| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আঁধার অন্তরালে
একজন , দুজন না, নয় নয়জন মেয়ে আমাকে প্রেমের অফার দিয়েছে । বন্ধুরা বলে, আমি নাকি মেয়েকপালী।
না, আমার রুপটুপ ততো উচ্চাঙ্গের না ।ঐ চোখদুটোই যা ঢলোঢলো মায়াকাড়া । আমার এক প্রাক্তন প্রেয়সী হেমলিনী , ও বলতো , ‘কেন জানি না , তোমার চোখের দিকে তাকালে আমার চোখে জল নেমে আসে । এমন পবিত্র !’। আর একটা ব্যাপার , আমার চুলগুলো বেশ কোমল আর আদুরে, পাকটাক নেই, সাটসাট লম্বা, হাওয়ায় ওড়ে ।দুটি বিষয়ে আমার বেশ দক্ষতা- বাঁশি বাজাতে আর খোলামকুচি খেলতে ।
আমি বিপুল রায় । অটো-রিক্সা চালায় । আগে নিজের-ই ছিল , লুটেরাদের হাতে সে লুট গেছে । এখন ভাঁড়ায় চালায় ।
আমার বাবা বিজয় রায় । বাবার ঠাকুর-দা প্রজয় রায় । এই প্রজয় রায় ছিলেন যশোর অঞ্চলের একজন জমিদার ।কিন্তু ব্যাটা মদ, জুয়া আর বারনারী, নতর্কীদের পাল্লায় সব উড়িয়ে, পুড়িয়ে, ছড়িয়ে একেবারে দেউলিয়া হয়ে একাল ছেড়েছে । তারই রক্তধারার আরেক যোগ্য উত্তরসূরী আমার দাদু অজয় রায়। জমিদারিত্বের যা একটু অবশিষ্ট ছিল, সেগুলো অজয় বাবুর সহ্য হল না । একেবারে সর্বশান্ত হয়ে পথে বসে তবে তিনি শান্ত হলেন । মুখে বোল ফুটতেই বাবাকে মুখাগ্নি করতে হল ।
আমাদের ইস্কুলের গেট দারোয়ান ছিলেন- মঙল পান্ডে । প্রথম সিপাহী বিদ্রহী না কিন্ত ।তবে উনার ছিল যোদ্ধার মতো সুঠাম দেহ আর মুখশ্রী সত্যি দেখবার মতো । সবসময় পরিপাটি হয়ে সে্জেগুজে থাকত আর কথা বলার সময় শুদ্ধ বাংলা বলার চেষ্টা করত । তাই অনেকে টিটকারী মেরে স্যার স্যার করত ।
একদিন বিকেলে বাজারের চায়ের দোকানে প্রবেশ করতেই কয়েকজন বলল, আরে শার এইচে, বস বস । কদিন দেখিনি যে ।
উনি বলল , ওরে তুরা ক্যান আমাকে স্যার বলিস বল তো । আমি কি ইস্কুলে পড়ায়? এসব ইয়ারকি ভাল্লাগে না ।
আমার কাকু জগমোহন রায়, এক কথায় শয়তান লোক, মানুষকে উপহাস করা তার ভীষন আনন্দের ।
বলল, না, না শার, ভালো না লাগলে কি হবে? ইস্কুলটা তো বলতে গেলে আপনার মাথার উপরেই চলছে- সে কি আর দশজন জানে না ।
দ্যাখো জগমোহন, এভাবে করলে তো আমায় ঘর-বন্দী হতে হবে । এই যদু, ফটাফট এক কাপ কড়া চা দে তো । দুধ চিনি ধরে দিস ।
জ়গমোহন কাকু বলল, ওরে যদু , মাষ্টার মশাই কে চট করে চা টা দে । শুনলি তো- দুধ চিনি লিকার একটু ধরে দিস । শারদের কত রাত জেগে খাতাপত্র দেখতে হয় ।
মঙল পান্ডে ফট করে উঠে গমগম করে চলে গেল । চায়ের দোকানে হোহো, হেহে ___ হাসির হিড়িক পরে গেল ।
এই মঙল পান্ডের মেয়ে দিশা পান্ডে ছিল আমার সহপাঠিনী । পদ্মগাছে তো পদ্মফুল ধরবে- তাইত নিয়ম । গৌরবর্ণা দিশার ঘনকালো আয়ত চোখ , ছিপছিপে দেহ , মধুর সরল হাসি, টসটসে কথা আমার বুকের একেবারে গহীনে ঠকঠক করে ঘা মারত । সব ক্লাসে বরাবর প্রথম হয়ে আসছে ।
