নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সায়েমা খাতুনঃ নৃবিজ্ঞানী, এথনোগ্রাফার এবং গল্পকার

সায়েমার ব্লগ

সায়েমা খাতুনঃ নৃবিজ্ঞানী, গবেষক ও লেখক

সায়েমার ব্লগ › বিস্তারিত পোস্টঃ

লিলি সিং সিন্ড্রোম ১

১৪ ই জুলাই, ২০২২ রাত ১০:৩৬



অনেক দিন ধরে লিলি সিং সিন্ড্রোম নিয়ে লিখবো ভাবছিলাম।একালের বিখ্যাত ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান শিখ ইউটিউবার এবং মার্কিন কমেডি চ্যানেল এনবিসির টক শো হোস্ট কমেডিয়ান লিলি সিং কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তাঁর অপ্রতিরোধ্য রসবোধ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাগুলো, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী, বর্ণবাদী, লিঙ্গবাদী আলাপচারিতাকে ধারালো ও মোক্ষমভাবে এক হাত দেখে নেয়ার জন্যে। ইংরেজিতে যাকে বলে একেবারে পেরেক ঠুকে দেয়ার জন্যে! শুধু ইউটিউবেই লিলি সিং এর রয়েছে প্রায় ১৫ মিলিয়ন বা দেড় কোটি অনুসারী।এই লিলি সিং বাংলাদেশী, পাকিস্তানী, ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান/কেনেডিয়ান পরিবারগুলোকে বিশেষভাবে জনপ্রিয় অনেকটা এই জন্যে যে, তাদেরই মত দেখতে বাদামী চামড়ার মেয়ের মূলধারার গণমাধ্যমে একটা জনপ্রিয় স্বর হয়ে ওঠার সাথে সাথে যেন কিছুটা তাদেরই স্বর শোনা গেলো। হোয়াইট ওয়াশ মিডিয়ায় এক বাদামী চামড়ার তরুণীকে দেখে আমাদের ঘরেও বেশ একটা হর্ষধ্বনি ওঠে।আমেরিকা কানাডার দেশী কমিউনিটিতে লিলি সিং এক অনুপ্রেরণা ও আত্মবিশ্বাসের নাম হয়ে ওঠে! শাদাদের রাজ্যে লিলি সিং এক জ্বলজ্বলে বাদামী পতাকা!

লিলি সিং এর প্রথমদিকের ভিডিওগুলো অনেকটাই নিজের টরণ্টোনিবাসী পাঞ্জাবি পরিবারের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতাকে উপজীব্য করে করা, যাতে আমি আর আলিনা হেসে খুন হয়ে যাই। আমাদের বাদামী চামড়ার মানুষের মার্কিন-কানাডীয় সমাজে অন্তর্ভুক্ত হতে পারা না পারার অসামঞ্জস্যগুলো নিয়ে তুমুল হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে আমরা দুই প্রজন্মের অভিবাসী নারী লিলি সিং এর সঙ্গে একাত্ম হই, নিজের পরিচয় খুঁজে পাই, সব চেয়ে বড় কথা, শেকড়চ্যুত হওয়ার, অন্তর্ভুক্ত হতে না পারবার যন্ত্রণা থেকে খানিকক্ষণ উপশম লাভ করি। এক আমাকে হারিয়ে আবার এক আমি হয়ে উঠি! লিলি সিং এর কমেডি আমাদের বিচ্ছিন্নতার এক ধরনের প্রশমন করে, আমাদের আত্মপরিচয় হারাবার ভয়কে নিরাময় করে নতুন করে স্থাপিত করে।লিলি সিং ঘরে ঘরে প্রিয় নাম হয়ে ওঠে।আমি এমনকি লিলি সিং নামের সিঁদুর রঙা লিপস্টিকও ব্যবহার করি (আমি তাই, যা আমি কিনি)! লিলি সিং এর রসে সিক্ত হতে চাই।

