নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনটা অন্যরকম হবার কথা ছিল!

শেরজা তপন

অনেক সুখের গল্প হল-এবার কিছু কষ্টের কথা শুনি...

শেরজা তপন › বিস্তারিত পোস্টঃ

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি হয়ে গেল বুঝি?’
অথচ আসল সত্য হলো, ঝাল না দিলে যে বস্তু মুখে তোলার অযোগ্য হতো, তা ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই এই লঙ্কাকাণ্ড! মুজতবা আলীর মত রসনাবিলাসী বাঙ্গালীর মনস্তত্ব নিয়ে আর এত গভীরভাবে কেউ ভেবেছেন বলে মনে হয় না।
তিনি এখানে ঝাল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বাঙ্গালীর হেঁশেলে ঝাল কিভাবে মহামারির মত ঢুকে পড়ল তার আদি রহস্য নিজের অজান্তেই উদ্ধার করে ফেলেছেন। বাঙ্গালী ললনারাই মুলত বিস্ব্বাদ রান্নাকে ঝাল দিয়ে ঠেসে খাদক, রসনাবিলাসী, খাদ্য রসিক পুরুষদের পেট দিয়ে 'হৃদয়ে হিট' করার গুহ্যতত্ত্ব আবিস্কার করেছেন।

জিভ অবশ করার মনস্তত্ত্ব (Psychological Weapon)
মুজতবা আলীর বিশ্লেষণ মতে, বেশি ঝাল দেওয়ার পেছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক খেলা কাজ করে:
ইন্দ্রিয় অচল করা: লঙ্কার কামড়ে জিভের স্বাদ গ্রহণকারী কোষগুলো (Taste Buds) যখন জ্বলেপুড়ে সাময়িক অচল হয়ে পড়ে, তখন খাবারের আসল সুস্বাদ বা বিস্বাদ বোঝার ক্ষমতা কারো থাকে না।

বাঙ্গালী নারীরা ভাল করেই জানে ঝাল তৃপ্তির ভ্রান্তি তৈরি: ঝাল খেয়ে চোখ-নাক দিয়ে জল পড়া এবং ‘আহা-উহু’ করাকে অনেক সময় ভুলেই "খুব দারুণ আর জমে যাওয়া রান্না" বলে চালিয়ে দেওয়া তাদের আরেক ভেলকি ।

বাঙ্গালী হেঁসেলে নারীরা থাকলেও তাদের কান থাকে খাবার ঘরে, কর্তা হাত পাখা চালাতে চালাতে অতিথিকে বার বার জিজ্ঞেস করছে, দাদা রান্না কেমন হয়েছে? আরেকটু দিই?
ওদিকে অতিথির মুখ বন্ধ করা: ঝালের চাপে অতিথি এতটাই কাবু হয়ে পড়েন যে, ঘামতে ঘামতে হাত আর মাথা নাড়েন; রান্নায় নুন কম হয়েছে নাকি মশলা কাঁচা রয়ে গেছে—সে কথা তোলার আর সুযোগ পায় না!

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা রম্যরসিক ও বহুভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলী বাঙালির খাদ্যাভ্যাস—বিশেষ করে ঝাল প্রীতি—নিয়ে বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনী দেশে-বিদেশে, রসাত্মক প্রবন্ধসংগ্রহ পঞ্চতন্ত্র এবং উপন্যাস শব্দনম-এ বাঙালির মরিচ ও ঝালপ্রেম নিয়ে একাধিক স্মরণীয় গল্প ও উক্তি রয়েছে।