আমার অবস্থান ছিল তেয়াতর নাম্বারে। অর্থাৎ আমার পরে আরো পাঁচজন বলদ ছিল ।পড়ালেখায় মন ছিল না তবে রোজ- ঝড়, বাদলা কিংবা কুয়াশা কাটিয়ে সবার আগে ইস্কুলে পৌঁছে আমার প্রিয় লাস্ট বেঞ্চে বসতাম । কান ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রথমা তন্মী বালিকার অপরুপ কেশবিন্যাসে অপলক চেয়ে ভাবতাম , ও চাঁদের মতো, ও রঙ-জ্বলা মেঘের মতো- কোনদিন কোন ক্ষণে ওর রুপের কমতি নেই । একেই বলে সুন্দর । তখন রোববার গল্প পড়েছি । আমার এক বলদ সতী্র্থ প্রদীপকে বলতাম, দিশা হলো ভগমানের বাড়াবাড়ি, বুঝলি ।
পরীক্ষা তখন দরজায় টোকা মারছে ।রাত্রিবেলা ভয়ংকর সব দুঃস্বপ্ন বিছানায় হানা দেয় । কিন্ত পড়তে বসলেই আমার চঞ্চলা মন চাঁদের আলোয় , ফুলের গন্ধে , পাখির গানে কেমন উতলা হয়ে যেত । তখন সমস্ত চোখে জল নিয়ে ক্লান্ত শুকতারার মতো দিশার দুটি চোখ আমার হৃদয়ের প্রদীপ হয়ে জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠত । বিভোর কল্পনায় ভেসে চলে যেত আমার মনের ঘোড়া ।কল্পনার সূতো কেঁটে কেঁটে রাতের প্রহর জলে ভেসে যেত ।মন্ত্র-তন্ত্র-যন্ত্রে উড়াল মন বাঁধা মানল না ।জগমোহন কাকু বলল , তোর আর কি দোষ দেব রে, যত দোষ সব বয়সের । তাছারা বংশের রক্তটায় তো এমন ।
গণিতবাদে সবগুলোতে পাশ! বাপরে বাপ ! সেই আনন্দে আমার হৃদয় মন একেবারে উছলে উঠল । বিকেল থেকেই টো মেরে বসে আছি , কিন্ত সুবিধা করতে না পেরে সন্ধ্যার আঁধারে হসপিটাল বাগান থেকে পটাপট বেশ ক’টা গোলাপ চুড়ি করে দৌঁড় দিলাম দিশার কাছে । হাতে কাঁটা ফুটেছে - ফুটুক, দিশা অন্তত বুজুক আমিও ফেলনা নই ।
তোর ফেলের কথা শুনে খুব খারাপ লাগছে রে । দিশা জানাল ।
ওই অংকটায় যে কিভাবে আটকে গেলাম মাথায় খেলছে না । শালার খাতা দেখায় নিশ্চয় ভেজাল আছে বুঝলি ।
তাই হবে বোধ হয় ।
বললাম, তুই মন খারাপ করিস না দিশা । সামনের বছর তো পাশ করছিই ।
ও বলল , হ্যা তা তো করবিই ।
তখন ফুলগুলো ওর সামনে ধরতেই ও চমকে উঠল , ফুল এনেছিস ক্যান ?
জেলাতে তুই প্রথম হলি । কি ভালো লাগছে ।
ও হাত বাড়িয়ে বলল , তুই ছাড়া কেউ কিন্ত দেয় নি । তারপর মৃদু হাসল । সে হাসি যে কি সে কি বলব । ওর হাতের পরশ লাগল আমার হাতে । যেন উন্মাদ মেঘে মেঘে ঘর্ষন লেগে বহু শতাব্দির গোপন আগুন মুক্তির আনন্দে একেবারে দিশাহারা হয়ে গেল । যদি পাশটা হয়ে যেত না তবে আজ বলেই ফেলতাম- তুই আমার । কিন্ত পোড়া কপাল আমার !
খুশিতে প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছি কিন্ত এ পাড়ার কুকুরগুলোর সেই আনন্দ সহ্য হল না । অসহায়ে ভয়ে চোখে জল এসে গেল । তখন লাইটার মেরে মঙল পান্ডে বাবু গলায় খাকানি দিতে দিতে সামনে এসে দাঁড়াল । অন্ধকারে চিনতে না পেরে বলল , কে, কে রে ?
