| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
উত্তরীয় হাওয়া
লালনীয় মানবিকতার এক সাগরেদ আমি। আমার আমিত্বে নেই কোন বিষেশত্ব। সরলতাই আমার সম্পদ। ``মানুষ ভজিলে সোনার মানুষ হবি`` এই আমার আদর্শ
টমাস আলভা এডিসনের আবিষ্কৃত বিদ্যুৎ তখনো #নারায়নপুর গ্রামে পৌছায় নি। বক্কর মেম্বার পল্লীবিদ্যুৎ অফিসকে স্পষ্টভাবে বলেছিল, " হামার কাছে তেলের ন্যাম্পই ভাল। হামরা কারেন্ট দিয়া কি করি?" তাই সন্ধ্যা মানেই নারায়নপুরের ঘরে ঘরে তখন সলতের কুপি। সন্ধ্যা মানেই গভীর অন্ধকার আর ঝি ঝি পোকার ডাক। রাত আটটায় মানে ঘরে ঘরে গভীর ঘুমের প্রতিযোগিতা। কিন্তু #রাজুরা এত সকালে ঘুমাতে পারতো না। বাপের আদেশ এত সকালে কিসের ঘুম। পড়ালেখা করতে হবে। কেননা বাপ ছিল চরম মেজাজি মানুষ। স্কুলে বাপের ছাত্র থাকা অবস্থায় পড়তে না পারার কারনে বাপের হাতে রাজুর অবর্ননীয় কঞ্চির বারি খাবার কথা কমবেশি সবাই জানতো। তাই মনে না চাইলেও ভান করে কুপির সামনে বসে থাকতে হবে। রাজুর অন্য ভাইবোনের এই অভিনয় পারলেও সে পারতো না। দাদা নাফাতুল্লা শেখের রেখে যাওয়া ২০০ বছরের বেশি পুরনো উচু খাটটার শিং-এ কুপিটা রেখে বইটা সামনে মেলে ধরতে না ধরতেই ঘুমিয়ে পরতো রাজু। মা নামাজ শেষে কুপিটা বন্ধ করে দিত।
গ্রীষ্মকাল মানেই রাজুদের গ্রাম এক আড্ডাময় গ্রাম। বিদ্যুৎ না থাকায় হাতপাখায় ক্লান্ত হয়ে সব পুরুষেরা রাস্তার মোড়ে, কিংবা টংগের দোকানে বা ব্রীজের উপরে আড্ডায় কিংবা আলোচনা-সমালোচনায় মজে যেত। এর বউ ওর সাথে পালিয়েছে, অমুকের সাথে তমুকের ঝগড়া হইছে ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বহুরাত পর্যন্ত জটলা থাকতো রাস্তার মোড়ে। এটাই ছিল গ্রীষ্মকালের নিত্যদিনের রুটিন। সে সময় মাঝে মাঝে ভাওয়াইয়া কিংবা জারি-সারি গান চলতো গভীর রাত পর্যন্ত।
নারায়নপুরে সে সময় বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল #আফজালের_রেডিও। সন্ধ্যা মানেই গ্রামের সিংহভাগ ছেলে পুরুষ আফজালের দোকানমুখী। প্রধান লক্ষ্য #বিবিসি শোনা। #সাদ্দামের সাথে আমেরিকা যুদ্ধের সর্বশেষ কি অবস্থা! ওসামা বিন লাদেন কোথায় নানা জ্বলন্ত টপিকস সে সময় তাদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। খবর চলতো, সবাই গভীর মনোযোগ আর পিনপতন নীরবতার মধ্যদিয়ে শ্রোতার কাজ করতো। বাধ সাধতো আফজালের রুটি, বিস্কুট, সামুছা বিক্রির ধান্ধা। তার রেডিও-তে খবর শুনতে হলে অবশ্যই খেতে হবে। কেউ যদি না খাবার কথা বলতো সে রেডিও এমন এক সময় বন্ধ করে দিত যখন খবরের মুল আকর্ষন সবার মাঝে মানুষিক চাপ তৈরি করেছে। খবর শেষ মানে দোকানও বন্ধ। ফজরের আজান দিবে আফজাল, তাই তাড়াতাড়ি চলে যেত সে। অন্য সবাই থাকতো সংবাদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করার জন্য। হঠাৎ করে #মোহ_মুন্সী বলে উঠতো শালা খিস্টানেরা মুসলমানদের শেষ করে দিল। সবার মাঝেই সে কি উত্তেজনা সে সময়! রাজু ছোট মানুষ, তাই চুপ করে পাশে বসে থাকতো। গ্রামের মানুষদের নানামুখী গল্প তাকে বুদ করে রাখতো। যে সময়ে কাজ থাকতো না গ্রামে অনেকেই টাংগাইল, ঢাকা,চিটাগং এ কাজ করার জন্যে বেরিয়ে যেত। তাদের সেই জায়গাগুলোতে কাজ করার নানাদিক নিয়ে কথা হত। এরকম গল্প শুনতে শুনতে রাজু বিভোর হয়ে যেত। ভাবতো আমিও যদি ওদের সাথে কাজে যেতে পারতাম। আরো কত কল্পনা। এভাবে প্রকৃতি কিছুটা ঠান্ডা হলে সবাই নিজ ঘরে ফিরে যেত।
ছোট বেলা থেকেই রাজু গানের পাগল। অরফিয়াসের বাশির সুরের মত গানের সুর তাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতো। অবশ্য এর কারন আছে। মা, বড়ভাই, বোন সবাই যথেষ্ট ভালভাবে গান গাইতে পারার প্রভাব। সন্ধ্যায় খাবার পরে রাজু আফজালের দোকানে মুলত রেডিও তে গান শোনার জন্যে যেত। কিন্তু পৈত্রিক সুত্রে মসজিদের মুয়াজ্জিন হবার কারনে তার রেডিও তে কখনো গান বাজতো না। শুধু যে রাজুর গান শোনার ইচ্ছে ছিল তা নয়, রুহুল, সাত্তার, মতিন সবার খুবই মন চাইতো। কিন্তু নিরুপার!!!
