

সংখ্যাগরিষ্ঠ, গর্বিত বাঙালি, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরসূরী, সারা দুনিয়ার রোল মডেল বা পবিত্র ধর্মের মহানুভবতা প্রদর্শনের নিমিত্তে আমাদের কর্তব্য ছিল সেসব সংখ্যায় অল্প জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, জীবনাচার রক্ষার উদ্যোগ নেয়া, রক্ষা করা। আমরা তা করতে পারিনি, করতে চাইনি। বরং ভোগ করতে চেয়েছি। এই না পারার/ভোগ করতে চাওয়ার শেষ ফল হচ্ছে-সেইসব মানুষেরা দলে দলে খ্রিস্টান হয়ে যাওয়া। আসলে তারা ধ্বংশের হাত থেকে বাঁচতে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে।

মুসলমানরা (মুসলমানরা এ দেশের প্রধান ধর্মগোষ্ঠী বলে তাদের নাম ম্যানশন করছি। হিন্দুরাও দায়ভার এড়াতে পারে না।) তাদের শাপ, ব্যাঙ খায় বলে ঘৃণা করেছে, দেখলে কটু কথা বলেছে। তারা মদ খায়, নাচে, নীচু জাত, গরবী বলে দূরে সরিয়ে রেখেছে। আর আরেক দেশ থেকে উড়ে আসা খ্রিস্টানরা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কাছে টেনে নিয়েছে। রিজিয়া রহমানের ইতিহাস আশ্রিত ‘একাল চিরকাল’ (১৯৮৪) উপন্যাসটা পড়তে পড়তে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। সেটা তারা ইসলামরে মূল ও একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী খ্রিস্টান ধর্মে ধমান্তরিত হয়ে গেছে বলে না। নিজেকে লজ্জ্বিত মনে হয়েছে এই ভেবে যে, যাদের কারণে আজ তারা কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের ধর্ম, ভাষা, উৎসব ভুলে গেল। যাদের দেখে তারা ভয় পায়, যাদের ঘৃণা করে, যাদের জন্য মনে চাপা ক্ষোভ জমে আছে, আমি সেইসব মানুষদেরই একজন। তারা বাঁচার জন্য সব জলাঞ্জলি দিয়ে আরেকটা বিশ্বাসের কাছে মাথা নত করল। আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখলাম।

অথচ আমরা কেউ এভাবে চিন্তা করলাম না, সাঁওতাল উৎসব হলে তা ইসলাম বা মুসলমানের, হিন্দু বা হিন্দু ধর্মের সৌন্দর্য্যও বাড়ায়। একজন উপজাতির বেঁচে থাকা মানে একদেশে আরেক খণ্ড বৈচিত্র্যের বাগান।

‘একাল চিরকাল’ উপন্যাসে রিজিয়া রহমান দেখিয়েছেন কিভাবে সরলপ্রাণ পাহাড়িদের খ্রিস্টান বানানো হয়েছে/হচ্ছে। প্রথমে খ্রিস্টান ধর্মজাজকেরা/মিশনারির লোকেরা গরীব এই মানুষগুলোর সাথে মিশেছে। উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে কোনো একটা প্রতিষ্ঠান/গির্জা/হাসপাতাল বানিয়ে তাদের সেবা করা শুরু করেছে। উৎসবে তাদের বিনা পয়সায় মদ খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। অভাবের তাড়নায় না খেয়ে থাকা মানুষদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছে। তাদেরকে দল উপদলে বিভক্ত করে/দ্বন্দ্ব লাগিয়ে দুর্বল করেছে। ৫ টাকা ১০ টাকা করে ঋণ দিতে দিতে হাজার, হাজার টাকার ঋণী করেছে। ঋণের পরিমান বেশি হলে ফেরৎ দিতে বলেছে। ফেরৎ দিতে না পারলে খ্রিস্টান হতে চাপ দিয়েছে। খ্রিস্টান হলে ঘরবাড়ি করে দিয়েছে, কাউকে কাউকে মাশোহারা দিয়ে গেছে। একটা ধর্ম মেনে নিলে খাওয়া পরার চিন্তা নাই দেখে আরও অনেকে বাপ দাদার ধর্ম-সংস্কৃতি ছেড়েছে। এভাবে ম্রিয়মান হয়েছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার বৈচিত্র্য।