আমি কাকা , বিপুল ।
ওহ! কুকুরগুলো তাড়িয়ে বলল , তোমার কাকু- জগা এমন খচ্চর ক্যান বল তো । আমি মেয়েকে বিলেতে পড়াব কি আমেরিকায় পড়াব তাতে ওর কি ! শয়তান লোক কোথাকার!
বললাম , কাকুকে তো জানেন, ওই রকম-ই ।
আজ আমিও ছেড়ে দিইনি । যাক তুমি তো ফেল করেছ ।
লজ্জায় বেদনায় বুকটা জমে গেল । বললাল, হ্যা একটাতে ।
কি বলব আর , জগার মতো না হয়ে লেখাপড়ায় মন দেও গে ।
দিশা খুলনা চলে গেল কলেজ পড়তে । শুনলাম ও নাকি কার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে । খেতেই পারে-দোষ কি? আমার তখন ঘোর কেটে গেছে । সেদিন রাতের কথা মনে হলে লজ্জায় মাথা কাটা যায় । দুষ্প্রাপ্য দিশাকে ভুলে তখন হেমনলিনীর সাথে লাইন মারছি । মাইরি বলছি ও আমায় যতটা ভক্তি করত তা লাখে দুজনের কপালে জোটে না ।
এর মধ্যে একদিন গ্রাম ব্যাপী হৈ হৈ রৈ রৈ পরে গেল । চায়ের দোকানে বসে জগমোহন কাকু বলল, ছ্যা ছ্যা ছ্যা ছ্যা , শেষ পর্যন্ত কিনা ভিডিও করে… ছুরিকে একেবারে ন্যাংটা করে ফেলেছে রে । হে হে হে ।
হুলস্থুল পড়ে গেল, দেকি দেকি, এরে তাইতো , এ তো মঙঈলার বেটিই তো রে, হায় ! হায়! কি অবস্থা!
পিরিত টিরিত কি আমাদের কালে ছিল না গো জগমোহন , এমন বেনিল্লাপনা ত দেখিনি ।
আর কিছুদিন বাঁচোই , আরো কত দেখবে ।
প্রদীপকে বললাম , ছেলেটা কে রে?
কে আবার , ওই নাগরটায় হবে । আর হয়ত বনছে না । এমন প্রেমিকের মুখে থুতু মারি ।
ঘরে ঘরে, মাচানে মাচানে , দোকানে দোকানে – এই নিয়ে গরম হাওয়া ।লজ্জা,অপমানের ভার সইতে না পেরে এক রাতে মঙ্গল পান্ডে তমাল ডালে ঝুলল । দিশা সেই পথে না গিয়ে অন্ধকারে কোন পথে , কোথায় চলে গেল- কেউ জানে না ।
চারিপাশটা থমকে গেল । দীগন্ত জুড়ে কেবল শুন্যতা , কেবল বিষন্নতা, কেউ যেন কোথাও নেই ।সুপ্ত প্রেমের ঘুম ভাঙল । বুকের মধ্যে এ্কটা অসহ্য বাথাভার ক্ষনে ক্ষনে গুমরে উঠছিল । তার-ই মধ্যে একদিন হটাৎ হেমনলিনীর বিয়ে হয়ে গেল । আমারও সব বাঁধা বন্ধন ছিড়ে গেল ।
সেদিন আশ্বিন মাসের কৃষপক্ষের রাত । কোজাগরী উপসী চাঁদের পড়ন্ত বেলাতেও রূপ-জোৎস্না ঠিকরে পড়ছে । গীর্জায় তখন ঢং ঢং করে দুটো ঘন্টা দিয়ে জানিয়ে দিল এখন রাত দুটো । দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছি – মায়ের কথা মনে পরছে ।আমার মায়ের খোলা গলায় – রবী ঠাকুরের গান আরো সরস , আরো সজীব হয়ে ওঠে । সেই সতের বছরে বিধবা, বৈধব্যের ব্যাথা বুকে দীর্ঘ জীবন দাঁড়িয়ে আছে । অস্তোগামী সূর্যের রক্তিম রেখা মায়ের কপালে কখন দেখিছি বলে মনে নেই । আমাকে নিয়ে তার-ও কত স্বপ্ন ছিল , কিছুই হল না । ছেলে শহরে অটো-রিক্সা চালাবে এ নিশ্চয় কখন ভাবে নি- অথচ তাই তো করতে হচ্ছে ।
একজন ভদ্র-গোছের লোক এসে বলল , এই যে ভাই যাবে?
কোথায়?
