| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
Sujon Mahmud
কারো যদি গোপন সাফল্যের চাবিকাঠি থাকে, তাহলে সেটা থাকে তার অন্যের কথার দৃষ্টাকোণ আর নিজের দৃষ্টি কোণ বুঝে নেওয়ার মধ্যে।।
রফিকের সকালটা কখনোই সূর্যের আলো দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় চিন্তার অন্ধকার দিয়ে। অ্যালার্ম বাজে ভোর ছয়টায়, কিন্তু তার আগেই ঘুম ভেঙে যায়—কারণ মাথার ভেতর হিসাব কষা চলতেই থাকে। আজকের বাজার, বাচ্চার স্কুলের ফি, মায়ের ওষুধ—সব মিলিয়ে মাসের শেষের আগেই টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়।
রফিক একটা ছোট কোম্পানিতে চাকরি করে। বেতন খুব বেশি না, ঠিক এতটুকুই—যাতে মাসের শেষে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এবার হয়তো একটু স্বস্তি মিলবে। কিন্তু সেই স্বস্তি কখনো আসে না। মাসের ২০ তারিখ পেরোতেই তার পকেট ফাঁকা হয়ে যায়, আর তখন থেকেই শুরু হয় টানাটানির আসল গল্প।
তার স্ত্রী সালমা খুব বেশি কিছু চায় না। তবুও মাঝে মাঝে যখন পাশের বাসার কারও নতুন শাড়ি বা নতুন ফ্রিজ দেখে, তখন তার চোখে এক ধরনের চাপা ইচ্ছা খেলা করে। সে কিছু বলে না, শুধু চুপচাপ রান্না করে, বাচ্চাকে খাওয়ায়, আর রাতে ঘুমানোর আগে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
রফিক সব দেখে, সব বোঝে। কিন্তু কিছুই করতে পারে না।
একদিন রাতে খাওয়ার সময় তাদের ছোট ছেলে রায়হান বলল, বাবা, আমার ক্লাসের সবাই কোচিংয়ে যায়, আমি কি যেতে পারব না
রফিক থমকে গেল। মুখে ভাত তুলতে গিয়েও থেমে গেল তার হাত। ছেলের চোখে একরাশ আশা। সেই আশার সামনে নিজের অসহায়তা লুকানো কত কঠিন, সেটা শুধু সে-ই জানে।
সে হাসার চেষ্টা করে বলল, অবশ্যই পারবি বাবা, একটু সময় দে
কিন্তু সে জানে, এই সময়টা হয়তো আর আসবে না।
রফিকের শিক্ষাগত যোগ্যতা খারাপ না। সে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে ভালো রেজাল্ট নিয়ে। অনেক জায়গায় আবেদন করেছে, ইন্টারভিউ দিয়েছে, কিন্তু ভাগ্য যেন তার সাথে কখনোই মেলে না। প্রতিবারই শুনতে হয়—আমরা পরে জানাবো। সেই পরে আর আসে না।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে তার দেখা হলো পুরনো এক বন্ধুর সাথে। বন্ধুটা এখন ভালো একটা চাকরি করে, গাড়ি আছে, ফ্ল্যাট আছে। গল্প করতে করতে হঠাৎ বন্ধু বলল, তুই তো অনেক ভালো স্টুডেন্ট ছিলি, এই অবস্থায় কিভাবে
রফিক হাসল। সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে ছিল অসংখ্য ব্যর্থতা আর অপ্রকাশিত কষ্ট।
সে বলল, জীবন সবার জন্য একরকম হয় না রে
রাতে বাসায় ফিরে দেখে, তার মা চুপচাপ বসে আছেন। জিজ্ঞেস করতেই মা বললেন, ওষুধ শেষ হয়ে গেছে, কাল আনতে হবে
রফিক মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে
কিন্তু সে জানে, পকেটে এখন যা আছে, তা দিয়ে সব কিছু একসাথে মেটানো সম্ভব না। সে রাতভর ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবতে থাকে, কোথায় ভুল করল সে
পরদিন সকালে সে সিদ্ধান্ত নেয়—সে হার মানবে না। হয়তো বড় কিছু করতে পারবে না, কিন্তু চেষ্টা বন্ধ করবে না। অফিসের পর সে নতুন করে কাজ খোঁজা শুরু করে, ছোট ছোট ফ্রিল্যান্স কাজ নেয়, রাতে ঘুম কমিয়ে দেয়।
সালমা একদিন জিজ্ঞেস করল, এত কষ্ট করছো কেন
রফিক বলল, আমি চাই না রায়হান আমার মতো হোক
এই একটাই কথা তাকে প্রতিদিন নতুন করে শক্তি দেয়।
জীবন তাকে খুব বেশি কিছু দেয়নি, কিন্তু সে এখনো লড়ছে। কারণ সে জানে, তার হার মানা মানে পুরো একটা পরিবার ভেঙে পড়া।
এই শহরের হাজারো রফিকের মতোই, সে প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে। কোনো বড় স্বপ্ন নয়, শুধু একটা স্বাভাবিক জীবন—এই চাওয়াটুকুই যেন সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে তার জন্য।
তবুও সে থামে না। কারণ তার চোখে এখনো একটুখানি আশা বেঁচে আছে। আর সেই আশাটুকুই তাকে প্রতিদিন আবার শুরু করার সাহস দেয়।
©somewhere in net ltd.