লিলি সিং এর প্রথম দিকের ভিডিও কন্টেন্টের একটা প্রধান উপজীব্য ছিল দেশী প্যারেন্টিং! লিলি সিং বাবামাকে নিয়ে মশকরা শুরু করে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করে এবং কোটিপতিহয়ে ওঠে l এখান থেকেই আমার আর আলিনার দুই বার্তা গ্রহণের বিষয়টি আসে! লিলি সিং এর মধ্যে আমি আমার কন্যাকে দেখতে পাই।আর আলিনা তার বাবা-মায়ের দুর্বোধ্য প্যারেন্টিং এর একটা মানে করতে পারে।মা হিসেবে আমি বুঝি যে, স্কুলে আর বাড়িতে - দুই সামাজিক-সাংস্কৃতিক মান এবং আকাঙ্ক্ষার চাপে বেচারা দেশী বাচ্চাগুলা দিশেহারা হয়ে যায়। মূলধারার শাদাদের অতি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী জীবনধারা এবং চরিত্র গঠনের ধরনের সাথে দেশী প্যারেন্টিং প্রায় ১৮০ ডিগ্রী দূরত্বে থাকে। বাবামায়ের জীবনে এক সময় সেই সব সংঘাত আমেরিকান দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। যদিও সারাদিন শেখানো হচ্ছে, তোমাকে তুমি হতে হবে। স্বাধীনতা মানে হল, আমি হতে পারবার স্বাধীনতা। কিন্তু এই আমি কি বাঙ্গালী হতে পারে? পাঞ্জাবী হতে পারে ? মুসলমান হতে পারে? যৌথবাদী হতে পারে? লিলি সিং অনেকটাই পশ্চিমের বাচ্চাদের দেশী প্যারেন্টিং এ বড় হওয়ার অসামঞ্জস্যকে দুর্দান্তভাবে স্বর দেয়। কিন্তু শেষ অবধি পুঁজিবাদী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী যুক্তিশীল কর্মনৈতিক বাজারসংস্কৃতির পশ্চিম সবাইকেই তার পেটে হজম করে নেয়।সেখানে বাস করে ধীরে ধীরে আমাদের আর বাংলাদেশী, পাকিস্তানী, ভারতীয় - ইত্যাদি হয়ে থাকা সম্ভব হয় না। তাছাড়া এইগুলোও কি কোন সমরূপ পরিচয়? এই জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের ঘেরাটোপও কত সহিংস পীড়নের চর্চা করে না কি? পশ্চিমে বসে আমি তাহলে কোন আমি হতে পারছি? কিভাবে পারছি? শ্বেতাঙ্গ মূলধারার সংস্কৃতির মধ্যে ধীরে ধীরে পরিচয় বৈচিত্র্যের বিলীন হওয়ার বিষাদ আরেক পাঞ্জাবি কানাডীয় তরুণ কবি রুপি কাউরের মত লিলি সিং ধারণ করতে পারে না।লিলি সিং শাদাদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়া সম্ভব হয় মূলত তার বাবা-মার দেশি প্যারেন্টিং নিয়ে মশকরা করে, যা দেখে তারা কুটি কুটি হেসে গড়িয়ে পড়ে।দেশি প্যারেন্টিং শাদাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে কতইনা হাস্যকর! আমি আর আলিনাও হেসে গড়াগড়ি খাই। আমি বুঝতে পারি, আমার সন্তান মানুষ করবার পদ্ধতি আমার মেয়ের কাছে কত হাস্যকর ঠেকে! বাবা-মায়ের কাণ্ড-কারখানা বাচ্চাদের বাড়তি টেনশন তৈরি করে, তাদের বন্ধুদের সামনে বিব্রত করে। দেশি প্যারেন্টিং এর পদ্ধতি সন্তানের উপর জোর-জবরদস্তির দোষে দুষ্ট হয়ে উঠে।আবার উল্টো দিকে বাচ্চারদের আচরণও দেশি সমাজে বাবামায়ের জন্যে অস্বস্তি ও বিব্রতকর হয়ে ওঠে! শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে নিজেকে হারিয়ে ফেলা! আমার রান্না-বান্না, আমার পোশাক-আশাক, সংস্কৃতি, আমার ভাষা, আমার ধর্মাচরণ, আমার জীবনাচরণকে পরের প্রজন্মের কাছে বাহিত করতে না পারবার মধ্য দিয়ে আমার সংস্কৃতির ধীরে ধীরে মৃত্যু ঘণ্টা বাজতে শুরু করে। আমার জানতে ইচ্ছা করে লিলি সিং এর মা-বাবা মালভিন্দার কাউর এবং সুখভিন্দার সিং এর অভিবাসী জীবনের কঠোর সংগ্রামের গল্প! নিজেকে অনেকটা হারিয়ে গল্পগুলো! কিভাবে আমাদের সন্তান একটু একটু করে শাদাদের সংস্কৃতির নিকটবর্তী হয়ে ওঠে! যাকে বলে আত্মবিশ্বাসী হওয়া! সাফল্যের অর্থ অনেকটাই তাতে দাঁড়িয়ে যায়! আমি না হওয়াটাই সাফল্য! যা কিছু আমি, তার থেকে একটু একটু করে দুরে চলে যেতে থাকে। আমি আর আমি থাকতে পারি না। আমি অন্য কেউ হয়ে উঠি!

এটাকেই আমি বলি লিলি সিং সিন্ড্রোম! !

জুলাই ১৪ ২০২২

Picture: India TV News

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.