বেশ কিছুদিন কেটে যায় এভাবে। গ্রামের ফকির নিয়ে আসে আফজালের চাইতে উন্নত #থ্রি_ব্যান্ড_রেডিও। মানুষ আফজাল থেকে মুখ ফেরাতে থাকে। ফকিরের রেডিও শোনার জায়গা হয় #কোলার_পাড়ের ব্রীজ। "#অনুরোধের_আসর_দুর্বার, #বাণিজ্যিক_কার্যক্রমের গান, #বিবিসি, #ভয়েস_অব_আমেরিকা শোনার জন্যে বিশাল জটলা শুরু হয় ব্রীজে।
গান, সংবাদ শুনতে শুনতে ভাল সময় কাটিছিল রাজুরও। সেবার ২০০২ সাল ক্লাস সিক্সে ওঠার পরে রাজুর মাঝে একটা তীব্র প্রত্যাশার জন্ম নেয়। তার চাই একটা নতুন #থ্রি_ব্যান্ড_রেডিও। কিন্তু কিভাবে? এই চিন্তাই তার মাথায় ঘুরপাক খেত সারাদিন রাত। সে জানতো মেজাজি বাপের কাছে এই দাবি মানে নিজেকে বেতের বারির মুখোমুখি দাড় করানো। আর মায়ের কাছে অত টাকা নেই। এভাবে চাওয়া, না পাওয়ার মাঝে অনেকদিন কেটে গেছে। একদিন রাজু এলাকায় এক ছাত্র-ছাত্রী কল্যান ফাউন্ডেশন এর পরীক্ষায় মেধা তালিকায় জায়গা করে নেয়। বিনিময়ে ৬০০ টাকা পেয়ে স্বপ্নে ভাসতে থাকে সে। সেদিন রাতে সে কি কল্পনা তার! পাশে মা নীরবে কাদে সন্তানের উচ্ছ্বাসে আর নিজের অক্ষমতায়। মহা কৌতূহলের রাত কেটে যায়, দিন আসে, আসে নতুন #থ্রি_ব্যান্ড_রেডিও।
বাপের কাছে পড়ালেখাই মুখ্য। বাপের কাছে পড়ালেখাই সব, অন্যকিছু করা মানেই ল্যাংটার দলে ভেড়া। একদিন বিকেল বেলা স্কুল থেকে বাসায় ফিরে সে শোনে শিক্ষক পিতা পুকুরে জলে রেডিওটিকে বিসর্জন দিয়েছেন।
সেদিন ভেংগে যায় এক শিল্পমন, ভেংগে যায় এক লালিত স্বপ্ন। অনন্ত হাহাকার চলতে থাকে প্রথম জীবনকার সেই #থ্রি_ব্যান্ড_রেডিও এর জন্যে। তাকে কে ফিরিয়ে দেবে তার কৈশরের সেই ভাংগা স্বপ্ন???
#শেখ_রাজু
২|
০৯ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ১১:০১
আকিব হাসান জাভেদ বলেছেন: বাস্তবিক গল্পটা স্মৃতির পাতায় আবার নিয়ে গেছে। আমার রেডিওটা ও আমার বাবা ভেঙ্গে ছিলো । যদিও পরে ভালো একটা কিনে দিয়েছে । ভালো লাগলো গল্পটা পড়ে । সুন্দর ।।
৩|
০৯ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ১১:১৩
মোঃ মঈনুদ্দিন বলেছেন: অসাধারণ! ঠিক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হবার মতো গল্প। আপনার গল্প পড়ে অভিভূত হলাম। ধন্যবাদ। লিখে চলুন সতত।
৪|
১০ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ৩:২৭
জুনায়েদ বি রাহমান বলেছেন: পুরানো দিনের স্মৃতি জাগানিয়া গল্প। মুগ্ধতা।
৫|
১০ ই জুলাই, ২০১৮ সকাল ১০:৩৩
রাজীব নুর বলেছেন: আপনার বাপ তো গ্রেট মানুষ।
৬|
১০ ই জুলাই, ২০১৮ দুপুর ১২:৪৭
আরাফআহনাফ বলেছেন: সুন্দর লিখেছেন - শুভেচ্ছা।
©somewhere in net ltd.
১|
০৯ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ১০:৫১
মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেছেন: সুন্দর।