এখানে শুধু ধর্মীয় চোখ দিয়ে দেখলে দেখবেন এক ধর্মের দেশে আরেক ধর্মের উদ্দেশ্যমূলক কাজকারবার। যদি মানুষের চোখ দিয়ে দেখেন। দেখবেন ক্ষুধার্ত মানুষ, তাদের দিকে বাড়িয়ে দেয়া দয়ালু হাত। সবেচয়ে বড় কথা হচ্ছে প্রয়োজন-চাহিদায় কারো পাশে থাকা, পাওয়া। উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। সেই প্রশ্ন সব ধর্মের বেলায়ই খাটে। আজকালতো দেখি ভারতের হিন্দু-বাংলাদেশের মুসলমানেরা মাদার তেরেসার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে সুখ খুঁজেন। কিন্তু কেউ কি তলিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করেন-কেন আমাদের সমাজে মাদার তেরেসাদের জন্ম হয় না! যেই খাদিজার (রা.) কথা বলে সংখ্যাগরিষ্ঠরা গর্ব করেন সেই খাদিজার মতো মহিলাতো দূরের কথা একজন পুরুষইবা কই আপনাদের জনপদে! আমিতো চারপাশে কেবল বাটপার দেখি।

আমিতো বাংলাদেশে প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর মানুষ দেখি না। ভরসা করার মতো কাঁধ খুঁজে পাই না। লম্বা লম্বা কথাওয়ালা বনমানুষের ভেংচি দেখি। বাটপার ও অশিক্ষিত অধ্যাপক, ব্যক্তিত্বহীন ও সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী, খয়রাতি ও অসৎ সাংবাদিক আর নীতিহীনদের মেলা দেখি। যে হুজুর কথা বলেন বেশি, তিনি খান আরও বেশি। তারপর তার ছেলের জন্য নেন, বউ-শালীর জন্য তুলে রাখেন। এরপর পারলে আত্মীয় স্বজনের পেট পুরিয়ে, নিজে আরেক দফা চালিয়ে হাই তুলেন - আহারে আমাদের নবীজির কষ্টের জীবন। টানা তিন দিন না খাওয়া-আহারে। না খেতে খেতে নবীজির পেট পিঠের সাথে লেগে গেছে। অথচ হুজুরের দেহের দুই হাত আগে তার পেট হাঁটে।

খাবারের আইটেম পছন্দ না হলে মাহফিল ক্যান্সেল করার কথাও শোনা যায়।

আমি এভাবে সবাইকে জেনারেলাইজড করছি না। কিন্ত আমি আমার এক জীবনে পাইনি ভক্তি শ্রদ্ধা করার মতো মুসলমান গুরু। যে সোনার মানুষের কথা আমরা শুনি সেই সোনার মানুষ এখনো আমার কাছে অধরা। খুব বিখ্যাত মানুষের কাছাকাছি গিয়ে দেখি মাকাল ফল। আখেরাত, পরকাল বলতে বলতে ইহকালে ধন ভাণ্ডার গড়ে তোলা মুমিন মুসলমানের অভাব নাই। পরর সম্পদ মেরে দিয়ে আলহামদুল্লিাহ বলা মুমিনে এই সমাজ ভরা। মুসলমান আছে মানুষ নাই। মানুষ আছে মনুষ্যত্ব নাই।

রংপুরের সাঁওতাল পল্লী ঘুরে: আমরা সুযোগ পেলে সাঁওতালদের কৃষি জমি দখল করি, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেই। কেউ কেউ মেকি প্রতিবাদ করে দায়িত্ব সারি। অথচ আমরা এমন পরিবশে তৈরি করতে পারতাম যেখানে থাকতে পারত ভালোবাসা-বিশ্বাস। আমার নিজের আমার রংপুরের পীরগঞ্জের সাঁওতাল পল্লী ঘুরে মনে হয়েছে সেখানে কেবল অবিশ্বাস আর ভয়। একই অঞ্চলে/গ্রামে বসবাস করেও সাঁওতালরা যেন দূর দ্বীপবাসিনী!