‘দেশে-বিদেশে’: বাঙ্গালীর অন্তরে চিরদিনের জন্য গেঁথে যাওয়া সেই আফগানী বোকা-সোকা বিশালদেহী সেই মানুষটি আবদুর রহমান ও নিজের খাবারের অভ্যাসের মধ্য দিয়ে বাঙালি ও আফগানদের খাদ্যাভ্যাসের বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। কাবুলের প্রচণ্ড শীতে যখন আফগানরা চর্বিযুক্ত গোশত ও রুটি খেত, তখন লেখক (বাঙালি হিসেবে) কাঁচা মরিচের ঝাল ছাড়া তৃপ্তি পেতেন না।
আবদুর রহমান লেখকের জন্য বাজার থেকে কাঁচা লঙ্কা কিনে আনত। লঙ্কা খাওয়ার সেই বর্ণনা ও উদ্ধৃতি:
"কাবুলে কাঁচা লঙ্কা দুর্লভ জিনিষ। আবদুর রহমান কোথা থেকে যেন গণ্ডা দুই কাঁচা লঙ্কা জোগাড় করে নিয়ে এল। কাঁচা লঙ্কা দেখে আমার চোখ দিয়ে জল এসে পড়ল— ঝালের ভয়ে নয়, আনন্দে। বাঙালির ভাতের থালায় এক কোণে একটা সবুজ কাঁচা লঙ্কা না থাকলে যেন পঞ্চব্যঞ্জনও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
"আবদুর রহমান চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে দেখত আমি কেমন করে মুড়মুড় করে কাঁচা লঙ্কা চিবিয়ে খাচ্ছি। ওর ধারণা ছিল, এই বস্তু খেলে মানুষের পেট ছিঁড়ে যাবে কিংবা জিভ খসে পড়বে। কিন্তু বাঙালি যে ঝাল সহ্য করার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়, তা ওদের মতো শুকনো রুটি-গোশত খাওয়া জাতির পক্ষে বোঝা অসম্ভব।"
বাঙ্গালীর খাবারের গল্প এলে আলী সাহেবের উদ্ধৃতি দিতে দিতে দিন কাবার হবার যোগাড়
‘পঞ্চতন্ত্র’: সিলেটি ‘সাতকরা’ ও মরিচ-প্রেম
সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশের বাড়ি ছিল সিলেটে। সিলেটিদের ঝাল এবং বিশেষ প্রজাতি টেংরা/বোয়াল মাছের সাথে সাতকরা (একধরনের টক-ঝাল ফল) ও প্রচুর শুঁটকি-লঙ্কার তরকারি খাওয়ার বর্ণনা তিনি তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে লিখেছেন।

পঞ্চতন্ত্র এবং নানা প্রবন্ধে বাঙালির ঝাল খাওয়া ও জিভের আসক্তি নিয়ে তিনি লিখেছেন:

"বাঙালির রসনা এক আশ্চর্য বস্তু। দুনিয়ার আর কোনো জাতি ঝাল খেয়ে ‘আহা-উহু’ করে চোখের জল- নাকের জল এক করেও আবার সেই ঝালের দিকেই হাত বাড়ায় না। ঝাল বাঙালির কাছে কোনো যন্ত্রণা নয়, ঝাল হচ্ছে এক পরম অভিজ্ঞতা।"

ইউরোপীয়দের পানসে ও নুন-মরিচহীন খাবারের সাথে তুলনা করে তিনি চমৎকার রসিকতা করেছেন:
"সাহেবদের খাদ্যতালিকায় সস থাকতে পারে, কিন্তু তাতে আত্মাপুরুষ ঠাণ্ডা হয় বটে, জিব জ্যান্ত হয় না। জিবকে সত্যি সত্যি জাগিয়ে তুলতে হলে বাঙালির সেই লঙ্কা-বাটা কিংবা ঝাল-ঝোল ছাড়া অন্য গতি নেই।"

‘শব্দনম’: ঝাল ও কাবাবের যুগলবন্দী
শব্দনম উপন্যাসে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তরভারতের নানা মুখরোচক খাবারের ভিড়ে লেখক কিভাবে বাঙালি মন নিয়ে ঝালের খোঁজ করতেন, তা উঠে এসেছে।
"কাবুল বা পারস্যের রন্ধনশিল্প চমৎকার হতে পারে, কিন্তু সেখানে ‘ঝাল’ নামক মহৌষধটির বড্ড অভাব। বাঙালি পেটের ব্যামো কিংবা সর্দি-কাশি হলে যেমন ঝাল-ঝোল খেয়ে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে, এদের রান্নায় সে জাদু নেই।"
বাঙালির ঝালপ্রীতি নিয়ে খাদ্য রস-বিশারদ মুজতবা আলীর অন্যান্য পর্যবেক্ষণ
ঝাল খেয়ে অনেকে গর্ব করে। আমার বন্ধু তাহমিদ তাহেরের ফোচকা তে এমন ঝাল দিতে বলত যে, সেখানে আলু বুট আর সিদ্ধ ডিম খুচতে হোত মরিচের ফাঁকে ফাঁকে। আড্ডায় নতুন কেউ আসলেই সে তাকে সেই ফোচকা খাইয়ে ব্যাপক বিনোদিত হত।
বিয়ের পরে তার বিদেশ ফেরত এক শ্যালক তার নতুন দুলাভাইয়ের সাথে প্রত্যেকদিন আডদায় আসার বায়না ধরে উপায়ান্তর না দেখে একদিন বিশেষ একপ্লেট ফোচকা অফার করল; শ্যালক মহাশয় বিদেশ ফেরত- এমনিতেই তার বাইরের খাবার পেটে সয় না কিন্তু তাহমিদ মহা ত্যাদড়; তার এক কথা এই আডদায় স্থায়ী হতে হলে এখানকার ফোচকা খেতেই হবে, সাথে সাথে সবাই সেই সায় দেয়। অবশেষে বেচারা একপ্লেট ফোচকা খেয়ে হাসপাতালে শয্যাশায়ী হয়েছিল। আর কোনদিন সে আড্ডামুখো হয়নি- এখনো নাকি তার পেট জ্বলে।
আমার বন্ধুর এক বড় ভাইকে অতি সম্মান ও সমাদরের সহিত এই ঝাল ফোচকা খাওয়ানোর পরে সেই বড়ভাই তার কানে কানে বলেছিল ' তুমি তো মানুষ খুনের কেসে পড়বা মিয়া''
আমার বন্ধু টাক্কু মইনের নাকি টাক ফেটে গিয়েছিল সেই ঝাল খেয়ে।