কুমারপাড়া, দু’ঘন্টার জন্য রিজার্ভ নেব ।
ঠিক আছে ।
পথঘাট শুনশান । যে কয়জন চোখে পড়ে তাদের বেশির ভাগ নেশাখোর আর বারনারী । ছমছম আঁধার চিড়ে একটা বাদুর ডানা ঝাপটিয়ে চলে গেল ।
কুমারপাড়া পৌঁছে উনি বলল , দাঁড়িয়ে থাকো । দেরি হলেও যেও না, ভাড়া পুষিয়ে দেব ।
ঠিক আছে, অপেক্ষা করছি ।
রাত তখন ফুরিয়ে আসছে । শিউলি ফুলের গন্ধে আকুল শেষ রাত্রির শীতল বাতাস । যন্ত্রনার অপেক্ষা শেষে ভদ্রলোক বেরিয়ে আসছে । আমার ঘুম জড়ানো চোখ, তবু ওকে বিদায় দিতে আসা মেয়েটাকে চিনতে ভুল হলো না যে ও দিশা ।মাথায় আকাশ ভেংগে পড়ল । এ কি !
এক কুকুরকে টানতে টানতে আমার মাথায় আরেক কুকুর জাগল । ঘুটঘুটে অন্ধকারে গাড়ি থামিয়ে ভদ্রলোককে বেধর চড়-থাপ্পর-লাথি মেরে চলে এলাম ।
ছটফটে প্রহর শেষে ভোরের আলোয় এসে দেখি ভাঙা কাঠের দরজায় তালা ঝুলছে ।
চায়ের দোকানীকে বললাম, ঐ বাড়িতে কে থাকে তা কি জানেন?
ঐ পুরাতন হলুদ বাড়িটাই?
হ্যা, হ্যা ঐটাই ।
ওই নিশিদেবী নামে এক খারাপ মেয়ে থাকে বুঝলেন । দিনে পাবেন না । রাতে আসে ।
আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে । সন্ধ্যার আঁধারে একজন বৃদ্ধা হারিকেন হাতে দরজা খুলে ভিতরে চলে গেল।
ঝড় উঠেছে । বিদ্যুৎ চলে গেছে ।ঘন-ঘোর অন্ধকারের প্রবল আশ্বিনী ঝড় বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি এইসময় দ্রুত পায়ে দিশা আসল । ঝড়ের ঝাপটাই ওর হাতের প্রদীপ নিভে গেল । দীগন্তের মেঘ চিড়ে বিজুলী আলো এসে পড়ল ওর চোখে মুখে ।সেই আলোক ঝলকে চমকে বিস্মিত হতবাক দিশা উৎসুক চোখে দাঁড়িয়ে রইল । ওর বেপরোয়া এলোচুল আর শাড়ির নীল আঁচল শূন্যে উথাল পাথাল ভাসছে ।
মুখমুখি দুজনই নির্বাক । সব কথা যেন আজ ঝড়ের হাওয়ায় উড়ে গেছে । ভুত দেখা হয়ে গেলে ঝড়ের চেয়ে দ্রুত গতিতে দিশা ভিতরে চলে গেল ।যেতে যেতে থমকে পেছন ঘুরে ও বলল, আপনি কি চান, পিছু নিয়েছেন ক্যান?
ঘুটঘুটে অন্ধকার । কেন জানি না , আমার পা কম্পনে টলমল করছে । বললাম, কি বলছিস যা তা, আমি বিপুল, দিশা ।
কে দিশা? আর আমি বিপুল টিপুল কাউকে চিনি না। ঘরে পৌঁছে চিৎকার করে বলল , মাসী দরজা লাগিয়ে দেও , আর সবাইকে আজ ফিরে যেতে বলবে ।বলেই দিশা সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে গেল ।
কাজের মেয়েটা এসে বলল, কি ,কানে শোন না নাকি? যাও আজ হবে না।
ওর হাতে ঝাটকা মেরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই বৃদ্ধা চেঁচিয়ে বলল, ওই ওই নাম নাম, আরে এ যে দেকি পাক্কা ডাকাত রে ।
ঝড় থেমে গেছে । টিপটিপ বৃষ্টি-টা তখনও ছিল । দিশা শান্ত হয়েছে । ও বলল , মরতে আমি-ও চেয়েছিনু । পারি নি ।হ্যারে বিপুল, আমাকে তোর ঘেন্না করছে না ?
ঘেন্না করবে ক্যান?
জানিস আমার একটা দেড় বছর-ই ছেলে আছে?
