নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

গল্প, কবিতা, ছড়া, অণুকাব্য, অনুভূতি

আনেক কিছুই আমার অজানা... আমি অনেক কিছু জানতে চাই....

সাঈফ জামান

একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার, সারা বিশ্বের বিশ্বয় তুমি আমার অহংকার

সাঈফ জামান › বিস্তারিত পোস্টঃ

(গল্প) কিছু স্বপ্ন কিছু কথা

১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ বিকাল ৫:০৪

অনিন্দিতা ইচ্ছে করেই জানালার ভেতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে হাতে নিয়ে মুখে মাখবে বলে। কিন্তু বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কিছুতেই সে ধরতে পারছে না। অনিন্দিতার ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে! ইচ্ছে করছে ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে। কিন্তু এখন তাও সম্ভব না। বাবা আজ বাসায়। বাবা যতক্ষণ বাসায় থাকবে, ততোক্ষণ অনিন্দিতা চুপচাপ থাকবে। বাবার সাথে অনিন্দিতার খুব বেশি একটা কথা হয় না। অথচ তার যে কজন বন্ধু আছে, সবার বাবার সাথেই তাদের খুব ভাব। সুরভী হলো অনিন্দিতার খুব ভালো বন্ধু। এইতো সেদিন সুরভী তার বাবাকে নিয়ে এসেছিল কলেজে। সবার সাথেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। সুরভী সবার সামনেই তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল-
“পৃথিবীতে যদি, আমার সব চাইতে ভালো কোনো বন্ধু থাকে, তবে সে হলো আমার বাবা”
সে দিন সুরভীর বাবা সবাইকে খাইয়েছিল।
মনে মনে খুব হিংসে হচ্ছিল অনিন্দিতার।
অনিন্দিতা ভাবছে, “আমার বাবাকে জড়িয়ে ধরে যদি এমন কথা বলতে পারতাম!”

অনিন্দিতা জানালার ভেতর থেকে হাত বের করে এনে খাটে গিয়ে বসলো। আজ অনিন্দিতার মনটা ভীষণ খারাপ। মন খারাপের বিষয়টা অনিন্দিতা ধরতে পারছে না। বাবার সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে। শেষ কবে বাবার সাথে প্রাণ খুলে কথা বলেছে মনে নেই।

বাবার সাথে কিছু ছোট বেলার স্মৃতি:
তখন অনিন্দিতা খুব ছোট, বয়স সাত কি আট হবে। পেছন থেকে বাবার গলা জাপটে ধরে আছে। আর বাবার শরীরের ঘ্রাণ, নিঃশ্বাসের সাথে সাথে বুকের ভেতরে নিচ্ছে। বাবার শরীরের ঘ্রাণ যে কী পরিমান মিষ্টি তা কাওকেই বোঝানো সম্ভব না। অনিন্দিতা এখনো লুকিয়ে লুকিয়ে বাবার শার্ট শুঁকে ঘ্রাণ নেয়।

ছোট বেলায় মাঝেমাঝেই বাবা অনিন্দিতাকে বলতো,
“আমার মাথা থেকে বেছে বেছে পাকা চুলগুলি উঠিয়ে দেতো মা”
তখন পরম আনন্দের সাথে বাবার মাথার পাকা চুল উঠিয়ে দিতো অনিন্দিতা।