আমাদের সাথে থাকা স্থানীয় এক তরুণকে জিজ্ঞাসা করলাম-এমন কেন হলো? তার ভাষ্য-সাঁওতালদের দলে দলে খ্রিস্টান হওয়ার পেছনে মুসলমানদের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার একটা ব্যাপারও আছে। গরীব সাঁওতালরা মুসলমান বাড়িতে কাজ পায় না, পেলে তাদের নানাভাবে অসম্মান করা হয়। মুসলমানদের চলার রাস্তা দিয়ে সাঁওতালদের চলতে বাঁধা দেয়া হয়। মুসলিমদের কল থেকে পানি আনতে দেয়া হয় না। সাঁওতালদের নানাভাবে একঘরে করে রাখা হয়। সাঁওতাল মেয়েদের অপমান করা হয়। এভাবে বিচ্ছিন্ন সাঁওতালেরা একদিন আপনজন খুঁজে পান/খুঁজে নেন। খ্রিস্টান মিশনারির লোকজন তাদের দিকে ভালোবাসার, বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়।

সাঁওতাল পল্লীতে আমার সাথে ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. নিসতার জাহান কবির ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদুল হক। আমি সাঁওতাল শিশুদের সাথে কথা বলি। বাচ্চাদের কয়েকজনকে চকলেট কেনার জন্য টাকা দেই। দেখতে দেখতে মানুষ জমে যায়। দুই অধ্যাপকও খুঁটিনাটি অনেক কিছু জানার চেষ্টা করেন।

একেকটা সাঁওতাল ঘর যেন একেকটা শিল্পকর্ম। কি সুন্দর কারুকার্যে পুরো এলাকাটি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দেখলে মন ভরে যায়। আমাদের বসতে দেয়। কথা বলতে বলতে জিজ্ঞাসা করি সোহরায় (সাঁওতালদের নিজস্ব উৎসব) এখানে পালন করা হয় না? বাচ্চারা বুঝতে পারে না-কি জিনিস। বয়স্ক এক ভদ্রমহিলা উত্তর দেন-এখন বড়দিনই সাঁওতাল উৎসব আর কোন উৎসব নেই। আগে ছিল কি না জানি না…

আমি রংপুর ছেড়েছি সেই কবে। আজো শেষ বিকেলে সেই মহিলার অসহায় মুখখানি আমার চোখে ভাসে।

রংপুরের পীরগঞ্জের সাওতাল পল্লীতে ছবিটি তুলেছেন মাহমুদুল হক, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

ছবিতে: সাঁওতাল মানুষ, লেখক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. নিসতার জাহান কবির।

(সমাপ্ত)

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ১৩ ই জুন, ২০২১ রাত ৯:৩৪

কামাল১৮ বলেছেন: মুসলমানরা সাঁওতালদের অপমান অপদস্ত না করলে তার আর যাই হউক খৃষ্টান হতো না।তারা তাদের ধর্মেই থাকতো,যে ধর্ম তারা হাজার হাজার বছর ধরে পালন করে আসছে।

১৪ ই জুন, ২০২১ বিকাল ৪:২৩

সরোজ মেহেদী বলেছেন: মুসলমানরা, যারা নিজেদের মুসিলম নেতা, ইমাম (হুুজরেরা) পরিচয় দেন তারা কখনো এর দায়ভার এড়াতে পারেন না।

২| ১৪ ই জুন, ২০২১ সকাল ১০:২২

জগতারন বলেছেন:
I only read first part of this series!
Did not find any interest in it.

১৪ ই জুন, ২০২১ বিকাল ৪:২৪

সরোজ মেহেদী বলেছেন: কোথাও না কোথাও ইন্টরেস্টেড কিছু পেয়ে যাবেন। আপনি যে ইন্টারেস্টেড কোনো কিছু'র খোঁজ করছেন এটাই বড় কথা।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.