আলী সাহেব এজন্যেই নাকি বলেছিলেন ঝাল খাওয়া বাঙ্গালীর মনস্তাত্ত্বিক আনন্দ: ঝাল খাওয়া বাঙালির কাছে কেবল খাদ্যের প্রয়োজন নয়, এটি এক ধরনের রোমাঞ্চ।
ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত কারণ: লেখক ঠাট্টা করে বলতেন যে, পূর্ববঙ্গের আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীর থেকে ঘাম ঝরিয়ে চাঙ্গা হওয়ার জন্য ঝাল ও লঙ্কার রস অপরিহার্য।
রাজস্থানের মরুভুমি অঞ্চলে কিছু অতি দরিদ্র মানুষের প্রায় সারা বছরের খাদ্য পেঁয়াজ আর শক্ত রুটি আর বিহারের দরিদ্রদের খাদ্য লবণ, মরিচ আর রুটি। তেমনি বাঙ্গালী কৃষকের আদি প্রিয় কিং অপ্রিয় খাদ্য পান্তাভাত পেঁয়াজ আর কয়েকখানা কাঁচা লঙ্কা।

আলী সাহেবের কাচা লঙ্কার খোঁচা এখান অবিও এসেছে- লঙ্কা ও কাঁচা পেঁয়াজের সংযোজন: ডাল-ভাতের সাথে কেবল একটি কাঁচা লঙ্কা ডলে নিলেই যে রাজভোগের তৃপ্তি পাওয়া যায়, তা বিশ্বের অন্য কোনো রন্ধনশৈলীতে বিরল।


বাংলা সাহিত্যের আরও বেশ কয়েকজন দিকপাল লেখক বাঙালির খাদ্যাভ্যাস, জিভের স্বাদ এবং বিশেষ করে ঝাল ও লঙ্কাপ্রীতি নিয়ে অত্যন্ত রসালো, মনোহর ও সরস মন্তব্য করেছেন

তবে সবার আগে কবিগুরুরুকে পেন্নাম করে নিই;

ঠাকুর সাহেব নিজে খুব হালকা খাবার পছন্দ করলেও বাঙালির ঝাল খাওয়া ও খাওয়ার আনন্দ নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও রসময়। হেমন্তবালা দেবী ও বিভিন্ন পত্রে তিনি খাবারের রসাল বর্ণনা দিয়েছেন। এছাড়া তাঁর ‘পঞ্চভূত’ প্রবন্ধসংগ্রহ এবং বিভিন্ন চিঠিপত্রে বাঙালির ঝাল ও মশলা খাওয়ার মানসিকতা নিয়ে মন্তব্য পাওয়া যায়:

"বাঙালির জিব কেবল স্বাদের জন্য নয়, অনুভূতির চরম সীমানায় পৌঁছানোর জন্য ঝালকে মাধ্যম করে নিয়েছে। যে-খাবারে চোখে জল আসে না, তা বাঙালির রসনাকে জাগাতে পারে না।"

আবার পারিবারিক স্মৃতিকথা ও চিঠিতে লঙ্কার ঝাল খাওয়া সম্পর্কে তাঁর সরস মন্তব্য:

"আমরা বাঙালিরা কেবল মুখে ঝাল খাই না, আমাদের রাগ, অনুরাগ এবং রসিকতার মধ্যেও লঙ্কামরিচের একটা তীব্র আভা থাকে। কাঁচা লঙ্কা কামড়ে ভাত না খেলে বাঙালির আহার যে অধুরা থেকে যায়, তা কোনো বিদেশী সাহেবকে বোঝানো দায়।"

আহা এই না হলে গুরু। এভাবে বাঙ্গালীর নাড়িতে হাত রেখে হৃদয়ের অলিতে গলিতে অনুসন্ধান আর ক'জন কবি সাহিত্যিক সঠিকভাবে করতে পেরেছেন বলুন তো?

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৮

নাহল তরকারি বলেছেন: বাঙালির খাবারে কাঁচা মরিচের উপস্থিতি যেন এক আলাদা আবেগ! ঝাল শুধু জিভের স্বাদ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির ঐতিহ্য, অভ্যাস ও রসনাবিলাস। চমৎকার রম্যরসাত্মক উপস্থাপনা।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.