একদিন সারা দেশে খবর ছড়ালো, পৃথিবী নাকি ধ্বংস হয়ে যাবে। যেদিন বিজ্ঞানিরা পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার তারিখ দিয়েছিল, সেদিন রাতে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। অনিন্দিতা গুটিসুটি মেরে বাবাকে জাপটে ধরে শুয়ে আছে। বাবাকে মৃদু স্বরে বললো-
“বাবা আজ কী সত্যি সত্যি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে?”
বাবা বলেছিল-
“জানিনা, দোয়া দরুদ পড়তে থাকো আর ঘুমানোর চেষ্টা করো।”
অনিন্দিতা সেদিন সকাল বেলা উঠে দেখে সব কিছু আগের মতোই আছে। রাতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর মধ্যে যে কী পরম শান্তি ছিল, তা কখনোই ভুলতে পারবে না সে। অনিন্দিতার বারবারই মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাক তাতে কিছুই যায় আসে না। বাবাতো আামার পাশে আছে। আমার কিছুই হবে না।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে অনিন্দিতার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরছে। হঠাৎ করেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ এলো। অনিন্দিতা বললো-
“কে.....?”
“আমি, দরজাটা খোল্ মা”
অনিন্দিতা চোখ মুছে দরজা খুলে দিলো।
“কেমন আছিস রে মা”
“ভালো, বাবা তোমার শরীর কেমন আছে?”
“ভালো, কী করছিলি?”
“কিছু না বাবা, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছোঁয়ার চেষ্টা করছিলাম”
“আগের অভ্যাসটা এখনো তোর গেলো না। বৃষ্টি দেখলেই ভিজতে ইচ্ছে করে। এ নিয়ে ছোট বেলায় তোকে কত বকা দিয়েছি। তারপরও বৃষ্টি এলে ভিজতে চলে যেতি। তোর সাথে তো খুব বেশি একটা কথা হয় না আমার। সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকি। তাই গল্প করতে চলে এলাম।”
“খুব ভালো করেছো বাবা, তোমার সাথেও খুব গল্প করতে ইচ্ছে করছিল।”
“তোর পড়াশোনার কী খবর?”
অনিন্দিতা বাবার চোখের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলো, বাবার কোন কারণে হয়তো মন খারাপ।
“জী বাবা ভালো, বাবা তোমার কি কোনো কারণে মন খারাপ?”
“গ্রামের কথা খুব মনে পড়ছেরে মা, অনেকদিন হলো গ্রামে যাওয়া হয়না। একঘেয়েমি জীবন আর ভালোলাগে না। চল একদিন সবাই মিলে গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। তোর মাও গ্রামে যাওয়ার কথা বললো”
“বাবা আমারও ভালোলাগছে না। কবে যাবে?”
“এই সপ্তাহের মধ্যেই যেতে চাই।”
“ঠিক আছে তুমি সব ব্যবস্থা কর।”
“অনিন্দিতা।”
“জী বাবা।”
“তোর কি মনে আছে, তুই যখন খুব ছোট, তোর বয়স তখন নয় কী দশ হবে। তোকে সঙ্গে করে সন্ধ্যা রাতে হাঁটতে বের হয়েছিলাম। বাড়ির পাশের এক দোকানে গিয়ে বসলাম, হঠাৎ মসজিদে আজান পড়লো। আমি ভাবলাম বের যেহেতু হয়েছি তাহলে এশারেরনামাজটা পড়েই যাই। তোকে সেই দোকানে বসিয়ে রেখে আমি নামাজে গিয়েছিলাম। নামাজ শেষে এসে দেখি তই নাই। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বলে “এই খানেইতো বসা দেখছিলাম, কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি কোথায় গেলো।” আমি দোকানদারকে অনেক বকাবকি করেছিলাম সেদিন। পরে পথে তোর সুলতান চাচার সাথে দেখা। সে বললো তোকে নাকি বাড়িতে যেতে দেখেছে। একটু সস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলাম। তবুও ভয় কাটছিলো না। সুলতান যদি ভুল দেখে থাকে। তারপর যখন বাসায় এসে তোকে দেখি তখন শান্তির নিশ্বাস ফেলেছিলাম। ওইদিন যা ভয় পেয়েছিলাম। সে কথা আমার সারজীবন মনে থাকবে।”
“হ্যাঁ বাবা মনে আছে। ওইদিন আমিও অনেক ভয় পেয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম তুমি আর আসবে না। আমাকে রেখে বাসায় চলে গিয়েছ। আমার কথা তুমি ভুলেই গিয়েছ। তাই একা একাই বাসায় চলে এসেছিলাম। বাবা জনো, ওইদিন আমি ভীষণ ভয় পেয়েছি। কান্না করতে করতে বাসায় এসেছি।”
“হা... হা...”
“তুমি হাসছো? তুমি জানো আমি কিসের ভয় পেয়েছিলাম?”
“কিসের ভয়”
“ভুতের ভয়। এমন অন্ধকার রাত ছিল সেদিন। একটু একটু করে আগাই আর ভাবি এই বুঝি ভুত এলো। আমার জীবনে এমন ভয় আর কখনো পাইনি। সেই রাতের কথা আমার সারাজীবন মনে থাকবে।”
“হা... হা... হা...।”
“প্লিজ বাবা হেসোনা?”

