| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

লঞ্চের নাম অগ্রদূত। সাদা ধবধবে ছিলো হয়তো এককালে কিন্তু এখনো কেমন মলিন হয়ে গেছে। যাত্রীদের গুঞ্জন পুরো লঞ্চঘাট জুড়ে। সকাল ৯টা বাজে। বেশ সুন্দর রোদ ঝলমলে এক সকাল। লঞ্চটি ধীরে ধীরে চলা শুরু করে দিয়েছে। লঞ্চে আজ মোটামুটি বেশ ভালোই যাত্রী হয়েছে। ধীরে ধীরে জলের বুকে চিড়ে এগিয়ে চলেছে অগ্রদূত। দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে তার গতি। গন্তব্য চাঁদপুর।
যাত্রীরা কেউ বসে আছে, কেউ ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করছে আর বাচ্চারা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। অভিভাবকরা যতই বাচ্চাদের চুপটি করে বসতে বলছে ততই যেনো তারা বেশি ছোটাছুটি করছে। এদের মধ্যে এক যাত্রী সালমা। তার কোলে তিন বছরের ছেলে মামুন। লঞ্চে ওঠার সময় মামুন ঘুমিয়ে ছিলো। হঠাৎ করে জেগে উঠে তারস্বরে চিৎকার করে কান্না শুরু করলো। সালমা তাকে চুপ করানোর অনেক চেষ্টা করলো তাও সে কান্না থামায় না। আশেপাশের লোকেরা সালমার দিকে বিরক্তির দিকে তাকাতে লাগলো। সালমা এতে কিছুটা বিব্রতবোধ করতে লাগলো এবং আরো ভালোমতো আদর করে ছেলের কান্না থামানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
পাশ থেকে একজন লোক এগিয়ে আসে মামুনকে চকলেট, আইসক্রিম, চিপস ইত্যাদির দিবে বলে কান্না থামানোর বৃথা চেষ্টা করে তার আগের জায়গায় ফিরে গেলো। সালমার মেজাজ হঠাৎ করে গরম হয়ে গেলো সে মামুনকে ধমক দিয়ে চুপ করতে বললো। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ধমকের ঠেলায় মামুনের কান্না আরো দ্বিগুণ হয়ে গেলো। মামুনের কান্নার যন্ত্রণায় তাকে ঘিরে লোকজন দাঁড়িয়ে বাচ্চা চুপ করানোর নানা রকম পরামর্শ দিতে লাগলো। কিন্তু কোনটিতেই কোনো কাজ হচ্ছিল না। সালমা কি করবে কিছু বুঝতে পারছিলো না। কোনো উপায় না দেখে সে বলে উঠলো, ‘এই চুপ, একদম চুপ। কাঁদলে পানির রাক্ষসের কাছে তোকে দিয়ে দেবো। পানিতে ফেলে দেবো তোকে তারপর তোকে পানির রাক্ষস খেয়ে ফেলবে’। এই বলে লঞ্চের রেলিংয়ের কাছে মামুনকে ফেলে দেয়ার ভয় দেখাতে মামুন একেবারে চুপ মেরে গেলো। চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে বেশ ভয় পেয়েছে। চোখ বড় বড় করে পানির দিকে সে তাকিয়ে রইলো। সবার মাঝে যেনো হঠাৎ করে শান্তি ফিরে আসলো। সবাই হাফ ছেড়ে যার যার স্থানে ফিরে গেলো।
চলতে চলতে অগ্রদূত দুলে উঠলো এবং দাঁড়িয়ে পড়লো যেনো লঞ্চটা কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেছে। অনেকেই বেশ ভয় পেয়ে গেলো এবং চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলো। লঞ্চের কর্মচারীরা ভালোমতো আশেপাশে দেখে নিলো কিন্তু এমন কিছুই দেখতে পেলো না যা লঞ্চের গতি রোধ করে রেখেছে। সবাইকে চমকে দিয়ে এক গুরুগম্ভীর আওয়াজ ভেসে আসলো। কে যেনো বলছে, ‘বাচ্চাটাকে পানিতে ফেলে দাও, বাচ্চাটাকে পানিতে ফেলে দাও’। বার বার একই কথা বলে যেতে লাগলো সেই অদৃশ্য স্বত্তা। প্রথমে অনেকেই ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। পরে সবার মনে পড়লো মামুন ও সালমার কথা। এই সেই বাচ্চা যার কথা বলা হচ্ছে গায়েবী আওয়াজে। সালমার বুকটা ধ্বক করে উঠলো। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারলো না কি ঘটছে। হঠাৎ করে আওয়াজ থেমে গেলো। সবাই কানাঘুষা শুরু করে দিলো। সবার চোখে ভয় উঁকি দিচ্ছে। আবার গায়েবী আওয়াজ ভেসে আসলো, ‘বাচ্চাকে না দিলে লঞ্চ ডুবে যাবে। কেউ বাঁচবে না, সবাই মরবে। জলদি বাচ্চাটাকে দাও’। কথার রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই লঞ্চ ভয়ানক ভাবে দুলতে লাগলো। যাত্রীরা সবাই ভয়ে হাতের সামনে যে যা পাচ্ছে তাই আঁকড়ে ধরে নিজেদের পতন ঠেকাল। যারা কোনো অবলম্বন পেলো না তারা চিৎপটাং হয়ে পড়লো মেঝের ওপর। দুলুনি থেমে লঞ্চ আবার স্থির হয়ে গেলো।
সবাই গিয়ে সালমাকে ঘিরে ধরলো। তাকে সবাই বোঝাতে লাগলো। একজনের জন্য এতজনের প্রাণ বাঁচবে, সবার জীবন বাঁচানোর জন্য আপনার ছেলেকে উৎসর্গ করে দিন, আপনার ছেলের জন্য এতগুলো মানুষের প্রাণ বিপন্ন করবেন, জলদি করে বাচ্চাটারে পানিতে ফেলে দেন, বাচ্চাটার জন্য কি আমরা এতগুলা মানুষ মরমু নাকি ইত্যাদি নানা ধরণের কথায় সালমার কান ঝালাপালা হবার দশা। সে মামুনকে শক্ত করে বুকের মধ্যে আগলে রাখলো। এযে তার নাড়ি ছেঁড়া ধন। তার একমাত্র ছেলে। মা হয়ে কি করে সে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিবে। কিছু লোক মামুনকে তার কোল থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইলো। কোনোমতেই সে মামুনকে হাতছাড়া করলো না। মামুনও বেশ ভয় পেয়েছে, সেও তার কচি দুহাতে তার মাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। জাহাজ আবার দুলে উঠলো এবং সেই একই কথা আবার ভেসে আসলো তবে এবারের কন্ঠে বেশ রাগের প্রকাশ শোনা গেলো। জাহাজের দুলুনি থামতেই তিন-চারজন মিলে জোর করে সালমার কাছ থেকে মামুনকে নিয়ে পানিতে ফেলে দিলো। মামুন চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে পানিতে পড়ার সাথে সাথে উধাও হয়ে গেলো। একটিবারের জন্যেও ভেসে উঠলো না। সালমাও পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলে তাকে অন্যেরা আটকে রাখল।
লঞ্চের ইঞ্জিনের আওয়াজ শোনা গেলো এবং ধীরে ধীরে অগ্রদূত আবার এগিয়ে চলল। সবার মুখে হাসি ফিরে এলো কিন্তু একজনের মুখে এলো না। হাহাকার করতে লাগলো সালমা। তাকে ধরে রাখতে না পেরে শেষ পর্যন্ত এক থামের সাথে বেঁধে রাখা হলো। মামুনের জন্য কিছুটা দুঃখ আর বেঁচে ফেরার আনন্দ নিয়ে সবাই যার যার বাড়ি ফিরে গেলো। কিন্তু সালমার মনে নেই আনন্দ। সে হয়ে গেছে বদ্ধ পাগল। পুত্রশোকে সে লঞ্চঘাটে ঘুরে বেড়ায় আর মামুন মামুন বলে ডেকে বেড়ায়। চাঁদপুরের লঞ্চঘাটে গেলে হয়তো কেউ কেউ দেখা পেয়েও যেতে পারেন এই পাগলী সালমার।
ধৈর্য ধরে গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। গল্পটি ভালো লাগলে জানাবেন। গল্পটি আমার ওয়েবসাইট অনুগল্পে প্রকাশ করা হয়েছে বেশ আগে। আরও গল্প পড়তে চাইলে নিচের লিঙ্ক থেকে ঘুরে আসতে পারেন অনুগল্পে।
জলে বিপদ - অনুগল্প
২|
১৫ ই মার্চ, ২০১৮ রাত ৯:৪৭
রাজীব নুর বলেছেন: লিংক তো কাজ করে না।
১৫ ই মার্চ, ২০১৮ রাত ৯:৫৬
সৈয়দ হাসান মাহমুদ তন্ময় বলেছেন: লিঙ্ক ঠিক করে দিলাম। এবার দেখতে পারবেন।
https://goo.gl/ncaMtd
৩|
১৫ ই মার্চ, ২০১৮ রাত ১১:২৬
আবু তালেব শেখ বলেছেন: গল্প হলেও বাস্তব উপলদ্ধি করলাম
১৬ ই মার্চ, ২০১৮ রাত ১২:৫১
সৈয়দ হাসান মাহমুদ তন্ময় বলেছেন: মন্তব্যটি ভালো লাগলো। ধন্যবাদ।
©somewhere in net ltd.
১|
১৫ ই মার্চ, ২০১৮ রাত ৮:৫৩
প্রামানিক বলেছেন: কষ্টের কাহিনী