না, জানব কি করে?
দেখিস কি সুন্দর হয়েছে ! ও একটা দীঘশ্বাস ফেলে বলল বেশ্যার-ও মা হতে সাধ হয় রে ।দিশা হাসতে লাগল । সে হাসিতে যে কত দুঃখ কত বেদনা মিলেমিশে ছিল তাই যেন ভোরের আলোর মতো স্পষ্ট হল ।
বৃদ্ধা এসে বলল , অরূপ বাবু এইচে ।
ওহ! ঘরে আলো জ্বেলে দেও । আমি আসছি । দিশা বলল ।
আমার দিকে তাকিয়ে, এখানেই তো থাকিস , মাঝে মাঝে আসিস ,গল্প হবে ।
তুই কি আমাকে চলে যেতে বলছিস ?
উপায় নেই ।
সিঁড়ির মুখে গতকালের ভদ্রলোকের সাথে দেখা । তাহলে এই অরূপ বাবু! ওর চোখ-মুখ এখনও ফুলে আছে । আমাকে দেখেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল । এই শালা তুই । ওরে কে আছিস , শুয়োর-টারে বাঁধ ।
কেউ নেই । বলে ওর কলার ধরতেই উন্মাদের মতো হাত ঘোরাতে লাগল । মারপিট লাগতেই সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে দিশা বলল , ছেড়ে দে বিপুল । তুই এখন-ই বেরিয়ে যা । আর আসবি না ।
ওর আদেশের হাত তখন শূন্যে ভেসে বাইরের পথ দেখাচ্ছে ।
ঘৃণা, অভিমান, ক্রোধ নিয়ে চলে এলাম ।যার দেহে রাজ্যের মাতাল গুন্ডাদের ছাপ , যার পুত্রের বাপের ঠিক নেই , যে নারী সমাজের প্রতিষ্ঠিত পতিতা – তার সাথে সংস্রব রাখবার কোন মানে হয়!
সেদিন কত রাত্রি কে জানে –সন্ধ্যার সরকার পক্ষ এবং বিরোধী দলের মধ্যে সংঘর্ষের ছোপ ছোপ রক্ত তখন রাস্তায় রাস্তায় । শুনশান হয়ে গেছে পথঘাট । রাস্তায় হলুদ সোডিয়াম আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা দিশাকে মন থেকে কিছুতেই এড়ানো গেল না ।বুকের মধ্যে এক দুর্নিবার ঝড় বয়ে গেল । ওকে মনে হল ও আমার চিরকালের ।সব কিছু চুরমার করে ভেঙ্গে ওকে আপনার করে পাবার এক সীমাহীন উন্মাদনা জাগল । কথাবার্তায় টের পেলাম ও নেশাগ্রস্থ ।
শুক্লা পঞমীর রাত । চাঁদের ঈষৎ আলোয় ওর মায়াবী মুখখানি আমার হৃদয় মোহাবিস্ট করে ফেলল । ভেতরের আরেক প্রাণ জেগে উঠল ।বুকের মধ্যে ওকে আঁকড়ে নিতেই দিশা বলল , আমাকে ছাড়িস না বিপুল, শক্ত করে জড়িয়ে ধর , দ্যাখ আমার বুক পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ।
কোথা থেকে চারজন উড়ে এসে চিলের মতো ছো মেরে চড় থাপ্পর কষিয়ে বলল, ভদ্রপাড়ায় ফস্টিনস্টি হচ্ছে না ।
আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললাম, না শুনুন , ও আমার …
কি বউ?
না কিন্তু…
দিশার নেশাটা তখন ধরে এসেছে । ও অবিরাম প্রলাপ বকছে, ওগো পায়ে পড়ছি , ওকে মেরনা । ও আমায় ভীষন ভালবাসে ।
ওরা মুখ বেঁধে প্রবল বৃষ্টির মতো ঘায়ের পর ঘা মেরে অন্ধকার গলির ভিতর একটা বকুল গাছে বেঁধে দৌঁড়ে পালাল ।
দিশার অবিরাম প্রলাপধ্বনি দূর থেকে দূরে রাত্রির বাতাসে মিলিয়ে গেল । অন্ধকারে তখন একটা করূণ পাপিয়া ও দূরাগত গির্জার আহত মিলিত ধ্বনি হায় হায় করে উঠল ।
©somewhere in net ltd.
১|
২৬ শে জুন, ২০১৪ রাত ১:০২
আহসানের ব্লগ বলেছেন: ভাল লিখেছেন