অনেকদিন পর বাবার সাথে প্রাণ খুলে কথা হলো। ভীষণ ভালোলাগছে অনিন্দিতার। আসলে বাবা মেয়ের সম্পর্কটা হওয়া উচিত সবচাইতে ভালো বন্ধুর মতো।

গ্রামের কথা উঠতেই শফিকের কথা মনে পড়ে গেলো অনিন্দিতার। শফিক গ্রামের খুব সরল-সহজ একজন মানুষ। গায়ের রং শ্যাম বর্ণের। সবসময় ঢিলাঢালা শার্ট পরে থাকবে। গ্রামের কলেজ থেকে ফার্স্টক্লাস নিয়ে ডিগ্রি পাস করেছে। ছাত্র-ছাত্রী পড়াতো। গ্রামে প্রাইমারি স্কুলের চাকরির জন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছে শুনেছি। এখন শফিকের কী অবস্থা কে জানে? প্রায় দুই বছর হলো গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয় না অনিন্দিতার।
অনিন্দিাতা সেবার যখন এস.এস.সি পরিক্ষা শেষ করে, গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। শফিক সারাক্ষণ তাদের সময় দিয়েছিল। বিশেষ করে অনিন্দিতাকে সারা গ্রাম ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছে সে। শফিক যখন কথা বলে, তখন অনিন্দিতার মনে হয়, পৃথিবীতে যদি নিষ্পাপ কোনো মানুষ থাকে, তবে সে হলো শফিক ভাই। সেবার শফিককে ছেড়ে আসতে খুব কষ্ট হয়েছিল অনিন্দিতার। শফিককে মাঝেমাঝেই খুব দেখতে ইচ্ছে করে তার। কেনো জানি শফিককে ভীষণ ভালো লাগে। অনিন্দিতা সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবার যখন গ্রামে যাবে, শফিককে তার ভালো লাগার সব কথা খুলে বলবে।

প্রায় অনেকদিন পর গ্রামের মাটিতে পা রাখতে পেরে ভীষন ভালো লাগছে অনিন্দিতার। কেমন যেনো বুকের ভেতর শিহরন বয়ে যাচ্ছে, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। একধরণের ভয়ও কাজ করছে। এমন কেনো হচ্ছে বুঝতে পারছে না সে। সব কিছু মিলিয়ে নিজেকে খুব সুখী মনে হচ্ছে অনিন্দিতার। তাদের গ্রামের বাড়িটা বিশাল জায়গা জুড়ে। এই বাড়িতে তার দুই চাচা থাকে। মেঝো চাচা আর ছোট চাচা। মেঝো চাচার দুই ছেলে, মামুন ও সুমন। এবং ছোট চাচার এক মেয়ে ও এক ছেলে, রুবিয়া আর পলাশ। অনিন্দিতার বেশ ভালোই লাগে এই বাড়িতে থাকতে। বাড়িটি টিনশেড। ওপরে চালা আর চারদিক ইটের দেয়াল করা। বিশেষ করে যখন বৃষ্টি হয়, তখন বৃষ্টির শব্দ শুনতে এতো ভালো লাগে, যা বলে প্রকাশ করা যাবে না।

শফিকের সাথে পথেই দেখা হয়ে গেলো অনিন্দিতার। শফিক জিজ্ঞেস করে-
“কেমন আছো অনিন্দিতা?”
“ভালো, আপনি কেমন আছেন?”
“আমিও ভালো আছি। যাও বাড়িতে গিয়ে ফ্রেস হয়ে খাওয়া দাওয়া করে বিশ্রাম নাও।”
“শফিক ভাই, আমাকে দেখে অবাক হননি?”
“হু, একটুতো অবাক হয়েছি, তুমি এই কদিনে বেশ বড় হয়ে গেছো।”
“আপনি কী জানতেন আমরা আসবো?”
“হু, জানতাম। চাচি আমাকে গতকালই বলেছে তোমরা আসবে। এখন যাও বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নাও।”
“আপনি কী আজ আসবেন বাড়িতে?”
“দেখি সময় পেলে আসবো।”

শফিক এমন ভাবে বলবে অনিন্দিতা আশা করেনি। সে ভেবেছিল, শফিক আরও একটু জোড় দিয়ে বলবে, “অবশ্যই আসবো”

এখন বিকেল পাঁচটা বাজে। একবারের জন্যও শফিক দেখা করতে আসেনি। অথচ গতবার তাদেরকেই বেশি সময় দিয়েছিল। এ বাড়িতেই পরে থাকতো শফিক।

অনিন্দিতা ফ্রেস হয়ে, রুবিয়াকে ডাকলো। রুবিয়া হলো ছোট চাচার মেয়ে। এবার অষ্টম শ্রেনিতে পড়ে। রুবিয়াকে নিয়ে হাঁটতে বের হলো অনিন্দিতা। কিছুক্ষণ হাঁটার পর অনিন্দিতা বললো-
“চলো রুবিয়া, আমরা শফিক ভাইয়ের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি”

অনিন্দিতা আর রুবিয়া শফিকের বাড়িতে গিয়ে উঠলো। রুবিয়া ডাকছে-
“শফিক কাকা ও শফিক কাকা”
শফিকের ঘর থেকে শাড়ি পরা এক কিশোরী মেয়ে বের হয়ে এলো।
রুবিয়া বললো-
“দেহো কারে নিয়া আইছি, শফিক কাকা কই?”
“তোমার কাকায়তো বাড়ি নাই?”
অনিন্দিতা জিজ্ঞেস করলো-
“রুবিয়া, উনি কে?”
“ওনারে চিনলেন না, উনি হইলো শফিক কাকার বউ”

অনিন্দিতার শরীর বেয়ে ঘাম বের হতে লাগলো, এমন কিছু ঘটবে কল্পনাও করতে পারেনি অনিন্দিতা। মাথাটা যেনো ঝিম ধরে উঠেছে। মনে হচ্ছে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলছে সে, কি বলবে কিছ্ইু বুঝতে পারছে না। তবুও অনেক কষ্টে অনিন্দিতা বললো,
“আচ্ছা তাহলে আজ যাই, হাঁটতে বের হয়েছিলাম। ভাবলাম এদিক দিয়েই যখন যাচ্ছি, শফিক ভাইয়ের সাথে একটু দেখা করে যাই। আর একদিন আসবো।”

অনিন্দিতা খুব দ্রুত পায়ে হাঁটছে। পৃথিবীতে এমন কিছু কষ্ট আছে, এমন কিছু লুকানো কথা আছে, যা কখনো প্রকাশ করা যায় না। যা বুকে নিয়েই সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।


(গল্প)
কিছু স্বপ্ন কিছু কথা
------সাঈফ জামান

প্রকাশ: দুর্জয় বাংলা ম্যাগাজিন ২০১৪

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.